আমরা প্রায় সবাই-ই ভোরে বা সকালে ঘুম থেকে জেগে এক গ্লাস পানি পান করি। সকালের নাশতায় রুটি, ডিম, সবজি, কলা বা দুধ খাই। লাঞ্চে ভাত বা রুটি, মাছ-মাংস, শাকসবজি, ডাল। বিকালে ফল, ডালপুরি-শিঙ্গাড়া বা ফুচকা। রাতে আবার ভাত, মাছ-মাংস। যাদের সহজেই এত সব খাদ্য কেনার সামর্থ্য রয়েছে, তারা মনে করছেন– আহারে, আমরা খাবার খাচ্ছি, শরীরে পুষ্টি হচ্ছে। কিন্তু যদি প্রশ্ন করি আসলে খাচ্ছিটা কী?
সব খাবারের সাথে আমরা যে অল্প অল্প করে বিষ খাচ্ছি, বললে তা বিশ্বাস করবেন? খাবার আমরা খাই আমাদের শরীরকে সুস্থভাবে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, কিন্তু তা না করে খাবার যদি আমাদের ধীরে ধীরে ধ্বংস করে, তাহলে কী করবেন?
তাহলে একটু বলি, কীভাবে আমরা বিষ খাচ্ছি। আমি এগুলো জেনেছি আমাদের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো থেকে। পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। অতিরিক্ত কীটনাশক, রাসায়নিক সার, ভেজাল খাদ্য, হেভি মেটাল, শিল্পকারখানার রাসায়নিক, অ্যান্টিবায়োটিকের অতি-ব্যবহার—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের খাবার এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যে নিরাপদ খাদ্য বলতে এখন আর কিছু নেই। বিষযুক্ত খাবার এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আমরা খেয়েই চলেছি, কিন্তু জানি না আসলে কী খাচ্ছি।
চিন্তা না করে খাদ্য উৎপাদন, বাজারজাতকরণ এবং খাওয়া এখন এক বড় সংকট— যা নিয়ে কেউ ভাবছে না। এই সংকট কোনও একটি খাবার বা একটি অঞ্চলের নয়, সারা দেশের ক্ষেত থেকে বাজার পর্যন্ত পুরো খাবারের চেইনটাই এখন আক্রান্ত। কৃষকেরা বেশি ফলনের আশায় মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করছেন। ফল দ্রুত পাকাতে ব্যবহার হচ্ছে কার্বাইড ও হরমোন। মাছ ও মুরগিতে অ্যান্টিবায়োটিক।
মসলা, তেল, দুধ, মধু, এমনকি শিশুদের খাদ্যেও ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ আমরা এখন এমন একটি খাদ্যব্যবস্থার মধ্যে আটকে গেছি যে, আমরা হয়তো জানি এসব খাওয়া ঠিক নয়, তারপরও নিরাপদ বিকল্প খুঁজে পাচ্ছি না। কিন্তু আমাদের কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে তেমন কিছু বলতে শুনি না—আর বললেও কোনও পদক্ষেপ দেখি না। এটি শুধু খাবারের সমস্যা নয়। এটি জনস্বাস্থ্য, কৃষি, অর্থনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তারও সমস্যা বলে আমি মনে করি।
কৃষিকে আমরা দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি হিসেবে মনে করেছি। কিন্তু সেই কৃষিই যদি বিষ উৎপাদনের মাধ্যম হয়ে যায়, তাহলে আমাদের সবার সন্তানেরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতের প্রজন্ম শারীরিক অসুস্থতায় ডুবে থাকবে।
খবরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৭২ সালে যেখানে দেশে কীটনাশকের ব্যবহার ছিল মাত্র ৪ হাজার মেট্রিক টন, ২০২৩ সালে তা প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টনে পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাত্র পাঁচ দশকে ব্যবহার বেড়েছে দশ গুণ। একই সঙ্গে কীটনাশকের বাজারও এখন পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি। বোঝাই যাচ্ছে যে, আমাদের কৃষি ব্যবস্থা কতোটা রাসায়নিকনির্ভর হয়ে পড়েছে।
এই রাসায়নিক-নির্ভরতার মূল্য দিচ্ছে আমাদের মাটি। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, দেশের প্রায় ৬১ শতাংশ আবাদযোগ্য জমিতে জৈব পদার্থের ঘাটতি রয়েছে। যেখানে মাটিতে ৩.৫ শতাংশ জৈব পদার্থ থাকা উচিত, সেখানে অনেক জমিতে তা ১ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে। মাটির প্রাণশক্তি কমে যাচ্ছে, খাবারের পুষ্টিমান কমছে, উৎপাদনের গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে। আজ যে জমিতে আমরা বিষ ঢালছি, আগামীকাল সেই জমিই হয়তো আর আমাদের খাদ্য ফলাতে পারবে না। এবং মানুষের শরীরের ওপর পড়ছে এর প্রভাব।
