নকলের সুযোগ না পেয়ে কেন্দ্রে হামলা এবং বিপজ্জনক তারুণ্য 

‘নকলের’ সুযোগ না পেয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুর। সম্প্রতি এমন একটি খবর এসেছে গণমাধ্যমে। বাংলাদেশ তো বটেই, পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম ঘটনা বিরল। যে বিরল ঘটনার সাক্ষী হলো দখিনের জেলা ভোলা। নৈসর্গিক সৌন্দর্যের জন্য খ্যাত চরফ্যাশন উপজেলা। গত ফেব্রুয়ারিতে এরকম ঘটনা ঘটেছিল ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে। রাজ্যের কালাবুরাগি জেলায় অবস্থিত ডা. মালাকারেড্ডি হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজে অভ্যন্তরীণ পরীক্ষায় নকল করতে বাধা দেওয়ায় এক সহকারী অধ্যাপকের ওপর হামলা চালায় পরীক্ষার্থীদের একটি অংশ।

খবরে বলা হচ্ছে, গত শনিবার (১১ জুলাই) ভোলার চরফ্যাশনের ফাতেমা মতিন মহিলা মহাবিদ্যালয় পরীক্ষা কেন্দ্রে এইচএসসির আইসিটি পরীক্ষায় নকল করতে না পেরে কেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছে একদল শিক্ষার্থী।  পরীক্ষা শেষে জোটবদ্ধ হয়ে তারা কলেজ গেট ও কলেজের অফিস কক্ষে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর শুরু করে। এ সময় শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধ করতে গিয়ে কলেজ ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি, একাধিক শিক্ষক ও পথচারী আহত হন। খবর পেয়ে চরফ্যাশন থানার পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করে দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

যদিও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ফাতেমা-মতিন কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকেরা পরীক্ষার শুরু থেকেই পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে কঠোর আচরণ করেছেন। পরীক্ষার সময় কোনও শিক্ষার্থী সময় জানতে চাইলেও খাতা নিয়ে কিছু সময় বসিয়ে রাখা হচ্ছে। এসব ঘটনায় পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। যে কারণে ওইদিন পরীক্ষা শেষে ক্ষুব্ধ কয়েকজন শিক্ষার্থী কলেজের জানালার গ্রিল ও কাচের জানালায় ইট ছুড়ে ভাঙচুর করেন।

নকলের সুযোগ না পেয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর বা পরীক্ষককে মারধরের ঘটনা বিরল হলেও দেশে বিভিন্ন সময়ে এরকম আরও কিছু ঘটনা ঘটেছে। যেমন ২০১৫ সালে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলায় এইচএসসি পরীক্ষায় এক পরীক্ষক নকল ধরার পর পরীক্ষা শেষে একদল শিক্ষার্থী তার ওপর হামলা চালায় এবং মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে। এ বছরই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এলএলবি পরীক্ষায় নকলের অভিযোগ তুলে বহিষ্কারের সুপারিশ করায় দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষককে কয়েকজন পরীক্ষার্থী ও তাদের সহযোগী মারধর করেছে—এরকম খবরও প্রকাশিত হয়েছে।

মানুষ সব সময় তরুণ থাকতে চায়। তারুণ্যের জয়গান গায়। তার কারণ প্রতিটি জাতির জীবনের অধিকাংশ অর্জনের পেছনে তরুণদের বিরাট ভূমিকা থাকে। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবশেষ যে বড় ঘটনা ঘটলো জুলাই অভ্যুত্থান—তারও নেতৃত্বে ছিল তরুণরা। এই তরুণরাই ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তুলে সারা দেশে সাড়া ফেলেছিল। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন মহান মুক্তিযুদ্ধেও এই তারুণ্যের ভূমিকা ব্যাপক। অথচ সেই তরুণদেরই একটি অংশ এখন পরীক্ষায় নকলের সুযোগ না পেয়ে কেন্দ্রে হামলা চালায়, ভাঙচুর করে, পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়ায়। তার মানে নকল করাকে তারা তাদের অধিকার মনে করছে। অথবা শিক্ষকদের পরামর্শে যে সিলেবাস ধরে তারা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছে, সেখান থেকে প্রশ্ন আসেনি, অর্থাৎ প্রশ্ন কমন পড়েনি বলে তারা সংক্ষুব্ধ হয়েছে। যদি তাই হয়, তাহলে সেই সংক্ষুব্ধতার বহিঃপ্রকাশ কীভাবে ঘটবে এবং এই ঘটনার মধ্য দিয়ে পুরো শিক্ষাব্যবস্থা এবং পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়েই বরং প্রশ্ন তোলা উচিত।

