বিশ্ব পর্যটন শিল্প গত দুই দশকে এক মৌলিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। একসময় পর্যটন বলতে বোঝাতো দর্শনীয় স্থান দেখা, ছবি তোলা এবং কিছু দিনের জন্য পরিচিত পরিবেশের বাইরে সময় কাটানো। কিন্তু আজকের পর্যটক আগের সেই পর্যটক নয়।
আধুনিক বিশ্বের ভ্রমণপ্রত্যাশী মানুষ শুধু একটি স্থান দেখতে চায় না—সে জানতে চায় সেই স্থানের মানুষ, ইতিহাস, সংস্কৃতি, জীবনধারা এবং গল্প। সে শুধু একটি গন্তব্যে যায় না; সে একটি অভিজ্ঞতার অংশ হতে চায়।
এই পরিবর্তনই বিশ্ব পর্যটন শিল্পে ‘এক্সপেরিয়েন্স ইকোনমি’ বা অভিজ্ঞতা অর্থনীতির ধারণাকে শক্তিশালী করেছে। অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, আধুনিক ভোক্তা পণ্য কেনার চেয়ে অভিজ্ঞতা অর্জনে বেশি আগ্রহী। পর্যটন খাতে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট। একজন পর্যটক সমুদ্র দেখতে যায় না; সে সমুদ্রের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা জীবনকে জানতে চায়। পাহাড় দেখতে যায় না; সে পাহাড়ের মানুষের গল্প শুনতে চায়। একটি শহরে যায় না; সে সেই শহরের আত্মাকে অনুভব করতে চায়। এই কারণেই বর্তমান বিশ্বের সফল পর্যটন গন্তব্যগুলো আর কেবল প্রকৃতি বা স্থাপনা বিক্রি করে না; তারা গল্প বিক্রি করে।
বাংলাদেশের জন্য এই বাস্তবতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু কক্সবাজার, সুন্দরবন বা পার্বত্য চট্টগ্রাম নয়; আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো এসব স্থানকে ঘিরে থাকা অসংখ্য গল্প, ইতিহাস এবং মানবজীবনের বৈচিত্র্য।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ পর্যটন বিপণনে এই সত্য অনেক আগেই উপলব্ধি করেছে। থাইল্যান্ডের পর্যটন প্রচারণা লক্ষ করলে দেখা যায়, তারা শুধু সমুদ্র সৈকতের ছবি দেখায় না; তারা দেখায় থাই সংস্কৃতি, উৎসব, খাদ্য, হাসিমুখের মানুষ এবং স্থানীয় জীবনযাত্রার গল্প। ‘Amazing Thailand’ মূলত একটি সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। সিঙ্গাপুরও তাদের প্রচারণায় কেবল আকাশচুম্বী অট্টালিকা দেখায় না; তারা দেখায় উদ্ভাবন, সৃজনশীলতা, বহুসাংস্কৃতিক সমাজ এবং মানুষের স্বপ্নের গল্প। এসব দেশ বুঝতে পেরেছে যে মানুষ একটি দৃশ্যের জন্য হাজার মাইল পাড়ি দেয় না; সে একটি অনুভূতির জন্য ভ্রমণ করে।
বাংলাদেশের পর্যটন অর্থনীতির অন্যতম সীমাবদ্ধতা হলো আমরা এখনও নিজেদের গল্পগুলোকে বিশ্বমঞ্চে যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারিনি। অথচ আমাদের কাছে রয়েছে এমন অনেক সম্পদ, যা পৃথিবীর অন্য কোনও দেশে হুবহু খুঁজে পাওয়া যাবে না।
ভাবুন, সুন্দরবনকে আমরা কীভাবে বিশ্বের কাছে উপস্থাপন করি? সাধারণত বলি, এটি বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। তথ্যটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একজন বিদেশি পর্যটকের কাছে আরও আকর্ষণীয় হতে পারে সেই জেলেদের গল্প, যারা জোয়ার-ভাটার সঙ্গে জীবনযুদ্ধ করে। আরও আকর্ষণীয় হতে পারে বনজীবীদের কাহিনি, মধু সংগ্রহকারীদের জীবন কিংবা রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে ঘিরে মানুষের বিশ্বাস ও কিংবদন্তি।
একইভাবে কক্সবাজারকে আমরা প্রায়শই বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিই। কিন্তু এর পাশাপাশি রয়েছে জেলেপল্লির জীবন, উপকূলীয় সংস্কৃতি, সমুদ্রনির্ভর মানুষের সংগ্রাম এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান উপকূলীয় ঐতিহ্যের গল্প।
বাংলাদেশের নদীগুলোও শুধু নদী নয়; এগুলো একটি সভ্যতার ধারক। পদ্মা, যমুনা, মেঘনা কিংবা ব্রহ্মপুত্রকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জীবন, গান, সাহিত্য, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সংস্কৃতির গল্প বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা গেলে সেটি হতে পারে এক অনন্য পর্যটন সম্পদ।
