রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: সংবিধান, আইন ও জুলাই সনদ

দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। আগ্রহী প্রার্থীদের পক্ষে আগামী ১৩ আগস্ট পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে। মনোনয়নত্র যাচাই-বাছাই হবে ১৬ আগস্ট। প্রত্যাহারের শেষ দিন ১৮ আগস্ট। আর একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদ ভবনে ভোটগ্রহণ হবে আগস্টের ২০ তারিখ। তবে একাধিক প্রার্থী না থাকলে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময় পার হওয়ার পরে একক প্রার্থীকে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে।

সংবিধানের ৪৮ এর এক অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। যদিও দেশে সংসদীয় ব্যবস্থা চালুর পর ১৯৯১ সালেই কেবল একাধিক প্রার্থী হওয়ায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট হয়েছিল। কিন্তু এরপর প্রতিবারই ক্ষমতাসীন দল মনোনীত প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। অর্থাৎ একক প্রার্থী থাকায় ভোটের প্রয়োজন হয়নি। এবারও যে তার ব্যতিক্রম হবে না, তা মোটামুটি নিশ্চিত।

১৯৯১ সালের আগে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতেন জনগণের ভোটে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ১৯৭৮ সালে প্রথম জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন জিয়াউর রহমান। এরপর ১৯৮১ সালে বিচারপতি আবদুস সাত্তার এবং সবশেষ ১৯৮৬ সালে এইচ এম এরশাদ সরাসরি জনগণের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী ছিলেন ১০ জন। তাদের মধ্যে জিয়াউর রহমান (বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট) সর্বোচ্চ ১ কোটি ৫৭ লাখ ৩৩ হাজার ৮০৭ ভোট পান। আর সবচেয়ে কম ২৩ হাজার ৯৬৮ ভোট পান জাতীয় জন মুক্তির অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ। ১৯৮১ সালের নির্বাচনে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী ছিলেন ৩১ জন। বিএনপির আব্দুস সাত্তার সর্বোচ্চ পান ১ কোটি ৪২ লাখ ৩ হাজার ৯৫৮ ভোট। আর সর্বনিম্ম ৩২ হাজার ৪৩৭ ভোট পান সৈয়দ শামসুর রহমান। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী ছিলেন ১২ জন। জাতীয় পার্টির এইচ এম এরশাদ পান সর্বোচ্চ ২ কোটি ১৭ লাখ ৯৫ হাজার ৩৩৭ ভোট। আর সর্বনিম্ন ৮৮ হাজার ৬৫০ ভোট পান সৈয়দ মনিরুল হুদা চৌধুরী। (তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের নির্বাচনি ব্যবস্থা ও ফলাফল, ঐতিহ্য/২০২৩)।

১৯৯১ সাল থেকে রাষ্ট্রপতি পদে জনগণের ভোটে নয়, বরং সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি শুরু হয়। অর্থাৎ এটিকে বলা হয় পরোক্ষ নির্বাচন। ওই বছরের ৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন আবদুর রহমান বিশ্বাস এবং বিরোধী দল আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন বদরুল হায়দার চৌধুরী। নির্বাচনে আব্দুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি পদে জয়ী হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বদরুল হায়দার চৌধুরী পান ৯২ ভোট।

এরপর ১৯৯৬, ২০০১, ২০০২, ২০০৯, ২০১৩, ২০১৮ এবং সবশেষ ২০২৩ সালের নির্বাচনে একক প্রার্থী থাকায় রাষ্ট্রপতি পদে কোনও নির্বাচন হয়নি। অর্থাৎ একাধিক প্রার্থী না থাকায় একক প্রার্থীকে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। এবারও যে তার ব্যতিক্রম হবে না, সেটি ধারণা করাই যায়। কেননা, ক্ষমতাসীন বিএনপি একজনকে মনোনীত করবে। আর সংসদে বিএনপির দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিরোধী দল থেকে কাউকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়ার সম্ভাবনা নেই। কেননা ভোট হলে তার জয়ী হওয়ার কোনও সম্ভাবনা থাকবে না। ফলে আগামী ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র দাখিলের দিনেই জানা যাবে বিএনপি রাষ্ট্রপতি হিসেবে কাকে মনোনয়ন দিয়েছে এবং হয়তো মনোনয়পত্র প্রত্যাহারের দিনেই নির্বাচন কমিশন তাকে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করবে। এরপর তিনি শপথ নেবেন। যদি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদকে বিএনপি পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনীত না করে তাহলে তিনি নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে স্পিকারের পদে পুনর্বহাল হয়ে যাবেন।

সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি-পদের মেয়াদ অবসানের কারণে ওই পদ শূন্য হলে মেয়াদ-সমাপ্তির তারিখের পূর্ববর্তী নব্বই হতে ষাট দিনের মধ্যে শূন্য পদ পূরণের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের ফলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পদটি শূন্য হওয়া পর নব্বই দিনের মধ্যে তা পূর্ণ করার জন্য নির্বাচন হবে। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যেহেতু রাষ্ট্রপতিকে সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত করেন এবং আগামী ১৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে যেহেতু পরবর্তী সংসদ অধিবেশন শুরু হবে, ফলে সংবিধানে উল্লিখিত সময়ের মধ্যেই জাতীয় সংসদ সদস্যরা পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে পারবেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য সংসদে বিশেষ বা জরুরি অধিবেশন ডাকার কোনও প্রয়োজন নেই। একাধিক প্রার্থী না থাকলে সংসদের জরুরি অধিবেশন ডাকার কোনও প্রয়োজন নেই। এমনকি একাধিক প্রার্থী থাকলেও সংসদ সদস্যদের ভোটগ্রহণের জন্য জরুরি অধিবেশন না ডাকলেও চলবে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন ১৯৯১ অনুযায়ী একাধিক প্রার্থী থাকলে সাড়ে তিনশ’ (৫০টি সংরক্ষিতসহ) সংসদ-সদস্য প্রকাশ্যে ভোট দেবেন। নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় সংখ্যক ব্যালট পেপার প্রস্তুত করবে। প্রত্যেকটি ব্যালট পেপারের দুটি অংশ থাকবে। কাউন্টার ফয়েলে প্রত্যেক ভোটারের নাম ও বিভক্তি সংখ্যা মুদ্রিত থাকবে এবং ভোটারের স্বাক্ষরের জন্য স্থান নির্ধারিত থাকবে। প্রত্যেকটি ব্যালট পেপারের আউটার ফয়েলে প্রত্যেক ভোটারের বিভক্তি সংখ্যা এবং রাষ্ট্রপতি পদ প্রার্থীদের নাম আদ্যাক্ষর অনুযায়ী ক্রমানুসারে সরল রেখার মধ্যে পৃথকভাবে মুদ্রিত থাকবে এবং প্রত্যেক নামের বিপরীতে ভোটার কর্তৃক স্বাক্ষরের মাধ্যমে ভোট প্রদানের জন্য নির্দিষ্ট স্থান থাকবে। প্রত্যেক ভোটার তার জন্য নির্দিষ্ট ব্যালটের কাউন্টার ফয়েলে নিজ নাম স্বাক্ষর করে ব্যালট পেপার সংগ্রহ করবেন। এরপর সেটি আউটার ফয়েলে তিনি যে প্রার্থীকে ভোট দেবেন, তার নামের বিপরীতে নির্দিষ্ট স্থানে নিজের পূর্ণ নাম স্বাক্ষর করে ভোট দেবেন এবং সেটি সংরক্ষিত ব্যালট বাক্সের ভেতরে রাখবেন। তার মানে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন হলে সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্যে ভোট দিতে হয়। অর্থাৎ কে কোন প্রার্থীকে ভোট দিলেন, সেটি জানা সম্ভব।

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গৃহীত জুলাই জাতীয় সনদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতির যে প্রস্তাব করা হয়েছে তা এরকম: রাষ্ট্রপতি আইন অনুযায়ী আইনসভার উভয় কক্ষের (নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ) সদস্যদের গোপন ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নির্বাচিত হবেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সংবিধানের অনুচ্ছেদে ৪৮(৪) বর্ণিত যোগ্যতাসমূহ এবং রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার সময় কোনও ব্যক্তি কোনও রাষ্ট্রীয়, সরকারি বা রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের পদে থাকতে পারবেন না। যদিও দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ হবে কিনা, তা এখনও নিশ্চিত নয়। 

প্রশ্ন হলো বিএনপি পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে কাকে বেছে নেবে? কয়েকজনের নাম আলোচনায় আছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কিন্তু তাকে রাষ্ট্রপতি করা হলে এই মুহূর্তে দলের মহাসচিবের দায়িত্ব কে পালন করবেন, সেটি নিয়ে একধরনের প্রশ্ন দলের ভেতরে আছে বলে শোনা যায়। সে ক্ষেত্রে দলের সিনিয়র নেতাদের মধ্যে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নজরুল ইসলাম খানের সম্ভাবনা অনেক বেশি বলে মনে হয়। তাছাড়া দেশের বিদ্যমান বাস্তবতায় দলের বাইরে গিয়ে কাউকে বিএনপি রাষ্ট্রপতি বানাবে– সেই সম্ভাবনা কম বলেই মনে হয়। কেননা, যিনি এবার রাষ্ট্রপতি হবেন তার অধীনেই আগামী জাতীয় নির্বাচন হবে এবং ওই নির্বাচনে বিএনপি যদি পুনরায় জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসতে না পারে, তারপরও নতুন সরকারের শুরুর দিনগুলোয় রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাদের দলের লোকই থাকবেন– এটি দল হিসেবে বিএনপিকে ‍কিছুটা হলেও সুবিধা দেবে। তাছাড়া ভবিষ্যতে রাজনীতি যদি আরও অস্থির বা সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে, তাহলে সেরকম পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির চেয়ারটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ফলে সেই চেয়ারে একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদের থাকা অনেক বেশি জরুরি। নির্দলীয় লোক যত যোগ্যই হোন না কেন, রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান হিসেবে তারা যে খুব একটা সুবিধা করতে পারেন না– সেই অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই দেশবাসীর হয়েছে।

আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক।