বাংলাদেশের উন্নয়ন, ডিজিটাল রূপান্তর এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের নানা সাফল্যের কথাই উঠে আসে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর আজও স্পষ্ট নয়—দেশে ঠিক কতজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি আছেন? প্রশ্নটি কেবল পরিসংখ্যানের নয়, এটি উন্নয়ন পরিকল্পনা, বাজেট এবং রাষ্ট্রীয় অন্তর্ভুক্তির অন্যতম ভিত্তি। যারা রাষ্ট্রের গণনায় থাকেন না, তাঁদের জন্য কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করাও বাস্তবে সম্ভব হয় না।
বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা নিয়ে সরকারি তথ্যেই বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১১ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশের মাত্র ১.৪৩ শতাংশ মানুষ প্রতিবন্ধিতার সঙ্গে বসবাস করেন। অন্যদিকে সমাজসেবা অধিদফতরের এক জরিপে এই হার ৭ শতাংশেরও বেশি। এই দুই হিসাবের পার্থক্য প্রায় এক কোটি মানুষের। এত বড় ব্যবধান শুধু পরিসংখ্যানগত দুর্বলতা নয়—এটি নীতিনির্ধারণের একটি মৌলিক সংকেত।
একটি রাষ্ট্র যদি নিশ্চিতভাবেই না জানে তার কতজন নাগরিক প্রতিবন্ধী, তাহলে তাঁদের জন্য কতটি বিদ্যালয় প্রয়োজন, কোথায় পুনর্বাসনকেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে, কতজনকে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দিতে হবে, কতজনের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে, কিংবা গণপরিবহন কতটা প্রবেশযোগ্য করতে হবে—এসব সিদ্ধান্তই বা কীভাবে নেবে? বিষয়টি অনেকটা গাড়ির সংখ্যা না জেনেই রাস্তা নির্মাণ করার মতো।
বাংলাদেশ দ্রুত ডিজিটাল হচ্ছে। সরকারি সেবা অনলাইনে যাচ্ছে, জাতীয় পরিচয়পত্র থেকে জন্মনিবন্ধন—সবই ক্রমে সমন্বিত হচ্ছে। অথচ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের তথ্য এখনও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদফতর ও প্রকল্পে বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে রয়েছে। কোথাও স্বাস্থ্যসেবার তথ্য, কোথাও ভাতাভোগীর তালিকা, কোথাও শিক্ষার তথ্য, কোথাও নিবন্ধনের তথ্য আছে—কিন্তু এসব তথ্যের কোনও সমন্বিত জাতীয় চিত্র নেই। ফলে সরকার নিজেও জানে না, কোথায় কী ধরনের সেবা বা বিনিয়োগ সবচেয়ে জরুরি।
এই তথ্য ঘাটতির বাস্তব প্রভাবও স্পষ্ট। নীতিনির্ধারকরা জানেনই না ঠিক কতজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কর্মক্ষম অথচ বেকার, কতজনের দক্ষতা রয়েছে, কতজন প্রশিক্ষণ নিতে আগ্রহী কিংবা কোন খাতে তাঁদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
একইভাবে, নগর পরিকল্পনায় প্রতিবন্ধীবান্ধব গণপরিবহন বা প্রবেশযোগ্য অবকাঠামোর কথা বলা হলেও স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োজনভিত্তিক তথ্যের অভাবে অনেক উদ্যোগ কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। এমনকি সরকারি চাকরিতে কতজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কর্মরত—সে সম্পর্কেও নির্ভরযোগ্য কোনও সমন্বিত তথ্য নেই।
ব্যবস্থাপনার একটি বহুল ব্যবহৃত নীতি হলো—যা পরিমাপ করা যায় না, তা কার্যকরভাবে পরিচালনাও করা যায় না। রাষ্ট্রীয় নীতির ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই। যে জনগোষ্ঠী তথ্যে বা উপাত্তে দৃশ্যমান নয়, তাঁদের বাজেট, পরিকল্পনা ও বিনিয়োগে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পাওয়াটাই স্বাভাবিক।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার প্রতিবন্ধী ভাতাভোগীর সংখ্যা ৩৪ লাখ ৫০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৩৮ লাখে উন্নীত করার এবং মাসিক ভাতা ৯০০ টাকা থেকে ১০০০ টাকায় বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। প্রায় সাড়ে তিন লাখ নতুন মানুষ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আসবেন। এটি অবশ্যই একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে প্রশ্ন হলো, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি কি এখনও মূলত ভাতাকেন্দ্রিক?