চিকিৎসক ও গবেষকরা এ নিয়ে তাদের মতামত অনেক বলেছেন। তারা জানাচ্ছেন, অনেকদিন ধরে কীটনাশক ও ভেজালযুক্ত খাদ্য কাওয়ার ফলে ক্যানসার, কিডনি বিকল, লিভারের জটিলতা, স্নায়ুবিক রোগ, শ্বাসকষ্ট, বন্ধ্যাত্ব, জন্মগত ত্রুটি এবং শিশুদের বিকাশজনিত সমস্যা বাড়ছে। এই রোগগুলোর অনেকগুলোই ধীরে ধীরে তৈরি হয়। মানুষ বুঝতেই পারে না যে বহু বছর আগে প্রতিদিনের খাদ্যের সঙ্গে শরীরে ঢুকে পড়া বিষ একদিন বড় রোগে রূপ নেবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ কীটনাশক বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয় এবং প্রায় ২ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটে। অন্যদিকে খাদ্যদূষণের কারণে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ অসুস্থ হয়। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এই ঝুঁকি আরও বড়, কারণ এখানে খাদ্য উৎপাদন, পরিবহন, সংরক্ষণ এবং বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপে তদারকির প্রচণ্ড ঘাটতি রয়েছে। আসলে কেউ দেখেই না।
আমাদের এখানে বাজার থেকে সংগ্রহ করা খাদ্য-নমুনার পরীক্ষায় ব্যাপক অনিয়ম ধরা পড়েছে। শত শত নমুনায় ভেজাল, নিষিদ্ধ কীটনাশক, আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম, সিসা এবং অন্যান্য ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। শাকসবজি, ফল, চাল, হলুদ, লবণ, মাছ, মুরগি— প্রায় সবই কোনও না কোনোভাবে দূষণের শিকার। কিন্তু কোনও প্রতিকার নেই। এটি আমাদের সিস্টেমের ব্যর্থতার এক প্রমাণ। আমরা আসলে এর কোনও প্রতিকার করতে পারি না। এই অবস্থার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে শিশুরা।
শিশুরা নিজের খাবার বেছে কিনে আনে না। তাদের মা-বাবা যে দুধ কিনছেন, যে ফল খাওয়াচ্ছেন, যে সবজি-মাছ-মাংস রান্না করছেন, সবই তারা বিশ্বাস করে খাচ্ছে। কিন্তু সেই খাবারেই যদি বিষ থাকে? তাদের মস্তিষ্ক, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, শারীরিক বৃদ্ধি, সবই তখন ঝুঁকির মুখে পড়বে। ভবিষ্যতের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়বে, অসুস্থ হয়ে পড়বে।
কৃষকরাও নিজেরাও নিরাপদ নন। গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের প্রায় ২৭ শতাংশ কৃষক কীটনাশক-জনিত নানা অসুস্থতায় ভুগছেন, বিশেষ করে ক্যানসারে। তাদের মধ্যে চোখ জ্বালা, ত্বকের সমস্যা, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগ দেখা দিচ্ছে। অর্থাৎ যিনি খাদ্য উৎপাদন করছেন, তিনিও একই বিষের শিকার। দেশের ক্যানসার রোগীদের বেশিরভাগই এখন কৃষক।
আমাদের আইন থাকা সত্ত্বেও পরিস্থিতি বদলাচ্ছে না কেন? বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য আইন রয়েছে, ভোক্তা অধিকার আইন রয়েছে, ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন রয়েছে।
ভেজাল খাদ্যের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধানও রয়েছে। কিন্তু আইনের অস্তিত্ব আর আইনের কার্যকর প্রয়োগ এক বিষয় নয়। বাজারে অভিযান হয়, জরিমানা হয়, সংবাদ প্রকাশিত হয়, কিন্তু কিছুদিন পর আবার একই চিত্র ফিরে আসে। কারণ সমস্যার মূলে গিয়ে কাজ করা হচ্ছে না।
এখানে আরেকটি উল্লেখ করা উচিত। অনেক কৃষক নিজের ইচ্ছায় অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করেন না— তারা ভুল পরামর্শ পান। অনেকেই বিক্রেতার কথামতো মাত্রা নির্ধারণ করেন। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়মিত তদারকি এবং বিকল্প প্রযুক্তির অভাবে রাসায়নিকের ওপর নির্ভরতা বাড়তেই থাকে। তাই কৃষককে দোষ আমরা দিতে পারবো না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কী করতে পারি?
