রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মৌলিক নীতি হলো—জনগণের কাছ থেকে সংগৃহীত করের অর্থ এমনভাবে ব্যয় করা, যাতে তার সর্বোচ্চ সুফল সাধারণ মানুষ ভোগ করতে পারে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারি ব্যয়ের প্রতিটি খাতের পেছনে জনস্বার্থ, জবাবদিহি ও অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা থাকা জরুরি। তাই যখন কোনও নির্দিষ্ট শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তার জন্য বিশেষ আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়, তখন তা জনপরিসরে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে প্রশাসন ক্যাডারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জন্য গাড়ি কেনায় ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত সুদমুক্ত ঋণ এবং গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মাসিক ৫০ হাজার টাকা ভাতা দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। সাম্প্রতিক সময়ে এই ভাতা ৫০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকায় নামিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি—যা আবারও সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ গত ৯ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা অর্ধেকে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে বলেছিল। কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনাগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট মহলের আপত্তির পর সেই উদ্যোগ থেকে সরে আসে অর্থ বিভাগ। ফলে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য মাসিক ৫০ হাজার টাকার রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা বহাল থাকে। একই সময়ে সরকার গাড়ি কেনার জন্য ৩০ লাখ টাকার সুদমুক্ত ঋণ সুবিধা সাময়িকভাবে স্থগিত করলেও রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা কমানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর না হওয়া দেখিয়েছে, ব্যয় সংকোচনের নীতি বাস্তবায়ন সব সময় সহজ নয়।
বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতি। গত কয়েক দশকে দেশটি উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু একইসঙ্গে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি, কর্মসংস্থান এবং নগর অবকাঠামোর মতো খাতগুলো এখনও পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অপেক্ষায় রয়েছে। সরকারি হাসপাতালের সংকট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধতা, মূল্যস্ফীতি এবং বেকারত্বের বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয় যে রাষ্ট্রের প্রতিটি টাকার কার্যকর ব্যবহার বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতির একটি মৌলিক ধারণা হলো সুযোগ ব্যয়। অর্থাৎ একটি খাতে অর্থ ব্যয় করলে অন্য একটি সম্ভাব্য খাতে সেই অর্থ ব্যয় করার সুযোগ হারিয়ে যায়। ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার জন্য সুদমুক্ত ঋণ এবং মাসিক রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা প্রদানের অর্থ হলো, সেই অর্থ স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা বা অবকাঠামো উন্নয়নের মতো জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যয় করা সম্ভব হচ্ছে না। অথচ সীমিত সম্পদের অর্থনীতিতে প্রতিটি সরকারি ব্যয়ের যৌক্তিকতা মূল্যায়ন করা জরুরি।
সুদমুক্ত ঋণ প্রকৃতপক্ষে এক ধরনের পরোক্ষ ভর্তুকি। কারণ অর্থেরও একটি মূল্য রয়েছে। সাধারণ নাগরিক যখন গাড়ি কিনতে ব্যাংক ঋণ নেন, তখন তাকে বাজার দরের সুদ দিতে হয়। কিন্তু একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা একই উদ্দেশ্যে সুদমুক্ত ঋণ পেলে সেই সুদের সুবিধা রাষ্ট্র বহন করে। অর্থাৎ করদাতাদের অর্থ ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয় এবং রাষ্ট্র সম্ভাব্য সুদের আয় থেকেও বঞ্চিত হয়।
এখানে ন্যায্যতার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি কর্মকর্তাদের কাজের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু সেই সুবিধা যদি ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়, তাহলে তা বিতর্ক সৃষ্টি করতেই পারে। কারণ গাড়িটি সরকারি সম্পদ নয়; এটি ব্যক্তিগত মালিকানায় চলে যায়। ফলে সরকারি অর্থ পরোক্ষভাবে ব্যক্তিগত সম্পদ সৃষ্টিতে ব্যবহৃত হয়।
এই সুবিধার ইতিবৃত্তও তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১১ সালে যুগ্ম সচিব থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জন্য ১৬ লাখ টাকা সুদমুক্ত গাড়ি ঋণ এবং ২৫ হাজার টাকা রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা চালু হয়। পরে ভাতার পরিমাণ ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়। ২০১৭ সালে উপসচিবদেরও এই সুবিধার আওতায় আনা হয় এবং তাদের জন্য গাড়ি কেনায় ৩০ লাখ টাকা সুদমুক্ত ঋণ ও ৫০ হাজার টাকা রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা নির্ধারণ করা হয়। ফলে সুবিধাভোগীর পরিধিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
