২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানের মর্যাদার পরীক্ষা

রাষ্ট্রপতির পদকে অনেকেই সীমিত ক্ষমতার একটি সাংবিধানিক অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করেন। সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় এই ধারণার বাস্তব ভিত্তিও রয়েছে। রাষ্ট্রপতি সরাসরি সরকার পরিচালনা করেন না, নীতিনির্ধারণের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডেও তার অংশগ্রহণ সীমিত। তবু এই পদের গুরুত্ব কখনোই কেবল ক্ষমতার পরিধি দিয়ে বিচার করা যায় না। রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতার প্রতীক, সংবিধানের মর্যাদার রক্ষক, প্রজাতন্ত্রের সাংবিধানিক অভিভাবক এবং জাতীয় ঐক্যের অন্যতম প্রতীক। তাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন একটি আনুষ্ঠানিক সাংবিধানিক প্রক্রিয়া হলেও এর রাজনৈতিক, নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক তাৎপর্য অনেক বিস্তৃত।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর বাংলাদেশ আবার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক মুহূর্তের মুখোমুখি হয়েছে। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নব্বই দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। ততদিন পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এই বিধান রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে। ফলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে কোনও শূন্যতা সৃষ্টি হয় না। কিন্তু আইন যে প্রশ্নের উত্তর দেয়, রাজনীতি অনেক সময় তার চেয়ে বড় প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। নতুন রাষ্ট্রপতি কে হবেন, সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব রাষ্ট্রপতির পদ সম্পর্কে কী ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করছে।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন না। সংসদ সদস্যদের ভোটেই তার নির্বাচন সম্পন্ন হয়। সে কারণে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের অবস্থানই কার্যত ফল নির্ধারণ করে। কিন্তু রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর তার রাজনৈতিক পরিচয় নতুন এক সাংবিধানিক পরিচয়ে রূপ নেয়। তখন তিনি আর কোনও দলের প্রতিনিধি নন। তিনি পুরো রাষ্ট্রের প্রতিনিধি। সংবিধানের প্রতি তার আনুগত্য দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে অবস্থান করার কথা। এই নৈতিক অবস্থান যত দৃঢ় হয়, রাষ্ট্রপতির প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থাও তত শক্তিশালী হয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কখনোই নিছক আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। প্রতিটি নির্বাচন সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করেছে। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী রাজনীতিক, সামরিক কর্মকর্তা, বিচারপতি ও অভিজ্ঞ সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের নির্বাচন একেক সময় একেক ধরনের বাস্তবতার প্রতিফলন। কোথাও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অগ্রাধিকার পেয়েছে, কোথাও জাতীয় সমঝোতার প্রয়োজন সামনে এসেছে, আবার কোনও সময় সাংবিধানিক সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সব সময়ই বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত।

১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমদকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেওয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। সে সময় প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য ছিল প্রবল। তবু তারা এমন একজন ব্যক্তিকে গ্রহণযোগ্য মনে করেছিল, যার ব্যক্তিগত সততা, নিরপেক্ষতা ও নৈতিক অবস্থান নিয়ে বড় কোনো প্রশ্ন ছিল না। তার নেতৃত্বে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং দেশে গণতান্ত্রিক ধারায় প্রত্যাবর্তনের পথ সুগম হয়। এই অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, রাজনৈতিক সংকটের সময় রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক ক্ষেত্রেই সাংবিধানিক ক্ষমতার চেয়েও বেশি কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।

আবার সক্রিয় রাজনীতি থেকে রাষ্ট্রপতির পদে আসার উদাহরণও বাংলাদেশের ইতিহাসে কম নয়। জিল্লুর রহমান কিংবা আবদুল হামিদের মতো নেতারা দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন শেষে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাদের সংসদীয় অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক বাস্তবতা সম্পর্কে জ্ঞান এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা রাষ্ট্র পরিচালনার নানা বিষয়ে সহায়ক ছিল। কিন্তু তাদের মূল্যায়নের প্রধান ভিত্তি ছিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাংবিধানিক আচরণ। রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণের পর তারা কতটা দলীয় সীমা অতিক্রম করে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে পেরেছেন, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত সেই মানদণ্ডেই বিচার করেছে। সে বিচারে সব মূল্যায়ন সমান ইতিবাচক নয়; বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক আজও রাজনৈতিক পরিসরে আলোচনার বিষয়।

পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমে বিস্তর আলোচনা চলছে। বিভিন্ন সম্ভাব্য নাম উচ্চারিত হচ্ছে। কোথাও অভিজ্ঞ রাজনীতিকের পক্ষে মত দেওয়া হচ্ছে, কোথাও সাবেক বিচারপতি কিংবা অভিজ্ঞ প্রশাসকের নাম আলোচনায় আসছে। এসব আলোচনা গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কারণ রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদ নিয়ে জনপরিসরে মতবিনিময় গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিরই অংশ। তবে আলোচনার সঙ্গে সিদ্ধান্তকে এক করে দেখার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শেষ পর্যন্ত সংবিধান, সংসদীয় বিধান ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সমন্বয়ে সম্পন্ন হবে।

