মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারপারসন নির্বাচনের বিষয়ে একটি প্রস্তাব 

কাওসার আহ্‌মেদ
০২ জুলাই ২০২৬, ১২:০০আপডেট : ০২ জুলাই ২০২৬, ১২:০০

সম্প্রতি বাতিল করা ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এ কমিশনের আর্থিক স্বায়ত্তশাসন, স্বাধীন তদন্ত কাঠামো এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতাসহ দীর্ঘ-প্রতীক্ষিত বেশ কিছু সংস্কার উঠে এলেও একটি মৌলিক প্রশ্ন উপেক্ষিত থেকে গেছে, আর তা হলো—জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারপারসন নিয়োগ পদ্ধতি। যেহেতু উক্ত অধ্যাদেশটি অংশীজনদের সঙ্গে অধিকতর পরামর্শ ও যাচাই-বাছাইয়ের উদ্দেশ্যে ইতোমধ্যে রহিত করা হয়েছে, তাই এখন আমাদের সামনে কমিশনের চেয়ারপারসন নিয়োগ পদ্ধতি পুনর্মূল্যায়ন করার একটি সুযোগ এসেছে, যাতে এ বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়। প্রসঙ্গত, বিভিন্ন সময়ে সঙ্গত কারণেই জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। উক্ত প্রেক্ষাপটে, এই লেখার আলোচ্য বিষয় প্রাসঙ্গিক বলে বিবেচিত হতে পারে।

উল্লেখ্য, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯ অনুযায়ী কমিশন গঠিত হবে সর্বোচ্চ সাত জন সদস্যের সমন্বয়ে, যথা একজন সার্বক্ষণিক চেয়ারম্যান, একজন পূর্ণকালীন সদস্য এবং অবশিষ্ট অবৈতনিক সদস্যরা। এই আইনে শুধু চেয়ারম্যান (পরবর্তীকালে ‘চেয়ারপারসন’ হিসেবে উল্লিখিত) এবং পূর্ণকালীন সদস্য কমিশনের নির্বাহী ক্ষমতা ও পদমর্যাদার অধিকারী হয়েছেন। অপরদিকে, কমিশনের অবৈতনিক সদস্যদের নিয়োগ ও কার্যক্রমের ধরন অস্থায়ী ও খণ্ডকালীন প্রকৃতির এবং আইনে তাঁদের জন্য কোনও প্রাতিষ্ঠানিক পদমর্যাদা নির্ধারণ করা হয়নি।

বলার অপেক্ষা রাখে না, কমিশন সদস্যদের মধ্যে ক্ষমতা ও মর্যাদার এই ভারসাম্যহীনতা বহুলাংশে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর কমিশন প্রতিষ্ঠার অন্তরায় হিসেবে কাজ করেছে। কমিশনের কার্য-নির্বাহের দায়িত্ব ‘পদমর্যাদা সম্পন্ন’ মুষ্টিমেয় সদস্যদের ওপর ন্যস্ত হওয়ায় এবং ‘পদমর্যাদাহীন’ সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সাথে কমিশনের কার্যক্রমের সীমিত সম্পৃক্ততার ফলে অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক দক্ষতা ও স্বচ্ছতা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নীত হতে পারেনি। কারণ, মানবাধিকার কমিশনের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্মপরিধি এতটাই বিস্তৃত যে, তা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রের প্রায় সব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত— ফলে অস্থায়ী ও খণ্ডকালীন সদস্যদের পক্ষে এসব দায়িত্ব দক্ষতা ও সময়োপযোগিতার সঙ্গে পালন করার ক্ষেত্রে যথাযথ অবদান রাখা সম্ভবপর নয়।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য, অন্যান্য অনেক কমিশনের কর্মপরিধি মানবাধিকার কমিশনের তুলনায় অপেক্ষাকৃত সীমিত হওয়া সত্ত্বেও সেসব কমিশনের সকল সদস্যই পূর্ণকালীন ভিত্তিতে নিয়োজিত থাকেন। জানা মতে, বাংলাদেশে মানবাধিকার কমিশনই একমাত্র রাষ্ট্রীয় কমিশন, যার সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য অস্থায়ী ও খণ্ডকালীন ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত।

