পর্যটন অর্থনীতি-৩: কেন সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিচ্ছে না? 

বাংলাদেশে পর্যটন নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই একটি শব্দ বারবার ফিরে আসে— ‘সম্ভাবনা’। রাজনৈতিক বক্তৃতা, উন্নয়ন পরিকল্পনা, বিনিয়োগ আলোচনা কিংবা গণমাধ্যমের প্রতিবেদন— সবখানেই আমরা শুনি যে, বাংলাদেশের পর্যটনের সম্ভাবনা বিপুল। কথাটি সত্য। প্রকৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের বিচারে বাংলাদেশ বিশ্বের অনেক দেশের চেয়েও সমৃদ্ধ।

কিন্তু অর্থনীতির একটি নির্মম বাস্তবতা হলো— সম্ভাবনা নিজে কোনও অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করে না। সম্ভাবনা তখনই সম্পদে পরিণত হয়, যখন তাকে পরিকল্পনা, বিনিয়োগ, দক্ষতা এবং সুশাসনের মাধ্যমে বাস্তবে রূপ দেওয়া যায়। সেখানেই বাংলাদেশের মূল চ্যালেঞ্জ।

প্রথম পর্বে আমরা দেখেছি কেন পর্যটন অর্থনীতি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। দ্বিতীয় পর্বে আলোচনা করেছি বাংলাদেশের অদেখা ও অব্যবহৃত পর্যটন সম্পদ নিয়ে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর এখনও বাকি রয়েছে— এত সম্পদ, এত সম্ভাবনা এবং এত আলোচনার পরও কেন বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যটন শিল্পে এখনও একটি উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করতে পারেনি?

প্রশ্নটি শুধু পর্যটনের নয়; এটি উন্নয়ন অর্থনীতিরও প্রশ্ন। কারণ বিশ্বের ইতিহাসে এমন বহু দেশ রয়েছে— যাদের প্রাকৃতিক সম্পদ বাংলাদেশের চেয়েও কম ছিল, কিন্তু তারা পর্যটনকে জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভে পরিণত করতে পেরেছে। আবার এমন অনেক দেশও আছে, যারা বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পরিকল্পনার অভাবে পিছিয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ কোন পথ বেছে নেবে, সেই সিদ্ধান্ত এখনও পুরোপুরি নেওয়া হয়নি। সমস্যাটি বোঝার জন্য একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। কক্সবাজার, সুন্দরবন, সেন্ট মার্টিন, বান্দরবান কিংবা সিলেট— এসব নিজে পর্যটন অর্থনীতি নয়। এগুলো পর্যটন অর্থনীতির কাঁচামাল মাত্র।

একটি সমুদ্রসৈকত নিজে অর্থনীতি সৃষ্টি করে না। একটি পাহাড় নিজে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে না। একটি বনভূমি নিজে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে না। এসবকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে হয়। আর সেই রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত রাষ্ট্রিক দৃষ্টিভঙ্গি।

বাংলাদেশের পর্যটন খাতের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা সম্ভবত এখানেই। দীর্ঘদিন ধরে পর্যটন উন্নয়নকে আমরা অনেকাংশে প্রকল্পভিত্তিক দৃষ্টিতে দেখেছি। কোথাও একটি সড়ক নির্মিত হয়েছে, কোথাও একটি পর্যটন মোটেল গড়ে উঠেছে, কোথাও নতুন অবকাঠামো নির্মাণ হয়েছে। কিন্তু এগুলোর অধিকাংশই একটি সমন্বিত জাতীয় পর্যটন কৌশলের অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়নি। ফলে উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু রূপান্তর ঘটেনি। বিশ্বের সফল পর্যটন রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে দেখা যায়। সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালদ্বীপ কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাত কেউই পর্যটনকে বিচ্ছিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে দেখেনি। তারা দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করেছে, অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন কৌশল নির্ধারণ করেছে এবং প্রতিটি বিনিয়োগকে একটি বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বাংলাদেশে সেই সমন্বিত কাঠামোর অভাব এখনও অনুভূত হয়।

দ্বিতীয় বড় সমস্যা হলো যোগাযোগ। আধুনিক পর্যটন শিল্পে দূরত্বের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সংযোগ। একজন পর্যটক জানতে চান, তিনি কত সহজে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন, কত কম সময়ে স্থান পরিবর্তন করতে পারবেন এবং যাত্রাপথে কতটা স্বাচ্ছন্দ্য পাবেন। বিশ্বের অধিকাংশ সফল পর্যটন কেন্দ্রের পেছনে রয়েছে উন্নত বিমানবন্দর, নির্ভরযোগ্য সড়ক যোগাযোগ, আধুনিক রেলব্যবস্থা এবং পর্যটকবান্ধব পরিবহন নেটওয়ার্ক। বাংলাদেশে অনেক সম্ভাবনাময় পর্যটন অঞ্চল এখনও যোগাযোগগত সীমাবদ্ধতার কারণে পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারেনি। কোথাও যাত্রাসময় অত্যধিক দীর্ঘ, কোথাও পরিবহন সেবার মান প্রত্যাশিত নয়, কোথাও পর্যটকের জন্য তথ্য ও দিকনির্দেশনার ব্যবস্থা দুর্বল। ফলে সম্পদ আছে, কিন্তু সহজ প্রাপ্যতা নেই।

তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ নিরাপত্তা। পর্যটনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা শুধু অপরাধ নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক আস্থার বিষয়।

