যে সমাজে নাগরিকরা প্রশ্ন করার সাহস হারায় কিংবা নীরবতাকে নিরাপদ মনে করে, সেখানে সুশাসন রূপ নেয় প্রশাসনিক আদেশে, আর উন্নয়ন পরিণত হয় কেবল ইটের স্তম্ভে। সরকারকে প্রশ্ন করা কোনও বৈরিতা বা বিরোধিতা নয়, এটি রাষ্ট্রকে তার নিজের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও সাংবিধানিক অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার সবচেয়ে মানবিক ও সংবেদনশীল গণতান্ত্রিক পথ।
একটি দেশ যখন নিজেকে প্রগতিশীল ও মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করে, তখন সেই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য ফুটে ওঠে তার নাগরিকদের প্রশ্ন করার স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে। রাষ্ট্রের উন্নয়ন প্রকল্প, বাজেটের ব্যবহার কিংবা নাগরিক সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা কোনও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং তা সুশাসনের মূল প্রাক-শর্ত।
আমাদের শাসন সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিন ধরে একধরনের প্রজা-মানসিকতা শিকড় গেড়ে বসে আছে। আমরা ধরে নিই, সরকার বোধহয় কোনও দয়ালু অভিভাবক, যিনি দয়া করে আমাদের রাস্তা বানিয়ে দিচ্ছেন, কিংবা কোনোমতে খাওয়ার পানিটুকু পৌঁছে দিচ্ছেন। কিন্তু অধিকারভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এই দৃষ্টিভঙ্গিকে একেবারেই মেনে নেয় না।
আমাদের বুঝতে হবে, সরকার ও জনগণের সম্পর্কটি কোনও দাতা ও গ্রহীতার সম্পর্ক নয়। এটি একটি পবিত্র আইনি ও সামাজিক চুক্তি। এই সামাজিক চুক্তিতে দেশের সাধারণ নাগরিকেরা হলেন—আসল ‘অধিকারভোগী’, আর রাষ্ট্র ও তার শাসনযন্ত্র হলো—অর্পিত দায়িত্ব পালনকারী ‘দায়িত্ববাহক’। যখন কোনও নাগরিক সরকারি দফতরে গিয়ে সেবার মান নিয়ে, কিংবা দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন—তখন তিনি কোনও অনুদান চাইছেন না, বরং নিজের রক্তঘামে অর্জিত ট্যাক্সের টাকায় গড়ে ওঠা রাষ্ট্রের কাছে নিজের ন্যায্য অধিকারটুকু দাবি করছেন।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান কোনও কেবল আইনি দলিল নয়, এটি নাগরিকের অধিকারের মহান সনদ। সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে খুব স্পষ্ট ভাষায় একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছে—প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ। অর্থাৎ রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে যে কাজই পরিচালিত হোক না কেন, তার মূল উৎস ও চালিকাশক্তি হলেন জনগণ। সংবিধান রাষ্ট্রকে কীভাবে পরিচালিত হতে হবে, তার একটি চমৎকার মানবিক দিকনির্দেশনা দিয়েছে—
গণতন্ত্র ও মানবসত্তা (অনুচ্ছেদ ১১): রাষ্ট্র পরিচালনায় গণতন্ত্রের ভিত্তি হবে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা, যেখানে প্রতিটি মানুষের মূল্যের ও মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ সুনিশ্চিত থাকবে।
মৌলিক প্রয়োজন ও বৈষম্যহীন সমাজ (অনুচ্ছেদ ১৫ ও ১৬): অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসার পাশাপাশি নগর ও গ্রামের জীবনযাত্রার বৈষম্য দূর করে প্রান্তিক মানুষের কাছে মৌলিক সুবিধা পৌঁছে দেওয়া রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়।
জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের সুরক্ষা (অনুচ্ছেদ ১৮ ও ১৮ক): জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধন এবং জনগণের পুষ্টির স্তর উন্নীত করাকে রাষ্ট্র তার ‘প্রাথমিক কর্তব্য’ হিসেবে মেনে নিয়েছে। পাশাপাশি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নদী, জলাভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করার আইনি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আইনের সাম্য ও নিরপেক্ষ সুরক্ষা (অনুচ্ছেদ ২৭ ও ৩১): সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং কোনও কারণ ছাড়া কারও ক্ষতি না করার নীতিকে অলঙ্ঘনীয় করা হয়েছে।
