চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে যখন ফেরদৌস স্টিলের ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে, তখন ভেতরে যে শ্রমিকেরা কাজ করছিলেন, তাদের অনেকেই জানতেন না—তারা যে জাহাজের খোলে ঢুকছেন সেটি একমাস আগেই নিরাপত্তা ত্রুটির অভিযোগে শ্রম আদালতে মামলার মুখে পড়েছিল। ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, আরও ১০-১২ জন এখনও হাসপাতালে লড়ছেন। এই মানুষগুলোর কেউ হয়তো সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় স্ত্রী-সন্তানকে বলে গিয়েছিলেন সন্ধ্যায় ফিরবেন। সেই ফেরাটা আর হয়নি। আর এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনও দুর্ভাগ্য নয়, বরং একটা পুরোনো ধারাবাহিকতারই সাম্প্রতিকতম অধ্যায়।
এ বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত তিন দফা পরিদর্শনে প্রতিষ্ঠানটির ঘাটতি চিহ্নিত হয়েছিল, তাগিদপত্র পাঠানো হয়েছিল বারবার। তবু ছুটির দিনেও পুরনো জাহাজের ভেতরে স্ক্র্যাপ কাটার কাজ চলেছে, আর সেখান থেকেই গ্যাস লিকেজ হয়ে প্রাণ গেছে ৯ জনের। এখানে সমস্যাটা তথ্যের অভাবে নয়। জানা তথ্য অনুযায়ী কাজ বন্ধ করে দেওয়ার সাহস বা সক্ষমতা কারও ছিল না, এটাই আসল কথা। প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার পর যেমন হয়, এবারও পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি হয়েছে, নেতৃত্বে আছেন শিল্প মালিকদের নিজস্ব সংগঠনের একজন কারিগরি উপদেষ্টা। কিন্তু নিজের প্রতিষ্ঠানের ভেতরকার মানুষই যদি নিজেদের তদন্ত করেন, সেই প্রতিবেদন কতটা নিরপেক্ষ হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। এনজিও শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্মের হিসাবে ২০০৯ সাল থেকে এই শিল্পে চারশর বেশি শ্রমিকের প্রাণ গেছে, ইন্ডাস্ট্রি অল গ্লোবাল ইউনিয়নের হিসাবে গত পাঁচ বছরেই ৩৮ জন নিহত ও ১৭৭ জন আহত হয়েছেন। প্রতিবার প্রতিশ্রুতি আসে, প্রতিবার একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটে।
অথচ এই শিল্পকে বন্ধ করে দেওয়ার কথা ভাবাও বাস্তবসম্মত নয়। দেশের ইস্পাত চাহিদার ষাট থেকে ৭০ শতাংশই আসে এই স্ক্র্যাপ থেকে, পদ্মা সেতু থেকে মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পর্যন্ত বড় অবকাঠামোর কাঁচামালের একটা বড় অংশ এসেছে সীতাকুণ্ডের এই ইয়ার্ডগুলো থেকেই। বছরে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক মূল্য যুক্ত হয় জাতীয় অর্থনীতিতে, সরকার রাজস্ব পায় ১২০০ থেকে ১৫০০ কোটি টাকা, আর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে দুই লাখের বেশি মানুষের সংসার চলে এই শিল্পের ওপর ভর করে। এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই বলতে হয়, নিরাপত্তা ও অর্থনীতি একে অপরের প্রতিপক্ষ নয় বরং একে অপরের ওপর নির্ভরশীল।
তাহলে সমস্যাটা ঠিক কোথায়। হংকং কনভেনশন অনুযায়ী গত ২৬ জুন থেকে গ্রিন সনদ ছাড়া কোনও ইয়ার্ডে জাহাজ ভাঙার কথা নয়, কিন্তু দুইশর বেশি নিবন্ধিত ইয়ার্ডের মধ্যে মাত্র সাত-আটটি এই সনদ পেয়েছে। একটি ছোট ইয়ার্ডকে পরিবেশবান্ধব করতে লাগে ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকা, সেই বিনিয়োগ মুনাফায় ফিরতে সময় লাগে ১০-১২ বছর বা তারও বেশি। পরিবেশ মন্ত্রণালয় এই খাতকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রাখায় ব্যাংক দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিতে রাজি হয় না, মেলে কেবল জাহাজ কেনার স্বল্পমেয়াদি ঋণ। ফলে যে মালিক সনদ পাননি, তিনি টিকে থাকার তাগিদেই পুরনো পথে হাঁটেন, আর ঠিক সেই ইয়ার্ডগুলোতেই দুর্ঘটনার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি থেকে যায়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এক হাজার কোটি টাকার বেশি আটকে থাকা আগাম আয়কর, দুই বছর ধরে যা সরকারি দফতরে জমে আছে, অথচ ছাড় পেলে সেটাই হতে পারতো কমপ্লায়েন্সের প্রথম পুঁজি। নিয়ন্ত্রক কাঠামোর নিজস্ব দুর্বলতাও আছে, শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের ১৪ সদস্যের তিনজনই ইয়ার্ড মালিকদের প্রতিনিধি, মাত্র ৪ জন থাকলেই বোর্ড সভা বৈধ হয়ে যায়।
