নেপালের সেই আমগাছটি আমাদের যা শেখায়

নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় এক হাজার মানুষ। এই ভয়াবহ দুর্যোগের মধ্যেও অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে গেছেন ২৪ বছর বয়সী দিনমজুর বিবেক কুমার। পানি, কাদা আর পাথরের প্রবল স্রোত তাঁকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। একপর্যায়ে তিনি একটি আমগাছে আটকে যান। সেই গাছটি আঁকড়ে ধরেই তিনি বেঁচে থাকেন। উদ্ধারের পর হাসপাতালে শুয়ে বিবেক বলেছেন, ‘‘আমগাছটি না থাকলে মারাই যেতাম।’’

এটি শুধু একজন মানুষের বেঁচে যাওয়ার গল্প নয়। এর মধ্যে আমরা আরও বড় একটি শিক্ষা পাই। আজ যে গাছটিকে আমরা রাস্তার পাশে ‘বাধা’ মনে করছি, যে গাছটি কাটার জন্য হয়তো উন্নয়নের যুক্তি দেখাচ্ছি, কাল সেটিই হয়তো কারও জীবন বাঁচানোর অবকাঠামো হয়ে দাঁড়াতে পারে।

আমরা গাছকে সাধারণত অক্সিজেন, ছায়া, সৌন্দর্যবর্ধন কিংবা কার্বন শোষণের বিষয়ে যুক্ত করি। পাহাড়কে দেখি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হিসেবে, জলাভূমিকে দেখি মাছ-পাখির আবাস হিসেবে। কিন্তু প্রকৃতিকে হয়তো আমরা ভুল দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছি।

প্রকৃতি শুধু আমাদের জীবনকে সুন্দর করে না; প্রকৃতি আমাদের সুরক্ষার অবকাঠামোও। পরিণত গাছ মাটিকে ধরে রাখে, বৃষ্টির পানি শোষণ করে, পানির প্রবাহের গতি কমায় এবং প্রচণ্ড গরমে আশপাশের তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করে। জলাভূমি ভারী বৃষ্টির পানি সাময়িকভাবে ধারণ করে শহর বা জনপদকে জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা করতে পারে। পাহাড় মাটির স্থিতিশীলতা ধরে রাখে এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহেও ভূমিকা রাখে। উপকূলের ম্যানগ্রোভ বন ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের শক্তি কমাতে পারে—  ২০০৯ সালেরন ঘূর্ণিঝড় আইলার সময় সুন্দরবনের সুরক্ষামূলক ভূমিকা আমরা নিজেরাই দেখেছি।

অথচ এই আমরাই কারণে-অকারণে বন উজাড় করি, সুযোগ পেলেই পাহাড়ের গাছপালা কেটে ফেলি, নানান বাহানায় জলাভূমি ভরাট করি, নদীর পাড় দখল করি এবং জেনে বা না জেনে প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র তছনছ করে দিই। তারপর প্রকৃতি যে সুরক্ষার কাজটি বিনা খরচে করে দিতো, সেটি করার জন্য জনগণের কোটি কোটি টাকা খরচ করে কৃত্রিম ব্যবস্থা তৈরি করি।

গাছ কেটে ফেলার পর শহরকে ঠান্ডা রাখতে আরও অবকাঠামো দরকার হয়। জলাভূমি ভরাট করার পর পানি সরাতে ড্রেন, পাম্প ও জলাধার তৈরি করতে হয়। পাহাড় কাটার পর ভূমিধস ঠেকাতে নানা ধরনের প্রকৌশল ব্যবস্থা নিতে হয়। অর্থাৎ যে প্রাকৃতিক সুরক্ষাব্যবস্থা আমাদের বিনা খরচে পাওয়ার কথা, আমরা আগে সেটি ধ্বংস করি— পরে তার বিকল্প বানাতে বিপুল অর্থ খরচ করি।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানুষ কি এসব জানে না? অবশ্যই জানে। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? সমস্যা হলো, শুধু সচেতনতা বা দায়িত্বশীলতার আহ্বান জানিয়ে মানুষের আচরণ বদলানো যায় না। পৃথিবীর কিছু দেশ এই বাস্তবতাটা অনেক আগেই বুঝেছে। তারা মানুষের চরিত্র বদলে যাওয়ার অপেক্ষা করেনি। বরং এমন ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যাতে সঠিক কাজটি করা সহজ হয়, স্বাভাবিক হয় এবং ধীরে ধীরে সেটিই সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে।

জাপানের কথাই ধরা যাক। সেখানে বর্জ্য আলাদা করা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ শুধু মাঝেমধ্যে প্রচারণার বিষয় নয়। এগুলো মানুষের দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষা এবং সামাজিক আচরণের অংশ হয়ে গেছে। সক্রিয় অংশগ্রহণ, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং দৈনন্দিন অভ্যাসের মাধ্যমে সেদেশে পরিচ্ছন্নতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।