আমাদের বাউল সংস্কৃতি, লালনের দর্শন, বৈষ্ণব ঐতিহ্য, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনধারা, পাহাড়ি সংস্কৃতি, পহেলা বৈশাখ, নবান্ন, গ্রামীণ মেলা কিংবা বাংলার লোকজ সংগীত— সবকিছুই আন্তর্জাতিক পর্যটনের ভাষায় একেকটি শক্তিশালী গল্প।
বিশ্বের বহু দেশ শত শত মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে যে ধরনের সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্মাণের চেষ্টা করে, তার অনেক উপাদান বাংলাদেশ প্রকৃতিগতভাবেই ধারণ করে আছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসও একটি বড় শক্তি। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং গণতন্ত্রের জন্য মানুষের আত্মত্যাগের ইতিহাস আন্তর্জাতিক পর্যটনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঐতিহাসিক স্মৃতি ও সংগ্রামকে কেন্দ্র করে বিশেষ পর্যটন গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশও সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।
ডিজিটাল যুগে গল্প বলার পদ্ধতিও বদলে গেছে। একসময় পর্যটন প্রচারণা সীমাবদ্ধ ছিল পোস্টার, টেলিভিশন বিজ্ঞাপন কিংবা ব্রোশিওরের মধ্যে। আজ একজন জনপ্রিয় ট্রাভেল ব্লগার বা ভ্লগারের একটি ভিডিও কয়েক মিলিয়ন মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। একটি ইনস্টাগ্রাম রিল, একটি ইউটিউব শর্টস কিংবা একটি টিকটক ভিডিও কোনও গন্তব্যকে রাতারাতি আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দিতে পারে।
তাই বাংলাদেশের পর্যটন বিপণনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উচিত কনটেন্টভিত্তিক স্টোরিটেলিং। শুধু ছবি নয়, গল্প। শুধু গন্তব্য নয়, অভিজ্ঞতা। শুধু স্থাপনা নয়, মানুষ। ‘Visit Bangladesh’ উদ্যোগের পরবর্তী ধাপ হওয়া উচিত হাজারো গল্পের বাংলাদেশকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা। আন্তর্জাতিক মানের ডকুমেন্টারি, ভ্রমণচিত্র, ডিজিটাল কনটেন্ট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রচারণা এবং বিদেশি কনটেন্ট নির্মাতাদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি জীবন্ত অভিজ্ঞতার গন্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব।
তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে—গল্প কৃত্রিমভাবে তৈরি করা যায় না। গল্প তৈরি হয় বাস্তবতা থেকে। ফলে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, সংস্কৃতির সংরক্ষণ, ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান এবং পর্যটকদের জন্য আন্তরিক আতিথেয়তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যটনের ভবিষ্যৎ মূলত সেইসব দেশের, যারা নিজেদের গল্প সবচেয়ে সুন্দরভাবে বলতে পারে। কারণ আধুনিক পর্যটক কেবল চোখ দিয়ে ভ্রমণ করে না; সে হৃদয় দিয়েও ভ্রমণ করে।
বাংলাদেশের সৌন্দর্য আছে, বৈচিত্র্য আছে, ইতিহাস আছে। এখন প্রয়োজন সেই সম্পদগুলোকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করার। আর সেই রূপান্তরের প্রথম শর্ত হলো নিজেদের গল্পগুলোকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দেওয়া। পর্যটন অর্থনীতির নতুন বাস্তবতায় তাই একটি বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে—পর্যটক শুধু কোনও স্থান দেখতে আসে না; সে একটি গল্পের অংশ হতে আসে। আর সেই কারণেই পর্যটন পণ্যের চেয়ে গন্তব্যের গল্পই বেশি বিক্রি হয়।
লেখক: সামাজিক-রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামিস্ট, জীবন সদস্য, বাংলা একাডেমি