দিল্লি না ঢাকা: লাভ হেইট রিলেশনশিপ! 

আমার ছেলে যেহেতু দার্জিলিং পড়ে, ২০২৩ সাল থেকে আমাকে নিয়মিত ভারত যেতে হয়। এই যাওয়াটা ভ্রমণ নয়। কখনও কখনও এমন হয়েছে ছেলেকে স্কুলে রেখে পরদিনই ফিরে এসেছি। ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারাও অবাক হয়েছেন।

এর আগে ২০১৯ সালে আমি কলকাতায় গিয়েছিলাম বেড়ানোর উদ্দেশ্যে। সেবারে কলকাতার নিউ মার্কেটে ঢু মেরেছিলাম। এত ভিড় যে ভেতরে ঢুকতেই পারিনি। কোনোমতে দুই-তিনটা দোকান দেখেই বের হয়ে আসতে বাধ্য হয়েছি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে যখন গেলাম, এত ফাঁকা-এত ফাঁকা যে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। মারকুইস স্ট্রিটে তেমন ভিড় নেই। হোটেলগুলো ফাঁকা। তাদের নাকি ব্যবসায়ে মন্দা চলে।

আমরা ছেলের কাছে সাধারণত যাই বুড়িমাড়ি-চ্যাংড়াবান্দা বন্দর দিয়ে। ইমিগ্রেশনে ভীষণ কড়াকড়ি। দুই দেশ থেকেই। তবে ওপারে গেলেই পরিচিতদের হাহাকার। তাদের ব্যবসা খারাপ যাচ্ছে। যে বন্দর দিয়ে আগে হাজার হাজার মানুষ পারাপার হতেন, সেই বন্দর দিয়ে এখন যাচ্ছেন দিনে ১০/১২ জন। গাড়িচালকরা বেকার হয়ে পড়ছেন। করোনার সময়েও নাকি তাদের এত খারাপ পরিস্থিতি আসে নাই। আমি মাঝে মাঝে তাদের বলতাম, ‘ভিসা তো আপনাদের সরকার বন্ধ রাখছে। আপনারা এ জন্য আন্দোলন করতে পারেন!’ তো তারা দেখি সে কথায় হাসে। আসলে আমরা তো আন্দোলন-বিক্ষোভের মানুষ। এ দেশে তো কথায় কথায় বিক্ষোভ হতে দেখছি। আমার মাথায় তাদের জন্য এছাড়া আর কোনও সান্ত্বনাবাণী আসে না!

অথচ দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েনের কারণে ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ভারতের ব্যবসায়ীদের প্রায় এক হাজার কোটি রুপি ক্ষতি হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এরপরও তাদের মধ্যে বড় ধরনের কোনও ক্ষোভ দেখিনি। তবে সরকারের ওপর কিছুটা চাপ নিশ্চয়ই ছিল। অবশ্য অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ভারত বারবারই বলেছে, এ দেশে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলেই সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখবে তারা।

এরপর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের প্রায় দুই মাস পর ভারতীয় দূতাবাসের ১৮তম হাইকমিশনার হিসেবে এলেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ দীনেশ ত্রিবেদী। আর গত ২৮ জুন থেকে বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা খুলে দেওয়া হলো। খোলার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মাত্র পাঁচটি কেন্দ্রে জমা পড়েছে এক লাখ ৪০ হাজারের বেশি আবেদন। সার্ভারও ডাউন হয়ে গিয়েছিল! 

এখন আমার প্রশ্ন, এটা কী হলো ভাই? অল্প কিছু দিন আগেও আপনারা দিল্লি না ঢাকা স্লোগান দিয়ে রাজপথ কাঁপিয়ে দিয়েছেন। ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাক দিয়েছেন। ভারতে যাবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করেছেন। এখন এমনভাবে হুমড়ি খেয়ে পড়তে হলো কেন, যাতে তাদের সার্ভারই ডাউন হয়ে গেলো!

