পর্যটন অর্থনীতি- ৮: বিদেশি বিনিয়োগ চাই, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নয় 

সালেক উদ্দিন
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:০০আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:০০

একটি দেশের পর্যটন শিল্প যখন বড় হতে শুরু করে তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—উন্নয়নের জন্য কি বিদেশি বিনিয়োগ অপরিহার্য? বিশ্বের অভিজ্ঞতা বলছে—হ্যাঁ। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন আছে—বিদেশি বিনিয়োগ আনতে গিয়ে কি রাষ্ট্রকে তার নিয়ন্ত্রণ, স্বার্থ এবং ভবিষ্যৎ মালিকানা ছেড়ে দিতে হবে? এর উত্তর হলো—না।

আধুনিক বিশ্বের সফল পর্যটন রাষ্ট্রগুলো দেখিয়েছে, বিদেশি পুঁজি ও প্রযুক্তি গ্রহণ করা যায়, কিন্তু জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে নয়। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, মালদ্বীপ কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাত—কোনও দেশই তাদের কৌশলগত সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উন্নয়ন করেনি। বরং তারা এমন কাঠামো তৈরি করেছে, যেখানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ এসেছে, কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি মালিকানা রাষ্ট্রের হাতেই থেকেছে।

বাংলাদেশের পর্যটন অর্থনীতির ভবিষ্যৎও এই ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করবে।

বিনিয়োগের বাস্তবতা: শুধু সৌন্দর্য যথেষ্ট নয়

বাংলাদেশের আছে বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত, বিস্তীর্ণ ম্যানগ্রোভ বন, পাহাড়ি অঞ্চল, দ্বীপ, নদী ও হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। কিন্তু একটি কঠিন বাস্তবতাও রয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানের রিসোর্ট, মেরিন ট্যুরিজম, থিম পার্ক, কনভেনশন সেন্টার, ক্রুজ টার্মিনাল, অ্যাডভেঞ্চার পার্ক কিংবা স্মার্ট পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বিপুল বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা প্রয়োজন।

রাষ্ট্র একা সব কিছু করতে পারবে না। আবার সম্পূর্ণ বেসরকারি বা বিদেশি নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর করাও ঝুঁকিপূর্ণ। সুতরাং, প্রয়োজন এমন একটি কাঠামো, যেখানে আন্তর্জাতিক পুঁজি আসবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ণ থাকবে।

বিদেশি বিনিয়োগ: অংশীদার, মালিক নয়

বাংলাদেশের পর্যটননীতির একটি মৌলিক দর্শন হওয়া উচিত— Investor is a partner, not the owner. অর্থাৎ বিদেশি বিনিয়োগকারী উন্নয়নের অংশীদার হবে, কিন্তু দেশের ভূমি, পরিবেশ, সংস্কৃতি কিংবা কৌশলগত সম্পদের মালিক হবে না। এই নীতিই দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। বিশ্বের সফল দেশগুলোও মূলত এই পথ অনুসরণ করেছে। সিঙ্গাপুর Marina Bay Sands নির্মাণে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যবহার করেছে, কিন্তু ভূমি ও নীতিগত নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছে রেখেছে। মালদ্বীপ আন্তর্জাতিক রিসোর্ট কোম্পানিগুলোকে পরিচালনার সুযোগ দিয়েছে, কিন্তু দ্বীপগুলোর সার্বভৌম মালিকানা কখনও ছেড়ে দেয়নি।

দুবাই বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে, কিন্তু উন্নয়নের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ সবসময় রাষ্ট্রের হাতে রেখেছে। বাংলাদেশকেও একই পথ অনুসরণ করতে হবে।

বিওএসটি: উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যবর্তী সেতু

বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর মডেল হতে পারে ‘‘ Build, Operate, Share, Transfer (BOST)—এই মডেলের মূল দর্শন অত্যন্ত সহজ। বিনিয়োগকারী অবকাঠামো নির্মাণ করবে। পরিচালনা করবে। রাজস্ব ভাগাভাগি করবে এবং নির্ধারিত সময় শেষে সম্পদ রাষ্ট্র বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করবে। এখানে বিনিয়োগকারী লাভ করবে। রাষ্ট্রও লাভ করবে। কিন্তু মালিকানা চিরস্থায়ীভাবে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যাবে না। এই মডেল উন্নয়ন ও সার্বভৌম স্বার্থের মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করে।

