রাজধানীর অভিজাত হোটেলের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মিলনায়তনে উজ্জ্বল আলো, চকচকে ব্যানার আর সুস্বাদু খাবারের আয়োজন। মঞ্চে বসে আছেন উন্নয়ন খাতের দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ, সরকারি কর্মকর্তা ও দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরা। বক্তব্যের পর বক্তব্যে ঘুরেফিরে একটি শব্দবন্ধ বারবার উচ্চারিত হচ্ছে—‘সিস্টেম শক্তিশালীকরণ’। গত এক দশকে বাংলাদেশের উন্নয়ন অঙ্গনে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা, জাতিসংঘ সংস্থা, উন্নয়ন ব্যাংক কিংবা দ্বিপক্ষীয় দাতা গোষ্ঠীগুলোর যেকোনও প্রস্তাবনা, বার্ষিক প্রতিবেদন কিংবা সেমিনারের সবচেয়ে জনপ্রিয় অলংকার হয়ে উঠেছে এই পরিভাষাটি।
কিন্তু ঝলমলে হোটেলের হলরুম থেকে বেরিয়ে যখন প্রত্যন্ত চরাঞ্চল, উপকূলীয় জনপদ, হাওর এলাকা বা প্রান্তিক শহরের সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কৃষি সম্প্রসারণ অফিস ও প্রশাসনিক দফতরে নজর দেওয়া যায়, তখন এক নিদারুণ বৈপরীত্য চোখে পড়ে। সেখানে দেখা যায়, দুই দিনের একটি কর্মশালা আয়োজন করে, গোটা তিনেক কম্পিউটার সরবরাহ করে, কিছু সচেতনতামূলক পথনাটক পরিবেশন করে, অথবা হাজারখানেক পরিবারের মাঝে অস্থায়ীভাবে ত্রাণ বা জীবনজীবিকার উপকরণ বিতরণ করেই দাতা সংস্থার রিপোর্টে সানন্দে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে—ব্যবস্থা বা সিস্টেমের নাকি আমূল পরিবর্তন ঘটে গেছে।
আমরা কি আদৌ অনুধাবন করতে পারছি যে, ‘সিস্টেম শক্তিশালীকরণ’ বলতে প্রকৃতপক্ষে কী বোঝায়? নাকি মেয়াদি অনুদান পাওয়ার চটকদার কৌশল হিসেবে একটি সুগভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ ধারণাকে শুধু একটি সস্তা স্লোগানেই পরিণত করা হয়েছে?
চাকা ঘোরে, কিন্তু এগোয় না
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন কেন্দ্রের অধ্যাপক ম্যাট অ্যান্ড্রুজ, ল্যান্ট প্রিটচেট এবং মাইকেল উলকক তাঁদের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকে প্রকাশিত যুগান্তকারী গবেষণা গ্রন্থ ‘বিল্ডিং স্টেট ক্যাপাবিলিটি: এভিডেন্স, অ্যানালাইসিস, অ্যাকশন’ (২০১৭)-কে ‘আইসোমরফিক মিমিট্রি’ বা রূপগত অনুকরণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাদের মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যখন কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ভেতর থেকে দুর্বল থাকে, তখন বাইরের অনুদানপুষ্ট সংস্থাগুলো আসল সমস্যার মূল উপড়ানোর বদলে একটি সফল কাঠামোর বহিরাঙ্গন বা রূপটি হুবহু নকল করে। এতে সাময়িকভাবে মনে হয়— যেন একটি আধুনিক ও দক্ষ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, কিন্তু ভেতরে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা থাকে শূন্যের কোঠায়। ফলে জন্ম নেয় একটি চিরস্থায়ী ‘অক্ষমতার ঘূর্ণাবর্ত’। প্রকল্প চলাকালীন আন্তর্জাতিক অর্থায়নে সবকিছু সচল মনে হলেও, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়া মাত্রই পুরো ব্যবস্থা আবার আগের মতো ভঙ্গুর ও অকার্যকর অবস্থায় ফিরে যায়।
বাংলাদেশের কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য বা স্থানীয় সরকার খাতে গত তিন দশকের প্রকল্পের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে হার্ভার্ডের এই গবেষণার করুণ সত্যতা প্রমাণিত হয়। আমরা বছরের পর বছর সরকারি কর্মকর্তাদের একই বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ দিচ্ছি, প্রকল্পের সূচক পূরণ করছি এবং দিনশেষে জাঁকজমকপূর্ণ চূড়ান্ত মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করছি। কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য অধিকার হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক সেবা পাওয়ার ব্যবস্থাটি আগের মতোই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অদক্ষতায় বন্দি হয়ে আছে।