বাংলাদেশে আয় বৈষম্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা। সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের সুযোগ-সুবিধার মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। একজন শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ব্যক্তিগত গাড়ি কিনতে বাজার দরের সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হন। সেখানে সীমিত সংখ্যক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার জন্য সুদমুক্ত ঋণ ও নগদ ভাতা বৈষম্যের অনুভূতি সৃষ্টি করে।
গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ মাসিক ৫০ হাজার টাকা নির্দিষ্ট ভাতাও প্রশ্নের জন্ম দেয়। সব কর্মকর্তা সমানভাবে সরকারি কাজে গাড়ি ব্যবহার করেন না। অথচ সবাই একই হারে ভাতা পান। এতে প্রকৃত ব্যয় ও প্রদত্ত অর্থের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশেই সরকারি কাজের জন্য ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করলে প্রকৃত ব্যয়ের ভিত্তিতে অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এতে সরকারি অর্থের অপচয় কমে এবং জবাবদিহি বাড়ে।
ব্যয় কমানোর উদ্যোগটি কেন বাস্তবায়িত হলো না, সেটিও তাৎপর্যপূর্ণ। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই ব্যবস্থার সঙ্গে শুধু কর্মকর্তারাই নন, গাড়িচালকদেরও স্বার্থ জড়িত। ফলে ব্যয় কমানোর উদ্যোগের বিরুদ্ধে আপত্তি ওঠে। এতে বোঝা যায়, একবার কোনও আর্থিক সুবিধা চালু হলে তা প্রত্যাহার করা প্রশাসনিকভাবে কতটা কঠিন হয়ে পড়ে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান এবং সিঙ্গাপুরের মতো দেশে উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার জন্য সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার প্রচলন নেই। সেখানে সরকারি কাজের জন্য সরকারি গাড়ি, পুল কার ব্যবস্থা অথবা প্রকৃত ভ্রমণ ব্যয়ের ভিত্তিতে অর্থ ফেরত দেওয়া হয়। অর্থাৎ সুবিধাটি ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির জন্য নয়, বরং সরকারি কাজ সম্পাদনের সুবিধার্থে সীমাবদ্ধ থাকে।
অবশ্য এই সুবিধার সমর্থকেরাও কিছু যুক্তি দেন। তাদের মতে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দ্রুত চলাচল নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের স্বার্থে জরুরি। মাঠপর্যায়ে প্রশাসনিক তদারকি, আইনশৃঙ্খলা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কিংবা জরুরি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য ব্যক্তিগত গাড়ি কার্যকর হতে পারে। তবে অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, ব্যক্তিগত গাড়িতে ভর্তুকি দেওয়ার পরিবর্তে সরকারি পুল কার ব্যবস্থা কিংবা প্রকৃত ব্যয়ের ভিত্তিতে ভ্রমণ ভাতা আরও স্বচ্ছ, সাশ্রয়ী এবং জবাবদিহিমূলক হতে পারে।
বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ব্যয় সংকোচন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, সীমিত রাজস্ব এবং উন্নয়ন ব্যয়ের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে সরকারি ব্যয় আরও দক্ষভাবে পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে একদিকে সুদমুক্ত ঋণ সাময়িকভাবে স্থগিত করা, অন্যদিকে রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা কমানোর উদ্যোগ থেকে সরে আসা নীতিনির্ধারণে দ্বৈততার প্রশ্নও উত্থাপন করেছে।
রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা নির্ভর করে সরকারি অর্থ কতটা স্বচ্ছ ও ন্যায্যভাবে ব্যয় হচ্ছে তার ওপর। করদাতারা আশা করেন, তাদের অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, নিরাপত্তা এবং সামাজিক কল্যাণে ব্যয় হবে। তাই কোনও বিশেষ সুবিধা যদি একটি সীমিত গোষ্ঠীর জন্য অসম সুবিধা হিসেবে প্রতীয়মান হয়, তবে তা জনমনে প্রশ্ন সৃষ্টি করাই স্বাভাবিক।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করা অবশ্যই জরুরি, তবে তা ব্যক্তিগত সম্পদে ভর্তুকি দিয়ে নয়; বরং সরকারি পুল কার, ব্যবহারভিত্তিক ভ্রমণ ব্যয় এবং স্বচ্ছ ব্যয় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিশ্চিত করা আরও কার্যকর হতে পারে। এতে প্রশাসনিক দক্ষতাও বজায় থাকবে, একই সঙ্গে করদাতাদের অর্থ ব্যবহারে ন্যায্যতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত হবে।
রাষ্ট্রের অর্থ শেষ পর্যন্ত জনগণের অর্থ। সেই অর্থ কোথায়, কীভাবে এবং কার স্বার্থে ব্যয় হবে, সেটি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়—এটি অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, সুশাসন এবং জনআস্থার প্রশ্ন। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়েছে যে ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া যত সহজ, তা বাস্তবায়ন করা ততটাই কঠিন। তবু সীমিত সম্পদের দেশে সরকারি ব্যয়ের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে জনস্বার্থ, স্বচ্ছতা এবং অর্থনৈতিক যৌক্তিকতার আলোকে মূল্যায়ন করাই সময়ের দাবি।
লেখক: অধ্যাপক, পরিসংখ্যান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়