২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দুই বছর যেতে না যেতেই ব্যাপকভাবে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির এবং ছাত্রশক্তি। বলতেই হবে, এই সংঘর্ষের মূলে কাজ করছে ক্ষমতা দখলের রাজনীতি। ৪ আগস্ট একসঙ্গে অনেকগুলো জায়গায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ সংঘর্ষ হয়। এ সংঘর্ষে তিন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মী ও সাংবাদিকসহ ৭০ জন আহত হন। সারাদিন ধরে চলে এই সংঘর্ষ। তবে রাতের দিকের খবর হলো, সেটির দখল নিয়েছে ছাত্রদল।
জগন্নাথ থেকে সেই সংঘর্ষ ছড়িয়ে আস্তে আস্তে আরও ডালপালা মেলে বকশীবাজারে। সেখানেও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। কয়েক ঘণ্টা ধরে দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষ চলে এবং আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। ছাত্রশিবিরকে হটিয়ে আলিয়া মাদ্রাসার একমাত্র আবাসিক হল, আল্লামা কাশগরী (রহ.) হল, দখলে নিয়েছে ছাত্রদল।
মারামারি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ঢাকা কলেজেও। সেখানেও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। সেখানে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। তবে উত্তেজনা শুরু হয়েছে বেশ কয়েক দিন আগ থেকেই।
এর আগের দিন, অর্থাৎ ৩ আগস্ট, রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে এই দুই সংগঠন। সেখানে ছাত্রশিবির জুলাই অভ্যুত্থান উপলক্ষে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিতদের ছবিসংবলিত একটি বিলবোর্ড স্থাপন করলে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও এর আগে ছাত্রশিবির একই ধরনের চেষ্টা করেছিল, কিন্তু শিক্ষার্থীরা তা প্রতিহত করেন।
প্রসঙ্গক্রমে জানিয়ে রাখা প্রয়োজন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে—ঢাকা, চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে—ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল জয়লাভ করে।
তবে জয়লাভের পর থেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের চাওয়াকে গুরুত্ব না দিয়ে ছাত্র সংসদকে নিজেদের উদ্দেশ্য অনুযায়ী পরিচালনা করছে। যার কারণে তাদের কর্মকাণ্ডে প্রাধান্য পাচ্ছে বিভিন্ন শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল, একে-ওকে ধরা, অব্যাহতি ও চাকরিচ্যুতির দাবি, একে-ওকে ধরপাকড় করা।
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলে ‘সমকামিতা’র অভিযোগে শিবির নেতাদের নাম আসায় সেটিকে ঘিরেও ক্যাম্পাসে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। ৪ আগস্ট তিনটি প্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষের ধরন দেখে আশঙ্কা করা হচ্ছিল, এই সংঘর্ষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে।
এর আগে ২৮ জুলাই হবিগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির গাড়িবহরে হামলা হয়। এই হামলায় দলটির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং আরও ১০ জন নেতাকর্মী ও সাংবাদিক আহত হয়েছেন বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে। পরে পুলিশের সহযোগিতায় তারা ঢাকায় ফিরে আসেন। এই হামলার পেছনে বিএনপি দায়ী বলে এনসিপির পক্ষ থেকে বারবার অভিযোগ তোলা হচ্ছে এবং ‘কঠিন হুঁশিয়ারি’ দেওয়া হচ্ছে।
এসব বিষয় নিয়ে সরকারের মধ্যে হেলদোল খুব কম। গণমাধ্যমে অনেক বেশি জায়গা পাচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ দূত সার্জিও গোরের বাংলাদেশ সফর এবং শেখ হাসিনার বাংলাদেশে আসার ঘোষণাকে ঘিরে নানা ধরনের জল্পনা-কল্পনা। সে কারণেই হয়তো সার্জিও গোরের এই সফর পেয়েছে মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব।
