জুলাই নিয়ে হিসাব-নিকাশের কাটাকুটি 

২০২৪-এর আগে জুলাই মানেই অনেকের কাছে ছিল ২০১৬ সালের ১ জুলাই ঢাকার হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় সংঘটিত হামলাকে স্মরণ। ২০২৪ সালে এই জুলাই আমাদের জীবনে এসেছিল। তবে অভ‍্যুত্থানের দুই বছর যেতে না যেতেই এই জুলাইকে নিয়ে প্রথম থেকেই থাকা পক্ষ-বিপক্ষের পাশাপাশি আরও অনেক অবস্থান, পর্যবেক্ষণ এবং কখনও কখনও ভুল-ভ্রান্তির স্বীকারকেন্দ্রিক বয়ানও সামাজিক যোগাযোগমাধ‍্যমে পাওয়া যাচ্ছে। এরও নানা ধরনের  রাজনৈতিক খানা-খন্দ রয়েছে।

জুলাই ২০২৪-এর প্রথমে পক্ষ ছিল দুটি—সে সময়ে ক্ষমতায় থাকা দল আওয়ামী লীগ এবং ‘বৈষম‍্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।’ আওয়ামী লীগ তখন থেকেই দাবি করে আসছিল—এই আন্দোলনের পেছনে জামায়াত ইসলামী রয়েছে। তারপরের ঘটনাগুলো আমরা কমবেশি দেখেছি। ঘটনার পেছনের অনেক ঘটনা সম্পর্কে পরবর্তীকালে বিভিন্ন গণমাধ‍্যমসূত্র, ব‍্যক্তির অভিজ্ঞতায় শুনেছি, জেনেছি। সে সময়কার আন্দোলনকে ‘ট‍্যাকল’ নিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতি, কৌশল, বিশেষ করে প্রতিদিনের মৃত‍্যু, রাতে রাতে বিভিন্নজনের বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থীদের ধরপাকড় সব কিছু মিলে জনমত আওয়ামী লীগের বিপক্ষে চলে গিয়েছিল। এরও আগে থেকেই রাজনৈতিক দল আর সরকারি দল আওয়ামী লীগের পার্থক্য ক্রমশ ঘুচে গিয়েছিল। জনগণের সঙ্গে তৈরি করেছিল মাপহীন দূরত্ব। তিনটি নির্বাচন করেছিল নিজেদের মতো, সেখানে জনগণের অধিকারের স্বীকৃতি মেলেনি। জনগণ ক্রমশ আস্থা হারিয়েছিল। আওয়ামী লীগ সেটি আমলে নেয়নি। তার ওপর আন্দোলন চলাকালে সরকারের ভূমিকা, শিক্ষার্থীদের মৃত‍্যুসহ সব কিছু মিলে অবস্থা এমন ছিল যে অনেক জনগণই রাস্তায় নেমে এসেছিল। জনগণ হয়তো রাস্তায় নামার অপেক্ষাতেই ছিল। জুলাই সেই সুযোগ করে দিয়েছিল।

৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর সেনাপ্রধানের ভাষণে বারবার জামায়াতে ইসলাম এবং হেফাজতে ইসলামের নাম উচ্চারিত হওয়ার মধ‍্য দিয়েই কেমন যেন ‘খটকা’র শুরু। কেননা, হেফাজতে ইসলাম কোনও রাজনৈতিক দল নয়। কিন্তু তাদেরও ডাকা হয়েছে আলোচনায়। সেই দিনেই এই বাংলা ট্রিবিউনে আমি লিখেছিলাম ‘কোন বিবেচনায় তারা প্রাধান‍্য পাচ্ছে?’ সেদিন গণভবন লুটপাটের পাশাপাশি  বিকাল থেকে শুরু হয় ভাঙচুর। যে ভাঙচুরের প্রধান টার্গেট যে শুধু শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের নেতারা ছিলেন তা নয়, ভাঙা এবং আগুন দেওয়া হয় ঐতিহাসিক ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ি, মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ভাস্কর্যে। পরের তিনদিন বাংলাদেশ সরকার ছাড়াই চলেছে। যদিও সেনাপ্রধান বলেছিলেন, তিনি সবার দায়িত্ব নিয়েছেন, কিন্তু আদতে দেখা গেলো—তিনি অনেক কিছুই রক্ষা করতে পারলেন না, চেষ্টা করেছিলেন কিনা সেটিও প্রশ্নসাপেক্ষ।

