ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আমাদের অঞ্চলে এক ধরনের আলাদা আস্থা আছে। শুধু ভারতীয় শিক্ষার্থীরাই নন, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরাও ভারতের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, চিকিৎসা ও প্রকৌশল শিক্ষার দিকে দীর্ঘদিন ধরে আশা নিয়ে তাকিয়ে থাকে। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক ভারতীয় শিক্ষার্থীও উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যান। সরকারি হিসাবে শুধু ২০২২ থেকে ২০২৪—এই তিন বছরে ২৪ লাখের বেশি ভারতীয় শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন।
তাই সেই ভারতেই যখন একের পর এক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, অনিয়ম, সুযোগের অসমতা এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশার চিত্র সামনে আসে, তখন সেটি আর নিছক একটি শিক্ষা-সংকটের খবর থাকে না। প্রশ্ন ওঠে, যে দেশে শিক্ষাকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির সবচেয়ে বড় সিঁড়ি মনে করা হয়, সেই দেশের তরুণদের একাংশ কেন রাস্তায় নামছে? ভারতের সাম্প্রতিক ছাত্র-যুব আন্দোলন শুরু হয়েছিল মূলত পরীক্ষাব্যবস্থার অনিয়ম ও প্রশ্নফাঁস নিয়ে তৈরি হওয়া ক্ষোভ থেকে। কিন্তু খুব দ্রুত এর সঙ্গে যুক্ত হয় বেকারত্ব, তীব্র প্রতিযোগিতা, দীর্ঘদিনের পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। আন্দোলনের চাপে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন; এরপর সরকার পরীক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার ও প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে কড়া পদক্ষেপের ঘোষণা দেয়। ফলে বড় আকারের আন্দোলনটি অনেকটা স্তিমিত হয়ে আসে। যদিও দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন বিক্ষোভ ও অসন্তোষ এখনও চলছে।
কিন্তু একটি প্রশ্ন এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের এই আন্দোলন কি সরকার পতনের আন্দোলন ছিল? সরকারের ওপর বড় রাজনৈতিক চাপ তৈরি হলেও আন্দোলনের মূল দাবি ছিল পরীক্ষা ব্যবস্থায় জবাবদিহি ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ। এটি শ্রীলঙ্কা, নেপাল বা বাংলাদেশের মতো সরাসরি সরকার পতনের পর্যায়ে যায়নি।
তাহলে প্রশ্নটি আরও বড় হয়ে দাঁড়ায়। গত কয়েক বছরে দক্ষিণ এশিয়ার একাধিক দেশে কেন এমন আন্দোলন দেখা যাচ্ছে, যার সূচনা ঘটেছিল একটি নির্দিষ্ট ক্ষোভ থেকে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সরকারের পতন ঘটিয়েছে? এর শুরুটা কোথায়? পাকিস্তানে, নাকি শ্রীলঙ্কায়?
২০২২ সালের ৯ এপ্রিল পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে অনাস্থা ভোটে ইমরান খানের সরকার পতন ঘটে। এটি ছিল সংসদীয় পদ্ধতির ক্ষমতার পরিবর্তন—রাস্তায় গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পতন নয়। তার সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের রাজনৈতিক নিপীড়ন ও অর্থনৈতিক দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। একই সময়ে পাকিস্তানের ক্ষমতাধর সেনাবাহিনীর সঙ্গেও ইমরানের সম্পর্কের ফাটল ধরে।
তবে এই অনাস্থা ভোটের ঠিক এক মাস আগে, ২০২২ সালের ৭ মার্চ, ওয়াশিংটনে তৎকালীন পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত আসাদ মাজিদ খানের সঙ্গে মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু’র বৈঠক হয়। ইমরান খান ওই বৈঠককে তার সরকারকে ফেলে দেওয়ার চক্রান্ত এবং মার্কিন চাপের প্রমাণ হিসেবে দাবি করেন। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য সরকার পতনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করে।
কিন্তু এটাও তো ঠিক যে বৈঠকটি ইমরানের সরকার পতনের ঠিক এক মাস আগেই হয়েছিল। তাছাড়া ইমরানের পাকিস্তান ক্রমেই চীনের সঙ্গে গভীর কৌশলগত সম্পর্কের দিকে ঝুঁকে পড়ছিল, যার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ‘চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর’ (সিপিসি)।
পাকিস্তানের জন্য চীন ছিল অর্থনীতি, অবকাঠামো ও কৌশলগত নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কটা বহু পুরোনো হলেও অনেক বেশি টানাপোড়েনপূর্ণ।
শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে দৃশ্যপটটি আরও নাটকীয়। স্বাধীনতার পর ২০২২ সালে দেশটি সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। জ্বালানি, খাদ্য ও ওষুধের সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি এবং সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে ক্ষোভ ধীরে ধীরে গণবিক্ষোভে পরিণত হয়। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নামে। ওই বছর জুলাইয়ে সেই আন্দোলন চূড়ায় পৌঁছে। আর এই আন্দোলনই শেষ পর্যন্ত গোতাবায়া রাজাপাকসেকে দেশ ছাড়তে ও পদত্যাগ করতে বাধ্য করে।
যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ওই আন্দোলনকে সমর্থন বা মদত দিয়েছিল—সেটা বলা কঠিন। তবে আন্দোলনের সময় শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকারকে সমর্থন করেছিল এবং সহিংসতার নিন্দা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