উন্নয়ন দর্শনের সংকট
অমর্ত্য সেন তার কালজয়ী গ্রন্থ ‘ডেভেলপমেন্ট অ্যাজ ফ্রিডম’ (১৯৯৯)-এ স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, উন্নয়ন কোনও সাময়িক দ্রব্যাদি হস্তান্তর বা মেয়াদি সাহায্যের খেলা হতে পারে না। উন্নয়ন হলো মানুষের মৌলিক সামর্থ্যের বিকাশ ঘটানো এবং এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ তৈরি করা যেখানে নাগরিক তার অধিকার ও স্বাধীনতা নিয়ে বাঁচতে পারে। সাময়িক অনুগ্রহ দিয়ে কখনোই নাগরিক অধিকারের টেকসই কাঠামো তৈরি করা যায় না।
একইভাবে অংশগ্রহণমূলক উন্নয়নের পথিকৃৎ রবার্ট চেম্বার্স তার ‘হুজ রিয়ালিটি কাউন্টস? পুটিং দ্য ফার্স্ট লাস্ট’ (১৯৯৭) গ্রন্থে উন্নয়ন খাতের ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া মনস্তাত্ত্বিক প্রভুত্বকে তীব্র আক্রমণ করেছেন। চেম্বার্সের মতে, বাইরের বিশেষজ্ঞরা যখন নিজেদের ধারণাগত মডেল আর অল্প দিনের ইভেন্ট দিয়ে স্থানীয় সমাজকে ‘উন্নত’ করতে যান, তখন মূল প্রাতিষ্ঠানিক মালিকানা ধ্বংস হয়ে যায়।
প্রকল্পের বাস্তব ব্যর্থতা
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের জলবায়ু- ঝুঁকিপূর্ণ হাওর ও উপকূলীয় অঞ্চলে দারিদ্র্য বিমোচন ও জলবায়ু অভিযোজনের নামে গত দুই দশকে শত শত কোটি টাকার মেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। এসব প্রকল্পের আওতায় গৃহহীন পরিবারগুলোর মাঝে জলবায়ু-সহনশীল গবাদিপশু বিতরণ করা হয়েছে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার উপকরণ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রকল্প শেষ হওয়ার দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে প্রায় অর্ধেকেরও বেশি পরিবার আবার পূর্বের দরিদ্র অবস্থায় ফিরে গেছে এবং গবাদিপশু বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছে।
এর কারণ অত্যন্ত পরিষ্কার। প্রকল্পগুলো কেবল সম্পদ বিতরণ আর কয়েকটি দল গঠন করেই তাদের কাজ শেষ করেছে। কিন্তু স্থানীয় কৃষি ও প্রাণিসম্পদ দফতরের সম্প্রসারণ সেবার সাথে এই পরিবারগুলোর স্থায়ী সংযোগ তৈরি করা, বাজারজাতকরণের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খল গড়ে তোলা, কিংবা জাতীয় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির রাজস্ব বাজেটে এদের স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত করার মতো মূল পদ্ধতিগত বা সিস্টেমিক কাজগুলো করা হয়নি। ফলে শত শত কোটি টাকার অনুদান ক্ষণস্থায়ী ত্রাণ হিসেবেই শেষ হয়ে গেছে, কোনও স্থায়ী রূপান্তর আনতে পারেনি।
স্বাস্থ্য ও পুষ্টি খাতের চিত্রও একই রকম। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিকিৎসা-নৃতত্ত্ববিদ ও হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের প্রয়াত অধ্যাপক পল ফার্মার তাঁর ‘প্যাথোলজিস অব পাওয়ার’ (২০০৩) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, কীভাবে ক্ষণস্থায়ী মেয়াদি স্বাস্থ্য ও পুষ্টি প্রকল্পগুলো কোনও দেশের মূল জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে আরও দুর্বল করে ফেলে।