ভিসা সংক্রান্ত আপডেটগুলো জানার জন্য ২০২৩ সাল থেকেই ফেসবুকের কয়েকটা গ্রুপে অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। এছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায়ই আমি ভারতকে তুলোধুনা করা স্ট্যাটাস ও কমেন্ট দেখি। আর এরপর ভিসা খুলে দেওয়ার সাথে সাথে এই হুমড়ি খাওয়া দেখে রীতিমতো লজ্জিত হচ্ছি। তাহলে ভারতবিদ্বেষ কি শুধুই সোশ্যাল মিডিয়ায় ছিল? মিছিলে আর রাজপথে ছিল? লোক-দেখানো ছিল? ভারতবিদ্বেষকারী আর ভিসা আবেদনকারীর এই বিপুল সংখ্যার বৈপরীত্য অনেকের মনেই প্রশ্ন তুলতে পারে—এ কেমন মানসিকতা আমাদের?

সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় এ ধরনের আচরণকে ‘লাভ-হেইট রিলেশনশিপ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এ দেশের মানুষ ভারতের নীতি বা তাদের সরকারের একপাক্ষিক আচরণের তীব্র বিরোধী হতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিগত প্রয়োজনে তারা ভারতের সুযোগ-সুবিধাকে বেছে নিতে দ্বিধা করে না। যখন কোনও মাধ্যম বা সুযোগ বন্ধ থাকে, তখন ক্ষোভ থেকে দুর্নাম বা বয়কটের ডাক আসে। কিন্তু বাস্তবতা যখন সামনে আসে, তখন প্রয়োজনের কাছে আবেগ হেরে যায়।

মনোবিজ্ঞানে একে জ্ঞানগত দ্বন্দ্ব বলা হয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে দুটি পরস্পরবিরোধী বিশ্বাস ধারণ করতে পারে। যেমন- ভারতের বর্তমান নীতির বিরোধিতা করি। আবার আমার সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা কিংবা ব্যবসার জন্য ভারতই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত গন্তব্য। এই দ্বন্দ্ব মানুষ বিভিন্নভাবে সমাধান করে। কেউ বলে, সরকারকে অপছন্দ করি, দেশটাকে নয়। কেউ বলে যাওয়ার প্রয়োজন আছে, কিন্তু সমর্থন করি না। অর্থাৎ নিজের সিদ্ধান্তকে নিজের কাছেই গ্রহণযোগ্য করে তোলে।

রাজনৈতিক অবস্থান অনেক সময় প্রতীকী। আর জীবন চলে ব্যবহারিক বাস্তবতায়। ফেসবুকে ভারতবিদ্বেষী পোস্ট দেওয়া সহজ। কিন্তু মায়ের চিকিৎসা, সন্তানের উচ্চশিক্ষা কিংবা ব্যবসার প্রয়োজন সামনে এলে মানুষ বাস্তবতার কাছেই ফিরে আসে। ফলে রাজনৈতিক পরিচয় আর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত এক জিনিস থাকে না।

সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের আবেগকে অনেক বেশি তীব্র করে তোলে। অনলাইনে মানুষ এমন ভাষা ব্যবহার করে, যা বাস্তব জীবনে করতো না। মনোবিজ্ঞানে একে অনলাইনে ‘আত্মসংযম শিথিল হওয়ার প্রবণতা’ বলা হয়। স্ট্যাটাস বা কমেন্ট বক্সে যে ভারতবিদ্বেষ চোখে পড়ে, বাস্তব জীবনে সেই মানুষটিই হয়তো ভারতীয় ভিসার আবেদন করছেন। ভার্চুয়াল পরিচয় আর বাস্তব আচরণের মধ্যে তাই বড় ফারাক থেকে যায়।

এছাড়া যখন দিল্লি না ঢাকা? ঢাকা, ঢাকা—রাজপথে এমন স্লোগান ওঠে, যখন ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাক ওঠে, তখন অনেকেই না বুঝে কেবল স্রোতে গা ভাসানোর জন্য বা দলছুট হওয়ার ভয়ে সেই স্লোগানে সুর মেলায়। এ ধরনের গণআবেগকে মনোবিজ্ঞান ও আচরণবিজ্ঞানে ‘ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট’ বলা হয়। কিন্তু এই সম্মিলিত উন্মাদনার স্থায়িত্ব খুব কম হয়। উন্মাদনার মেঘ কেটে গেলেই মানুষ তার ব্যক্তিগত স্বার্থ ও যুক্তিবোধে ফিরে আসে।