কবি-সাহিত্যিকেরা যে তারুণ্যের জয়গান গেয়ে লিখেছেন: ‘ওরে তরুণ ওরে আমার কাঁচা, আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা’ কিংবা ‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’—সেই তরুণরা এখন কাকে ঘা মারছে? তারা কোন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে?

এই তরুণদেরই একটি অংশ এখন জড়িয়ে পড়ছে ধর্মীয় উগ্রবাদে। তারা বুঝে হোক বা না বুঝে, কালেমা লেখা পতাকা নিয়ে মিছিল করছে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের পতাকা ওড়ানোর প্রতিবাদ হিসেবে। অথচ তারা হয়তো বুঝতেই পারছে না যে কী এক ভয়ংকর আন্তর্জাতিক খেলার অংশ হয়ে যাচ্ছে। তারা বিশ্বকাপ ফুটবলের বিরোধিতা করতে গিয়ে নিজেরাই যে জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদের বৈশ্বিক খেলার ঘুঁটি হয়ে যাচ্ছে, সেটি টের পাচ্ছে না। তারা একটি বড় অপশক্তির দ্বারা ব্যবহৃত হচ্ছে, তাদের চেনাজানা মানুষগুলোই যে তাদের মগজ ধোলাই করে বিপথে এবং নিজ দেশের, মানুষের ও সভ্যতার বিপরীতে দাঁড় করাচ্ছে, সেটি সম্ভবত বুঝতে পারছে না।

এই তরুণদের একটি অংশই এখন কিশোর গ্যাং যাদের ভয়ে সারাক্ষণ তটস্থ থাকে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী এবং চট্টগ্রামসহ দেশের নানা প্রান্তের মানুষ। পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, সঙ্গদোষ, টাকার লোভ, মাদকাসক্তি এবং সর্বোপরি স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও প্রভাবশালীদের প্রশ্রয়ে গড়ে ওঠা এসব কিশোর গ্যাং এখন তারুণ্যের অহ্ঙ্কার নয়, বরং তারুণ্যের অপচয়ে পরিণত হয়েছে।

সুতরাং, আজ যে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় নকল করার সুযোগ না পেয়ে কেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুর চালালো, তাদের মধ্য থেকেই ভবিষ্যতে কেউ যদি বড় অপরাধী হয়ে ওঠে, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। আবার এদের মধ্য থেকেই ভবিষ্যতে কেউ হয়তো এমপি-মন্ত্রী হবে। বিসিএস দিয়ে সরকারি কর্মচারী হয়ে সচিব বা সিনিয়র সচিব হয়ে অবসরে যাবে। ফলে শিক্ষাজীবনের মাঝপথে এসে তারা যে ভয়াবহ অনৈতিকতার আশ্রয় নিলো, এর রেশ কি তাদের সেই কর্মজীবনে প্রভাব ফেলবে না?

যারা উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় নকলের সুযোগ না পেয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙুর চালালো, তাদের কাছে তাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র কতটা নিরাপদ থাকবে? তার চেয়ে বড় প্রশ্ন, যারা এই কাজ করলো, তাদের বাবা-মা, পরিবার এমনকি তাদের শিক্ষকরাও কি এর দায় এড়াতে পারেন? জীবনের শুরু থেকেই তারা যদি নীতি-নৈতিকতা, শৃঙ্খলা আর বিনয়ের শিক্ষা পেতো, তাহলে কি তারা পরীক্ষাকেন্দ্রে হামলা চালানোর মতো এমন ভয়াবহ কাজে অংশ নিতো? সুতরাং, তাদের বাবা-মা এবং শিক্ষকদেরও প্রয়োজনে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং তাদেরও আত্মসমালোচনারও অবকাশ রয়েছে। কারণ সন্তান বখে গেলে বাবা-মা যেমন তার দায় এড়াতে পারেন না, তেমনই কোনও কলেজের শিক্ষার্থীদের একটি অংশ যদি নকলের সুযোগ না পেলে হলে ভাঙচুর চালায়, তাহলে সেই কলেজের পড়লেখা, পরিবেশ এবং শিক্ষকদের দায়িত্ববোধ নিয়েও প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন।