উন্নয়নের প্রথম শর্ত: রাষ্ট্রের মাস্টারপ্ল্যান

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের আগে একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে— আমরা কী নির্মাণ করতে চাই? যদি এই প্রশ্নের উত্তর আগে নির্ধারিত না হয়, তাহলে উন্নয়নের পরিবর্তে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। এ কারণেই একটি শক্তিশালী Tourism Master Plan Authority (TMPA) গঠন অপরিহার্য। এই সংস্থা হবে বাংলাদেশের পর্যটন উন্নয়নের কেন্দ্রীয় মস্তিষ্ক। তাদের দায়িত্ব হবে পর্যটন মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন, অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন নির্ধারণ, বিনিয়োগ অনুমোদন, পরিবেশ ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন, দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— Master Plan-এর বাইরে কোনও উন্নয়ন নয়। এটি নিশ্চিত করতে না পারলে ভবিষ্যতের পর্যটন অঞ্চলগুলো অপরিকল্পিত নগরায়ণের শিকার হবে।

জোনিং আইন: উন্নয়নের সংবিধান

পর্যটন উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ। একটি সুন্দর সৈকত খুব দ্রুত কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত হতে পারে। একটি শান্ত পাহাড়ি অঞ্চল হারিয়ে ফেলতে পারে তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। এই ঝুঁকি এড়াতে প্রয়োজন কঠোর Zoning Law। এই আইনের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে— কোথায় রিসোর্ট হবে, কোথায় আবাসিক এলাকা হবে, কোথায় বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলবে, কোথায় কোনও নির্মাণই করা যাবে না। সিঙ্গাপুর, মালদ্বীপ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাফল্যের পেছনে এই নীতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

Carrying Capacity: বেশি নয়, ভালো পর্যটন

বাংলাদেশের পর্যটন উন্নয়নের একটি মৌলিক দর্শন হওয়া উচিত— ‘‘More tourists is not always better tourism.’’ একটি সৈকত, একটি দ্বীপ কিংবা একটি বনাঞ্চল কতজন পর্যটক ধারণ করতে পারে, তার একটি সীমা আছে। এই সীমাকেই বলা হয় Carrying Capacity। সেন্ট মার্টিনের উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে। নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটন পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং পর্যটন অভিজ্ঞতা—সবকিছুকেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। মালদ্বীপ এই বিষয়টি অনেক আগে বুঝেছিল। তাই তারা বেছে নিয়েছে— কম পর্যটক, উচ্চমানের অভিজ্ঞতা, বেশি আয়। বাংলাদেশের জন্যও এই মডেল অধিক টেকসই।

বিনিয়োগকারীর আস্থা কেন জরুরি

রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ থাকবে, কিন্তু বিনিয়োগকারীর আস্থাও থাকতে হবে। কারণ অনিশ্চয়তার পরিবেশে কোনও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করবে না। সুতরাং, প্রয়োজন নীতির ধারাবাহিকতা, চুক্তির সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক সালিশ ব্যবস্থা, স্বচ্ছ অনুমোদন প্রক্রিয়া, দীর্ঘমেয়াদি লিজ সুবিধা। একজন বিনিয়োগকারীকে জানতে হবে যে তার বিনিয়োগ নিরাপদ। একইসঙ্গে রাষ্ট্রকেও নিশ্চিত করতে হবে যে জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।

নিরাপত্তা: বিনিয়োগের পূর্বশর্ত

পর্যটনের মতোই বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও নিরাপত্তা একটি মৌলিক শর্ত। কোনও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড এমন জায়গায় বিনিয়োগ করতে চায় না, যেখানে নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এ কারণেই প্রস্তাব করা যেতে পারে— Tourism Security Zone (TSZ)। যেখানে থাকবে—Tourism Police, Smart Surveillance System, AI Monitoring, Rapid Response Team, Emergency Medical Support। নিরাপত্তা কেবল পর্যটকের জন্য নয়; এটি বিনিয়োগকারীর জন্যও আস্থার ভিত্তি।