প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, উপরিউক্ত পরিস্থিতির পেছনে আরও দুটি কারণের ভূমিকা রয়েছে: (১) কমিশনের নির্বাহী পদে প্রজাতন্ত্রের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়োগ; এবং (২) কমিশন সভায় মন্ত্রিসভাসুলভ আচরণের অনুকরণ, যেখানে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে চেয়ারপারসন যেন কার্যত প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন এবং প্রত্যেক সদস্যের কাছ থেকে তাঁর সঙ্গে সহমতের প্রত্যাশা করেন। ফলে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কমিশনের অভ্যন্তরে অংশগ্রহণমূলক ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির তুলনামূলক অনুপস্থিতি সহজেই অনুমেয়।

এমতাবস্থায়, ২০০৯ সালের আইনে নির্দেশিত কমিশন সদস্যদের মধ্যে দায়িত্ব, ক্ষমতা ও মর্যাদার এই অপ্রয়োজনীয় বিভাজন দূর করা গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হিসেবে পরিগণিত হওয়ার কথা ছিল।

উল্লেখ্য, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫-এ কমিশনের গঠন সংক্রান্ত পূর্বোল্লিখিত বেশ কয়েকটি অসঙ্গতি সমাধান করা হলেও চেয়ারপারসনের নিয়োগ ও পদমর্যাদা-সংক্রান্ত বিধানগুলো কম-বেশি অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।

যেমন- ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে একজন চেয়ারম্যান ও চারজন পূর্ণকালীন সদস্যের সমন্বয়ে কমিশন গঠন করার কথা বলা হয়েছে। আবার, একই অধ্যাদেশে চেয়ারপার্সনের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারকের পদমর্যাদার সমতুল্য নির্ধারণ করা হলেও, অন্যান্য কমিশনার বা সদস্যদের ক্ষেত্রে তা হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকের পদমর্যাদার অনুরূপ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে কমিশনের গঠন-পদ্ধতিতে পূর্ববর্তী জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯-এর তুলনায় কিছু পরিবর্তন আনা হলেও চেয়ারপারসনের নিয়োগ, পদমর্যাদা ইত্যাদি বিষয়ে পূর্বতন আইনের ছাপ লক্ষ করা যায়।

উল্লেখ করা প্রয়োজন, প্যারিস নীতিমালা অনুযায়ী, কোনও দেশের মানবাধিকার কমিশনের দায়িত্ব হলো— মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সম্পর্কে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং প্রয়োজনবোধে এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান সম্পর্কে মতামত প্রদান করা। এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের জন্য কমিশনের সরকারের প্রভাবমুক্তভাবে স্বাধীনভাবে কাজ করার মানসিকতা ও সক্ষমতা থাকতে হবে। বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বলা যায়, সরকারের অনুগত ব্যক্তিদের মধ্য থেকে চেয়ারপারসন নিয়োগ ও বাকি কমিশনার বা সদস্যদের তুলনায় তাঁকে উচ্চতর মর্যাদা প্রদান, এবং কমিশনের অভ্যন্তরে মন্ত্রিসভায় অনুসৃত ক্ষমতার স্তরবিন্যাস অনুযায়ী আচরণের অনুকরণ– যা চেয়ারপারসনের মাধ্যমে কমিশনের ওপর সরকারের প্রভাব বিস্তারের পথ করে দেয়। যেহেতু প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তারা সরকারের সন্তোষ অনুযায়ী চাকরিতে বহাল থাকেন, তাই তাঁদের মধ্যে সরকারের প্রতি অনুগত থাকার একটি সহজাত প্রবণতা তৈরি হয়। এ প্রেক্ষাপটে, আইনে প্রজাতন্ত্রের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কমিশনের চেয়ারপারসন তথা কমিশনার বা সদস্য পদে নিয়োগ নিরুৎসাহিত করা উচিত। একই সঙ্গে, আমি মনে করি যে কমিশনার বা সদস্যদের মধ্য থেকেই চেয়ারপারসন নির্বাচন করার বিধান করা উচিত, অথবা তাঁদের মধ্য থেকে পর্যায়ক্রমে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য একজন করে সভাপতি নিয়োগ করা যেতে পারে।