নিরাপদ খাদ্যকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করতে পারি। তারপর? তারপর কাজটা কে করবে? এটি শুধু কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়; স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার, বাণিজ্য, পরিবেশ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ‘দায়িত্বশীল’ উদ্যোগ প্রয়োজন।
আমাদের প্রতি জেলায় কি আধুনিক খাদ্য পরীক্ষাগার আছে? যেখানে যেখানে আছে, সেখানকার পরীক্ষার ফল কি আমাদের জন্যে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়? সেটি করার সততা এবং সাহস থাকলে, আমরা জানতে পারতাম কোন খাদ্যপণ্য নিরাপদ, আর কোনটি ঝুঁকিপূর্ণ। কীটনাশক বিক্রির ক্ষেত্রে লাইসেন্সিং ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং চালু করা হয় না কেন? আমরা এত্ত এত্ত ডিজিটাল হলাম আর কোন কৃষক কী কিনছেন, কতটা ব্যবহার করছেন, তা জানতে পারবো না? এর একটি তথ্যভান্ডার থাকা দরকার।
খাদ্যে ভেজাল প্রমাণিত হলে শুধু জরিমানা নয়, প্রতিষ্ঠান বন্ধ, লাইসেন্স বাতিল এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে পারলে কাজ হবে। এখানে ঘুষ বাণিজ্য চলে তা আমরা জানি এবং সে কারণেই খাবারে বিষ প্রয়োগ বন্ধ হয় না। অপরাধের অর্থনৈতিক লাভ যদি জরিমানার চেয়ে বেশি হয়, তাহলে অপরাধ কখনোই কমবে না। আমরা কমিউনিকেশন করতে পারি—জনসচেতনতামূলক প্রচারণা বাড়াতে পারি।
সংবাদমাধ্যম, স্কুল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে আমরা দেখি না। আজকাল নেতাদের মাঝে মাঝে এসব কথা বলতে শুনছি, কিন্তু কোনও অ্যাকশন দেখছি না। তবে তারা যদি চিন্তা করতে পারতেন যে একটি দেশের হাসপাতাল যদি প্রতিদিন ক্যানসার, কিডনি-লিভারের রোগ, বন্ধ্যাত্ব এবং অজানা দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় ভরে যেতে থাকে, তবে শুধু চিকিৎসা ব্যবস্থাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, তাহলে আমাদের জাতির উপকার হতো।
আমরা খাবারের দিকে না তাকিয়ে, হাসপাতালের বেড বাড়াতে চাইছি। কিন্তু আমাদের স্বাস্থ্য নির্ভর করছে খাবারে বিষ মেশানোর মধ্যে। এটি একসময় মহামারি আকারে আসবে এবং আমরা খাদ্য ঘাটতির কারণে নয়, নিরাপদ খাদ্যের অভাবে অসুস্থ একটি জাতিতে পরিণত হবো।
ইকরাম কবীর: কথাসাহিত্যিক




