হত্যা বা নির্যাতন নয়, বন্ধুত্ব গড়ে উঠুক মানুষ ও ভাষাহীন প্রাণীর মধ্যে

শাহানা হুদা রঞ্জনা
০৫ জুলাই ২০২৬, ১৪:০০আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৬, ১৪:০০

একটি অসহায় কুকুরকে তিন-চারজন মানুষ গলায় দঁড়ি পরিয়ে, ইট বেঁধে নদীতে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে— এই দৃশ্যটা দেখার পর দম আটকে আসছিল। কেন মানুষকে এত নির্মম হতে হয়? কুকুরটিকে পানিতে ছুঁড়ে ফেলার কাজে জড়িত ছিল অনেকে। এদের মধ্যে কেউ কেউ হাসছিল, যেন খুব মজার কোনও ঘটনা ঘটছে। পশুপাখির প্রতি মানুষের পৈশাচিকতার ঘটনা ক্রমশ বাড়ছে।

গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে হইচই হওয়ার পর কিছু ঘটনা আইনের আওতায় এসেছে— তবে বেশিরভাগ চাপা পড়ে গেছে। কুকুর, বিড়াল, বানর, হাতি, বনবিড়াল, মেছোবাঘ, পাখি কেউই বাদ যাচ্ছে না। মানুষ কেন এদের হত্যা করছে, এর কোনও নির্দিষ্ট কারণ নেই। মনে হচ্ছে, হত্যা করার আনন্দেই হত্যা করছে। অনেকেই মনে করছেন, যখন সমাজে সামগ্রিক সহিংসতা বাড়ে, তখন দুর্বল ও প্রতিরোধহীন প্রাণীরা সহজ লক্ষ্য হয়ে ওঠে।

মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, যারা প্রাণীকে অনুভূতিহীন বস্তু হিসেবে দেখে বা ওদের কষ্টকে গুরুত্ব দেয় না, সেসব মানুষের মধ্যে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণের ঝুঁকি বেশি হয়। সহানুভূতির অভাব এ ধরনের ঝুঁকির একটি বড় কারণ।

কিছুদিন ধরে একটা গ্রুপ প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছিল যে, পথকুকুর জলাতঙ্ক ছড়ায়, কাজেই তাদের হত্যা করে এর সমাধান করতে হবে। প্রাণী রক্ষাকারী গ্রুপ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, নির্বিচারে কুকুর হত্যা— এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়, বরং টিকাদান ও নিউটারকরণ বেশি কার্যকর।

মানুষ যখন দেখে কোনও প্রাণীকে নির্যাতন ও হত্যা করে কেউ কোনও শাস্তি পাচ্ছে না, তখন সে সেই আচরণ আরও বেশি করতে উৎসাহিত বোধ করে। বাংলাদেশে প্রাণিকল্যাণ আইন থাকলেও অপরাধ জামিনযোগ্য, মামলা কম হয় এবং শাস্তিও তুলনামূলকভাবে কম। ফলে অপরাধীদের মধ্যে ভয়ের অনুভূতি তেমন থাকে না। যেমন- নরসিংদীতে কুকুরটিকে নদীতে ফেলে দেওয়ার ঘটনায় যে মূল আসামি, সে আটকের একদিনের মধ্যে জামিন পেয়েছে। ২০২৪ সালে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে জাপান গার্ডেন সিটিতে ১০টি কুকুর ও একটি বিড়াল বিষাক্ত খাবার খেয়ে মারা যায়। ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে এবং মামলা হয়। পরবর্তীকালে তদন্তে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদন দেওয়া হলেও মামলাটি নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত থাকে।