সামগ্রিকভাবে, কমিশনার বা সদস্যদের মধ্য থেকেই চেয়ারপারসন নির্বাচন অথবা তাঁদের মধ্য পর্যায়ক্রমে সভাপতি নিয়োগের বিধান প্রবর্তন করা হলে সরকারের পক্ষ থেকে অনুগত ব্যক্তিকে চেয়ারপারসন হিসেবে নিয়োগের মাধ্যমে কমিশনের ওপর প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা হ্রাস পাবে বলে আশা করা যায়। এর ফলে, মানবাধিকার কমিশনের অভ্যন্তরে সমতার ভিত্তিতে যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে উঠবে এবং কমিশন একটি শক্তিশালী, নিরপেক্ষ ও স্বাধীন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে মানবাধিকার রক্ষা ও প্রসারে যথোপযুক্ত ভূমিকা পালন করতে পারবে ।

উদাহরণস্বরূপ, জাতিসংঘের প্রায় সকল অঙ্গসংস্থায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিদের মধ্য থেকে নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সভাপতি নির্বাচিত হন সদস্য রাষ্ট্রদের ভোটে। মানবাধিকার পরিষদের (হিউম্যান রাইটস কাউন্সিল) সভাগুলোতে পর্যায়ক্রমে সভাপতিত্ব করেন এর সভাপতি এবং চারজন সহ-সভাপতি। নিরাপত্তা পরিষদে ইংরেজি বর্ণানুক্রম অনুসারে

প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্র এক মাস করে সভাপতির দায়িত্ব পালন করে। আন্তর্জাতিক আদালতের (আইসিজে) বিচারকেরা নিজেদের মধ্যে ভোটের মাধ্যমে একজন সভাপতি ও একজন সহ-সভাপতি নির্বাচন করেন। জাতিসংঘের সাথে সম্পর্কিত বিশেষায়িত সংস্থাগুলোর নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।

বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারপারসন নির্বাচনের ক্ষেত্রে উপরোক্ত মডেলগুলো থেকে কোন একটি বেছে নেওয়া যেতে পারে। যে প্রতিষ্ঠান সমষ্টিগতভাবে মানবাধিকার রক্ষা ও প্রসারে নেতৃত্ব দেবে, তার নিজের নেতৃত্ব যৌথ, সমতাভিত্তিক, স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক হওয়া অপরিহার্য।

লেখক: আইনজীবী (আপিল বিভাগ), বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

 

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৭ কিলোমিটার যানজট
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৭ কিলোমিটার যানজট
পর্তুগাল-ক্রোয়েশিয়া ম্যাচের আগে টরন্টোয় তাপপ্রবাহের সতর্কতা
পর্তুগাল-ক্রোয়েশিয়া ম্যাচের আগে টরন্টোয় তাপপ্রবাহের সতর্কতা
গোপন কায়দায় আনা ১৮ কেজিরও বেশি স্বর্ণ জব্দ শাহজালালে
গোপন কায়দায় আনা ১৮ কেজিরও বেশি স্বর্ণ জব্দ শাহজালালে
ঋতুপর্ণা–মনিকাদের ‘প্রথম কোচ’ শান্তিমনি হাসপাতালে
ঋতুপর্ণা–মনিকাদের ‘প্রথম কোচ’ শান্তিমনি হাসপাতালে
সর্বশেষসর্বাধিক