শিক্ষক: অমাবস্যার রাতে নক্ষত্রের মতো

চিররঞ্জন সরকার
০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০

অমাবস্যার রাতে বোধহয় নক্ষত্র-ভরা আকাশের অনুপস্থিতিই সবচেয়ে গভীরভাবে অনুভূত হয়। চারপাশের অন্ধকার তখন মনে করিয়ে দেয়—আলো শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, পথ চিনে নেওয়ার জন্যও অপরিহার্য। জীবনের কিছু নির্জন মুহূর্তেও তেমনই উপলব্ধি হয়—কিছু মানুষের উপস্থিতির মূল্য তাদের কাছ থেকে দূরে সরে গেলেই সবচেয়ে বেশি বোঝা যায়। স্কুলজীবনের শিক্ষকরা তেমনই কিছু মানুষ। তাঁদের কণ্ঠস্বর, শাসন, স্নেহ, বকুনি, পরামর্শ আর ভালোবাসা মিলিয়েই তৈরি হয় আমাদের শৈশব ও কৈশোরের অদৃশ্য মানচিত্র।

সবে পঞ্চম শ্রেণিতে উচ্চবিদ্যালয়ে পা রাখা। নতুন স্কুল, নতুন বন্ধু, নতুন পরিবেশ, নতুন শিক্ষক-শিক্ষিকা। প্রথম দিকে শিক্ষকরা ছিলেন দূরের, গম্ভীর এক জগতের মানুষ। তাঁদের সামনে দাঁড়ালে কণ্ঠস্বর নিচু হয়ে আসতো, ভুল করলে বুক ধড়ফড় করতো। কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে, সেই দূরত্ব তত কমেছে। ধীরে ধীরে বুঝেছি, শিক্ষক শুধু পাঠ্যবই পড়ানোর মানুষ নন। কখনও তিনি অভিভাবক, কখনও পথপ্রদর্শক, কখনও কঠোর বিচারক, আবার কখনও এমন এক নিঃশব্দ আশ্রয়—যাঁর গুরুত্ব জীবনের অনেক পরে এসে বোঝা যায়।

আমাদের সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনেকটাই ছিল পরিবারের সম্প্রসারিত রূপ। স্কুলে আমরা শুধু বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস কিংবা গণিত শিখিনি; শিখেছি সম্পর্কের মূল্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ এবং একসঙ্গে বেড়ে ওঠার সংস্কৃতি। তখন হয়তো বুঝিনি, বিদ্যালয় কেবল বই ও পরীক্ষার জায়গা নয়; এটি মানুষ হয়ে ওঠারও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।

মনে পড়ে রুবি আপার কথা। টানা পাঁচ দিন স্কুলে অনুপস্থিত থাকার কারণে তিনি রাসেলকে প্রধান শিক্ষকের কক্ষে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেদিন হয়তো রাসেলের মনে হয়েছিল আপা অকারণে ‘নালিশ’ করেছেন। কিন্তু আজ  নিশ্চয়ই সে বুঝতে পারে, সেই অভিযোগের মধ্যেও ছিল দায়িত্ববোধ, উদ্বেগ এবং একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তরিক চিন্তা।

মোর্শেদ স্যারকে আমরা সবাই ‘ডন স্যার’ বলে ডাকতাম। তাঁর কাছেই শিখেছিলাম নিয়মানুবর্তিতা, সময়ের মূল্য ও শৃঙ্খলা। প্রায় এক যুগ আগে বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে এসেছি। তবু আজও  কখনও কখনও হাই স্যারের সেই ‘কলা গাছ’ বকুনিটি শুনতে ইচ্ছে করে। ফিরে পেতে ইচ্ছে করে মোজাম্মেল স্যারের ইংরেজি, লতিফ স্যারের বাংলা, দেবনাথ স্যারের সংস্কৃত কিংবা শফিউল্লাহ স্যারের ইতিহাসের ক্লাস। তখন বুঝিনি, জীবনের সাধারণ মুহূর্তগুলোই একদিন অসাধারণ স্মৃতিতে পরিণত হয়। কিন্তু এখানেই আজকের প্রশ্নটি আরও তীব্র হয়ে ওঠে— আজকের বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা কি বিদ্যালয়কে একইভাবে অনুভব করে?

