৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা: জাপানের ভুল, কোরিয়ার শিক্ষা, বাংলাদেশ কোন পথে? 

অর্থনীতিবিদ ইয়ানোশ কোরনাই ১৯৮০-এর দশকে একটি ধারণা প্রবর্তন করেছিলেন, যা আজও বিশ্বজুড়ে রাষ্ট্রনির্দেশিত ঋণ কর্মসূচি বোঝার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক হাতিয়ার—‘‘শিথিল বাজেট সীমাবদ্ধতা’’। তাঁর পর্যবেক্ষণ ছিল সহজ কিন্তু গভীর। যখন কোনও প্রতিষ্ঠান জানে যে ক্ষতির মুখে পড়লেও রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ব্যাংক তাকে বাঁচাবে, তখন সেই প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বাড়ানোর প্রণোদনা নষ্ট হয়ে যায়। বাংলাদেশের নতুন ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল বিশ্লেষণ করতে হলে এই তাত্ত্বিক কাঠামো এবং একাধিক দেশের বাস্তব অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

জাপান: হারানো দশক-এর শিক্ষা

১৯৯০-এর দশকে জাপানের সম্পদ বাজার ধসের পর, ব্যাংকগুলো বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের মুখোমুখি হয়ে একটি বিপজ্জনক কৌশল বেছে নিয়েছিল, দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেউলিয়া ঘোষণা না করে বরং তাদের ঋণ শর্ত শিথিল করে, নতুন ঋণ দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা, যাতে ব্যাংকের নিজের ব্যালান্স শিটে ক্ষতি প্রকাশ পেতে না হয়। অর্থনীতিবিদ রিকার্দো কাবায়েরো, তাকেও হোশি ও অনিল কাশ্যপ তাদের বহুল উদ্ধৃত গবেষণায় এই ঘটনাকে নাম দেন ‘জম্বি ঋণদান’। ফলাফল ছিল ভয়াবহ—মূলধন নতুন, উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানের কাছে না গিয়ে ‘জম্বি’ প্রতিষ্ঠানগুলোতে আটকে থাকলো, প্রতিযোগিতা কমে গেল এবং জাপানের অর্থনীতি প্রায় এক দশক ধরে স্থবিরতায় ভোগে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্য পুনঃতফসিল করা ঋণের ৪০ শতাংশ এক বছরের মধ্যেই আবার খেলাপি হওয়া— জাপানের এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে বিপজ্জনকভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্র: দ্রুততার মূল্য

করোনাকালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘পেচেক প্রোটেকশন প্রোগ্রাম’ প্রমাণ করে যে সদিচ্ছা ও দ্রুততার সঙ্গে বিতরণ করা বিপুল অর্থ পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই ছাড়া বিতরণ করলে কী ঘটতে পারে। মার্কিন ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রশাসনের নিজস্ব মহাপরিদর্শকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৮০০ বিলিয়ন ডলারের এই কর্মসূচিতে জালিয়াতিমূলক দাবির পরিমাণ ছিল আনুমানিক ১০ শতাংশের বেশি, যা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের করদাতার অর্থ ভুয়া প্রতিষ্ঠান ও অতিরঞ্জিত দাবির মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এক্ষেত্রে শিক্ষা স্পষ্ট। দ্রুত বিতরণের রাজনৈতিক চাপ এবং যথাযথ যাচাই ব্যবস্থা— এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন, বিশেষত যখন প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য-কাঠামো দুর্বল।

দক্ষিণ কোরিয়া: শৃঙ্খলার সঙ্গে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা

তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতা উল্লেখযোগ্য। ১৯৯৭ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের পর কোরিয়া তার আর্থিক খাতে ব্যাপক সংস্কার করেছিল। দেশটি দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিহ্নিত করে হয় পুনর্গঠন, নয়তো বন্ধ করে দেওয়ার একটি কঠোর, সময় বেঁধে দেওয়ার প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছিল। পরবর্তীকালে ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময় কোরিয়া তার এসএমই সহায়তা কর্মসূচিতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত যুক্ত করেছিল। নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে সহায়তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রত্যাহার, নিয়মিত স্বতন্ত্র নিরীক্ষা এবং প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত কার্যক্ষমতা যাচাইয়ের ভিত্তিতে সহায়তা অব্যাহত রাখা বা বন্ধ করার সুস্পষ্ট মানদণ্ড। বিশ্বব্যাংকের একাধিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এই কাঠামোগত শৃঙ্খলার কারণে কোরিয়ার প্রণোদনা কর্মসূচি তুলনামূলক কম অপচয়মূলক হয়েছিল।