বাংলাদেশে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা যখন দাতাসংস্থার অর্থায়নে নিজস্ব কর্মী দিয়ে সমান্তরালভাবে পুষ্টি উপাদান বিতরণ বা স্বাস্থ্যসেবা পরিচালনা করে, তখন সাময়িকভাবে কিছু মানুষ সুবিধা পায় সত্য, কিন্তু স্থানীয় সরকারি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সক্ষমতা একই জায়গায় স্থবির হয়ে থাকে। প্রকল্প বন্ধ হলে সংস্থার কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়, আর দরিদ্র মানুষ আবার মহাসংকটে পড়ে। পল ফার্মারের ভাষায়, সত্যিকারের পরিবর্তন তখনই আসবে যখন প্রকল্পের অর্থ সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চিকিৎসক, স্থায়ী সরবরাহ শৃঙ্খলা এবং নিজস্ব বাজেটের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যবহার করা হবে, যাতে বাইরের কোনও সংস্থা না থাকলেও রাষ্ট্র তার নাগরিককে নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে বাধ্য থাকে।
প্রাথমিক শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন ক্ষেত্রেও একই চিত্র দৃশ্যমান। বিশ্বব্যাংকের বিশ্ব উন্নয়ন প্রতিবেদন ‘লার্নিং টু রিয়ালাইজ এডুকেশনস প্রমিজ’ (২০১৮)-এ উল্লেখ করা হয়েছে, কেবল নতুন ভবন তৈরি করা বা ক্ষণস্থায়ী প্রশিক্ষণ দিলেই শিক্ষা ও দক্ষতার বিকাশ ঘটে না। আসল সিস্টেম দাঁড়িয়ে থাকে শিক্ষকের নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, পেশাগত মর্যাদা, মূল্যায়ন ব্যবস্থা এবং শিল্পের চাহিদার সাথে কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থার স্থায়ী যোগসূত্রের ওপর। আমরা প্রকল্পের আওতায় হাজার কোটি টাকা খরচ করে প্রশিক্ষণ ইভেন্ট করছি, অথচ মূল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সংস্কার না করায় গুণগত পরিবর্তনের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছে না।
কাঁটা ফুল বনাম গভীরমূল বটবৃক্ষ
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের মেয়াদি প্রকল্প এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রোগ্রামের মধ্যকার দার্শনিক ফারাকটি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে। একটি মেয়াদি প্রকল্প হলো ফুলদানিতে সাজিয়ে রাখা কাঁটা ফুলের মতো। এটি প্রকল্পের মেয়াদ চলাকালীন দেখতে অত্যন্ত বর্ণিল ও আকর্ষণীয় লাগে, কিন্তু এর নিজস্ব কোনও শিকড় বা জীবনীশক্তি নেই। প্রকল্পের মেয়াদ শেষে তহবিল বন্ধ হলেই তা শুকিয়ে নেতিয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, একটি অধিকারভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি প্রোগ্রাম হলো একটি গভীরমূল বটবৃক্ষের বীজ রোপণ করার সমতুল্য। শুরুতে এর বিকাশ ধীরগতির মনে হতে পারে, এর পরিচর্যায় অনেক ধৈর্য ও প্রাতিষ্ঠানিক মেধার প্রয়োজন হয়; কিন্তু সময়ের সাথে সাথে যখন এর শিকড় সমাজের মাটি ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর গভীরে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা শত ঝড়ের মুখেও অটল থাকে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ছায়া ও ফল দান করে।
প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ মাহবুব উল হক যে মানব উন্নয়ন সূচকের প্রবর্তন করেছিলেন, তার মূল দর্শনই ছিল— মানুষকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক নীতি গ্রহণ করা, যা মেয়াদি প্রকল্পের চাটুকারিতা থেকে মুক্ত। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ইলিনোর ওস্ট্রম তাঁর ‘গভর্নিং দ্য কমন্স’ (১৯৯০) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, কীভাবে স্থানীয় জনগণ ও প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারদের যৌথ মালিকানায় দীর্ঘমেয়াদি টেকসই নিয়ম-কানুন ও সুশাসন কাঠামো গড়ে ওঠে, যা বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া যেকোনও প্রকল্পের চেয়ে বহুগুণ বেশি কার্যকর ও স্থায়ী।
পদ্ধতিগত রূপান্তরের ধারাবাহিক যাত্রা