সময় বদলেছে। প্রযুক্তি শিক্ষাকে সহজ করেছে, তথ্যকে করেছে হাতের মুঠোয়। কিন্তু একইসঙ্গে শিক্ষার্থীর মনোযোগের সামনে দাঁড় করিয়েছে এক শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেম, ইউটিউব, স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও ও অবিরাম ডিজিটাল বিনোদন তৈরি করছে দ্রুত আনন্দ পাওয়ার অভ্যাস। ফলে একটি দীর্ঘ ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখা, বই পড়া, শিক্ষকের ব্যাখ্যা মন দিয়ে শোনা কিংবা কোনও বিষয় নিয়ে ধৈর্য ধরে চিন্তা করা অনেকের কাছেই কঠিন হয়ে উঠছে।

কোভিড-১৯ মহামারি এই পরিবর্তনকে আরও তীব্র করেছে। দীর্ঘদিন বিদ্যালয় বন্ধ থাকা, অনলাইন শিক্ষার ওপর নির্ভরতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা শিক্ষার্থী-শিক্ষক সম্পর্কেও দূরত্ব তৈরি করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পারিবারিক চাপ, অর্থনৈতিক সংকট, শহর-গ্রামের বৈষম্য, বিদ্যালয়ছুট, পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।

তাই কোনও শিক্ষার্থী ক্লাসে মনোযোগ দিচ্ছে না দেখলেই তাকে ‘অমনোযোগী’ বা ‘অযোগ্য’ বলে চিহ্নিত করা সমস্যার সমাধান নয়। একজন শিক্ষার্থীর নীরবতার পেছনে থাকতে পারে পারিবারিক সংকট, অর্থনৈতিক চাপ, মানসিক অস্থিরতা, প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার কিংবা বিদ্যালয়ের সঙ্গে তার দুর্বল সম্পর্ক। শিক্ষার সংকটকে শুধু শিক্ষার্থীর ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে আমরা সমস্যার অর্ধেকও বুঝতে পারবো না।

এই বাস্তবতায় সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ককে নতুন করে ভাবা। সুসম্পর্ক মানে শাসনের সম্পূর্ণ অবসান নয়, আবার শিক্ষককে বন্ধুর মতো করে ফেলার নামও নয়। প্রকৃত সুসম্পর্ক হলো এমন একটি বিশ্বাসের পরিবেশ, যেখানে শিক্ষার্থী শিক্ষককে ভয় করবে না, আবার অসম্মানও করবে না। নিজের সমস্যার কথা বলতে পারবে, প্রশ্ন করতে পারবে, ভুল স্বীকার করতে পারবে এবং একই সঙ্গে নিজের দায়িত্ব থেকেও পালাবে না।

একজন ভালো শিক্ষক শুধু নম্বর দিয়ে শিক্ষার্থীকে বিচার করেন না। তিনি তার ব্যক্তিত্ব, দুর্বলতা, সম্ভাবনা ও স্বপ্ন বোঝার চেষ্টা করেন। তিনি শুধু বলেন না—‘পড়ো’; বোঝান, কেন পড়তে হবে। শুধু পরীক্ষার উত্তর শেখান না; শেখান কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, কীভাবে যুক্তি দিয়ে ভাবতে হয়, কীভাবে মতের অমিলকে সম্মান করতে হয় এবং কীভাবে একজন দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে উঠতে হয়।

কিন্তু শিক্ষক যতই নিবেদিত হোন, একটি দুর্বল শিক্ষাব্যবস্থার সব বোঝা তাঁর কাঁধে চাপিয়ে দিলে চলবে না। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে প্রায় প্রতিটি সরকারই শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছে। ‘সবার জন্য শিক্ষা’ থেকে ‘ডিজিটাল শিক্ষা’, ‘স্মার্ট শিক্ষা’—স্লোগান বদলেছে, লক্ষ্যও বদলেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের প্রতিটি শিক্ষার্থী কি সেই পরিবর্তনের সমান অংশীদার হতে পেরেছে?

আজও এমন বিদ্যালয় আছে যেখানে পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ নেই, শিক্ষক সংকট আছে, বিজ্ঞানাগার বা পাঠাগারের সুযোগ সীমিত, নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন নিশ্চিত নয়। কোথাও শিক্ষককে একাধিক শ্রেণির দায়িত্ব সামলাতে হয়, কোথাও শিক্ষার্থী আছে কিন্তু পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। আবার শহরের বহু শিক্ষার্থী আধুনিক প্রযুক্তি ও কোচিংয়ের সুযোগ পেলেও প্রান্তিক অঞ্চলের অনেক শিক্ষার্থী মৌলিক শিক্ষাসুবিধা নিয়েই সংগ্রাম করে।

এই বৈষম্য শুধু অবকাঠামোর নয়; এটি সুযোগের বৈষম্য। আর যেখানে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা দুর্বল, সেখানে স্বাভাবিকভাবেই কোচিং নির্ভরতা ও বাণিজ্যিক শিক্ষার প্রসার ঘটে। শিক্ষার মান তখন বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ থেকে সরে গিয়ে অনেকাংশে নির্ভর করতে শুরু করে পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের ওপর। যে শিক্ষা নাগরিকের অধিকার হওয়ার কথা, সেটি যদি ক্রমে ক্রয়ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে সেখানে শুধু শিক্ষার্থী নয়—সমাজের ভবিষ্যৎও বৈষম্যময় হয়ে ওঠে।