আজকের বিশ্বে একজন পর্যটক কোনও গন্তব্য নির্বাচন করার আগে ইন্টারনেটে খোঁজ নেন, অভিজ্ঞতা পড়েন, নিরাপত্তা পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেন এবং ঝুঁকি বিবেচনা করেন। একটি নেতিবাচক সংবাদ বা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা কখনও কখনও হাজার কোটি টাকার প্রচারণাকেও ম্লান করে দিতে পারে। এই বাস্তবতায় পর্যটন নিরাপত্তা এখন একটি বিশেষায়িত বিষয়। পর্যটন পুলিশ, জরুরি সহায়তা ব্যবস্থা, পর্যটক তথ্যকেন্দ্র, স্মার্ট নজরদারি, দ্রুত প্রতিক্রিয়া ইউনিট এবং নির্দিষ্ট পর্যটন নিরাপত্তা অঞ্চল—এসব আন্তর্জাতিক পর্যটন শিল্পের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশকেও সেই বাস্তবতা মেনে এগোতে হবে।

চতুর্থত, সীমাবদ্ধতা বিনিয়োগ। পর্যটন অর্থনীতি মূলধননির্ভর একটি খাত। আন্তর্জাতিক মানের রিসোর্ট, মেরিনা, কনভেনশন সেন্টার, থিম পার্ক, পর্যটন নগরী, ক্রুজ টার্মিনাল কিংবা আধুনিক বিনোদন সুবিধা গড়ে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা শুধু সম্ভাবনার গল্প শুনে সিদ্ধান্ত নেন না। তারা দেখেন নীতির ধারাবাহিকতা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জমি ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ বাজারের স্থিতিশীলতা। বাংলাদেশের পর্যটন খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে একটি সুস্পষ্ট বার্তা দিতে হবে— এই খাত শুধু সম্ভাবনাময় নয়, এটি পরিকল্পিত, নিরাপদ এবং দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক।

পঞ্চম চ্যালেঞ্জ মানবসম্পদ। বিশ্ব পর্যটন শিল্পে একটি বহুল প্রচলিত কথা আছে—“Tourists remember experiences, not infrastructure.” অর্থাৎ পর্যটক অবকাঠামোর চেয়ে অভিজ্ঞতাকে বেশি মনে রাখেন। একজন পর্যটক একটি সুন্দর সমুদ্রসৈকত ভুলে যেতে পারেন, কিন্তু তিনি ভুলবেন না বিমানবন্দরে তার অভ্যর্থনা কেমন ছিল, হোটেলের কর্মীরা কীভাবে আচরণ করেছেন, গাইড কতটা দক্ষ ছিলেন কিংবা তিনি কতটা সম্মান ও সহযোগিতা পেয়েছেন। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পে এখনও দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি রয়েছে। আতিথেয়তা, ভাষাগত দক্ষতা, আন্তর্জাতিক সেবামান, পর্যটক ব্যবস্থাপনা এবং পেশাদার প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে আরও বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন।

ষষ্ঠত, এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং। আজ পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ “Amazing Thailand”, “Malaysia Truly Asia”, “Incredible India” কিংবা “Dubai” সম্পর্কে জানে। কারণ এসব দেশ শুধু পর্যটন উন্নয়ন করেনি; তারা নিজেদের গল্প বিশ্বকে শুনিয়েছে। বাংলাদেশ এখনও সেই গল্প বলার ক্ষেত্রে পিছিয়ে। কক্সবাজার বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত হওয়া সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে তার পরিচিতি সীমিত। সুন্দরবন বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হওয়া সত্ত্বেও অনেক বিদেশি পর্যটক জানেন না এটি মূলত বাংলাদেশের সম্পদ। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, লোকজ ঐতিহ্য এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বড় অংশ এখনওবৈশ্বিক পর্যটন বাজারে অদৃশ্য রয়ে গেছে।

ফলে আমাদের অনেক শক্তি এখনও অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়নি। তবে এই চিত্র হতাশার নয়। বরং আশাবাদের। কারণ বাংলাদেশের পর্যটন খাতের সমস্যাগুলো সম্পদের নয়; কাঠামোর। আমাদের যা প্রয়োজন তার অধিকাংশই আমাদের রয়েছে—সমুদ্র আছে, পাহাড় আছে, বন আছে, নদী আছে, ইতিহাস আছে, সংস্কৃতি আছে, তরুণ জনগোষ্ঠী আছে।।অর্থাৎ ভিত্তি প্রস্তুত।

যা প্রয়োজন তা হলো— সমন্বিত নীতি, দক্ষ প্রতিষ্ঠান, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং ধারাবাহিক বাস্তবায়ন।

বাংলাদেশের সামনে তাই মূল প্রশ্নটি আর সম্ভাবনার নয়। প্রশ্নটি সক্ষমতার। আমরা কি এমন একটি পর্যটন কাঠামো নির্মাণ করতে পারবো, যা প্রাকৃতিক সম্পদকে অর্থনৈতিক সম্পদে, সম্ভাবনাকে বাস্তবতায় এবং সৌন্দর্যকে সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করবে?

কারণ উন্নয়নের ইতিহাসে বিজয়ী হয়েছে তারা, যাদের সম্পদ সবচেয়ে বেশি ছিল বলে নয়; বরং যারা তাদের সম্পদকে সবচেয়ে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাতে পেরেছে। বাংলাদেশের পর্যটন খাতের সামনে এখন সেই পরীক্ষাই অপেক্ষা করছে। সম্ভাবনার গল্প আমরা বহু বছর শুনেছি। এখন সময় রূপান্তরের গল্প লেখার।

লেখক:  সামাজিক-রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামিস্ট, জীবন সদস্য, বাংলা একাডেমি