যে নামেই ডাকেন না কেন… 

জোবাইদা নাসরীন
২৭ জুলাই ২০২৬, ১২:০০আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২:০০

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও আলোচনায় উগ্রবাদ ও চরমপন্থা। লক্ষ‍ করুন এখন আর ‘জঙ্গি’ শব্দটি ব‍্যবহৃত হচ্ছে না। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাদা-কালো কাপড়ে কলেমা শাহাদাত লেখা পতাকা টানানোর পর দেশে জঙ্গিবাদ, উগ্রবাদ এবং চরমপন্থা আলোচনায় যেমন এসেছে, তেমনই মানুষ কিছুটা আতঙ্কগ্রস্তও হয়ে পড়েছে। গত ১৫ জুলাই জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক তারেক রহমান বলেন, ‘‘আগেও বলেছি, আবারও আমি উল্লেখ করতে চাই—বর্তমান সরকার কোনোভাবেই কোনও প্রকার চরমপন্থা বা উগ্রবাদকে প্রশ্রয় দেবে না।

আমরা সরকারি দল ও বিরোধীদল বিভিন্ন বিষয়ে, সংসদে কোনও কোনও বিষয়ে হয়তো দ্বিমত করেছি, কিন্তু একইসঙ্গে অনেক বিষয়ে আমরা একমত পোষণ করেছি। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে উগ্রবাদ ও চরমপন্থাকে বর্তমান সরকার প্রশ্রয় দেবে না, এ ব্যাপারে আমরা সম্পূর্ণভাবে বিরোধী দলের সহযোগিতা পাবো। ’’(দ‍্য ডেইলি স্টার, ১৫ জুলাই, ২০২৬)।

হঠাৎ করে নয়, বরং বিভিন্ন ধরনের আলামতকে সঙ্গে নিয়েই এই ধরনের ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। এবারই প্রথম নয়, বাংলাদেশে এর আগে বিভিন্ন সময় নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীরের মিছিলেও কালেমা খচিত সাদা ও কালো দুই ধরনের পতাকার ব‍্যবহার দেখা গিয়েছে। আর এ কারণে বলা যায় যে নির্দিষ্ট ডিজাইনের এই পতাকা ব্যবহারকে ঘিরে মানুষের বিভিন্ন ধরনের সন্দেহ-অনিরাপত্তা সবই তৈরি হচ্ছে। এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সংসদে উগ্রবাদ ও চরমপন্থার বিষয়ে কঠোর অবস্থার অঙ্গীকার করা হলেও কার্যত ঘটছে ভিন্ন বিষয়। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে এই ধরনের পতাকা দেশের অনেক জেলাতে টানানো হলেও সরকারের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে কোনও অবস্থান ব‍্যক্ত করা হয়নি এবং কারা এগুলো করছে এবং কেন করছে, সেই বিষয়ে কোনও ধরনের প্রশ্ন তোলা হয়নি। কিংবা ওগুলো খোলার ব‍্যবস্থাও করা হয়নি। গত এপ্রিলে উগ্রবাদীরা বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেও সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। এমনকি এটি নিয়ে জরুরি/গোপনীয় উল্লেখ করে পুলিশের সদর দফতর থেকে একটি চিঠি র‍্যাবসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে পাঠানো হয়েছিল। যে চিঠিতে ছিল, সম্প্রতি গ্রেফতারকৃত নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য ইসতিয়াক আহম্মেদ ওরফে সামী ওরফে আবু বক্কর ওরফে আবু মোহাম্মদের সাথে চাকরিচ্যুত দুই সেনা সদস্যের নিয়মিত যোগাযোগের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। তারা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে (জাতীয় সংসদ, বাংলাদেশ পুলিশ/সেনাবাহিনীর সদস্য অথবা স্থাপনাগুলো, ধর্মীয় উপাসনালয়, বিনোদনকেন্দ্র, শাহবাগ চত্বর) বোমা বিস্ফোরণ এমনকি দেশীয় ধারালো অস্ত্র কিংবা আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হামলা করতে পারে মর্মে জানা যায়।

আরও লেখা ছিল, এ লক্ষ্যে তারা বিভিন্ন বাহিনীর অস্ত্রাগারে হামলার পরিকল্পনা গ্রহণ করে থাকতে পারে। দেশের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য তারা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এমতাবস্থায়, বর্ণিত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা জোরদারকরণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। এছাড়াও নজরদারি বৃদ্ধিসহ বর্ণিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হলো (বিবিসি নিউজ বাংলা ৩০ এপ্রিল ২০২৬)।