প্রকৃত সিস্টেম শক্তিশালীকরণের মূল উপাদানগুলো কী কী এবং কীভাবে তা অর্জন করা সম্ভব? কোনও একটি খাত বা ক্ষেত্রের ‘সিস্টেম’ মূলত ছয়টি আন্তসম্পর্কিত মৌলিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। প্রথম ভিত্তিটি হলো, স্বচ্ছ নীতি ও আইনি জবাবদিহি, যা রাষ্ট্র বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সেবা প্রদানে বাধ্য করে। দ্বিতীয় ভিত্তিটি হলো, অভ্যন্তরীণ ও টেকসই অর্থায়ন কাঠামো, যা বৈদেশিক অনুদানের মুখাপেক্ষী না হয়ে জাতীয় বা স্থানীয় রাজস্ব থেকে অর্থ সংস্থান করে। তৃতীয় ভিত্তিটি হলো, স্থায়ী ও পেশাদার মানবসম্পদ, যেখানে প্রকল্পের অস্থায়ী কর্মীর বদলে প্রাতিষ্ঠানিক স্থায়ী পদের সক্ষমতা বাড়ানো হয়।
চতুর্থ ভিত্তিটি হলো, প্রমাণভিত্তিক তথ্য ও উপাত্ত ব্যবস্থাপনা, যা অনুমানের বদলে সঠিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নীতি নির্ধারণের সুযোগ দেয়। পঞ্চম ভিত্তিটি হলো, নাগরিকের সোচ্চার অংশগ্রহণ ও সামাজিক জবাবদিহি, যেখানে নাগরিককে করুণার পাত্র না ভেবে অধিকারপ্রাপক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এবং ষষ্ঠ ভিত্তিটি হলো, প্রাতিষ্ঠানিক সেবা প্রদান পরিকাঠামো, যা কোনও সাময়িক সংস্থা সরাসরি না চালিয়ে স্থানীয় ও জাতীয় স্থায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
এই ভিত্তিগুলোকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো কোনও একদিনের ঘটনা বা কয়েকটি ইভেন্টের সমষ্টি নয়; এটি একটি সুনির্দিষ্ট ও ধারাবাহিক পর্যায়ভিত্তিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ হলো গভীর ও বস্তুনিষ্ঠ পদ্ধতিগত বিশ্লেষণ, যেখানে বাহ্যিক সমস্যা বা উপসর্গ না দেখে সমস্যার একদম মূল কারণ খুঁজে বের করা হয়। হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের গবেষকদের প্রবর্তিত সমস্যা-চালিত পুনরাবৃত্তিমূলক অভিযোজন পদ্ধতি অনুযায়ী, স্থানীয় অংশীদারদের সাথে নিয়ে ব্যবস্থার মূল বাধাগুলোকে চিহ্নিত করাই প্রথম কাজ।
দ্বিতীয় ধাপ হলো, অংশীদারত্ব-ভিত্তিক পরিকল্পনা ও স্থানীয় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা, যেখানে যেকোনও মডেল বা সমাধানের প্রধান ভূমিকায় বসাতে হবে সরকারি কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজকে। বেসরকারি বা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে বুঝতে হবে যে তারা কোনোভাবেই এই ব্যবস্থার মালিক বা কারিগর নয়, তাদের ভূমিকা হবে কেবল একজন অনুঘটক, উপদেষ্টা বা সহায়ক হিসেবে।
তৃতীয় ধাপ হলো, বাস্তবভিত্তিক অভিযোজনমূলক শিখন, যেখানে একতরফা বিদেশি মডেল চাপিয়ে না দিয়ে স্থানীয় বাস্তবতায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নীতি পরিমার্জন করতে হবে। চূড়ান্ত ও চতুর্থ ধাপ হলো জাতীয় বাজেট, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি এবং আইনি কাঠামোর সাথে এই মডেলের স্থায়ী একীকরণ, যেখানে প্রকল্প পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে রাষ্ট্র বা স্থানীয় প্রতিষ্ঠান নিজ অর্থায়নে ও শক্তিতে পুরো ব্যবস্থাটি পরিচালনা করতে শুরু করবে।
উত্তরণ ও অনুদান-উত্তর ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই রূপান্তরটি কেবল একটি তাত্ত্বিক বিলাসিতা নয়, বরং অস্তিত্বের প্রশ্ন। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক অনুদান ও রেয়াতযোগ্য ঋণের প্রবাহ ক্রমশ হ্রাস পাবে। বৈদেশিক সহায়তার প্রতিটি মুদ্রার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
