সার নেই, বিদ্যুৎ নেই: কৃষির সামনে জোড়া বিপদ 

এম এম মুসা
২৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এখন বাংলাদেশের ধানক্ষেতেও পৌঁছে গেছে। হরমুজ প্রণালিতে সাত মাস ধরে যে অস্থিরতা চলছে, তার ঢেউ এসে লাগছে কুমিল্লার সেচপাম্পে, রাজশাহীর বোরো জমিতে, আর দিনাজপুরের সারের দোকানে। এই সংযোগ চোখে দেখা যায় না, কিন্তু এর প্রভাব প্রতিটি কৃষকের হিসাবের খাতায় স্পষ্ট।

বিশ্বব্যাংকের এপ্রিল ২০২৬ সালের কমোডিটি মার্কেট আউটলুক বলছে, চলতি বছর বৈশ্বিক সারের দাম গড়ে ৩০ শতাংশের বেশি বাড়বে। ইউরিয়ার দাম বাড়বে প্রায় ৬০ শতাংশ। মার্চেই ইউরিয়ার আন্তর্জাতিক দাম মাসওয়ারি ৫৩ শতাংশ বেড়ে টনপ্রতি ৭২৫ ডলার ছুঁয়েছে—যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। কারণ একটাই—বিশ্বের সমুদ্রপথে সারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পরিবহন হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে, আর সেই পথ এখন যুদ্ধের কারণে অনিশ্চিত। প্রাকৃতিক গ্যাস ইউরিয়া উৎপাদনের মূল কাঁচামাল, তার দামও বেড়েছে একই কারণে।

বাংলাদেশের জন্য এই সংকট বিশেষভাবে বিপজ্জনক। কারণ দেশের ইউরিয়া সরবরাহের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে—ঠিক যে অঞ্চল দিয়ে যুদ্ধের আঁচ ছড়িয়ে পড়ছে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে, ইউরিয়ার মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদনে গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে। এটি নতুন কোনও ভবিষ্যদ্বাণী নয়—দেশের ভেতরেই এর লক্ষণ স্পষ্ট।

আগস্টে সারা দেশে সার নিয়ে যে অস্থিরতা দেখা গেছে, তার পেছনে দুটি কারণ জড়িয়ে আছে। একদিকে সরকার বলছে, গুদামে পর্যাপ্ত মজুত আছে, সংকট কৃত্রিম। অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের কৃষকেরা বলছেন, তারা বাড়তি দামে কালোবাজার থেকে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। দুটো কথাই হয়তো সত্য। সরবরাহ থাকা আর সেই সরবরাহ কৃষকের হাতে পৌঁছানো—এই দুইয়ের মধ্যে বিরাট ফাঁক তৈরি হয়েছে। ডিলার-খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে বরাদ্দ নিয়ে যে দ্বন্দ্ব চলছে, তার মাশুল গুনছেন আমন মৌসুমের কৃষক। কৃষি মন্ত্রণালয় সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলেছে, কমিটিও হয়েছে। কিন্তু কাঠামোগত সমস্যার সমাধান শুধু কমিটি দিয়ে হয় না।

বিদ্যুৎ সংকটের গল্পটাও প্রায় একই সুতোয় বাঁধা। দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা পাঁচ হাজার দুইশত মেগাওয়াট থেকে নেমে এসেছে সাড়ে তিন হাজারে। একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর সরবরাহ আরও কমেছে। আগস্টের মাঝামাঝি লোডশেডিং সাড়ে তিন হাজার সাতশত মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে—একদিনে গ্যাসের চাহিদা ছিল আড়াইশত কোটি ঘনফুট, সরবরাহ মিলেছে মাত্র সত্তর কোটি ঘনফুট। এই ঘাটতির প্রথম শিকার গ্রামের সেচপাম্প। কুমিল্লার বুড়িচংয়ে একজন সেচপাম্প মালিক দিনে সাত-আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ না পেয়ে বোরো ক্ষেতে সময়মতো পানি দিতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন। রাজশাহী অঞ্চলে জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদামতো বিদ্যুৎ না পাওয়ায় বোরো চাষ ঝুঁকিতে পড়েছিল। এপ্রিলে হাজার হাজার সেচপাম্প বন্ধ থাকার খবরও এসেছিল সংবাদমাধ্যমে।

এই দুই সংকট একসঙ্গে এলে ফল হয় ভয়ংকর। সার না পেলে ফলন কমে। বিদ্যুৎ না পেলে সময়মতো সেচ হয় না, আর দেরিতে সেচ দিলে ফলন কমে আরও বেশি। দুটো একসঙ্গে ঘটলে কৃষকের খরচ বাড়ে, ঝুঁকি বাড়ে, আর ফলনের নিশ্চয়তা থাকে না। এই বছর বোরো মৌসুমে আগাম বন্যা আর প্লাবনে হাওরাঞ্চলের ধান নষ্ট হয়েছিল, তার ওপর সেচ সংকট যোগ হয়েছিল। এখন আমন মৌসুমে সারের অনিশ্চয়তা যোগ হলো। একটার পর একটা ধাক্কা—কৃষক সামলাতে পারছেন না।

বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক থাকার যথেষ্ট কারণ আছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০২৭ সালে দাম কিছুটা কমবে, তবে তা নির্ভর করছে যুদ্ধ কতদিন চলে তার ওপর। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বা হরমুজ প্রণালিতে ফের উত্তেজনা বাড়লে, ইউরিয়ার দাম ২০২২ সালের রেকর্ড—টনপ্রতি সাতশত ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। সেবার বিশ্ব সার সংকটে পড়েছিল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে। এবার কারণ ভিন্ন, ফল একই। বাংলাদেশের মতো আমদাননির্ভর দেশের জন্য এই অনিশ্চয়তা মানে ভর্তুকির বোঝা বাড়া, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ পড়া, আর শেষ পর্যন্ত কৃষকের ঘাড়ে খরচ চাপা পড়া।

সরকারকে এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। প্রথমত, সারের আমদানি উৎস বৈচিত্র্যকরণ জরুরি। শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর নির্ভর না করে মিসর, নাইজেরিয়া বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উৎপাদক দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, দেশের নিজস্ব ইউরিয়া কারখানাগুলো—যেগুলো গ্যাস সংকটে মাঝে-মধ্যেই বন্ধ থাকে—তাদের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক গ্যাস বরাদ্দ নিশ্চিত করা দরকার। তৃতীয়ত, সেচ মৌসুমে বিদ্যুৎ বণ্টনে কৃষিকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। শিল্প ও নগর এলাকার তুলনায় সেচপাম্প চালানোর সময়টুকু নির্দিষ্ট করে দেওয়া গেলে, ফলনের ক্ষতি অনেকটাই এড়ানো যায়। প্রতিবেশী দেশগুলোতে কৃষি ফিডারে আলাদা লোডশেডিং সময়সূচি রাখার অভিজ্ঞতা আছে, বাংলাদেশ তা থেকে শিখতে পারে।

সার বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনাও এখন অপরিহার্য। ডিজিটাল ডিলার-বরাদ্দ ট্র্যাকিং, কৃষক পর্যায়ে সরাসরি ভর্তুকি বা স্মার্ট কার্ডভিত্তিক বিতরণ চালু থাকলে কালোবাজারি অনেকটাই ঠেকানো যায়। কৃষি মন্ত্রণালয় ও বিসিআইসি-বিএডিসির মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করতে একটি জরুরি টাস্কফোর্স গঠন করা দরকার, যার হাতে বরাদ্দ, তদারকি আর শাস্তির ক্ষমতা—সব একসঙ্গে থাকবে। শুধু কমিটি গঠন করে দায় সারলে চলবে না।

দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশকে সারনির্ভরতা কমানোর পথ খুঁজতে হবে। জৈব সার ব্যবহার বাড়ানো, মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে সুষম সার প্রয়োগ, আর পানিসাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়া গেলে রাসায়নিক সার ও বিদ্যুতের ওপর চাপ কমে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ চালিত সেচপাম্পের সংখ্যা বাড়ানো উচিত—জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃষককে কিছুটা হলেও স্বনির্ভর করা যায়।

এই সংকট শুধু কৃষি মন্ত্রণালয়ের একার সমস্যা নয়। জ্বালানি, বাণিজ্য, অর্থ আর কৃষি— এই চার মন্ত্রণালয়কে এক টেবিলে বসিয়ে একটি সমন্বিত খাদ্য নিরাপত্তা কৌশল তৈরি করতে হবে, যার লক্ষ্য হবে আগামী দুই মৌসুম। সময়টা বেশি নেই। আমন মৌসুমের ফলাফল কয়েক মাসের মধ্যেই বোঝা যাবে, আর বোরো মৌসুম শুরু হবে আরও কয়েক মাস পরে। প্রস্তুতি এখনই নিতে হবে, নইলে ফসল ঘরে ওঠার আগেই সংকট ঘরে ঢুকে পড়বে।

কৃষক সবসময় ঝুঁকি নেন—আবহাওয়ার, বাজারের, প্রকৃতির। কিন্তু সার আর বিদ্যুতের মতো মৌলিক জিনিস সময়মতো না পাওয়ার ঝুঁকিটা তার একার বহন করার কথা নয়। এই দায় রাষ্ট্রের। যুদ্ধ হয়তো বাংলাদেশের সীমানার বাইরে, কিন্তু তার প্রভাব এসে পড়ছে দেশের ভেতরের মাটিতে। এখনই প্রস্তুতি না নিলে আগামী ফসল কাটার সময় খালি গোলার দৃশ্য দেখতে হতে পারে।

লেখক: উন্নয়নকর্মী ও গবেষক

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
মেসিরা পেলেন নতুন আর্জেন্টাইন কোচ
মেসিরা পেলেন নতুন আর্জেন্টাইন কোচ
জুতা সাজিয়ে রাখবেন না, প্যারামেডিকদের অদ্ভুত আবেদন
জুতা সাজিয়ে রাখবেন না, প্যারামেডিকদের অদ্ভুত আবেদন
নারী এশিয়া কাপ শুরু, ২০১৮ ফেরাতে পারবে কি বাংলাদেশ
নারী এশিয়া কাপ শুরু, ২০১৮ ফেরাতে পারবে কি বাংলাদেশ
হিমালয়ে উষ্ণতা বাড়ছে, হিমবাহ গলছে: নেপালের বন্যা কি ভয়াবহ ভবিষ্যতের ইঙ্গিত
হিমালয়ে উষ্ণতা বাড়ছে, হিমবাহ গলছে: নেপালের বন্যা কি ভয়াবহ ভবিষ্যতের ইঙ্গিত
সর্বশেষসর্বাধিক