তাই প্রযুক্তি নিয়ে বড় বড় কথা বলার আগে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, প্রতিটি শিশুর হাতে বই আছে কিনা; প্রতিটি বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক আছেন কিনা; মেয়েদের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার আছে কিনা; শ্রেণিকক্ষ নিরাপদ কিনা; শিক্ষক মর্যাদা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছেন কিনা। স্মার্ট ক্লাসরুমের স্বপ্ন অবশ্যই থাকবে, কিন্তু তার আগে নিশ্চিত করতে হবে—প্রতিটি শিশুর জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ শ্রেণিকক্ষ।

প্রযুক্তিকে শত্রু বানিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তির সঠিক ও দায়িত্বশীল ব্যবহার শেখাতে হবে। একই সঙ্গে বই পড়া, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সহপাঠীর সঙ্গে মেলামেশা এবং শিক্ষকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ বাড়াতে হবে। কারণ শিক্ষা কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করার নাম নয়। শিক্ষা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, অন্যকে সম্মান করতে শেখায়, ভুল থেকে শিখতে শেখায় এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল করে তোলে।

৫ অক্টোবর শিক্ষক দিবস সামনে রেখে তাই পুরোনো দিনের সেই স্কুলঘরগুলোর কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে কালো বোর্ড, চক, টিফিনের ঘণ্টা, ক্লাস ফাঁকি দেওয়ার অজুহাত, পরীক্ষার আগের উৎকণ্ঠা, শিক্ষকের বকুনি আর অকারণেই পাওয়া কোনও প্রশংসা। কত শিক্ষক হয়তো আজ আমাদের পাশে নেই। কেউ অবসরে, কেউ দূরে, কেউ হয়তো পৃথিবী থেকেই বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের বলা কিছু কথা, শেখানো কিছু মূল্যবোধ, দেওয়া কিছু শাসন আজও আমাদের জীবনের অদৃশ্য পথনির্দেশক।

শিক্ষককে আমরা প্রায়ই ‘জাতি গঠনের কারিগর’ বলি। কথাটি এত বেশি ব্যবহৃত হয়েছে যে অনেক সময় এর গভীরতাই হারিয়ে যায়। অথচ সত্যিটা খুব সরল—একজন শিক্ষক একটি শিশুর চিন্তার ধরন বদলে দিতে পারেন; একটি ভুল সিদ্ধান্ত থেকে তাকে ফিরিয়ে আনতে পারেন; তার ভেতরের সম্ভাবনাকে চিনিয়ে দিতে পারেন। কখনও একটি বাক্য, কখনও একটি বকুনি, কখনও সামান্য উৎসাহ একজন মানুষের পুরো জীবনকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে।

অমাবস্যার রাতে তাই মনে হয়, নক্ষত্রহীন আকাশ যেমন অসম্পূর্ণ, শিক্ষকহীন শ্রেণিকক্ষও তেমনই অনুজ্জ্বল। কিন্তু শুধু শিক্ষক থাকলেই আলো জ্বলে না; সেই আলো জ্বালিয়ে রাখার জন্য দরকার সম্মান, প্রশিক্ষণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, পর্যাপ্ত সম্পদ এবং একটি কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা।

এই শিক্ষক দিবসে তাই প্রার্থনা হোক—বাংলাদেশের প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে আবার আলো জ্বলুক। শিক্ষক- শিক্ষার্থীর সম্পর্ক ফিরে পাক বিশ্বাস, শ্রদ্ধা ও মমতার উষ্ণতা। আর প্রতিটি শিক্ষার্থী হয়ে উঠুক এমন এক আলোকিত নক্ষত্র, যার আলো শুধু তার নিজের পথ নয়, একদিন আলোকিত করবে আরও অনেকের পথ।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
রোনালদোর জন্য পর্তুগালের দরজা খোলা, তবে...
রোনালদোর জন্য পর্তুগালের দরজা খোলা, তবে...
‘এভাবে সবকিছুর দাম বাড়লে আমরা কীভাবে চলবো’
‘এভাবে সবকিছুর দাম বাড়লে আমরা কীভাবে চলবো’
‘আমাগের এই দুক্কোডা কি আর দূর হবে না?’
আজ ভবদহ দিবস ‘আমাগের এই দুক্কোডা কি আর দূর হবে না?’
মেসির বিদায়ী ম্যাচ খেলতে এসে বেনিনকে এ কেমন আতিথেয়তা
মেসির বিদায়ী ম্যাচ খেলতে এসে বেনিনকে এ কেমন আতিথেয়তা
সর্বশেষ সর্বাধিক