মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বহনকারী ৩২ নম্বর তার গুরুত্ব হারাবে না 

কিছু দিন আগে তামান্না চৌধুরী প্রিয়াঙ্কা নামের একজন নারী বাদী হয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটান ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলার আবেদন করেন। তিনি অভিযোগ করেন, গত বছর ৫ই ফেব্রুয়ারি ঘোষণা দিয়ে, সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা চালিয়ে, শত শত মানুষ জড়ো করে, সিটি করপোরেশনের বুলডোজার আর এক্সক্যাভেটর ব্যবহার করে ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নম্বর রোডে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর ভেঙে দেওয়া হয়। এই অপরাধের জন্য তিনি দায়ী করেন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মাদ ইউনূসসহ ২৭ জনকে।

এরপর যা হবার তাই হলো। মামলার আবেদন গ্রহণ করার মতো ‘উপাদান’ না থাকায় আদালাত তা খারিজ করে দেয়। অর্থাৎ অভিযোগ প্রমাণ করা বা খণ্ডন করা তো দূরে থাক, মামলাই গ্রহণযোগ্য নয়। মুহাম্মাদ ইউনূসকে বিবাদী করে এই নিয়ে একাধিক মামলার আবেদন খারিজ করা হলো। মনে হয়, ইউনূস বিচারের ঊর্ধ্বে, ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। এক ধরনের অলিখিত দায়-মুক্তি তাঁকে ‘মামলা-প্রুফ’ করে রেখেছে।

তবে এখানে আসল বিষয় সাবেক প্রধান উপদেষ্টা নন। এখানে বিষয় হলো— আইনের শাসন এবং অপরাধীর জবাবদিহি। ইউনূসের ১৮ মাস শাসনামলে অনেক সহিংসতা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, মব সহিংসতা ইত্যাদি প্রকাশ্যে ঘটলেও, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিতো। যেমন করা হয় গত ডিসেম্বর মাসে দ্য ডেইলি স্টার এবং প্রথম আলো পত্রিকা দুটোর কার্যালয়ে ভাঙচুর আর অগ্নিসংযোগের সময়। অলিখিত ইনডেমনিটি।

তবে ২০ আগস্ট যে মামলা দায়ের করার চেষ্টা করা হয়, তার বিষয়বস্তুর গুনগত মান অন্যান্য মব সহিংসতা থেকে ভিন্ন। এই মামলা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর মধ্যে অন্যতম ভবনকে ধ্বংস করা নিয়ে। যে ভবনের সঙ্গে দেশের গৌরব এবং বেদনা দুটোই মিশিয়ে আছে, সেই ভবনকে পরিকল্পিতভাবে, আগাম ঘোষণা দিয়ে, সেনাবাহিনীর চোখের সামনে তিন-চার দিন ধরে ধ্বংস করা হয়।

স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস

গত বছর ৫ই ফেব্রুয়ারিতে শুরু করা এই ধ্বংসলীলার পুরোটা টেলিভিশন এবং সামাজিক মাধ্যমের বিভিন্ন সাইটে লাইভ সম্প্রচার করা হয়। কেউ বলতে পাড়বে না যে, তারা জানতো না কী হচ্ছে; কেউ বলতে পারবে না যে, তারা জানতো না কারা এর পেছনে ছিল। অপরাধ টিভিতে সম্প্রচার করা হয়েছে, অপরাধীরা টিভিতে সাক্ষাৎকার দিয়েছে।

কিন্তু এই ঐতিহাসিক ভবন শুধু ইট আর সিমেন্ট নয়। এটা স্বাধীনতার একটি স্মৃতিচিহ্ন, দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী, রাষ্ট্রের স্থপতি স্মরণে একটি জাদুঘর। এই ভবন ধ্বংসের জন্য দায়ী অপরাধীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো তো দূরের কথা, ঘটনা নিয়ে কোনও তদন্ত পর্যন্ত হয়নি।

তাহলে ৩২ নম্বরের এই বাসা ধ্বংস করা হলো কেন? হয়তো কারণটা ভবনের ইতিহাসেই অন্তর্নিহিত আছে। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসা শুধু একজন সাবেক প্রেসিডেন্টের বাসা ছিল না। এই বাসার সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

এই বাসা থেকেই মুজিব ১৯৭১ এর মার্চ মাসে তাঁর সব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। অসহযোগ আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের ডাক, সব কিছুর সিদ্ধান্ত ৩২ নম্বর রোডের এই বাসা থেকে নেওয়া হয়েছে। গোটা মার্চ মাস এই বাসা মানুষের জন্য একটি রাজনৈতিক তীর্থস্থানে পরিণত হয়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা নানা পেশার লোকজন মিছিল করে ৩২ নম্বরে আসতেন, মুজিবের কথা শুনতে, মুজিবকে তাদের কথা জানাতে।