এ সময় সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামানের একটি বক্তব্যও নানামুখী চিন্তার সুযোগ তৈরি করেছে। ৩ আগস্ট জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পে আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইনস্টিটিউট (এআইআইআই) উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেছেন, ‘আধুনিক ও ইসলামী শিক্ষার সমন্বয় ছাড়া ভবিষ্যতে নৈতিক, দক্ষ ও মানবিক জাতি গঠন সম্ভব নয়’ (দৈনিক সমকাল, ৪ আগস্ট ২০২৬)।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র সবচেয়ে ভয়াবহ। সেখানে যখন-তখন দাঁড়িয়ে যাচ্ছে নানা নামের সংগঠন। সেগুলোর নামও তখন-তখনই ঠিক করা হচ্ছে। নানা অভিযোগ তৈরি করছে তারা। কয়েকজনই মূলত এগুলো করছে। তারা তালিকা তৈরি করছে, একে-ওকে জড়িয়ে নানা অভিযোগ দাখিল করছে, আর প্রশাসন সেগুলো আমলে নিচ্ছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে জিএস আম্মার একাই বিভিন্নজনের ওপর চড়াও হচ্ছে, একটা ভয়ের রাজত্ব তৈরি করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক কাবেরী গায়েনের জিজ্ঞাসাকেন্দ্রিক একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে দাঁড়িয়ে গেল কয়েকজন। তাঁর বিচার চাইল সেই কয়েকজনই। বিশ্ববিদ্যালয়ও সঙ্গে সঙ্গে তদন্ত কমিটি করল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হলো, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যেন এ ধরনের অভিযোগের অপেক্ষাতেই ছিল। এতে অধ্যাপক কাবেরী গায়েন আরও অনিরাপত্তার ঝুঁকিতে পড়ে গেলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৩১ জন শিক্ষকের শাস্তি দাবি করেছেন সাদাদলের (বিএনপি ও জামায়াতপন্থি) শিক্ষকরা। সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সিন্ডিকেট থেকে গঠিত হয়েছে নতুন কমিটি। কখন কার নাম কোন তালিকায় ঢুকে যায়, সেটি নিয়ে অনেকেই কমবেশি শঙ্কিত।
সর্বশেষ সিন্ডিকেটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষককে সাময়িকভাবে বরখাস্ত এবং অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাদেকা হালিমসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষককে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া চার শিক্ষককে একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ডুবে আছে গভীর এক ভয়ের রাজ্যে। আশার বিষয় হলো, এসব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ হচ্ছে। যদিও ক্ষমতার নির্মমতা হলো, দলগুলো যখন ক্ষমতায় থাকে, তখন কোনো কিছুকেই তোয়াক্কা করে না।
এর পাশাপাশি অনিরাপত্তার আতঙ্কও রয়েছে সব জায়গায়। বিশেষ করে মেট্রোরেলের বিভিন্ন স্টেশনে ‘বোমাসদৃশ’ বস্তু পাওয়া জনমনের এই আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। যদিও মতিঝিলেরটিতে শক্তিশালী বোমা ছিল, পরেরগুলোতে সে রকম উপকরণ না পেলেও নানামুখী ভয়ে আছে দেশের মানুষ। এর আগে এনসিপির জনসভাতেও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
দুই বছরের মধ্যেই শুধু ঝনঝন করে ভাঙা নয়, ফাটলই নয়; বরং সংঘর্ষ তৈরি হয়েছে জুলাইয়ের শক্তিগুলোর মধ্যে। যদিও এই ফাটল অভ্যুত্থানের দুই-এক মাস পর থেকেই বোঝা গিয়েছিল। অনেকেই চেঁচামেচি করছেন, জুলাইয়ের শক্তিগুলোর ঐক্য দরকার। কিন্তু সেটি যে হওয়ার নয়, সেটিও সকলেরই জানা। কেন ঐক্য দরকার? এই ঐক্যের উদ্দেশ্য অন্য। এই দলগুলোর মধ্যে একটাই ঐক্যের জায়গা, আর সেটি হলো আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ রাখা।
তবে সংঘর্ষের যে ধারা চলছে, তাতে আসলে মূল ভুক্তভোগী জনগণ। তারা খুব আতঙ্কে আছে, ভয়ের মধ্যে আছে।
লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ইমেইল: zobaidanasreen@gmail.com