ভারত বড় দেশ। সুযোগ-সুবিধা বেশি। আমরা অবচেতন মনে এক ধরনের ‘ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স বা হীনম্মন্যতায়’ ভুগি? আমরা যখন দেখি আমাদের চিকিৎসা, শিক্ষা বা বিনোদনের জন্য অন্য বড় দেশের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, তখন আমাদের আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগে? নির্ভরশীলতার লজ্জা ঢাকতে মানুষ অনেক সময় বিদ্বেষমূলক আচরণ করে। এটা আসলে নিজের দুর্বলতাকে আড়াল করার একটা মনস্তাত্ত্বিক ঢাল।

বাংলাদেশে ভারত-বিরোধিতা সবসময়ই ভোটের রাজনীতিতে একটি জনপ্রিয় ‘কার্ড’। একদল ভারতের জুজু দেখিয়ে জাতীয়তাবাদ চাঙা করতে চায়। অন্য দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকে অতি-ভারত প্রীতির। বিগত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি ক্ষোভের একটা বড় অংশ গিয়ে পড়েছিল দিল্লির ওপর। সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল—দিল্লি বাংলাদেশের জনগণের চেয়ে একটি নির্দিষ্ট দলকে বেশি সমর্থন দিচ্ছে। ‘দিল্লি না ঢাকা’ স্লোগানটি আসলে সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদার প্রতীকী লড়াই ছিল, কোনও সাধারণ ভারতীয় নাগরিকের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত বিদ্বেষ নয়।

ভারতের সঙ্গে আমাদের প্রায় চার হাজার কিলোমিটারের বেশি সীমান্ত। দেশের মধ্যে পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে যাওয়া এবং অবস্থান অনেকটাই ব্যয়বহুল। অথচ সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ওদেশে বেড়াতে বা চিকিৎসার জন্য যাওয়াটা সহজ ও সাশ্রয়ী। যেমন- যশোরের মানুষের কাছে ঢাকায় চিকিৎসা ব্যয়ের চেয়ে কলকাতার চিকিৎসা ব্যয় কম। আবার পঞ্চগড়ের মানুষের কাছে কক্সবাজারের চেয়ে দার্জিলিং যাওয়াটা সহজ। এই ভৌগোলিক সত্যকে কোনও রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

এছাড়া হাজার হাজার শিক্ষার্থী ভারতের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। পাশাপাশি কাপড়ের ব্যবসা, কাঁচামাল আমদানি বা পাইকারি ব্যবসার জন্য ভারতের ওপর দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা নির্ভরশীল। সমাজবিজ্ঞানের যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ শেষ পর্যন্ত এমন সিদ্ধান্তই নেয়, যেটিকে তার কাছে সবচেয়ে লাভজনক মনে হয়। রাজনৈতিক অবস্থান, আবেগ কিংবা পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ হলেও চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা কিংবা সন্তানের ভবিষ্যতের প্রশ্ন এলে মানুষ লাভ-ক্ষতির বাস্তব হিসাবকেই অগ্রাধিকার দেয়।

দুদেশের মধ্যে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলেও অবৈধ অভিবাসন, সীমান্ত হত্যা, নদীর পানিবণ্টনসহ নানা ইস্যুতে সম্পর্ক এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। তারপরও ভিসা চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে বিপুল আবেদন জমা পড়লো, তা মনে করিয়ে দেয়—রাজনীতি অনেক সময় রাষ্ট্রের সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু মানুষের প্রয়োজনকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ফলে ভারতবিরোধিতা এ দেশের মানুষের একটি রাজনৈতিক ও আবেগীয় অবস্থান। কিন্তু ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুই দেশের মানুষ একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। আমরা ক্ষোভ দেখাই সামষ্টিক আবেগে। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিই ব্যক্তিগত প্রয়োজনে। রাজনীতির স্লোগান দিয়ে হয়তো ক্ষণিকের জন্য বুক ফোলানো যায়, কিন্তু দিনশেষে মানুষ বাস্তবতার কাছেই নতজানু হয়।

লেখক: সাইকোলজিস্ট