কার্যত স্বাধীনতা দিবস 

এই ভবনের ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল দিন ছিল ১৯৭১ সালের ২৩ শে মার্চ। দিনটি ছিল পাকিস্তানের জাতীয় দিবস। সারা দেশে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলনের কথা। কিন্তু সারা দিন হাজার হাজার মানুষ স্রোতের মতো বাংলাদেশের পতাকা হাতে মিছিল করে ৩২ নম্বর রোড দিয়ে  যান। সেদিন বঙ্গবন্ধু নিজেই তাঁর বাসায়— যেটা কার্যত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের  প্রশাসনিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল, বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন।

পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর নিজ বাসভবনে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করলেন। স্বাধীনতার ঘোষণা না করেও কীভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করা যায়, তার একটি উদাহরণ তিনি সৃষ্টি করলেন। পাকিস্তানের সেনা কর্মকর্তারাও সেদিনের তাৎপর্য বুঝতে পেড়েছিলেন।

জার্মান রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ডয়েচে ভেলের বাংলা বিভাগ সম্প্রতি ৩২ নম্বর নিয়ে একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রচার করে, যেখানে পূর্ব পাকিস্তানে নিয়োজিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শীর্ষ চারজন অফিসারের লেখা বই থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া হয়। “বাঙালি তরুণরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে রাস্তায় রাস্তায় মিছিল করছিল, তাদের কাছে এটি ছিল কার্যত এক স্বাধীনতা দিবস,” ব্রিগেডিয়ার-জেনেরাল সিদ্দিক সালিকের “উইটনেস টু সারেন্ডার” বই থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে ডয়েচে ভেলে বলে। পূর্ব পাকিস্তান গভর্নরের রাজনৈতিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীকে উদ্ধৃত করে জার্মান গণমাধ্যম বলে, “সেদিনটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সেদিনই মুজিব তাঁর বাসভবনে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন।” 

কালো অধ্যায়

পাকিস্তান সেনাবাহিনী যখন ২৫ শে মার্চ রাতে তাদের গণহত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে হামলা শুরু করে, তখন মুজিব ৩২ নম্বরেই রয়ে যান। ভবনের ইতিহাসে আরেকটি অধ্যায় যুক্ত হয়, যখন সেখান থেকেই তাঁকে গ্রেফতার করে করাচিতে নিয়ে যাওয়া হলো। দেশদ্রোহিতার অভিযোগে বিচারের ব্যবস্থা তৈরিই ছিল।

মুজিবের সহকর্মী, আওয়ামী লীগ এবং ছাত্র লীগের শীর্ষ নেতারা ২৫ শে মার্চ রাত অব্দি এই ভবনেই প্রতিদিন আসতেন, বৈঠক করতেন, আগামী দিনের কর্মপন্থা ঠিক করতেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত মানুষদের অভিনন্দন জানাতেন। সেই রাতে বাড়ি খালি হয়ে গিয়েছিল। নেতাকর্মীরা সবাই ঢাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। অনেকেই হয়তো জানতেন না,  দু’একদিনের মধ্যেই শীর্ষ নেতারা ভারতে প্রবেশ করবেন, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির সঙ্গে বৈঠক করবেন, স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র জারি করবেন, মুজিবকে প্রেসিডেন্ট করে প্রবাসী সরকার গঠন করবেন এবং ভারতের সহায়তায় মুক্তিযুদ্ধকে একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসবেন।

স্বাধীনতার পর বাড়িটির গুরুত্ব কিছুটা কমে যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব তাঁর সরকারি কার্যালয় থেকে সরকারি কাজ করতেন। কিন্তু তারপরও অনেকের কাছে ৩২ নম্বরের আকর্ষণ কমেনি। বঙ্গবন্ধুও এই বাড়ি ছেড়ে প্রধানমন্ত্রী বা পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবনে যাননি। এই ভবনের জন্য তাঁর ভালোবাসা তাঁর জন্য কাল হয়ে ওঠে। ভবনের ইতিহাসে সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায় আসে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট।