স্থানীয় জনগণ: উন্নয়নের অংশীদার

বিশ্বের বহু দেশে দেখা গেছে, স্থানীয় জনগণকে বাদ দিয়ে পর্যটন উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে সফল হয় না। পর্যটন যদি শুধুমাত্র বাইরের বিনিয়োগকারীদের লাভের উৎস হয়ে যায়, তাহলে সামাজিক বিরোধ তৈরি হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাই প্রয়োজন স্থানীয় কর্মসংস্থান, স্থানীয় উদ্যোক্তা উন্নয়ন, Community-Based Tourism, রাজস্বের একটি অংশ স্থানীয় উন্নয়নে ব্যয়। পর্যটন তখনই টেকসই হয়, যখন স্থানীয় মানুষ উন্নয়নের অংশীদার হয়।

ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন

পর্যটন বিপ্লব কোনও একদিনে ঘটে না। সফল দেশগুলো ধাপে ধাপে এগিয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ হতে পারে—প্রথম ধাপ (১-২ বছর): আইন, TMPA, Zoning Framework, Master Plan। দ্বিতীয় ধাপ (৩-৫ বছর): অবকাঠামো, নিরাপত্তা, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা। তৃতীয় ধাপ (৫-১০ বছর): BOST প্রকল্প, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং, বিদেশি বিনিয়োগ। চতুর্থ ধাপ (১০-২৫ বছর): স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি, মালিকানা হস্তান্তর, পূর্ণাঙ্গ পর্যটন অর্থনীতি।

উপসংহার

পুঁজি চাই, কিন্তু সার্বভৌমত্বের বিনিময়ে নয়। বাংলাদেশের সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। একদিকে রয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক বৈচিত্র্য। অপরদিকে রয়েছে বৈশ্বিক পর্যটন বাজারের দ্রুত সম্প্রসারণ। এই সুযোগ কাজে লাগাতে বিদেশি বিনিয়োগ অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু বিনিয়োগের লক্ষ্য হওয়া উচিত উন্নয়ন, নির্ভরতা নয়। সুতরাং, বাংলাদেশের পর্যটন নীতির মূল দর্শন হতে পারে—বিদেশি পুঁজি স্বাগত, কিন্তু জাতীয় নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ণ; আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব প্রয়োজন, কিন্তু মালিকানা ও নীতিগত কর্তৃত্ব রাষ্ট্রের হাতে। বিশ্বের সফল দেশগুলো আমাদের এটাই শিখিয়েছে—পর্যটনের প্রকৃত সাফল্য তখনই আসে, যখন একটি দেশ বিদেশি বিনিয়োগকে কাজে লাগায়, কিন্তু নিজের ভবিষ্যতের নিয়ন্ত্রণ কখনও হারায় না।

লেখক: সামাজিক-রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামিস্ট, জীবন সদস্য, বাংলা একাডেমি

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
‘বিগ বস’ প্রতিযোগী কাজিকে ‘ভারতের মাইকেল জ্যাকসন’ বলেছিলেন অরিজিৎ
‘বিগ বস’ প্রতিযোগী কাজিকে ‘ভারতের মাইকেল জ্যাকসন’ বলেছিলেন অরিজিৎ
অষ্টম শ্রেণির ছাত্রকে ভয় দেখিয়ে ২২ লাখ টাকা আদায়
অষ্টম শ্রেণির ছাত্রকে ভয় দেখিয়ে ২২ লাখ টাকা আদায়
পর্যটন অর্থনীতি- ৮: বিদেশি বিনিয়োগ চাই, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নয় 
পর্যটন অর্থনীতি- ৮: বিদেশি বিনিয়োগ চাই, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নয় 
শ্যামলীর টিবি হাসপাতালকে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ ইনস্টিটিউট করা হবে: ববি হাজ্জাজ
শ্যামলীর টিবি হাসপাতালকে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ ইনস্টিটিউট করা হবে: ববি হাজ্জাজ
সর্বশেষসর্বাধিক