কোনও রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতি যাচাই করতে হলে শুধু নির্বাচন বা সরকার পরিবর্তনের দিকে তাকালেই হয় না; তাকাতে হয় তার সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে। কারণ গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানের মর্যাদায় নিহিত। রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে সাম্প্রতিক আলোচনা তাই কেবল একজন ব্যক্তিকে নিয়ে নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং সাংবিধানিক পরিপক্বতাকে নতুন করে ভাবার একটি উপলক্ষ।
বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান। সংসদীয় ব্যবস্থায় তাঁর নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত, কিন্তু তাঁর নৈতিক অবস্থান সীমিত নয়। তিনি রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতার প্রতীক, সংবিধান রক্ষার শপথ নেওয়া ব্যক্তি এবং রাজনৈতিক সংকটে জাতির কাছে একটি নৈতিক আশ্রয়। ফলে রাষ্ট্রপতির প্রকৃত শক্তি সংবিধানের লিখিত বিধানের চেয়ে অনেক বেশি নিহিত থাকে জনগণের আস্থা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিদের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে— রাষ্ট্রপতির বিদায় খুব কম ক্ষেত্রেই নিছক ব্যক্তিগত ঘটনা ছিল। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর পদত্যাগের পেছনে যেমন তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা কাজ করেছে, তেমনই বিচারপতি আবদুস সাত্তারের মেয়াদ সামরিক অভ্যুত্থানের কারণে অসমাপ্ত থেকে যায়। গণঅভ্যুত্থানে জেনারেল এরশাদের বিদায়, পরে অধ্যাপক এ. কিউ. এম. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগ— প্রতিটি ঘটনাই দেখিয়েছে যে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি-প্রতিষ্ঠান প্রায় সব সময়ই বৃহত্তর রাজনৈতিক সমীকরণের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। ফলে অনেক সময় ঘোষিত কারণের চেয়ে রাজনৈতিক কারণই ইতিহাসে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
অবশ্য এই বাস্তবতা একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নও উত্থাপন করে। বাংলাদেশে কি রাষ্ট্রপতিরা সত্যিকার অর্থে সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধ, নাকি রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিই বেশি জবাবদিহি করতে বাধ্য হন? সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে নিরপেক্ষ রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে কল্পনা করলেও তাঁকে নির্বাচন করেন রাজনৈতিক প্রতিনিধিরাই। ফলে দায়িত্ব গ্রহণের আগেই তাঁর সঙ্গে একটি রাজনৈতিক পরিচয় যুক্ত হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে সেই পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠতে পারা যেমন রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত প্রজ্ঞার বিষয়, তেমনই রাজনৈতিক দলগুলোর পরিপক্বতারও পরীক্ষা।
বর্তমান রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে বিতর্কের ক্ষেত্রেও এই প্রশ্নগুলো প্রাসঙ্গিক। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের এক গুরুতর সংকট। সেই সময়ে বহু মানুষ রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে আরও দৃশ্যমান, সক্রিয় ও নৈতিক ভূমিকা প্রত্যাশা করেছিলেন। সংবিধান তাঁর নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত করেছে, কিন্তু নৈতিক অবস্থান গ্রহণের সুযোগ কেড়ে নেয়নি। রাষ্ট্রপতি সব সংকটের সমাধান দিতে পারেন না— কিন্তু ইতিহাসের কিছু মুহূর্তে নীরবতাও একটি রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল তেমনই একটি মুহূর্ত। সে কারণে বর্তমান রাষ্ট্রপতির ভূমিকা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তাকে একেবারে অমূলক
বলার সুযোগ নেই। ইতিহাসও নিশ্চয়ই সেই সময়ের মূল্যায়ন করবে। তবে ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির সীমাবদ্ধতা আর রাষ্ট্রপতি প্রতিষ্ঠানের মর্যাদাকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। গণতন্ত্রে ব্যক্তি সমালোচিত হবেন, প্রতিষ্ঠান নয়। কারণ ব্যক্তি ক্ষণস্থায়ী, প্রতিষ্ঠান স্থায়ী।
রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, তাঁর ভূমিকার সমালোচনা হতে পারে কিন্তু রাষ্ট্রপতি পদকে যদি প্রতিদিনের রাজনৈতিক সংঘর্ষের অংশ বানিয়ে ফেলা হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাষ্ট্র নিজেই।
রাষ্ট্রপতিকে মহামান্য বলা হয়। এই সম্বোধন কোনও ব্যক্তিকে অলংকৃত করার জন্য নয়; রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ভাষা। আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে বিদ্রূপ, কৌতুক কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণ প্রায় স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এর দায় কেবল কোনও একজন রাষ্ট্রপতির নয়, এর দায় আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও। আমরা ক্রমশ এমন এক জায়গায় পৌঁছেছি, যেখানে প্রতিপক্ষকে আঘাত করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকেও আঘাত করতে দ্বিধা করি না।
যেকোনও পরিণত গণতন্ত্রের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো, সেখানে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আলাদা করে দেখা হয়। সরকার পরিবর্তিত হয়, কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে। ভারত, জার্মানি কিংবা ইতালির মতো সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত হলেও তাঁর সাংবিধানিক মর্যাদা নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা হয় না। বাংলাদেশের জন্যও সেই সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি।
রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে বর্তমান আলোচনা শেষ পর্যন্ত একটি বড় শিক্ষা দেয়। ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি সফল বা ব্যর্থ হতে পারেন— কিন্তু একটি রাষ্ট্র তখনই পরিণত হয়, যখন তার সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক পালাবদলের ঊর্ধ্বে সম্মান পায়। বাংলাদেশের সামনে আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নতুন রাষ্ট্রপতি কে হবেন, সেটি নয়। বড় প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতের কোনও রাষ্ট্রপতি কি জাতীয় সংকটের
মুহূর্তে জনগণের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠতে পারবেন? তিনি কি দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে স্মরণীয় হবেন?
রাষ্ট্রপতিরা আসবেন, চলে যাবেন। সরকারও বদলাবে। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখে রাজনৈতিক ক্ষমতা নয়, টিকিয়ে রাখে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, সংবিধানের প্রতি অবিচল আনুগত্য এবং রাজনৈতিক শিষ্টাচারের চর্চা। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎও শেষ পর্যন্ত সেখানেই নির্ধারিত হবে।
লেখক: মানবাধিকার কর্মী