যারা প্রাণীকে সমস্যা বা শত্রু বলে মনে করে, তারা সমস্যা দূর করার জন্য প্রথমেই সহিংস পথকে বেছে নেয়। এটাও যে হত্যাকাণ্ড তা মনে করে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই কাজটা মানুষ দলগতভাবে করে, যাতে ব্যক্তিগত দায় কম হয়। মানুষের ক্ষেত্রে এই আচরণকেই আমরা ‘মব সন্ত্রাস’ বলছি। জাপান গার্ডেন সিটির ঘটনার পর ঢাকার আরও কিছু এলাকায় বিষপ্রয়োগে পথপ্রাণী হত্যার অভিযোগ উঠেছে। ২০২৪/২৫ সালে বনানী ও অন্যান্য এলাকায় সন্দেহজনক বিষপ্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে।

উত্তর বাড্ডায় পথকুকুরকেও নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে, এইতো সেদিন। ঘটনাগুলো ভাইরাল না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত অপরাধী শাস্তি নিয়ে একদম চিন্তিত থাকে না। তারা ভাবে যে কুকুর, বিড়াল, হাতি, সাপ ইত্যাদি মারলে কিছু হবে না। তাই ইচ্ছা হলেই প্রাণী হত্যা করে। তবে দেখেছি, সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হলে, এ ধরনের অপরাধ নিয়ে কথা হয়, মানুষ সচেতন হয় এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখে পড়ে।

রাষ্ট্রের দ্রুত প্রতিক্রিয়া সমাজে বার্তা দেয় যে, প্রাণীর ওপর সহিংসতাও অপরাধ। যেমন- নরসিংদীতে নদী থেকে ফেলে কুকুর হত্যার ঘটনার পরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে বলেছেন, প্রাণী হত্যা বন্ধ করতে হবে। বগুড়ায় পথকুকুরকে ছুরিকাঘাত করার ঘটনাতেও অভিযুক্ত ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আটক করা হয়েছে।

২০২১ সালে ২০টি কুকুর হত্যার ঘটনায় ২০২৬ সালে তিনজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এটি বাংলাদেশে প্রাণিকল্যাণ আইনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দণ্ডাদেশ। শুধু বিষ দিয়ে বা নদীতে ফেলে হত্যা নয়, পথকুকুর ও বিড়ালদের শরীরে গরম পানি ঢেলে দেওয়া হয়, গলা চেপে ধরা হয়, বস্তাবন্দি করে ফেলে দেওয়া এবং চোখ উপড়ে ফেলার মতো ভয়াবহ ঘটনাও ঘটছে সবসময়। প্রাণী হত্যা কখনও মজা হতে পারে না।

এই যে কাঁটাবনে প্রাণীগুলোকে যেভাবে রাখা হয়, তা দেখলে খুব মন খারাপ হয়। ছোট ছোট খাঁচায় ওদের দাঁড়ানোর ও হাঁটাচলা করার জায়গাও থাকে না। প্রচণ্ড গরমে, ধুলোবালি ও শব্দের মধ্যে সারাদিন রাস্তার পাশে সেই খাঁচাগুলো পড়ে থাকে। রাতে অবস্থা হয় আরও ভয়াবহ, গরমে দোকানের ভেতরে আটকে রাখা হয়। সে এক অবর্ণণীয় পরিবেশ। করোনোকালে এভাবে বন্দি থেকে কাঁটাবনে কয়েকশো প্রাণী মারা গেছে। ভালোবাসাহীন, নিমর্ম পরিবেশে প্রাণীগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা হয় শুধু বিক্রির উদ্দেশ্যে। এজন্য বিশ্বের অনেক দেশেই প্রাণী বিক্রি নিষিদ্ধ।