জীবনের অধিকার নিয়ে সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে যে কথা বলা হয়েছে, তার এক যুগান্তকারী ও মানবিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন আমাদের মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ। আদালত স্পষ্ট রায়ে ঘোষণা করেছেন যে নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানীয় জল পাওয়া মানুষের বেঁচে থাকার বা জীবনের অধিকারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি কোনও অনুগ্রহ নয়, এটি নাগরিকের একটি মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার।
ফলে, কোনও নাগরিক যদি বিশুদ্ধ পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন, কিংবা দূষিত পানি পান করতে বাধ্য হন, তবে রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করার পূর্ণ আইনি ও নৈতিক ভিত্তি সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে দেওয়া চিন্তা, বিবেক ও বাক-স্বাধীনতার সুনির্দিষ্ট সুরক্ষার মাঝেই নিহিত রয়েছে। বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশ একটি দায়িত্বশীল ও মানবাধিকারকামী রাষ্ট্র হিসেবে একাধিক আন্তর্জাতিক সনদে সই করেছে। এই আন্তর্জাতিক সনদগুলো কেবল কোনও আন্তর্জাতিক উপহার নয়, এগুলো বাস্তবায়নের আইনি বাধ্যবাধকতা সরকারের ওপর বর্তায়।
১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদে সই করে। এর ১১ ও ১২ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রতিটি মানুষের উপযুক্ত জীবনযাত্রার মান এবং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের সর্বোচ্চ অর্জনযোগ্য মান নিশ্চিত করার অধিকার রয়েছে, যার মূল ভিত্তি হলো পরিষ্কার সুপেয় পানি। ২০১০ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ পানি ও স্যানিটেশনকে একটি পৃথক ও সর্বজনীন মানবাধিকার হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়।
১৯৮৪ সালে অনুমোদিত সিডও (সিইডিএডব্লিউ) সনদের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গ্রামীণ নারীদের পানি ও স্যানিটেশন সেবা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার বাধ্য। ১৯৯০ সালে সই হওয়া শিশু অধিকার সনদের (সিআরসি) ২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ শিশুদের বিশুদ্ধ পানি দিয়ে রোগ থেকে বাঁচানোর কথা বলে। একই সাথে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার সনদের (সিআরডিডি) ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদ সমতার ভিত্তিতে পানি ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতের নির্দেশ দেয়।
২০৩০ সালের মধ্যে সকলের জন্য সমতার ভিত্তিতে সুপেয় পানি নিশ্চিত করা (টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ৬) এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক শাসন কাঠামো গড়ে তোলা (টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ১৬) বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বিশ্বজনীন অঙ্গীকার। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রিও ঘোষণার ১০ নম্বর নীতি অনুযায়ী, পানি বা প্রাকৃতিক পরিবেশ সম্পর্কিত তথ্য নাগরিকদের কাছে উন্মুক্ত রাখা রাষ্ট্রের নীতিগত দায়িত্ব। আন্তর্জাতিক সনদের আলোকেই বাংলাদেশ ওয়াশ (ডব্লিউএএসএইচ) খাতে বেশ কিছু প্রগতিশীল জাতীয় নীতি দলিল তৈরি করেছে। যেমন—‘জাতীয় ওয়াশ নীতি’, ‘জাতীয় ওয়াশ কৌশল’ এবং ‘সেক্টর ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান’।
নীতিমালায় কাগজ-কলমে খুব সুন্দর কথা বলা হয়েছে। ওয়াশ নীতিতে সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য কমিউনিটি স্কোরকার্ডের মাধ্যমে জনগণের মতামত নেওয়া, সেবা প্রদানকারী সংস্থাকে মুখোমুখি বসিয়ে জনশুনানি করা, উন্মুক্ত জাতীয় ওয়াশ ডেটা রিপোজিটরি তৈরি করা এবং বছরের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ (ওঅ্যান্ডএম) অডিট প্রকাশ্যে আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। একই কথা লেখা আছে কৌশলেও—যেখানে উপকূলীয় লোনা পানির এলাকা, হাওর, পার্বত্য অঞ্চল এবং মেগাসিটির বস্তিবাসীকে সুরক্ষিত