এই ফাঁক গলে প্রতিবেশীরা এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুত। ভারত তার আলাং ইয়ার্ডকে চাঙা করতে ৪৫৪ মিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা প্যাকেজ আনছে, জাহাজ মালিকরা স্ক্র্যাপ মূল্যের প্রায় ৪০ শতাংশ ক্রেডিট নোট হিসেবে ফেরত পাবেন। আলাংয়ে এখন শতাধিক কমপ্লায়েন্ট ইয়ার্ড কাজ করছে, এমনকি পূর্ব উপকূলে নতুন কেন্দ্র গড়ার পরিকল্পনাও চলছে, যাতে বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা টেনে নেওয়া যায়। পাকিস্তানের গাদানিও সাময়িক সুরক্ষা সনদ ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, এক সপ্তাহেই চারটি জাহাজ পেয়েছে তারা। ফল স্পষ্ট, সীতাকুণ্ডের এক ব্যবসায়ীর ভাষায়, বাংলাদেশি ইয়ার্ড টনপ্রতি ৬৫০ ডলার দিলেও ভারতীয় ইয়ার্ড ৬৮০ ডলার দিয়ে জাহাজ কিনে নিচ্ছে।
এখান থেকেই আসল ঝুঁকিটা শুরু। জাহাজ মালিকরা একবার নতুন গন্তব্যে অভ্যস্ত হয়ে গেলে সেই সম্পর্ক দ্রুত ফিরে আসে না, শিপিং ব্যবসা মূলত সম্পর্ক আর আস্থার ওপর দাঁড়ানো। আজ যে জাহাজ আলাংয়ে যাচ্ছে দাম কিছুটা বেশি পাওয়ার কারণে, আগামী বছর সেই একই মালিকের বহরের বাকি জাহাজগুলোও একই পথে যাবে, কারণ ততদিনে তার ভারতীয় দালাল, ব্যাংক গ্যারান্টি আর কাগজপত্রের চেনা পথ তৈরি হয়ে গেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনুমোদিত তালিকায় ঢুকতে না পারলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে বৈশ্বিক জাহাজ মালিকদের বিবেচনার বাইরে চলে যাবে, আর একবার সেই তালিকা থেকে বাদ পড়ে গেলে ফিরে আসাটা কেবল কয়েক বছরের পরিশ্রমের নয়, বহু বছরের বিশ্বাস পুনর্গঠনের কাজ। এদিকে দক্ষ শ্রমিকরাও যদি নিয়মিত মজুরি ও নিরাপত্তার আশায় গাদানি বা আলাংয়ে পাড়ি জমাতে শুরু করেন, সীতাকুণ্ডের ইয়ার্ডগুলো একদিন অদক্ষ শ্রমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে, যা দুর্ঘটনার হার আরও বাড়াবে। এভাবেই একটি শিল্প ধীরে ধীরে, নাটকীয় কোনও ঘোষণা ছাড়াই, প্রতিযোগীদের হাতে চলে যেতে পারে, আর যেদিন তা বোঝা যাবে, সেদিন হয়তো আর ফেরানোর কিছু বাকি থাকবে না।
তাহলে পথ কী। ভারতের ক্রেডিট নোট মডেলের অনুরূপ একটি সীমিত প্রণোদনা কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে গ্রিন সনদপ্রাপ্ত ইয়ার্ডে জাহাজ আনলে আমদানিকারকরা কর ছাড় পাবেন। আটকে থাকা আগাম আয়কর দ্রুত ছাড় করে ব্যবসায়ীদের হাতে তারল্য ফিরিয়ে দেওয়া প্রয়োজন, যা কোনও বাড়তি ব্যয় ছাড়াই কেবল প্রশাসনিক অগ্রাধিকারের বিষয়। বিচিং ও কাটিং অনুমোদনের দুই মাসের বিলম্ব কমিয়ে আনা জরুরি, কারণ প্রতিটি দিনের বিলম্বই ব্যাংক সুদের আকারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষয় করে। নিয়ন্ত্রক বোর্ডের কাঠামো পুনর্বিবেচনা করে শিল্পের অংশগ্রহণকে পরামর্শমূলক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখা দরকার, যাতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে স্বাধীনতা বজায় থাকে। আর পরিদর্শনের পর কেবল নোটিশেই থেমে না গিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংশোধন না হলে কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত করার মতো বাস্তব প্রয়োগ ক্ষমতা পরিদর্শন সংস্থার হাতে থাকা প্রয়োজন। ফেরদৌস স্টিলের ক্ষেত্রে তিন দফা পরিদর্শন ও একটি মামলার পরও কাজ বন্ধ না হওয়াটাই প্রমাণ করে, বর্তমান প্রয়োগ কাঠামো কতটা ঠুনকো।
সীতাকুণ্ডের এই ঘটনাপ্রবাহ শেষ পর্যন্ত একটাই সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে। অর্থনৈতিক গুরুত্ব আর মানবিক নিরাপত্তা পরস্পরবিরোধী কোনও লক্ষ্য নয় বরং একে অপরের পরিপূরক। বাংলাদেশের হাতে এখনও সময় আছে হারানো জায়গা ধরে রাখার, প্রতিযোগীদের ছুঁয়ে ফেলার আগেই ঘুরে দাঁড়ানোর। কিন্তু সেই ঘুরে দাঁড়ানো যদি প্রতিবার আরেকটি প্রাণহানির মূল্যে আসতে থাকে, তাহলে বিশ্ববাজারে শীর্ষস্থান ধরে রাখার সেই গৌরব একদিন কেবল কাগজে-কলমেই থেকে যাবে, বাস্তবে নয়।
লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক




