পর্যটন অর্থনীতি-৪: উন্নয়নের দুই পূর্বশর্ত যোগাযোগ ও নিরাপত্তা

এই লেখার প্রথম পর্বে আমরা দেখেছি কেন পর্যটন অর্থনীতি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। দ্বিতীয় পর্বে আলোচনা করেছি বাংলাদেশের অদেখা পর্যটন সম্পদ নিয়ে। তৃতীয় পর্বে খুঁজেছি সেই প্রশ্নের উত্তর, এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কেন আমরা কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারিনি। সেই আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপসংহার ছিল, বাংলাদেশের প্রধান সংকট সম্পদের নয়, কাঠামোর। আর সেই কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি ভিত্তি হলো যোগাযোগ ও নিরাপত্তা।

বিশ্বের পর্যটন ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোনো দেশ শুধু সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্যের কারণে আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হয়নি। প্রকৃতি পর্যটনের কাঁচামাল দিতে পারে, কিন্তু পর্যটন অর্থনীতি তৈরি করে মানুষ, পরিকল্পনা এবং রাষ্ট্র। প্রশ্নটি সহজ। একজন পর্যটক যদি কোনো গন্তব্যে সহজে পৌঁছাতে না পারেন কিংবা সেখানে নিজেকে নিরাপদ মনে না করেন, তাহলে সেই গন্তব্যের সৌন্দর্যের মূল্য কতটুকু?

অর্থনীতির ভাষায় বলা যায়, পর্যটন সম্পদের অর্থনৈতিক মূল্য নির্ভর করে তার একসেসিবিলিটি এবং সিকিউরিটির ওপর। অর্থাৎ পর্যটক সেখানে কত সহজে পৌঁছাতে পারবেন এবং কতটা নিরাপদ অনুভব করবেন। এই দুই উপাদান ছাড়া পর্যটন শিল্পের বাকি সব বিনিয়োগ অনেকাংশেই অপূর্ণ থেকে যায়।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম) ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স বারবার দেখিয়েছে, পরিবহন অবকাঠামো, নিরাপত্তা এবং পর্যটকবান্ধব পরিবেশ আন্তর্জাতিক পর্যটন প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান সূচক। অর্থাৎ পর্যটনের ক্ষেত্রে যোগাযোগ ও নিরাপত্তা কোনো সহায়ক বিষয় নয়, এগুলোই মূল ভিত্তি।

বাংলাদেশের জন্য এই বাস্তবতা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের অধিকাংশ প্রধান পর্যটন গন্তব্য রাজধানী ঢাকা থেকে দূরে অবস্থিত। কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সুন্দরবন, বান্দরবান, রাঙামাটি, সেন্ট মার্টিন, সিলেট কিংবা হাওরাঞ্চল, প্রতিটি গন্তব্যের সাফল্য নির্ভর করবে পর্যটক কত সহজে সেখানে পৌঁছাতে পারেন তার ওপর।

একজন বিদেশি পর্যটকের বাংলাদেশ-অভিজ্ঞতা শুরু হয় বিমানবন্দর থেকে। তিনি যখন একটি দেশ নির্বাচন করেন, তখন শুধু গন্তব্যের সৌন্দর্য দেখেন না; তিনি ভিসা প্রক্রিয়া, বিমান যোগাযোগ, অভিবাসন ব্যবস্থা, পরিবহন সুবিধা এবং সামগ্রিক ভ্রমণ-সহজতাও বিবেচনা করেন। এই কারণেই সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দর, দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কিংবা মালদ্বীপের ভেলানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর শুধু পরিবহন অবকাঠামো নয়; এগুলো নিজেই পর্যটন ব্র্যান্ডের অংশ।

একজন পর্যটক যখন বিমান থেকে নামেন, তখন প্রথম কয়েক ঘণ্টার অভিজ্ঞতাই অনেক সময় তার পুরো সফরের মানসিক কাঠামো তৈরি করে দেয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে শুধু যাত্রী পরিবহনের কেন্দ্র হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলোকে পর্যটন প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