কাউকে অ্যাডপ্ট করতে চাইলে শেল্টার হোম থেকে নিতে হয়। কিছুদিন আগে পত্রিকায় নিউজ হওয়ার পর পুলিশ ও উদ্ধারকারী সংগঠন ঢাকার মিরপুর এলাকা থেকে অসংখ্য দুর্লভ বন্যপ্রাণী উদ্ধার করেছে। এদের বিক্রির জন্য রাখা হয়েছিল। ইচ্ছাকৃত নির্যাতনের পাশাপাশি অবহেলাও প্রাণিকল্যাণের গুরুতর লঙ্ঘন। তবে আশার কথা, বিভিন্ন প্রাণিকল্যাণ সংগঠন মামলা, উদ্ধার ও জনসচেতনতা কার্যক্রম বাড়িয়েছে। বেড়েছে সামাজিক মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা। ইতিবাচক সামাজিক কার্যক্রম যত বাড়বে, মানুষ ততই তা অনুকরণ করতে উদ্বুদ্ধ হবে, বিশেষ করে শিশুরা। গবেষণা বলছে, শৈশব থেকে প্রাণীর প্রতি সহমর্মিতা শেখানো হলে, শিশুর মনে মানুষের প্রতি সহানুভূতিও বাড়ে।

ব্যক্তির সামাজিক হতাশা ও ক্রোধ অনেকক্ষেত্রেই দুর্বল মানুষ ও প্রাণীর ওপর গিয়ে পড়ে। তাইতো আমাদের সমাজে ভাষাহীন প্রাণীর পাশাপাশি, শিশু ও নারীর ওপরে সহিংসতা বেশি হয়। নিপীড়ণকারী ব্যক্তি ধরেই নেয়— এরা দুর্বল, এরা স্বর উঁচু করতে পারে না, এদের পাশে কেউ নেই, কেউ প্রতিবাদ করবে না, আইন থাকলেও কার্যকারিতা নাই, কাজেই অত্যাচার করা সহজ।

আমাদের এখন ভাবতে হবে শিশুদের নিয়ে। শিশুরাই আমাদের আশ্রয় হতে পারে। যে শিশু পশুপাখির প্রতি ভালোবাসা নিয়ে বড় হবে, সেই শিশু মানুষের প্রতিও ভালোবাসা দেখাবে। আর যে শিশু পশুপাখিকে নির্যাতন করছে, তাকে নিয়ে আশঙ্কা আছে বলে গবেষণা বলছে। আজ যারা খুনি, শিশুকালে এরা প্রাণী হত্যা করেছে বলে একটি সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

কিন্তু এটিই একমাত্র কার্যকারণ নয়। কিছু ক্ষেত্রে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতার কারণ হিসেবে সহানুভূতির অভাব, পারিবারিক সহিংসতা বা অন্যান্য আচরণগত সমস্যার কথা এসেছে। তবে দেখা গেছে যে, অনেক সহিংস অপরাধী বা খুনির শৈশবে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতার ঘটনা, অন্যদের তুলনায় বেশি। তবে যেসব শিশু প্রাণীকে নির্যাতন করেছে, বড় হয়ে তারা যে খুনিই হবে— গবেষণা এমনটিও বলছে না।

কিন্তু এমন নেতিবাচক আচরণকে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিরোধ করা এবং সেই শিশুর আচরণ পর্যবেক্ষণ করা দরকার। আমরা দেখেছি, শিশুদের কেউ কেউ বিনা কারণে বা নিছক মজা করার জন্য বিড়ালের গলায় দঁড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে রাখে, ফড়িং ও প্রজাপতি ধরে ডানা ভেঙে দেয়, পিঁপড়ার ঢিপি দেখলে খামোখা খুঁচিয়ে ভাঙে, পাখির বাসা দেখলে ডিম বা বাচ্চা পাখির ক্ষতি করে। এমনটা হলে অবশ্যই চিন্তার কথা।

সভ্য দেশগুলোতে এজন্যই শিশুর এ ধরনের আচরণকে মনিটর করা হয়। শৈশব বা কৈশোরে প্রাণীর প্রতি ইচ্ছাকৃত নিষ্ঠুরতা পরবর্তী জীবনে সহিংস বা অপরাধমূলক আচরণের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। কারাগারে থাকা সহিংস অপরাধীদের ওপর করা বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সহিংস অপরাধীরা অহিংস অপরাধীদের তুলনায় শৈশবে বেশি প্রাণী নির্যাতন করেছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা হচ্ছে গবেষণাগুলো করা হয়েছে বন্দিদের শৈশবের স্মৃতির ওপর নির্ভর করে। তাই এগুলো আচরণের দিকটি তুলে ধরে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে না যে, শিশুকালে প্রাণী হত্যা করেছে বলেই সে খুনি হয়েছে।