আমরা যদি এখনও দাতাসংস্থার অর্থের ওপর নির্ভর করে তিন বা পাঁচ বছরের মেয়াদি ইভেন্ট- সর্বস্ব প্রকল্প চালিয়ে যাই, তবে অর্থায়ন বন্ধ হওয়ার সাথে সাথেই আমাদের সমস্ত অর্জন ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। জাতীয় সম্পদের চরম সীমাবদ্ধতার এই যুগে আমাদের এমন মডেল গ্রহণ করতে হবে যা অনুদান বন্ধ হওয়ার পরও স্বয়ংক্রিয়ভাবে টিকে থাকে।
মানসিকতা, কৌশল ও মূল্যায়নের আমূল রূপান্তর
এই মহান রূপান্তর অর্জনের জন্য উন্নয়ন খাতের সমস্ত অংশীদারদের তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে মানসিকতা ও কৌশলের আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। প্রথমত, আমাদের মনস্তাত্ত্বিক ত্রাণকর্তা মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে অনুধাবন করতে হবে যে তারা কোনও রূপকথার ত্রাণকর্তা নয়। নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রের এবং অধিকারের মালিক জনগণ। নিজেদের সাফল্যকে কত কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন হলো তা দিয়ে না মেপে, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাকে কতটা স্বাবলম্বী করে প্রকল্প বন্ধ করা গেল—তা দিয়ে মাপার দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, মেয়াদি প্রকল্পের সংক্ষিপ্ত চিন্তা থেকে বের হয়ে অধিকারভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি প্রোগ্রামিং কৌশলে প্রবেশ করতে হবে। পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রথম দিন থেকেই প্রশ্ন তুলতে হবে যে আজ যে কার্যক্রম শুরু হচ্ছে, পাঁচ বছর পর যখন আমাদের এক টাকাও অনুদান থাকবে না, তখন এই সেবাটি কীভাবে এবং কার খরচে চলবে? যদি সেই প্রশ্নের সুস্পষ্ট ও স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক উত্তর না থাকে, তবে বুঝতে হবে সেই উদ্যোগ কোনও সিস্টেম শক্তিশালীকরণ নয়, বরং আরেকটি অকার্যকারিতার ফাঁদ।
তৃতীয়ত, উন্নয়ন খাতের মনিটরিং ও মূল্যায়ন পদ্ধতির মূল সূচকগুলো আমূল বদলে ফেলতে হবে। কয়টি ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হলো, কতজন অতিথি সেখানে বক্তব্য দিলেন বা কতগুলো লিফলেট বিতরণ করা হলো—এসব বাহ্যিক ও অগভীর সূচক এক পাশে সরিয়ে রেখে প্রাতিষ্ঠানিক নীতি পরিবর্তন, স্থায়ী বাজেটে সংস্থান, আইনি জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং নাগরিকের অধিকার অর্জনের মতো রূপান্তরমূলক সূচক দিয়ে সফলতা পরিমাপ করতে হবে।
চাকা ঘুরবে, সামনেও এগোবে
উন্নয়ন কোনও ক্ষণিকের উৎসব বা চকচকে ব্যানারের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার আয়োজন নয়। এটি একটি জাতি ও তার সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি স্বাবলম্বিতা অর্জনের কঠিন লড়াই। আজ যদি বাংলাদেশের উন্নয়ন খাতের সুশীল সমাজ, সরকারি নীতিনির্ধারক, দেশি-বিদেশি সংস্থা এবং দাতাগোষ্ঠীগুলো ‘সিস্টেম শক্তিশালীকরণ’ শব্দটিকে তাদের অনুদান পাওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা বন্ধ না করে, তবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক ভঙ্গুর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকবে। চটকদার পরিভাষার আড়ালে অকার্যকর প্রকল্প আর ইভেন্ট-সর্বস্বতার দিন এখনই শেষ হওয়া দরকার।
আসুন, ক্ষণস্থায়ী প্রকল্প কালচারকে বিদায় জানিয়ে একটি অধিকারভিত্তিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘমেয়াদি প্রোগ্রামিংয়ের যুগে প্রবেশ করি। তবেই আমরা এমন এক স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক বৃক্ষের বীজ রোপণ করতে পারবো, যা আগামী দিনের যেকোনও বড় দুর্যোগেও অটল থাকবে এবং বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিককে একটি মর্যাদাপূর্ণ, টেকসই ও স্বাবলম্বী ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দেবে।
লেখক: একজন উন্নয়নকর্মী