ঢাকার পাশাপাশি কক্সবাজার, সিলেট এবং চট্টগ্রামকে আন্তর্জাতিক পর্যটন হাব হিসেবে উন্নয়ন করা গেলে পর্যটনের ভৌগোলিক বিস্তার অনেক দ্রুত ঘটতে পারে। সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট, দ্রুত অভিবাসন সেবা, বহুভাষিক তথ্যকেন্দ্র এবং ডিজিটাল সহায়তা ব্যবস্থা এখন আর বিলাসিতা নয়; এগুলো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার অপরিহার্য শর্ত।

তবে বিমানবন্দরই পুরো গল্প নয়। একজন পর্যটক কক্সবাজারে পৌঁছানোর পর যদি দীর্ঘ যানজটে আটকে যান, পাহাড়ি অঞ্চলে যেতে যদি ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহার করতে হয় কিংবা দ্বীপাঞ্চলে যেতে যদি অনিশ্চিত নৌপরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হয়, তাহলে তাঁর অভিজ্ঞতা দ্রুত নেতিবাচক হয়ে উঠতে পারে। আধুনিক পর্যটন শিল্পে গন্তব্যের সৌন্দর্যের পাশাপাশি যাত্রার স্বাচ্ছন্দ্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

স্পেন তাদের উচ্চগতির রেলব্যবস্থাকে পর্যটন উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করেছে। থাইল্যান্ড পর্যটন করিডোর গড়ে তুলেছে। জাপান অভ্যন্তরীণ পরিবহনকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে পর্যটকরা অনায়াসে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যেতে পারেন। এই অভিজ্ঞতাগুলো একটি বিষয় স্পষ্ট করে, যোগাযোগে বিনিয়োগ আসলে পর্যটন অর্থনীতিতে বিনিয়োগ।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কক্সবাজার-কেন্দ্রিক উপকূলীয় পর্যটন করিডোর, চট্টগ্রাম-পার্বত্যাঞ্চল সংযোগ, সিলেট-হাওর পর্যটন রুট এবং সুন্দরবনভিত্তিক নৌপর্যটন নেটওয়ার্ক পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা গেলে দেশের পর্যটন অর্থনীতির চিত্র বদলে যেতে পারে। কিন্তু যোগাযোগ যতই উন্নত হোক, নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে পর্যটনের ভিত্তি কখনো শক্তিশালী হয় না।

আন্তর্জাতিক পর্যটন শিল্পে একটি অঘোষিত নিয়ম আছে, ‘পারসেপশন ইজ রিয়েলিটি।’ অর্থাৎ একজন পর্যটক কোনো গন্তব্যকে যতটা নিরাপদ মনে করেন, সেটিই তার কাছে বাস্তবতা। তিনি হয়তো কোনো দেশের অপরাধ পরিসংখ্যান জানেন না, কিন্তু তিনি জানতে চান সেখানে নিরাপদে চলাফেরা করা যাবে কি না, জরুরি অবস্থায় সহায়তা পাওয়া যাবে কি না এবং কোনো সমস্যায় পড়লে কর্তৃপক্ষ তার পাশে থাকবে কি না। এই আস্থাই পর্যটনের সবচেয়ে বড় মূলধন।

বিশ্বের বিভিন্ন উদাহরণ দেখায়, নিরাপত্তাজনিত একটি বড় ঘটনা কখনো কখনো বহু বছরের প্রচারণা ও বিনিয়োগকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। আবার শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা একটি দেশকে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে আস্থার প্রতীকে পরিণত করতে পারে। বাংলাদেশের জন্য তাই নিরাপত্তাকে পর্যটন নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে।

পর্যটন পুলিশ প্রতিষ্ঠা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। কিন্তু ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ আরও বড়। পর্যটন নিরাপত্তাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে হবে, যেখানে আইনশৃঙ্খলা, প্রযুক্তি, জরুরি সেবা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা একসঙ্গে কাজ করবে।