দক্ষিণ কোরিয়া খাবারের অপচয় কমানোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের শিক্ষা দিয়েছে। মানুষকে শুধু ‘খাবার অপচয় করবেন না’ বলা হয়নি। বরং এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে কতটুকু খাবার ফেলে দেওয়া হচ্ছে, সেটি দৃশ্যমান হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে তার জন্য অর্থও দিতে হয়। খাবারের বর্জ্য আলাদা করে সংগ্রহ করা হয় এবং ‘যত ফেলবেন, তত টাকা দেবেন’ ধরনের ব্যবস্থার মাধ্যমে অপচয়ের সঙ্গে আর্থিক দায় যুক্ত করা হয়েছে।

ওজনভিত্তিক এই ফি খাবারের অপচয় কমাতেও কার্যকর হয়েছে। এর ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে। খাবারের বর্জ্য আলাদা করা আর পরিবেশ রক্ষার জন্য বিশেষ কিছু নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক কাজ হয়ে গেছে।

সিঙ্গাপুরের উদাহরণও গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে খাবারের দোকান বা হকার সেন্টারে খাওয়ার পর ব্যবহৃত ট্রে ও বাসন নির্দিষ্ট জায়গায় ফেরত দেওয়ার অভ্যাস তৈরি করতে শুধু মানুষকে বোঝানোর ওপর নির্ভর করা হয়নি। শিক্ষামূলক প্রচারণার পাশাপাশি কার্যকর ব্যবস্থা ও প্রয়োগের মাধ্যমে ট্রে ফেরত দেওয়ার হার ৯০ শতাংশের ওপরে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ আচরণ বদলেছে, আর সেই আচরণই ধীরে ধীরে সামাজিক মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে।

এসব দেশের সাফল্যের গল্পের মূল শিক্ষা হলো, তারা মানুষের স্বভাব বদলে যাওয়ার অপেক্ষা করেনি। তারা মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করে এমন পরিবেশটাই বদলে দিয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এখানেই বড় শিক্ষা আছে।

আমরা প্রতিবছর বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করি। কতগুলো গাছ লাগানো হলো, সেটি নিয়ে হিসাব করি। কিন্তু কয়েক বছর পর সেই গাছগুলোর কতটি বেঁচে আছে, তা নিয়ে আর ততটা ভাবি না। গাছ লাগানো সহজ, বাঁচিয়ে রাখা কঠিন।

আমাদের সাফল্যের মাপকাঠিও তাই বদলানো দরকার। একটি প্রকল্পে কত গাছ লাগানো হয়েছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত পাঁচ বছর পর সেগুলোর কয়টি গাছ টিকে আছে। শহরের রাস্তা প্রশস্ত করা, ভবন নির্মাণ বা কোনও উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের সময় একটি পরিণত গাছের পরিবেশগত ও সুরক্ষামূলক মূল্যও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

জলাভূমির ক্ষেত্রেও একই চিন্তা প্রয়োজন। আমরা কেন জলাভূমিকে এমন জমি হিসেবে দেখি, যেটি আপাতত খালি পড়ে আছে এবং সুযোগ পেলেই ভরাট করে কাজে লাগানো যায়? জলাভূমি আসলে শহরের প্রাকৃতিক পানি ব্যবস্থাপনার অংশ। ভারী বৃষ্টির সময় সেটি পানি ধরে রাখে। সেটি ধ্বংস করার অর্থ হলো পরে একই কাজ ড্রেন, পাম্প, জলাধার কিংবা অন্য কোনো প্রকৌশল অবকাঠামোর মাধ্যমে করাতে হবে।

অর্থাৎ আমরা একদিকে বিনা খরচের প্রাকৃতিক অবকাঠামো ধ্বংস করছি, অপরদিকে সেটির বিকল্প তৈরি করতে জনগণের টাকা খরচ করছি। পাহাড়ের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। পাহাড়ের গাছপালা উজাড় করে সেখানে কয়েকটি চারা লাগিয়ে বলা যায় না যে, পরিবেশ ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাহাড়ের মাটির স্থিতিশীলতা, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ, জীববৈচিত্র্য— সবকিছু মিলিয়ে সেখানে একটি জটিল প্রাকৃতিক ব্যবস্থা কাজ করে। সেটি নষ্ট হলে কয়েকটি চারা দিয়ে তার পুরোপুরি বিকল্প তৈরি করা সম্ভব নয়।

তাই উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের আগে আমাদের নতুন প্রশ্ন করা উচিত— এই প্রকল্পের কারণে আমরা কোন প্রাকৃতিক অবকাঠামো হারাচ্ছি, আর ভবিষ্যতে তার কাজ কৃত্রিমভাবে করতে কত টাকা প্রয়োজন হবে? এই একটি প্রশ্নই আমাদের উন্নয়ন-ভাবনাকে অনেকটাই বদলে দিতে পারে। কারণ পরিবেশ রক্ষা শুধু গাছ, পাখি, নদী কিংবা পাহাড় বাঁচানোর বিষয় নয়। এটি আমাদের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য এবং নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। একটি গাছের মূল্য শুধু তার কাঠের দাম দিয়ে মাপা যায় না।