প্রাণী নির্যাতন অনেক সময় মূল সমস্যা নয়, বরং বড় সমস্যার একটি সংকেত। দেখা গেছে, সেই ব্যক্তিই বড় অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে, যারা পরিবারে সহিংসতা দেখেছে বা সহিংতার শিকার হয়েছে, শৈশবে নির্যাতন বা অবহেলার মধ্যে বড় হয়েছে এবং সহানুভূতি পায়নি।

মনোবিজ্ঞানী জে এম ম্যাকডোনাল্ড ১৯৬৩ সালে ‘ম্যাকডোনাল্ড ট্রায়াড’ এর ধারণা দেন। এই ধারণা অনুযায়ী প্রাণী নির্যাতন, আগুন লাগানো, পাঁচ বছর বয়সের পরেও বিছানা ভেজানো ভবিষ্যতের খুনির লক্ষণ হিসেবে জনপ্রিয় হয়েছিল। যদিও ম্যাকডোনাল্ড ট্রায়াড একসময় অপরাধতত্ত্বের জনপ্রিয় আলোচনায় এবং টেলিভিশনের অপরাধভিত্তিক নাটক-সিনেমায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, কিন্তু আধুনিক গবেষণা এই ধারণাকে যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করেছে।

পরবর্তী গবেষণাগুলো দেখিয়েছে যে, এই তিনটি আচরণ ভবিষ্যতে সহিংস অপরাধী হওয়ার ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস বা ধারণা দেয় না। অর্থাৎ, এসব আচরণ থাকলেই কেউ ভবিষ্যতে খুনি বা সহিংস অপরাধী হবে, এমন দাবি বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থিত নয়।

বর্তমান গবেষণার ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞরা মনেকরেন, শৈশবে প্রাণী নির্যাতন ভবিষ্যতের সহিংসতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিসূচক। তবে এটিকে দেখে বলা যাবে না যে, শিশুটি ভবিষ্যতে নিশ্চিতভাবে খুনি হবে। অর্থাৎ, প্রাণী নির্যাতনকে ভবিষ্যতের খুনির ‘প্রমাণ’ হিসেবে নয়, বরং প্রাথমিক সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা উচিত, যেন সময়মতো মনস্তাত্ত্বিক ও পারিবারিক সহায়তা দেওয়া যায়।

আমরা চাই, আমাদের সন্তানরা শ্রীলঙ্কার সেই শিশুটির মতো কোলে ঘুম-ঘুম গন্ধগোকুল বা বিড়ালের বাচ্চা ও পেছনে একটা মস্ত কাঁটাওয়ালা সজারু নিয়ে আল ধরে হাঁটুক। ওদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে উঠুক, আর মানুষসহ সব প্রাণী নিশ্চিন্তে বাঁচুক। নেটদুনিয়ায় ভাইরাল হোক আমাদের দেশের মানুষ, প্রাণীকুল ও প্রকৃতি ভালোবাসায় জড়িয়ে থাকার গল্প।

লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলামিস্ট

/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
খামেনির জানাজা ঘিরে তেহরান মেট্রোতে রেকর্ড যাত্রীর ঢল
খামেনির জানাজা ঘিরে তেহরান মেট্রোতে রেকর্ড যাত্রীর ঢল
ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে মামলার আবেদনে কী আছে
ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে মামলার আবেদনে কী আছে
আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর
আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর
‘সাইবার যুদ্ধ, তথ্যযুদ্ধ উপেক্ষার সুযোগ নেই, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে হবে’
‘সাইবার যুদ্ধ, তথ্যযুদ্ধ উপেক্ষার সুযোগ নেই, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে হবে’
সর্বশেষসর্বাধিক