আমি পূর্ববর্তী আলোচনাগুলোতে ট্যুরিজম সিকিউরিটি জোন (টিএসজি)-এর ধারণা উত্থাপন করেছি। নির্দিষ্ট পর্যটন অঞ্চলকে বিশেষ নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় এনে সেখানে পর্যটন পুলিশ, স্মার্ট নজরদারি, জরুরি প্রতিক্রিয়া ইউনিট, পর্যটক সহায়তা কেন্দ্র এবং প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। বিশেষ করে কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সেন্ট মার্টিন, সুন্দরবন, সিলেট এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো অঞ্চলে এ ধরনের ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আস্থা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ, রিয়েল-টাইম সিসিটিভি মনিটরিং, ড্রোন নজরদারি, ডিজিটাল পর্যটক সহায়তা ব্যবস্থা এবং সমন্বিত কমান্ড সেন্টার এখন বিশ্বের বহু পর্যটন অঞ্চলে ব্যবহৃত হচ্ছে।

সিঙ্গাপুরের স্মার্ট সিটি মডেল, দুবাইয়ের সমন্বিত নিরাপত্তা কাঠামো এবং থাইল্যান্ডের পর্যটন নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখায়, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদের সমন্বয়ই ভবিষ্যতের পথ। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-সংবেদনশীল দেশের জন্য নিরাপত্তার আরেকটি মাত্রা রয়েছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা।

ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, পাহাড়ধস কিংবা আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে দ্রুত সতর্কতা, উদ্ধার ব্যবস্থা এবং পর্যটক সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি আধুনিক পর্যটন কাঠামোর অপরিহার্য অংশ। কারণ একজন পর্যটক তখনই স্বস্তি অনুভব করেন, যখন তিনি জানেন যে সংকটের মুহূর্তে একটি নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা তার পাশে রয়েছে।

আসলে যোগাযোগ ও নিরাপত্তা আলাদা দুটি বিষয় নয়; তারা একে অপরের পরিপূরক। উন্নত সড়ক জরুরি সেবাকে দ্রুত পৌঁছাতে সাহায্য করে। আধুনিক বিমানবন্দর নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করে। স্মার্ট অবকাঠামো নজরদারি সক্ষমতা বাড়ায়। প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থা সংকট মোকাবিলাকে সহজ করে। অর্থাৎ একটি উপাদান অন্যটিকে শক্তিশালী করে।

বাংলাদেশ যদি সত্যিই পর্যটনকে একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক খাতে পরিণত করতে চায়, তাহলে যোগাযোগ ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ পর্যটক প্রথমে আসতে চান, তারপর থাকতে চান। আসার জন্য প্রয়োজন সহজ যোগাযোগ। থাকার জন্য প্রয়োজন নিরাপত্তা। এই দুই ভিত্তি শক্তিশালী না হলে পর্যটনের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো টেকসই অর্থনীতি নির্মাণ করা সম্ভব নয়।

তাই বাংলাদেশের পর্যটন উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ শুধু নতুন হোটেল, রিসোর্ট বা বিনোদন কেন্দ্র নির্মাণ নয়; বরং একটি নিরাপদ, সংযুক্ত এবং আস্থাভিত্তিক পর্যটন পরিবেশ গড়ে তোলা। কারণ শেষ পর্যন্ত পর্যটনের সাফল্য নির্ধারণ করে শুধু কোনো স্থানের সৌন্দর্য নয়, সেখানে পৌঁছানোর সহজতা এবং সেখানে অবস্থানের নিরাপত্তা। আর সেই কারণেই যোগাযোগ ও নিরাপত্তা পর্যটন উন্নয়নের দুটি পূর্বশর্ত নয় শুধু, বরং পুরো পর্যটন অর্থনীতির ভিত্তিপ্রস্তর।

লেখক: সামাজিক-রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামিস্ট, জীবন সদস্য, বাংলা একাডেমি