৮ আগস্ট অধ‍্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হলো অন্তর্বর্তী সরকার। শুরু হলো মব। স্কুল, কলেজ-বিশ্ববিদ‍্যালয় থেকে পাড়া-মহল্লায় এর বিস্তৃতি ছড়িয়ে পড়লো। এর পাশাপাশি শুরু হলো আন্দোলনের প্রধান কারিগর কে ছিল সেটি নিয়ে টানাহেঁচড়া। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ড. ইউনূস নিজেই এই আন্দোলনকে ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ হিসেবে হাজির করেছেন এবং এই আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলমকে পরিচয় করে দিয়েছিলেন।

এরপর থেকেই শুরু হয় আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড দাবির প্রতিযোগিতা। মূলত এই প্রতিযোগিতায় প্রতিযোগী ছিল দুটো পক্ষ। বিএনপির সিনিয়র নেতারা দাবি করে আসছেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানই ছিলেন এই আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড। কিন্তু শিবির নেতারা বারবার বলেছেন, আন্দোলনের স্লোগান থেকে ৯ দফা এবং কর্মসূচিগুলো তাদের হাতেই হয়েছে। কিন্তু আন্দোলনে জনগণের সমর্থন পাওয়ার জন‍্য তারা নিজেদের লুকিয়ে রেখেছিলেন।

এরপরের দেড় বছর মবে আক্রান্ত হয়েছে মাজার, বাউল, সুফি-সাধকেরা। ‘ফ‍্যাসিস্ট’ ট‍্যাগ দিয়ে নিজ ঘরানার বাইরের অনেক অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে ‘তৌহিদী জনতা’র ব‍্যানারে। সরকার মবের বিরুদ্ধে ব‍্যবস্থা না নিয়ে বারবার এটিকে বৈধ করেছিল ‘প্রেসার গ্রুপ’ বলে। বলতেই হবে যে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে ধর্মীয় আধিপত‍্যবাদী গোষ্ঠীর দাপট ছিল এবং এখনও কম বেশি রয়েছে। একের পর এক তৈরি হয়েছে জুলাইয়ের সওদাগর। আরও বলতে হবে যে জুলাইয়ের অভ‍্যুত্থানে নারী নেতৃত্ব, বিভিন্ন বিশ্ববিদ‍্যালয় এবং কলেজে পড়া নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই আন্দোলন অনেকটাই ছিল নারীবিদ্বেষী। কারণ সেই আন্দোলন থেকেই আমরা দেখতে পেয়েছি—রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে ‘বেশ‍্যা’ বলে গালি দিতে। এমনকি এরপর থেকেই আমরা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একের পর এক নারীবিদ্বেষী বক্তব‍্য এবং যৌনবাদী তকমা রাজনীতিতে অনেকটা যেন স্থান করে নিয়েছে।

মূলত আন্দোলনের প্রথম কয়েক মাসের মধ‍্যেই বিভক্তির শুরু, যা এখন চরমে। আওয়ামী লীগ এবং জুলাইপন্থিদের বাইরেও রয়েছে বিভিন্ন পক্ষ। সে পক্ষগুলোর মধ‍্যে আছে, যারা জুলাই আন্দোলনে ছিল, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের এবং জামায়াতবিরোধী। তারা কিছুতেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরোধিতাকারী জামায়াতের দাপট মেনে নিত পারছেন না। এদের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ‍্যম এবং গণমাধ‍্যমে বলেছেন—তারা জানতো না এই আন্দোলনের পেছনে জামায়াত-শিবর রয়েছে, তারা জানতেন না এই আন্দোলনের মাধ‍্যমে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে অসম্মান করা হবে। তারা অনেকেই বলছেন, তারা না বুঝেই ‘ফাঁদ’-এ পা দিয়েছিলেন।