আর এটাও ঠিক যে রাজাপাকসে পরিবারের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠতা বহুদিনের। হাম্বানটোটা গভীর সমুদ্রবন্দরসহ চীনা অবকাঠামো বিনিয়োগের কারণে শ্রীলঙ্কা ততদিনে ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতার এক গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ডে পরিণত হয়েছে। ২০২২ সালের সংকটের সময় ভারত অবশ্য দ্রুতই বিপুল সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসে। আর সংকটের একদম শুরুতে তাৎক্ষণিকভাবে শ্রীলঙ্কাকে নতুন করে বড় আকারের কোনও নগদ অর্থ বা জরুরি ছাড় দিতে আগ্রহী ছিল না চীন। তবে সংকট তীব্র হলে মানবিক সহায়তা ও জ্বালানি কিনতে আর্থিক ঋণ পাঠায় চীন।
শ্রীলঙ্কার সংকট দেখিয়েছে, একটি সরকার যখন অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়ে, তখন ভূ-রাজনৈতিক বন্ধুত্বও তাকে রক্ষা করতে পারে না।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঘটনাগুলো আরও সূক্ষ্ম ও জটিল। ২০২৩ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রকাশ্য কূটনৈতিক চাপ তৈরি করছিল। এমনকি গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞার নীতিও ঘোষণা করেছিল। একই সময়ে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঢাকার উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগও চলছিল; ২০২৪ সালের মে মাসে বাংলাদেশ সফর করেন ডোনাল্ড লু।
ঠিক এই সময়েই সেন্টমার্টিন দ্বীপ নিয়ে বাংলাদেশে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ নিজের সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিয়ে কোনও বিদেশি শক্তিকে সেন্টমার্টিন হস্তান্তর করবে না। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে জানায়, তারা সেন্টমার্টিন দখল বা নেওয়ার বিষয়ে কোনও আলোচনা করেনি।
এদিকে ২০২৪ সালের ৮-১০ জুলাই, অর্থাৎ হাসিনার সরকারের পতনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে, তিনি চীন সফর করেন। সফর শেষে দুই দেশ নিজেদের সম্পর্ককে কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বে উন্নীত করার পাশাপাশি ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগের মাধ্যমে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে সম্মত হয়।
তার অর্থ এই নয় শেখ হাসিনা চীনের দিকে পুরোপুরি হেলে পড়েছিলেন। বরং বাংলাদেশের বাস্তবতা ছিল আরও জটিল—ভারত ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ও নিরাপত্তার অংশীদার; চীন ছিল বড় অবকাঠামো বিনিয়োগের অংশীদার; আর যুক্তরাষ্ট্র ছিল প্রধান বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক শক্তি।
তবু ২০২৩-২৪ সালের ঘটনাগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে; যখন একটি সরকার একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক চাপ এবং অপরদিকে চীনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গভীর করছে, তখন সেই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট কি শুধুই অভ্যন্তরীণ রাজনীতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট?
নেপালের ভূ-রাজনীতিও সরাসরি তিন মেরুতে বিভক্ত—চীন, ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্র। নেপালে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে আলোচিত উদ্যোগ হলো পাঁচশত মিলিয়ন ডলারের ‘মিলিনিয়াম চ্যালেঞ্জ করপোরেশন’ (এমসিসি) প্রকল্প। বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও সড়ক উন্নয়নে নেওয়া এই প্রকল্প ঘিরে ২০২২ সালে সেখানে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক ও সামাজিক বিক্ষোভ দেখা দেয়। সমালোচকদের আশঙ্কা ছিল, এই প্রকল্পের মাধ্যমে ওয়াশিংটন নেপালের কৌশলগত পরিসরে তাদের প্রভাব বাড়াবে। তবে সব বিতর্ক পেছনে ফেলে শেষ পর্যন্ত নেপালের সংসদ প্রকল্পটি অনুমোদন করে।
এদিকে নেপালের শীর্ষ নেতা কে পি শর্মা ওলি দীর্ঘদিন ধরেই চীনের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ২০১৫ সালের ভারতীয় সীমান্ত অবরোধের পর বেইজিংয়ের দিকে তার ঝোঁক আরও বাড়ে এবং অবকাঠামোগত সহযোগিতার পরিধি বিস্তৃত হয়।
২০২৫ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে, অর্থাৎ পদত্যাগের ঠিক আগে তিনিও চীন সফর করেন এবং বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেন।
তবে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেপালের তরুণদের ‘জেন- জি’ আন্দোলনের মূল কারণ ছিল কিছুটা ভিন্ন। দুর্নীতি, শাসকগোষ্ঠীর প্রতি জনঅসন্তোষ, তীব্র বেকারত্ব এবং সরকারের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধের সিদ্ধান্ত তাদেরকে আরও বিক্ষুব্ধ করে তোলে। বিক্ষোভকারীদের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রাণঘাতী হামলার পর এই ক্ষোভ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত ওলিও পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
তাহলে কি দক্ষিণ এশিয়ার এই চারটি দেশের সরকার পতনের পেছনে একই অদৃশ্য বিদেশি শক্তির হাত রয়েছে? নাকি দেশগুলোর ভেতরের ক্ষোভের আগুনই সামান্য উসকানিতে জ্বলে উঠেছে? নিশ্চয়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও তরুণদের সংগঠিত হওয়ার ক্ষমতা ছিল সেই আগুন ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যম; আর যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা ছিল সেই আগুনের চারপাশের অক্সিজেন।
কিন্তু বাইরের কেউ এসে সেই আগুনটা জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে কিনা—সেটিই এখনও সবচেয়ে বড় ও কঠিন প্রশ্ন। আর সেই কারণেই দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে শুধু গণঅভ্যুত্থান কিংবা কেবল বিদেশি ষড়যন্ত্র—যেকোনও একটি শব্দে ব্যাখ্যা করা সম্ভবত ভুল হবে। আসল গল্প হয়তো আরও অস্বস্তিকর!
লেখক: সাইকোলজিস্ট