রাখার কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু আমরা যখন মাঠপর্যায়ে তাকাই, তখন নীতি নথির সাথে বাস্তব জীবনযাত্রার সংঘাত দেখতে পাই। আমাদের দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার প্রকোপে হাজার হাজার নারী আজও প্রতিদিন কয়েক মাইল পথ হেঁটে খাবার পানি সংগ্রহ করছেন। পার্বত্য অঞ্চল বা হাওরাঞ্চলে পানির তীব্র সংকট মানুষের প্রতিদিনের সংগ্রামকে আরও কঠিন করে তুলছে। বড় বড় শহরগুলোতে বস্তিতে থাকা খেটে খাওয়া মানুষকে অনিরাপদ পানির জন্য চড়ামূল্যে টাকা দিতে হচ্ছে, অথচ অভিজাত এলাকার বাসিন্দারা সরকারি ভর্তুকির সুপেয় পানি সহজে পেয়ে যাচ্ছেন। পয়েন্ট বর্জ্য বা ফিকাল স্লাজ ম্যানেজমেন্ট ঠিকমতো না হওয়ায় আমাদের নদী ও ভূগর্ভস্থ পানির উৎসগুলো ক্রমেই বিষাক্ত হয়ে উঠছে।
নীতি দলিলের প্রতিশ্রুতি আর বাস্তব জীবনের হাহাকারের মাঝখানে যে সুবিশাল দেয়ালটি দাঁড়িয়ে আছে—তা ভেঙে ফেলার একমাত্র হাতিয়ার হলো সাধারণ মানুষের সাহসী ও সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন। নাগরিক যদি প্রশ্ন না তোলে, তবে নীতি দলিলগুলো কেবল সরকারি দফতরের সুন্দর আলমারিতেই আটকে থাকবে। সরকারকে প্রশ্ন করা মানে তথ্য ও যুক্তি দিয়ে অধিকার আদায়ের এক বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। এই লড়াই চালানোর জন্য আমাদের হাতে বেশ কিছু আইনগত মাধ্যম রয়েছে—
তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯: সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের আলোকে তৈরি এই আইন আপনাকে যেকোনও সরকারি প্রকল্পের বাজেট, চুক্তি ও কাজের মানের তথ্য জানার আইনি ক্ষমতা দেয়।
সামাজিক অডিট ও জনশুনানি: স্থানীয় পরিষদ বা ওয়াসার কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সাধারণ মানুষ একত্রিত হয়ে সেবার মূল্যায়ন করতে পারেন।
জনস্বার্থে মামলা (আর্টিকেল ১০২): যখন নদী দূষণ করা হয় কিংবা পানির উৎস ধ্বংস করা হয়, তখন সংবিধান অনুযায়ী নাগরিকেরা সরাসরি উচ্চ আদালতের সুরক্ষাও চাইতে পারেন।
তবে এই পুরো ব্যবস্থার সুফল পেতে হলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির এক মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করছেন, তাদের নাগরিকদের প্রশ্নকে শত্রুতা বা অবাধ্যতা হিসেবে না দেখে নিজেদের কাজের মান উন্নয়ন করার সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে। 'জাতীয় ওয়াশ নীতি ২০২৫'-এ যে উন্মুক্ত ডেটা প্ল্যাটফর্মের কথা বলা হয়েছে, তা নিজেদের আগ্রহেই জনগণের সামনে উন্মুক্ত করে দিতে হবে।
নাগরিকদেরও নিষ্ক্রিয় নীরবতা ভেঙে বেরিয়ে আসতে হবে। শুধু অভিযোগ না করে, সংবিধানে আমাদের কী অধিকার দেওয়া হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সনদে কী প্রতিশ্রুতি দেওয়া আছে—তা জেনে তথ্যভিত্তিক প্রশ্ন তোলার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। বিশেষ করে আমাদের সমাজের নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী মানুষ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুপেয় পানির সংকট নিয়ে আমাদের আরও বেশি সোচ্চার হতে হবে। একটি প্রাণবন্ত ও সমতাভিত্তিক দেশ গঠনের প্রধান প্রাক-শর্ত হলো—সেই দেশের মানুষ কতটা নির্ভয়ে এবং কতখানি আত্মমর্যাদা নিয়ে নিজেদের দায়িত্ব বাহকদের মুখোমুখি হতে পারছে।
সুপেয় পানি পাওয়ার অধিকার, স্বাস্থ্যসম্মত জীবনের অধিকার কিংবা বাজেটের হিসাব পাওয়ার অধিকার কোনও অনুদান নয়—এটি আমাদের মহান সংবিধানে লিখিত এবং আন্তর্জাতিক সনদে স্বীকৃত আইনি ও মানবাধিকারের প্রাধিকার। রাষ্ট্রের চালকের আসনে যারা আছেন, তারা যখন নিজেদের ‘শাসক’ না ভেবে জনগণের সত্যিকারের ‘দায়িত্ব বাহক’ হিসেবে ভাববেন এবং নাগরিকেরা যখন ভয় ও নীরবতা ভেঙে নিজেদের সাংবিধানিক প্রাধিকার নিয়ে কথা বলবেন—তখনই বাস্তবে রূপ নেবে একটি সমতাভিত্তিক মানবিক রাষ্ট্র। চলুন, আমরা প্রশ্ন করার এই সংস্কৃতিকে উদ্ভাসিত করি। কারণ, আপনার একটি সাহসী ও যৌক্তিক প্রশ্নই পারে রাষ্ট্রকে তার সঠিক ও দায়িত্বশীল পথে ফিরিয়ে আনতে।
লেখক: একজন উন্নয়নকর্মী