স্মরণ করা যেতে পারে, ২০২২ সালে ঢাকার অদূরে সাভার উপজেলার আশুলিয়ায় হাজী ইউনুছ আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক উৎপল কুমার সরকারকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছিল দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে। তখনও এই প্রশ্ন উঠেছিল যে একজন কিশোর, একজন তরুণ কোন প্রক্রিয়ায়, কাদের ছত্রছায়ায় অপরাধী হয়ে ওঠে এবং কিশোর গ্যাং গড়ে তুলে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে? রাজনৈতিক প্রশ্রয় ছাড়া কি কারও পক্ষে অপরাধ করে পার পাওয়া সম্ভব?

প্রশ্ন ওঠে, সন্তানের বখে যাওয়ার দায় কার? সন্তানকে মোটরসাইকেল কিনে দিয়ে মাস্তানি করার সুযোগ দেন কে? সন্তান যে এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে, সেই কথা বাবা- মায়েরা কি খেয়াল করেন না? কিশোর গ্যাংয়ে যুক্ত সব তরুণই কি পরিবার বিচ্ছিন্ন? যারা পরিবার বিচ্ছিন্ন নয়, তাদের কাছে কি বখে যাওয়া সন্তানের ব্যাপারে অভিযোগ যায় বা গেলেও কি তারা শাসন করে সন্তানকে সুপথে ফিরিয়ে আনেন? সন্তান যে ভেতরে ভেতরে খুনি হয়ে উঠছে, সেটি খেয়াল রাখার দায়িত্ব কার?

সুতরাং, যেসব কারণে এবং যে প্রক্রিয়ায় একজন সাধারণ কিশোর বা তরুণ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে যায় এবং কিশোর গ্যাং তৈরি হয়, নির্মোহ অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, সেখানে মূল ভূমিকা পালন করে নষ্ট রাজনীতি এবং প্রভাবশালীদের ব্যক্তিগত স্বার্থ। এলাকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক বড় ভাইয়েরা তাদের ছোট ভাইদের দিয়ে নানান ফরমাশ খাটায় এবং তাদের ধীরে ধীরে ক্ষমতার বলয়ে নিয়ে আসে। সেই ক্ষমতা চর্চার প্রধান মাধ্যম হচ্ছে মোটরসাইকেল—যা কিশোরদের কিনে দিতে বাধ্য হন তাদের অভিভাবকরাই। অর্থাৎ রাজনৈতিক বড় ভাই এবং বিশেষ করে অনেক নির্মাণ ব্যবসায়ীর ছত্রছায়ায় সাধারণ, গরিব এবং পরিবারবিচ্ছিন্ন তরুণদের একটি বড় অংশ গ্যাং কালচারে যুক্ত হয়ে যায়। ছোটখাটো অপরাধ দিয়ে হাতেখড়ি এবং একপর্যায়ে তারা খুনোখুনিতেও জড়ায়। সুতরাং, কোনও একটি সিঙ্গেল পদক্ষেপ নিয়ে তারুণ্যের এই অপচয় বন্ধ করা যাবে না। এটি সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রশ্ন।

অভাব অনটন আর অবহেলায় বেড়ে ওঠা তরুণদের অপরাধে জড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কা সবচেয়ে বেশি। তার সঙ্গে আছে পারিবারিক মূল্যবোধ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়ও কম নয়। অতএব, সকলের দায় ও দায়িত্ব নিশ্চিত করা না গেলে যে তরুণরা আজ পরীক্ষায় নকল করার সুযোগ না পেয়ে কেন্দ্রে ভাঙচুর চালালো, কাল সে ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে কোনও নারীকে খুন করবে বা ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য হয়তো আরও বড় কোনও অপরাধে জড়িয়ে পড়বে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট