প্রশ্নকারীকে দোষী সাব্যস্ত নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন এক ধরনের অস্বাভাবিক ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যে কেউ যে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করতে পারছে, এবং অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জনপরিসরে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ, চরিত্রহনন এবং তাৎক্ষণিক রায়ের সংস্কৃতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আনুষ্ঠানিক তদন্তের আগেই অনেকের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হয়ে যাচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার সর্বশেষ শিকার হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. কাবেরী গায়েন।

তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে তিনি জুলাই আন্দোলনের বিরোধিতা করেছেন, আন্দোলনকে অবমাননা করেছেন এবং ‘ফ্যাসিবাদের’ পক্ষাবলম্বন করেছেন। অভিযোগের বিষয়বস্তু এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করার প্রবণতা স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। অর্থাৎ তদন্ত শুরুর আগেই বিচার, এবং বিচার শেষ হওয়ার আগেই রায়—এই প্রবণতাই সবচেয়ে উদ্বেগজনক।

বিশ্ববিদ্যালয় অবশ্য এমন হওয়ার কথা ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয় আদালতও নয়, আবার জনতার মিছিলও নয়। এটি এমন এক জায়গা, যেখানে প্রশ্নকে ভয় করা হয় না। বরং প্রশ্নের ভেতর থেকেই নতুন জ্ঞান, নতুন উপলব্ধি, এমনকি প্রতিষ্ঠিত সত্যেরও সংশোধন জন্ম নেয়। ইতিহাসের বড় বড় আবিষ্কার অনেক সময় একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন থেকেই শুরু হয়েছিল। সেই প্রশ্ন যদি প্রথম দিনেই শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত হতো, তাহলে পৃথিবীর জ্ঞানভাণ্ডার আজ অনেক দরিদ্র হতো।

এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে, ড. কাবেরী গায়েন আমার দীর্ঘদিনের পরিচিত ও ঘনিষ্ঠজন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি ছিলেন আমার সিনিয়র এবং আমরা একই রাজনৈতিক-সাংগঠনিক পরিমণ্ডলে কাজ করেছি। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আমি তাঁকে একজন আদর্শনিষ্ঠ, স্পষ্টভাষী এবং ন্যায়বোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে জেনেছি। তিনি যা বিশ্বাস করেন, তা-ই বলেন; অন্যের সুবিধাজনক অবস্থানকে অনুসরণ করার প্রবণতা তাঁর মধ্যে কখনও দেখিনি। সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলার ক্ষেত্রে তিনি বরাবরই আপসহীন। তিনি সব সময় জনপ্রিয়তার চেয়ে নীতিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

সম্প্রতি তিনি ফেসবুকে জুলাই আন্দোলন-সংক্রান্ত কিছু বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। এর মধ্যে একটি ছিল সানজিদা আহমেদ তন্বী নামের এক তরুণীকে ঘিরে প্রচারিত একটি আলোচিত ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে। জুলাই আন্দোলনের সময় একটি রক্তাক্ত ও আতঙ্কিত মুখের ছবি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে একটি ভাইরাল ভিডিওতে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা শারমীন মুর্শিদ এবং ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমের কথোপকথন প্রকাশিত হয়, যেখানে ওই ঘটনার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। ভিডিওতে শারমীন মুর্শিদ বিস্ময় প্রকাশ করে জানতে চান, এটি কি সেই মেয়ের ঘটনা, যিনি আহত হওয়ার অভিনয় করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশে থাকা সাদিক কায়েম ওই পরিচয়ের বিষয়ে সম্মতি জানান। এই ভিডিও প্রকাশের পর ঘটনাটি নিয়ে জনপরিসরে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়।

এই ভাইরাল ভিডিওটি তন্বীর রক্তমাখা মুখাবয়বের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল। ড. কাবেরী গায়েন তাঁর ফেসবুক পোস্টে মূলত এই প্রশ্নের সত্যতা জানতে চেয়েছিলেন।

এই প্রশ্নটি কেবল তাঁর একার নয়; জনপরিসরে আরও অনেকেই একই প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু সেই পোস্টের পর তাঁর বিরুদ্ধে তন্বীকে এবং জুলাই আন্দোলনকে অবমাননার অভিযোগ এনে ভিসির কাছে অভিযোগ দায়ের করা হয়। অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রক্টরের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি সত্যানুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এখানেই প্রক্রিয়াগত প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কমিটি অভিযোগকারীদের ডেকে অভিযোগের বিস্তারিত জানতে চেয়েছে। একই সময়ে ছাত্রশিবিরের একজন কর্মীর স্বাক্ষরে “সন্ত্রাসবিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ” নামে একটি ফোরামের ব্যানারে প্রক্টর অফিসের সামনে অবস্থান কর্মসূচিও অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু অভিযোগের বিষয়ে ড. কাবেরী গায়েনকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে কি না, তাঁকে অভিযোগের অনুলিপি দেওয়া হয়েছে কি না, এবং তদন্ত শুরুর আগে তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনও জনসমক্ষে আসেনি। ন্যায়বিচারের একটি মৌলিক নীতি হলো, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁর বক্তব্য শোনার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে এই নীতির ব্যত্যয় অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

জুলাই আন্দোলনকে ঘিরে বিভিন্ন ধরনের তথ্যগত বিতর্ক ও অসঙ্গতির অভিযোগও গত এক বছরে সামনে এসেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কিছু মামলায় জীবিত ব্যক্তিকে নিহত হিসেবে দেখানো হয়েছে, কোথাও ভুয়া বাদী, কোথাও তথ্যগত অসত্যতা পাওয়া গেছে। বিবিসি বাংলা লিখেছে, “জীবিত ব্যক্তিকে জুলাই আন্দোলনে ‘শহীদ’ দেখিয়ে হত্যা মামলা।” বিডিনিউজ লিখেছে, “জুলাইয়ে হত্যা: ‘শহীদ’ এখন সৌদি আরবে, মামলার বাদী ভুয়া।” দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে, ‘‘এক মামলায় একজন মায়ের দাবি ছিল তাঁর ছেলে গুলিতে নিহত হয়েছেন, কিন্তু তদন্তে সেই দাবি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। আরেকটি মামলায় একজন জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখানো হয়েছিল। পিবিআইয়ের তদন্তে জানা যায়, তিনি জীবিত আছেন। পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-পরবর্তী সময়ে সারা দেশে হওয়া ১৯৫টি সিআর মামলার তদন্তে অন্তত ১৪টি ভুয়া মামলার প্রমাণ পাওয়া গেছে।’’

এই ঘটনাগুলোর গুরুত্ব এখানেই যে, এগুলো প্রকৃত ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচারের দাবিকেও দুর্বল করে দিতে পারে। যখন আদালতের সামনে একের পর এক ভুয়া বা অসত্য তথ্য উপস্থাপিত হয়, তখন প্রকৃত অপরাধের বিচারও জটিল হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যদি গুরুতর অপরাধের বিচার চলমান থাকে, তাহলে ভুয়া মামলা ও তথ্যগত অসঙ্গতি পুরো বিচারপ্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

জুলাই আন্দোলন নিয়ে নানা বিতর্ক, পাল্টা দাবি এবং তথ্যগত প্রশ্ন জনপরিসরে এসেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা অবশ্যই যাচাই হওয়া উচিত। কিন্তু প্রশ্ন করলেই তাকেই নাস্তানাবুদ করা, একটা নেতিবাচক ট্যাগ লাগিয়ে দিয়ে প্রশ্নকর্তাকে অভিযুক্ত বানিয়ে ফেললে সত্যের অপমৃত্যু হয়। ন্যায় বিচার বলে কোনো কিছু আর অবশিষ্ট থাকে না। 

বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে প্রশ্ন করার অধিকার যেমন স্বীকৃত, তেমনি সেই প্রশ্নের জবাবও খোঁজা হয় যুক্তি, প্রমাণ ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে। ফলে কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে তার সমাধানও হতে হবে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিধি, ন্যায়বিচারের নীতি এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধ অনুসরণ করে। অন্যথায় বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র থেকে ধীরে ধীরে ভীতি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতির দিকে এগিয়ে যায়।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বহু বছর ধরেই রাজনৈতিক বিভাজন, মতাদর্শগত সংঘাত এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের অভিঘাত বহন করছে। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, শিক্ষক নিয়োগ, শৃঙ্খলাবিষয়ক ব্যবস্থা—এসব ক্ষেত্রেও প্রায়ই রাজনৈতিক ব্যাখ্যা সামনে আসে। এ ধরনের পরিবেশে কোনো তদন্ত বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ যদি যথেষ্ট স্বচ্ছ না হয়, তাহলে সেটি সহজেই পক্ষপাতদুষ্ট বলে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব শুধু নিরপেক্ষ থাকা নয়; নিরপেক্ষতার দৃশ্যমান প্রমাণও তুলে ধরা।

ড. কাবেরী গায়েনের পোস্ট নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, সেটিরও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন প্রয়োজন। তিনি কোনো ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে মন্তব্য করেছেন কি না, নাকি একটি সংবাদকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন তুলেছেন—এটি তদন্তের বিষয়। কিন্তু তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কোনো শিক্ষককে জনপরিসরে দোষী সাব্যস্ত করার প্রবণতা গ্রহণযোগ্য নয়। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কেবল পাঠদান করেন না; তাঁরা গবেষণা করেন, মত প্রকাশ করেন, জনপরিসরের বিতর্কে অংশ নেন এবং সমাজকে সমালোচনামূলকভাবে ভাবতে শেখান। ফলে তাঁদের মতের সঙ্গে দ্বিমত থাকতেই পারে। কিন্তু মতের জবাব যদি তদন্ত, শাস্তির হুমকি বা সামাজিক চাপ হয়ে ওঠে, তাহলে ভবিষ্যতে অন্য শিক্ষকেরাও আত্মনিয়ন্ত্রণে বাধ্য হবেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে মুক্তবুদ্ধির পরিবেশ, যা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ।

আজকের প্রশ্নটি তাই ড. কাবেরী গায়েনকে নিয়ে নয়। আগামীকাল অন্য কেউ হবেন, পরশু আরেকজন। কিন্তু যদি প্রক্রিয়াটিই দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে ব্যক্তি বদলাবে, অন্যায় বদলাবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ মতকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়; মতের পরীক্ষা নেওয়া। আর সেই পরীক্ষার একমাত্র গ্রহণযোগ্য প্রশ্নপত্রের নাম হলো যুক্তি, প্রমাণ এবং ন্যায়বিচার।

কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিচার অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু বিচার যদি ন্যায়বিচারের চেয়ে দ্রুত দৌড়াতে শুরু করে, তাহলে একসময় বিশ্ববিদ্যালয় আর জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠান থাকে না; সেটি কেবল অভিযোগ ব্যবস্থাপনার একটি দক্ষ দপ্তরে পরিণত হয়। আর ইতিহাসের একটি পুরোনো অভ্যাস আছে—সে শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানকে নয়, প্রতিষ্ঠানের ন্যায়বোধকেই বিচার করে।