তবু এই আলোচনার মধ্যেই একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে এসেছে। রাষ্ট্রপতির পদে কেমন ব্যক্তিকে দেশের মানুষ দেখতে চায়? শুধু দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা কি যথেষ্ট? নাকি নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ? প্রশাসনিক দক্ষতা, সাংবিধানিক জ্ঞান, সংযম, নৈতিক দৃঢ়তা, জনআস্থা ও জাতীয় গ্রহণযোগ্যতার মধ্যে কোন বৈশিষ্ট্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত? এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু একজন ব্যক্তিকে নির্বাচন করার জন্য নয়, রাষ্ট্রপতির প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ মর্যাদা নির্ধারণের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর অভিজ্ঞতা এই প্রশ্নের কিছু উত্তর দেয়। ভারতের প্রণব মুখার্জি কয়েক দশকের রাজনৈতিক জীবন শেষে রাষ্ট্রপতির পদে অধিষ্ঠিত হন। অর্থ, প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দফতরে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাকে রাষ্ট্র পরিচালনার জটিল বাস্তবতা সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি দিয়েছিল। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তিনি দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষার চেষ্টা করেন। তার কর্মকাণ্ড দেখিয়েছে, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তখনই কার্যকর হয়, যখন তা সাংবিধানিক নিরপেক্ষতার সঙ্গে সমন্বিত হয়।

জার্মানির রাষ্ট্রপতি ফ্রাঙ্ক ভাল্টার স্টাইনমায়ার কিংবা ইতালির সার্জিও মাত্তারেল্লার অভিজ্ঞতাও একই শিক্ষা দেয়। দুই দেশেই রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত। কিন্তু রাজনৈতিক অচলাবস্থা, জোট সংকট কিংবা জাতীয় অনিশ্চয়তার সময় তাদের নৈতিক অবস্থান রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। তারা দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রপতির আসনের শক্তি শুধু সংবিধানের বিধানে নয়, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, সংযম ও জনগণের আস্থার ওপরও নির্ভর করে। আয়ারল্যান্ডের মতো দেশেও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত হলেও জাতীয় ঐক্য, সামাজিক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে এই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অবশ্য সতর্কবার্তাও বহন করে। অনেক দেশে দলীয় রাজনীতি থেকে রাষ্ট্রপতির পদে আসা ব্যক্তিরা দলীয় প্রভাব থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ মুক্ত করতে পারেননি। এর ফলে রাষ্ট্রপতির নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এই অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, শুধু অভিজ্ঞতা বা জনপ্রিয়তা যথেষ্ট নয়। সততা, আত্মসংযম, সাংবিধানিক মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকার, বিচারবোধ এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতাই একজন রাষ্ট্রপতির সবচেয়ে বড় যোগ্যতা।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে চলমান আলোচনা মূলত দুটি প্রবণতাকে সামনে এনেছে। একটি অংশ মনে করে, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রপতির জন্য বড় সম্পদ। অন্য অংশের মতে, নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি ও সর্বজনগ্রাহ্য ব্যক্তিত্ব বর্তমান সময়ে আরও বেশি প্রয়োজন। এই মতপার্থক্য গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। নাগরিক সমাজ, আইনজীবী, শিক্ষাবিদ, সাবেক আমলা ও পেশাজীবীদের মতামত জনপরিসরের বিতর্ককে সমৃদ্ধ করে। তবে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কোনও জনপ্রিয়তা প্রতিযোগিতা নয়। এটি একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া, যেখানে সংসদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

তবে ব্যক্তি নির্বাচনই শেষ কথা নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো রাষ্ট্রপতির প্রতিষ্ঠানকে কতটা শক্তিশালী করা সম্ভব হচ্ছে। ব্যক্তি পরিবর্তিত হবেন, সরকার বদলাবে, রাজনৈতিক সমীকরণও রূপ নেবে নতুন আকারে। কিন্তু সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে গণতান্ত্রিক কাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একটি পরিণত গণতন্ত্রের ভিত্তি শক্তিশালী ব্যক্তি নয়, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রপতির পদ সেই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।

স্বাধীনতার অর্ধশতকেরও বেশি সময়ে বাংলাদেশ বহু রাজনৈতিক উত্থান, সংকট, সামরিক শাসন, গণআন্দোলন, নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক, সংবিধান সংশোধন ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। প্রতিটি অধ্যায় একটি মৌলিক শিক্ষা দিয়েছে। সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা যত বাড়বে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা যত সুদৃঢ় হবে, গণতন্ত্রও তত স্থায়ী ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে।

এই বাস্তবতায় ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কেবল নতুন একজন ব্যক্তিকে বঙ্গভবনে পাঠানোর বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিপক্বতা, সাংবিধানিক চেতনা ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তিত হবে, নতুন নেতৃত্ব আসবে, ক্ষমতার সমীকরণও বদলাবে। কিন্তু রাষ্ট্রপতির পদ যদি জাতীয় আস্থার কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে সেই অর্জন কোনও এক সরকারের নয়, পুরো রাষ্ট্রের। সেই কারণেই আগামী রাষ্ট্রপতির সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত তিনি কোনও দলের প্রতিনিধি নন; তিনি সমগ্র প্রজাতন্ত্রের সাংবিধানিক অভিভাবক, জাতীয় ঐক্যের প্রতীক এবং গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার বিশ্বস্ত রক্ষক।

লেখক: অধ্যাপক, পরিসংখ্যান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়