চীন: অতিরিক্ত সক্ষমতার ফাঁদ

২০০৮ সালের বৈশ্বিক সংকটের পর চীন ৪ ট্রিলিয়ন ইউয়ানের (তখনকার প্রায় ৫৮,৬০০ কোটি মার্কিন ডলার) একটি বিশাল প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল, যার একটি বড় অংশ স্থানীয় সরকার ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অবকাঠামো ও শিল্প খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছিল। স্বল্পমেয়াদে এটি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সাহায্য করেছিল, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ইস্পাত, সিমেন্ট ও সৌর প্যানেলের মতো খাতে বিশাল অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হয়—যা এখনও চীনা অর্থনীতির একটি কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। এই দৃষ্টান্ত শেখায় যে প্রণোদনা শুধু স্বল্পমেয়াদি চাহিদা সৃষ্টি করলেই যথেষ্ট নয়, তা যদি বাজারের প্রকৃত চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ না হয়, তাহলে তা ভবিষ্যতের জন্য নতুন কাঠামোগত সমস্যা তৈরি করে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিথিলতার প্রমাণ

কোরনাইয়ের তত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো রাজনৈতিক সংযোগ। যখন ঋণদানের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক প্রভাব দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে বলে বাজারে ধারণা তৈরি হয়, তখন তা কোরনাইয়ের ‘শিথিল বাজেট সীমাবদ্ধতা’র একটি ক্লাসিক লক্ষণ, যেখানে ঋণগ্রহীতা জানেন যে ব্যর্থ হলেও তাকে উদ্ধার করা হবে, ফলে তার দক্ষ ব্যবহারের প্রণোদনা দুর্বল হয়ে পড়ে। নতুন ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল যদি একই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে বিতরণ করা হয়, যেখানে ব্যাংক ব্যবস্থাপনা ও বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান, তাহলে অতীতের একই প্রবণতা পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা যৌক্তিক।

কী শেখা প্রয়োজন

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে তিনটি স্পষ্ট নীতিগত শিক্ষা পাওয়া যায়। প্রথমত, প্রতিটি সহায়তা কর্মসূচিতে স্পষ্ট সময়সীমা ও প্রস্থান কৌশল থাকা আবশ্যক—কোরিয়ার মডেলের মতো, যাতে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য জিইয়ে না থাকে। দ্বিতীয়ত, বিতরণ প্রক্রিয়া থেকে ব্যাংক-শিল্পগোষ্ঠী ঘনিষ্ঠতার প্রভাব কমাতে স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে যোগ্যতা যাচাই প্রয়োজন, বিশেষত বৃহৎ ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে। তৃতীয়ত, জাপান ও চীনের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় রেখে, শুধু ‘কতটা বিতরণ হলো’ নয়, বরং ‘এই অর্থ কি প্রকৃতপক্ষে উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান বাড়াচ্ছে’ তা পরিমাপ করার জন্য ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন, নিছক বিতরণের পরিমাণভিত্তিক মূল্যায়ন নয়।

শেষ কথা

রাষ্ট্রনির্দেশিত প্রণোদনা ঋণ নিজে থেকে ভালো বা মন্দ নয়, এর ফলাফল নির্ভর করে প্রাতিষ্ঠানিক নকশার ওপর। জাপান ও চীনের অভিজ্ঞতা সতর্কতার বার্তা দেয়, দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায় যে, শৃঙ্খলার সঙ্গে বাস্তবায়ন করলে ইতিবাচক ফলাফলও সম্ভব। বাংলাদেশের ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল কোন পথে যাবে, তা এখনও নির্ধারিত নয়—কিন্তু ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা স্পষ্টভাবে বলছে, নিছক সদিচ্ছা ও বড় অঙ্কের ঘোষণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কঠোর শর্ত, স্বাধীন তদারকি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বাস্তবায়ন, যা ছাড়া এই তহবিলও অতীতের মতোই একটি সৎ উদ্দেশ্যপূর্ণ কিন্তু ব্যর্থ পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।

লেখক: উন্নয়নকর্মী ও গবেষক