সরকারের প্রথম ছয় মাস: অর্থনীতির অগ্রগতি ও অপূর্ণ কাজ

বর্তমান সরকার এমন একটি অর্থনীতি পেয়েছিল, যেটি ছিল অত্যন্ত দুর্বল। ফেব্রুয়ারি মাসে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় অর্থনীতির গতি ছিল ধীর, মূল্যস্ফীতি ছিল বেশি এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ছিল দুর্বল। ব্যাংক খাত খেলাপি ঋণসহ নানা সংকটে ছিল এবং রাজস্ব আয়ও ছিল কম। বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণদের জন্য কাজের সুযোগ সীমিত ছিল। ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায় এবং ব্যবসায়িক আস্থাও দুর্বল ছিল। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, ব্যাংকিং, রাজস্ব ও কর্মসংস্থানে বড় ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতা ছিল।

বিএনপির ইশতেহারে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার, সামাজিক সুরক্ষা এবং কর্মসংস্থান—এই বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে কর্মসংস্থান এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে চাকরি সৃষ্টির অঙ্গীকার ছিল। নিম্ন আয়ের পরিবারকে সহায়তার জন্য নারীর নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং কৃষকদের জন্য ‘ফার্মার কার্ড’ দেওয়ার কথা বলা হয়। কৃষিঋণ মওকুফ, ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুপুরের খাবার চালুর প্রতিশ্রুতিও ছিল। অর্থনৈতিক অঙ্গীকারের মধ্যে ছিল বন্ধ শিল্পকারখানা চালু, ‘মেক ইন বাংলাদেশ’ উদ্যোগ, রফতানি বহুমুখীকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ ও কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণ। পাশাপাশি যুব দক্ষতা ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন, দুর্নীতি দমন, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং ব্যবসার নিয়মকানুন সহজ করার অঙ্গীকার করা হয়।

অঙ্গীকারগুলো উচ্চাভিলাষী এবং সেগুলোর বেশির ভাগই প্রথম ছয় মাসে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তবে সরকারকে প্রতিটি অঙ্গীকারের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। প্রয়োজনীয় বাজেট, বাস্তবায়নকারী সংস্থা, অর্থের উৎস ও নির্দিষ্ট সময়সীমা স্পষ্ট করা জরুরি। একই সঙ্গে নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে, যাতে জনগণ বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে জানতে পারে।  অবশ্য সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র তিন মাসের মধ্যে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করেছে, যা একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন। সীমিত সময় ও কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে এ কাজ সম্পন্ন করা সহজ ছিল না। বাজেটে ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার কার্ড, যুবঋণ, কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ উৎসাহিত করার মতো কয়েকটি নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে এসব বরাদ্দের সময়মতো ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।

সরকারের প্রথম ছয় মাসে বেশ কিছু ইতিবাচক লক্ষণ দেখা গেছে। নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠার ফলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে। রেমিট্যান্স বৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে এবং মূল্যস্ফীতিও কিছুটা কমেছে, যদিও বাজারে এখনো বড় স্বস্তি আসেনি। সরকার বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে বিভিন্ন অগ্রাধিকারমূলক উদ্যোগ ঘোষণা করেছে। নতুন বাজেটে ব্যবসার নিয়ম সহজ করা এবং স্টার্টআপ, স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও উৎপাদনমুখী কয়েকটি খাতে করসুবিধা দেওয়া হয়েছে। তবে বিনিয়োগের আস্থা ফেরাতে আইনের শাসন, নীতির ধারাবাহিকতা ও ব্যবসার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

সরকার ব্যাংক রেজল্যুশন কাঠামোর আওতায় দুর্বল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, সম্পদের মান যাচাই এবং তদারকি জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে। পুঁজিবাজারে তথ্য প্রকাশ ও কয়েকটি বিধি সংস্কার করা হলেও সুশাসন ও বিনিয়োগকারীর আস্থা এখনো দুর্বল। বিনিয়োগ সহজ করা, কারখানা পুনরায় চালু, যুবঋণ, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে । তবে দৃশ্যমান ফল পেতে আরো অপেক্ষা করতে হবে। জ্বালানি আমদানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের মাধ্যমে সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও দক্ষ সঞ্চালনব্যবস্থার জন্য মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

আগামী ছয় মাসে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও কমানো এবং নিম্ন আয়ের মানুষকে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়া। শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা নিতে হবে। ব্যংক খাতের সংস্কার চালিয়ে যেতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়, ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি নিরূপণ এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর সময়বদ্ধ পুনর্গঠন চালাতে হবে। চাঁদাবাজি, দখল, আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা ও নীতির অনিশ্চয়তা কমিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে হবে।

পুঁজিবাজারে কারসাজির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে, ভালো কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করতে হবে এবং আর্থিক প্রতিবেদনের মান নিশ্চিত করতে হবে। করজাল সম্প্রসারণ, কর-ছাড় পর্যালোচনা এবং কর প্রশাসন ডিজিটাল করার মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়ানো প্রয়োজন। কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতির বিপরীতে নিয়মিত যাচাইযোগ্য অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ করা উচিত। ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার কার্ডের উপকারভোগী নির্বাচনে জাতীয় সামাজিক নিবন্ধন, ডিজিটাল অর্থ প্রদান এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা রাখতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার বরাদ্দ সময়মতো ও কার্যকরভাবে ব্যয় করতে হবে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ সামনে রেখে রফতানি বহুমুখীকরণ, বাণিজ্য চুক্তি, উৎপাদনশীলতা ও শ্রমমান উন্নয়নের কাজও দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে।

উন্নয়ন ব্যয় অর্থায়নে অতিরিক্ত ব্যাংকঋণ নিলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তি কমতে পারে এবং বেশি বৈদেশিক ঋণ ভবিষ্যতে পরিশোধের চাপ বাড়ায়। তাই রাজস্ব বৃদ্ধি সবচেয়ে টেকসই পথ। করহার না বাড়িয়ে করের আওতা বাড়াতে হবে এবং আয় থাকা সত্ত্বেও কর না দেওয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে করজালে আনতে হবে। জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তি, গাড়ি ও কোম্পানি নিবন্ধনের তথ্য সমন্বয় করা প্রয়োজন। অপ্রয়োজনীয় কর-ছাড় কমানো, ই-চালান, ই-ইনভয়েস ও ডিজিটাল অডিট সম্প্রসারণ করতে হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের লোকসান, প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি ক্রয়ে অপচয় কমাতে হবে। রাজস্ব আদায়ের অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করাও জরুরি।

শিক্ষিত যুবকদের জন্য সরকার যুবঋণ, দক্ষতা উন্নয়ন, আইসিটি ও স্টার্টআপে সহায়তা, কারখানা পুনরায় চালু এবং বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এগুলোর অধিকাংশই প্রাথমিক পর্যায়ে এবং কতটি চাকরি সৃষ্টি হয়েছে, তার নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। কর্মসংস্থান বাড়াতে খাত, অঞ্চল ও সময়ভিত্তিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। শিক্ষা ও শিল্পের মধ্যে সংযোগ, বেতনসহ শিক্ষানবিশি এবং প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক দক্ষতা বাড়াতে হবে। কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, স্বাস্থ্যসেবা, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং জেলা পর্যায়ে কাজের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। তরুণ উদ্যোক্তাদের ঋণের পাশাপাশি বাজার, প্রযুক্তি ও পরামর্শ সহায়তাও দিতে হবে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ ও নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)