সামাজিক নিরাপত্তা প্রয়োজন, কিন্তু তা কখনোই উন্নয়নের বিকল্প হতে পারে না। বাজেটে ভাতার কথা থাকলেও শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, সহায়ক প্রযুক্তি, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, কর্মসংস্থান, প্রবেশযোগ্য অবকাঠামো, গণপরিবহন কিংবা ডিজিটাল সেবায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সমন্বিত বিনিয়োগের কোনও সুস্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায় না। ফলে অনেকেই সামাজিক সুরক্ষার আওতায় এলেও অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিতই থাকেন।
এই ঘাটতি শুধু সরকারের নয়, বেসরকারি খাতও এর প্রভাব অনুভব করে। অনেক প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্তিমূলক নিয়োগে আগ্রহী হলেও কোথায় দক্ষ প্রতিবন্ধী কর্মী আছেন, তাঁদের দক্ষতার ধরন কী এবং কী ধরনের সহায়ক প্রযুক্তি প্রয়োজন—এসব তথ্য না থাকায় নিয়োগের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়।
বিশ্বজুড়ে এখন প্রতিবন্ধিতাকে করুণা বা দানের বিষয় হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের বিষয় হিসেবে দেখা হয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মতে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানের ব্যবধান কমানো গেলে একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রায় ৩ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। অর্থাৎ এটি কেবল সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন নয়, এটি উৎপাদনশীলতা, প্রবৃদ্ধি এবং অর্থনীতিরও প্রশ্ন।
বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায়, তাহলে প্রথম কাজ হবে একটি সমন্বিত জাতীয় প্রতিবন্ধিতা তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সমাজকল্যাণ, শ্রম, স্থানীয় সরকার, নির্বাচন কমিশন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের তথ্য একটি অভিন্ন কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। জাতিসংঘের ‘ওয়াশিংটন গ্রুপ প্রশ্নাবলি’ ব্যবহার করলে তথ্যের মান ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে তুলনীয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। পাশাপাশি শুধু প্রতিবন্ধিতার ধরন নয়—শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান, আয়, স্বাস্থ্য, পরিবহন, ডিজিটাল সেবা ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্পর্কিত তথ্যও সমন্বিতভাবে সংগ্রহ করতে হবে। তাহলেই প্রয়োজনভিত্তিক বাজেট ও কার্যকর নীতি প্রণয়ন সম্ভব হবে।
প্রতিবন্ধিতা অন্তর্ভুক্তিকে বছরে একদিনের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। প্রতিবছর ৩ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবসে আলোচনা করেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। জাতীয় বাজেট, নগর পরিকল্পনা, ডিজিটাল রূপান্তর, সরকারি ক্রয়নীতি এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ নীতিতেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তিকে মূলধারায় আনতে হবে।
বাংলাদেশের ইতিহাস বলে, সরকার, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী ও নাগরিক সমাজ একসঙ্গে কাজ করলে বড় পরিবর্তন সম্ভব। দারিদ্র্য হ্রাস, ক্ষুদ্রঋণের বিস্তার, অ্যাসিড-সন্ত্রাস রোধ কিংবা প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ বৃদ্ধির মতো সাফল্য তারই প্রমাণ। প্রতিবন্ধিতা অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রেও এখন তেমনই একটি সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ প্রয়োজন। আসন্ন জাতীয় জনশুমারি এবং ভবিষ্যতের সব বড় সরকারি জরিপে ‘ওয়াশিংটন গ্রুপ প্রশ্নাবলি’ বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তই হতে পারে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পদক্ষেপগুলোর একটি।
একটি উন্নত রাষ্ট্রের পরিচয় শুধু কতজন মানুষকে ভাতা দেওয়া হলো, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না, বরং নির্ধারিত হয় কতজন মানুষকে শিক্ষা, দক্ষতা, প্রযুক্তি ও প্রবেশযোগ্য কর্মপরিবেশ দিয়ে উৎপাদনশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা গেল, তা দিয়ে। একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ভাতার ওপর নির্ভরশীল একজন নাগরিক নন; তিনি হতে পারেন একজন করদাতা, উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক এবং অর্থনীতির সক্রিয় অংশীদার—তবে রাষ্ট্রকে তাঁকে সেই সুযোগটি দিতে হবে।
উপাত্ত কেবল সংখ্যা নয়; উপাত্তই নির্ধারণ করে কার জন্য বাজেট হবে, কে উন্নয়ন প্রকল্পে স্থান পাবেন, কে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন, আর কে রাষ্ট্রের চোখেই অদৃশ্য থেকে যাবেন। যে রাষ্ট্র তার সব নাগরিককে গণনায় রাখে, সেই রাষ্ট্রই প্রকৃত অর্থে কাউকে পিছিয়ে রাখে না। অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের যাত্রাও শুরু হবে সেখান থেকেই।
লেখক: কমিউনিকেশন, কালচার ও করপোরেট দায়িত্বশীলতা পেশায় নিয়োজিত