প্রায় পুরো পরিবারসহ মুজিবকে এই ভবনেই হত্যা করে একদল সেনা অফিসার এবং সৈন্য। সিঁড়িতে পড়ে থাকা বঙ্গবন্ধুর লাশের ছবি সবাইকে জানিয়ে দেয়— এখানে কী ধরনের ভয়াবহ এবং নৃশংস ঘটনা ঘটানো হয়েছে। হত্যাকারীদের দায়-মুক্তি দেওয়া হয়েছিল এবং তখন থেকেই ‘ইনডেমনিটি’ শব্দটা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অভিশপ্ত তাৎপর্য বহন করে আসছে।

ভাঙচুর আর অগ্নিসংযোগ

ভবনটি খুব বেশি দিন মুজিব পরিবারের সম্পত্তি ছিল না। আওয়ামী লীগের কার্যক্রমও এই ভবন থেকে পরিচালিত হতো না। শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে সরকারি হেফাজত থেকে বাড়িটি ফিরে পান। কিন্তু তিনি এবং বোন রেহানা ১৯৯৪ সালে বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্ট গঠন করে বাড়িটি ট্রাস্টের মালিকানায় দিয়ে দেন। অর্থাৎ বাড়িটি আর হাসিনা এবং রেহানার মালিকানায় রইলো না।

একই বছর ভবনে “জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর” স্থাপন করা হয়। ভবনটি তখন জাতীয় সম্পত্তিতে পরিণত হয়। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক উন্মাদনায় ইতিহাস লালনের কোনও সংস্কৃতি যে গড়ে ওঠেনি, তার প্রমাণ আবার পাওয়া গেল ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রথমবার ৩২ নম্বরের বাড়িতে হামলা হয়, ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগ করা হয়। তখন বলা হয়েছিল, হাসিনার অত্যাচারে ক্ষুব্ধ  হয়ে জনতা তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত স্থাপনায় হামলা করেছে। তখন দেশে কোনও সরকারও ছিল না। সেনাবাহিনী আইন-শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকলেও তারা বিক্ষুব্ধ জনতার মুখোমুখি দাঁড়াতে চায়নি।

কিন্তু গত বছর ৫ই ফেব্রুয়ারির ঘটনা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের উদ্দেশে শেখ হাসিনার একটি ভাষণের অজুহাতে ভবনটি গুড়িয়ে দেওয়ার ডাক দেওয়া হয় সামাজিক মাধ্যমে। বুলডোজার নিয়ে ৩২ নম্বরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা জানতেন না, একথা বলার কোনও রাস্তা নেই। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আগাম কোনও তথ্য ছিল না, এ কথা কোনও পাগলও বিশ্বাস করবে না।

সেদিন ৩২ নম্বরে সেনাবাহিনী ছিল, কিন্তু ‘বিক্ষুব্ধ জনতা’ যখন আরবি হরফে কলেমা লেখা পতাকা নিয়ে হাজির হয়ে ভবন ভাঙা শুরু করলো, তখন তারা সেখান থেকে সড়ে গেলেন। দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে বুলডোজার এবং এক্সক্যাভেটর নিয়ে এসে দেয়াল এবং ছাদ ধ্বংস করা হলো। আগের বছর আগস্টের ৫ তারিখে যে কাজ ক্ষোভের মুখে শুরু হয়েছিল, সেকাজ ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিতভাবে ৫ই ফেব্রুয়ারি সম্পন্ন করা হলো।

ধ্বংসকারীরা শুধু বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি মোছার চেষ্টা করছিল না। তাদের আক্রোশ ছিল এই ভবনের প্রতীকী মূল্য, তার নৈতিক শক্তির প্রতি। এই ভবনের প্রতিটি ইট ছিল ১৯৭১ এর মুক্তি সংগ্রামের সাক্ষী। যারা সেদিন ভবনটি ভেঙেছে তারা শেখ মুজিব বা শেখ হাসিনাকে আঘাত করছিল না। তাদের প্রতিটি আঘাতের লক্ষ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি।  

বর্তমান বিএনপি সরকার, যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে বলে নির্বাচনের সময় দাবি করেছিল, তারা ৩২ নম্বর-সহ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে চালানো ধ্বংসযজ্ঞ নিয়ে নিশ্চুপ আছেন। তারা ইউনূস আমলে সংঘটিত কোনও অপরাধ নিয়ে মাথা ঘামাতে চায় না। কিন্তু সাম্প্রতিক এই মামলার প্রচেষ্টা থেকে বোঝা যায়, ৩২ নম্বর বা মুক্তিযুদ্ধের অন্যান্য স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংসের জন্য বিচারের দাবি সহসা হারিয়ে যাবে না।

লেখক: একজন সাংবাদিক এবং পডকাস্টার

ইমেইল: sabir.mustafa@gmail.com