সরকারের কাছে প্রত্যাশা

বদিউল আলম মজুমদার
১২ মার্চ ২০২৬, ১৪:০১আপডেট : ১৩ মার্চ ২০২৬, ১৪:০০

যদিও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কিছু প্রশ্ন রয়েছে, তবুও সবাই এই সরকারকে মেনে নিয়েছে। আমরা সরকারকে স্বাগত জানাই, অভিনন্দন জানাই এবং তাদের সাফল্য কামনা করি।

দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে নতুন সরকারের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। জাতির কাছে তাদের অনেক অঙ্গীকারও আছে। কিছু সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার পূরণে সরকার ইতোমধ্যে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। আশা করি, তারা তাদের অগ্রাধিকার ঠিক করে দ্রুত কাজে মনোনিবেশ করবে এবং সাফল্য অর্জন করবে।

এক্ষেত্রে সরকার যদি প্রথম ১৮০ দিনের একটি স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারে, তবে সাধারণ মানুষ তাদের সব কাজে সহযোগিতা করবে। ২০২৭ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কোন বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এবং বাস্তবায়ন করা হবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। পাঁচ বছরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি বার্ষিক বা ছয় মাসের ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করা জরুরি। তাহলে পরিকল্পনাগুলো সুচারুভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। তবে পরিকল্পনা করলেই হবে না, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদও নিশ্চিত করতে হবে। অর্থের উৎস চিহ্নিত করে তা আহরণের পথ খুঁজে বের করতে হবে।

বর্তমানে আমরা একটি জটিল ও জরুরি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বা বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে আমাদের অর্থনীতি কোন দিকে যাচ্ছে এবং এর সম্ভাব্য প্রভাব কী হতে পারে—এসব বিষয় নিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে। সংকট মোকাবিলায় বিকল্প পরিকল্পনাও তৈরি রাখতে হবে। এমনিতেই আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা অনেকটা স্থবির ছিল, যদিও ব্যাংকিং খাতে কিছুটা স্থিতিশীলতা এসেছে।

বেসরকারি খাতে দেশীয় বিনিয়োগ বহু বছর ধরে স্থবির রয়েছে। এটি বৃদ্ধি করতে হবে। বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান যেমন বাড়বে, তেমনি নতুন আয়ের উৎসও তৈরি হবে। তাই স্থবির অর্থনীতিকে সচল করা এবং কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও আমাদের অনেক দায় রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ে অনেক সমালোচনা থাকলেও নানা জটিলতার মধ্যেও তারা কিছু দায় পরিশোধ করে গেছে।

আমাদের ওপর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ঋণের বড় বোঝা রয়েছে। এসব ঋণ কীভাবে পরিশোধ করা হবে, তা একটি জটিল বিষয়। অতীতে কিছু চুক্তি বা প্রকল্প একতরফাভাবে বা দুর্নীতির মাধ্যমে করা হয়েছে, যেগুলোতে বিশেষ কিছু পক্ষ অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়েছে। এসব চুক্তি নিয়ে সরকারকে নতুন করে আলোচনা করতে হবে। প্রয়োজনে কিছু চুক্তি বাতিলও করতে হতে পারে।

দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়ে গেছে। পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা সহজ নয়। তবে এ বিষয়ে যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া শুরু হয়েছে, সেগুলো অব্যাহত রাখতে হবে।

অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, দলীয়করণ আমাদের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়েছে। এখন সময় এসেছে মেধার ভিত্তিতে প্রশাসন পরিচালনার। মানুষের কল্যাণে কাজ করবে—এমন দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব দিতে হবে, যারা কোনও ব্যক্তি বা দলের স্বার্থে নয়, রাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করবেন।

 

সরকারের কিছু সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। যেমন—বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে অপসারণ, মেট্রোরেল প্রকল্প থেকে আন্তর্জাতিকভাবে অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে বাদ দেওয়া কিংবা সিটি করপোরেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

অনুগত কিন্তু অযোগ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসালে এর মাশুল শুধু দল নয়, পুরো জাতিকেই দিতে হয়। তাই নিয়োগ ও পদায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আনুগত্যের চেয়ে যোগ্যতা ও মেধাকে প্রাধান্য দেওয়া জরুরি।

তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এজন্য তাদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে এবং কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। কিন্তু এখানে দুটি বড় বাধা রয়েছে। প্রথমত, আমাদের দেশে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। জ্ঞান-বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিশ্বমানের কোনও প্রতিষ্ঠানও নেই।

ভবিষ্যতের অর্থনীতি অনেকাংশে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর হবে। কিন্তু তথাকথিত ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি, শ্রমিক রাজনীতি এবং অতিরিক্ত রাজনৈতিক প্রভাব অনেক সময় অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তরুণদের রাজনীতির বাইরে থেকে গবেষণা ও জ্ঞান অর্জনের দিকে মনোযোগী হতে হবে। তাদের জীবিকা অর্জনের পথ হতে হবে উৎপাদন ও সৃজনশীল কাজ, চাঁদাবাজি বা অন্য কোনও অপপথ নয়।

বর্তমানে দেশে তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা অনেক বেশি। এই তরুণদের সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে দেশ এগিয়ে যাবে এবং অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। তাই তরুণদের কীভাবে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা যায়, সে বিষয়ে সরকারের আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

সরকার নির্বাচনের আগে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড একটি। এই ফ্যামিলি কার্ড কীভাবে সুষমভাবে জনগণের মধ্যে বিতরণ করা যায়, তার একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।

এ সরকারের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ। বৈশ্বিক রাজনীতি ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ইতোমধ্যে বাজারে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও জড়িত। দ্রব্যমূল্য কমাতে হলে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, সরবরাহ ব্যবস্থার জটিলতা কমাতে হবে এবং উৎপাদন বাড়াতে হবে। তরুণদের উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে হবে।

ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের অন্যায় ও অপরাধ দমনে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সক্ষম হতে হবে।

সরকারকে পরিবেশের দিকেও নজর দিতে হবে। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের প্রভাব আমাদের পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। পরিবেশ ঠিক না থাকলে উন্নয়নের সব অর্জনই ঝুঁকির মুখে পড়বে।

১৬–১৭ বছর পর দেশে একটি সুন্দর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠিত হয়েছে এবং একটি বিরোধী দলও এসেছে। বিরোধী দলও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অংশ। এখন আমাদের সামনে দুটি পথ রয়েছে—আমরা হয় তাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে পারি, অথবা শুরু থেকেই বৈরী সম্পর্ক ও বিভক্তির পরিবেশ তৈরি করতে পারি। সম্পর্ক বৈরী হবে নাকি সমঝোতা ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা হবে—এটা শুরু থেকেই স্পষ্ট করা উচিত। আমার মনে হয়, বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে সমস্যার সমাধান করা সরকারের জন্য ইতিবাচক দিক হবে।

সংস্কার, জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোট নিয়ে যে বিরোধ বা দ্বিমত এখন দেখা যাচ্ছে, তা অনেকটাই অপ্রয়োজনীয়। দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের মতামত দিয়েছে। তাই এসব বিষয় মাথায় রেখে এগোনো উচিত। এগুলো নিয়ে দ্বন্দ্ব বা হানাহানি সৃষ্টি করা কারও জন্যই ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না।

আমাদের দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো করা দরকার। সরকার সিটি করপোরেশনগুলোতে যে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে, তা নিয়েও ইতোমধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়াই উচিত। আমাদের দেশে প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থা না থাকায় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচন এখন জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো মাদক। মাদক নিয়ন্ত্রণ এই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। মাদক আমাদের তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংস করছে এবং এর কারণে প্রতিদিন নানা ধরনের অপরাধ ঘটছে। মাদক নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সমাজ ও তরুণদের জন্য তা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

সবশেষে, এই সরকারের জন্য শুভকামনা রইল। আশা করি, সরকার প্রজ্ঞা ও সাহসিকতার সঙ্গে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেশের সমস্যাগুলোর সমাধানের চেষ্টা করবে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, রাজনীতি বিশ্লেষক, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও উন্নয়নকর্মী

/এম/  

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বিএনপি শুধু গণভোটকে অস্বীকার নয়, তাদের ৩১ দফা অঙ্গীকারও মানছে না: আখতার হোসেন
বিএনপি শুধু গণভোটকে অস্বীকার নয়, তাদের ৩১ দফা অঙ্গীকারও মানছে না: আখতার হোসেন
যমজ দুই বোনের সাফল্য দেখে গর্বিত বাবা-মা, খুশি শিক্ষকরা
যমজ দুই বোনের সাফল্য দেখে গর্বিত বাবা-মা, খুশি শিক্ষকরা
খাল খনন শেষে ৬৪ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিলেন ইউএনও
খাল খনন শেষে ৬৪ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিলেন ইউএনও
‘দুই দিন ধরে খাইনি, ভাত নিয়ে আসো’ বলার পর অসুস্থ যুবককে পিটিয়ে হত্যা
‘দুই দিন ধরে খাইনি, ভাত নিয়ে আসো’ বলার পর অসুস্থ যুবককে পিটিয়ে হত্যা
সর্বশেষসর্বাধিক