তবে গত কয়েক মাস ধরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ‍্যমে বিভিন্নভাবে জঙ্গি এবং উগ্রবাদ নিয়ে নানা ধরনের সত‍্য-অসত‍্য খবর এসেছে। তবে এ বিষয়ে সরকারের দ্বৈততা আরও স্পষ্ট হয়—একই দিনে সরকারের দুজন গুরুত্বপূর্ণ ব‍্যক্তি এই জঙ্গি বিষয়ে দু’রকমের কথা বলেছেন। কোস্টগার্ডের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে দেশে জঙ্গি উত্থান বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘‘আমি ওই পরিভাষাটি (জঙ্গিবাদ) স্বীকার করি না। আমাদের দেশে এমন কোনও কার্যকলাপ নেই (দ‍্য ডেইলি স্টার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬)।

অন‍্যদিকে আরেকটি অনুষ্ঠানে তথ‍্য উপদেষ্টা বলেন, প্রথম কথা হচ্ছে, সরকারের কাছে কতখানি তথ্য আছে এটা বলা যাবে না। এটা একটা সেনসিটিভ (সংবেদনশীল) তথ‍্য। এই তথ্যটা গোপন থাকবে। কিন্তু যেটুকু তথ্য সরকার জানিয়েছে, এটা ফ্যাক্ট (বাংলাদেশে জঙ্গি আছে, দৈনিক যুগান্তর, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬)

জার্মান সংবাদ সংস্থা ডয়েচে ভ‍্যালের রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী দেশে ১ হাজার ৬১১ জঙ্গির নাম তালিকাভুক্ত রয়েছে এবং এই জঙ্গিদের বেশিরভাগ বিভিন্ন সময় জামিনে মুক্ত হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এক হাজার ২৩১ জন জঙ্গি জামিনে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছে। আর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত জামিন পেয়েছে আরও ৩৮০ জন। সংবাদ সংস্থাটি আরও জানিয়েছে—দেশের ১৬টি কারাগারে গত বছরের জুন পর্যন্ত ১৬২ জন জঙ্গি বন্দি রয়েছেন। এর মধ্যে বিচারাধীন আছেন ৩২ জন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৫৯ জন, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ৪৬ জন ও অন্যান্য ২৫ জন। এছাড়া ২০২৪ সালের আগস্টে কারাগার ভেঙে পালিয়ে যাওয়া জঙ্গিদের মধ্যে ৭৯ জনকে এখনও ধরা যায়নি। এদের মধ্যে ৯ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত (ডয়েচে ভ‍্যালে ২৯ এপ্রিল, ২০২৬)।

এখন প্রশ্ন হলো, যারা জামিনে মুক্ত এবং ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ‘সব বন্দিদের’ কারামুক্তি হলে, বের হওয়া এবং জেলখানা ভেঙে পালিয়ে যাওয়ারা এখন কোথায় আছে এবং কী করছে—সেটির সর্বশেষ কোনও তথ‍্য জানা নেই। সরকারের কাছে আছে কিনা সেটিও সরকারকে পরিষ্কার করতে হবে।

এখন ফিরে আসি, তাহলে সরকার প্রধান হিসেবে তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব‍্য। তাকে কেন বলতে হচ্ছে বর্তমান সরকার উগ্রবাদ বা চরমপন্থাকে প্রশ্রয় দেবে না? এ ব্যাপারে তিনি বিরোধী দলের সহযোগিতা আশা করছেন। যদিও সরকার খুব কৌশলে জঙ্গি শব্দটি ব‍্যবহার না করে ‘চারমপন্থা’ এবং ‘উগ্রবাদ’ শব্দটি ব‍্যবহার করেছে। কিন্তু কার্যকারিতার ধরনে এগুলো সবই এক। তাহলে ধরেই নিতে হচ্ছে, দেশে জঙ্গি আছে এবং জেল থেকে বের হওয়া জঙ্গিরা কোথায় আছে, কী করছে সেগুলো সরকার জানে এবং সেগুলো সরকারকে বেকায়দায় ফেলছে।

সরকারকে মনে রাখতে হবে, এ দেশের মানুষ সব সময়ই জঙ্গিবাদবিরোধী। তাই মানুষের আস্থা পেতে হলে শুধু মুখে বললেই হবে না, বাস্তবে দেখাতে হবে। কিন্তু সরকারের কথায় এবং কাজে ফারাক চোখে পড়ছে।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ‍্যালয়।

ইমেইল: [email protected]

 

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
এইচএসসির ইংরেজি ভার্সনের প্রশ্নপত্র ভুলে ভরা, ক্ষুব্ধ পরীক্ষার্থীর
এইচএসসির ইংরেজি ভার্সনের প্রশ্নপত্র ভুলে ভরা, ক্ষুব্ধ পরীক্ষার্থীর
চলন্ত বাসে নারী যাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টা, রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে যেভাবে উদ্ধার করলো পুলিশ
চলন্ত বাসে নারী যাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টা, রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে যেভাবে উদ্ধার করলো পুলিশ
ঢামেক চত্বরে দুই ভবঘুরে নারীর মৃত্যু
ঢামেক চত্বরে দুই ভবঘুরে নারীর মৃত্যু
যে নামেই ডাকেন না কেন… 
যে নামেই ডাকেন না কেন… 
সর্বশেষসর্বাধিক