জুলাই-এর দল এনসিপি। তাদের নিয়েও নানা ধরনের আলোচনা। নিজেদের মধ‍্যপন্থি বলে দাবি করা এই দলটি শুধু নির্বাচনি জোটই নয়, আদর্শের দিকে থেকেও জামায়াতের দিকেই হেলে আছে অনেকখানি, যার কারণে কড়া সমালোচকরা তাদের জামায়াতের ‘বি’ টিম বলতেও দ্বিধা করছে না। বৈষম‍্যবিরোধী আন্দোলন হিসেবে স্বপ্ন দেখালেও—সেখানে ভিড়ে অনেকেই এই দেড় বছরে হোঁচট খেয়েছেন।

এই আন্দোলনের একটি বড় পক্ষ আন্তর্জাতিক মহল। এটিও আওয়ামী লীগ প্রথম থেকেই প্রচার করছে। তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতির, বিশেষ করে আমেরিকার অবস্থান নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হলেও সেটিও অনেকটাই যেন জোর পেয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে করা চুক্তির মাধ‍্যমে।

বাংলাদেশের পরিচিত বাম শিবিরও আছে বিপাকে। তাদের নিজস্ব ভাঙন এবং জুলাই নিয়ে তাদের মধ‍্যে রয়েছে নানা ধরনের বোঝাপড়া। বিশেষ করে জুলাই ২০২৪-এর পর ডানপন্থার ভয়াবহ উত্থানের আঁচ তাদের গায়েও লাগার কথা। কিন্তু আবার আছে নিজেদের এবং পার্টির নিরাপত্তার বিষয়টিও। কারণ কখন কার অফিসে কিংবা গায়ে আগুন লেগে যাবে আবার!

গুপ্ত-সুপ্ত কিংবা হালের আঞ্চলিক কথনের ‘ছুপা’ এই আন্দোলন থেকে উৎপাদিত হালের টার্ম। এই অভ‍্যুত্থান নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ছাত্রশিবির, যাদের অনেকেই দীর্ঘদিন ছাত্রলীগের রাজনীতিতে ছিল এবং অনেক হল কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদেও ছিল। সুযোগ বুঝে তারা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করেছেন এবং ‘মতাদর্শিক ছড়ি’ ঘুরাচ্ছেন। তবে জামায়াতের পরিচয় দিতে এখনও অস্বস্তি রয়েছে জামায়াতপন্থি বিএনপির নেতাকর্মীদের। এরকম নেতাকর্মী আওয়ামী লীগ এবং বাম দলেও রয়েছে।

কারণ আমাদের বলতেই হবে, বর্তমানে অবস্থা যা-ই থাকুক,  আর জামায়াত ইসলাম যা-ই বলুক, মুক্তিযুদ্ধে তাদের বাংলাদেশবিরোধী অবস্থান, কর্মকাণ্ড, নিপীড়ন, হত‍্যায় পাকিস্তানি সেনাদের সহায়তা সেগুলো সাফ করতে পারবে না। বাংলাদেশের মানুষের সেগুলোর স্মৃতি ভয়ংকরভাবে আছে।

এরকম ভয়ভীতি, অস্বস্তি থাকার কথা ছিলে না। অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের কথা ছিল। কিন্তু এই দুই বছরে ইসলামী দলগুলোর রাজনীতির মূল জায়গা দখল এবং আঘাত করা ছাড়া আর কোনও অন্তর্ভুক্তি সত‍্যিকারভাবে চোখে পড়েনি। জুলাই নিয়ে হিসাবের কাটাকুটি খেলা এভাবেই চলছে, চলবে বলেই মনে হচ্ছে।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ‍্যালয়

ইমেইল: zobaidanasreen@gmail.com