একটি জলাভূমির মূল্য শুধু সেখানে কত মাছ পাওয়া যায়, তা দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। একটি পাহাড়ের মূল্য শুধু পর্যটনের সম্ভাবনা দিয়ে বিচার করা যায় না। প্রকৃতির প্রকৃত মূল্য আমরা প্রায়ই বুঝতে পারি তখনই, যখন সেটি আর থাকে না। এখানেই ‘সচেতনতা’ আর ‘সংস্কৃতি’র পার্থক্য। সচেতনতা হলো মানুষ জানে তার কী করা উচিত। সংস্কৃতি হলো মানুষকে আর বলে দিতে হয় না।

একটি শিশু যদি ছোটবেলা থেকে দেখে তার বাড়িতে বর্জ্য আলাদা করা হয়, স্কুলে তা শেখানো হয়, পাড়ায় সবাই তা করে এবং না করাটাই অস্বাভাবিক মনে হয়, একসময় সেটি তার কাছে কোনো নিয়ম নয়, স্বাভাবিক জীবনের অংশ হয়ে যায়।

একইভাবে ছোটবেলা থেকেই যদি আমাদের শেখানো হয় যে, একটি বড় গাছ শুধু গাছ নয়, শহরের অবকাঠামোর অংশ, তাহলে বড় হয়ে আমাদের কাছে রাস্তা তৈরির সময় গাছ কেটে ফেলা প্রথম সমাধান হবে না। সংস্কৃতি তৈরি হয় যখন একটি আচরণ বারবার করা হয়, প্রতিষ্ঠান সেই আচরণকে সমর্থন করে, সমাজর সেটিই প্রত্যাশা করে এবং পরবর্তী প্রজন্ম সেটিকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করে।

তাই বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিককে পরিবেশপ্রেমী বানানোর প্রকল্পে আমাদের নামার প্রয়োজন নেই। আমাদের বরং এমন বাংলাদেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে পরিবেশ রক্ষা করাই স্বাভাবিক কাজ।

যেখানে গাছ কাটার আগে তার মূল্য হিসাব করা হবে। যেখানে জলাভূমিকে খালি জমি নয়, পানি ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো হিসেবে দেখা হবে। যেখানে পাহাড়কে উন্নয়নের জন্য সরিয়ে দেওয়ার জায়গা নয়, প্রাকৃতিক সুরক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। যেখানে গাছ লাগানোর চেয়ে গাছ বাঁচানোর সাফল্য বেশি গুরুত্ব পাবে।

নেপালের সেই আমগাছটি কোনও পরিবেশ প্রকল্পের অংশ ছিল না। কেউ হয়তো তার সামনে দাঁড়িয়ে বলেনি, ‘এই গাছ একদিন আমাদের বাঁচাবে।’

কিন্তু পাহাড় থেকে যখন পানি, কাদা আর পাথরের স্রোত নেমে এলো— তখন সেই সাধারণ গাছটিই একজন মানুষের জন্য হয়ে উঠল জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানের শেষ আশ্রয়। প্রকৃতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এটাই— সে আমাদের প্রতিদিন নীরবে নানানভাবে সেবা দিয়ে যায়।

আমরা তার মূল্য বুঝি না, কারণ কাজ শেষে সে আমাদের হাতে কোনও বিল ধরিয়ে দেয় না। কেবল বিপদ এলে তখনই বুঝি, প্রকৃতি কতটা প্রয়োজনীয় ছিল। তাই আরেকটি দুর্যোগের অপেক্ষা করে গাছের মূল্য বুঝতে হবে না। আরেকটি ভয়াবহ জলাবদ্ধতার পর জলাভূমির প্রয়োজনীয়তা আবিষ্কার করতে হবে না। আরেকটি ভূমিধসের পর পাহাড়ের গুরুত্ব উপলব্ধি করারও দরকার নেই।

আধুনিক, বুদ্ধিমান সমাজ দুর্যোগের পর বড় বাঁধ বানানোর চেয়ে দুর্যোগের আগে প্রকৃতির তৈরি বাঁধগুলো রক্ষা করে। নেপালের সেই আমগাছটি একজন মানুষকে বাঁচিয়েছে। আমাদের কাজ হলো— তার মতো হাজার হাজার গাছ, জলাভূমি, পাহাড় ও প্রাকৃতিক ব্যবস্থা যেন আমাদের বাঁচিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়।

লেখক: কমিউনিকেশন, কালচার ও করপোরেট দায়িত্বশীলতা পেশায় নিয়োজিত