৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। দিনটি এলেই গুমের শিকার মানুষদের আমরা স্মরণ করি। তাঁদের পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষার কথা বলি। সত্য উদ্ঘাটন ও বিচারের দাবি জানাই। এসব দাবি অবশ্যই জরুরি। কিন্তু এর সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নও সামনে আনা দরকার— বিচার চলবে, সত্য উদ্ঘাটনে সময় লাগবে, সেই অপেক্ষার সময়টুকু গুমের শিকার পরিবারগুলো কীভাবে বাঁচবে?
একজন মানুষ গুম হলে শুধু একজন মানুষই হারিয়ে যান না। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকেও হারাতে হয়। তাঁর স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা কিংবা অন্য নির্ভরশীল স্বজনেরা হঠাৎ করে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যান। সংসারের আয় বন্ধ হয়ে যায়। সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, খাবার ও বাড়িভাড়ার মতো নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরও গভীর এক যন্ত্রণা—অনিশ্চয়তা। মানুষটি কোথায়? তিনি কি বেঁচে আছেন? তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছে? তাঁকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল? তিনি কি কোনোদিন ফিরে আসবেন?
বছরের পর বছর এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া একটি পরিবারকে ভেতর থেকে ভেঙে দিতে পারে। মৃত্যুর ক্ষেত্রে অন্তত একটি পরিণতি জানা যায়। মানুষ শোক করতে পারে, শেষ বিদায় জানাতে পারে, প্রিয়জনের কবরের কাছে যেতে পারে। কিন্তু গুমের ক্ষেত্রে সেই সুযোগটুকুও অনেক পরিবার পায় না। প্রিয়জনকে হারিয়েও তাঁরা নিশ্চিতভাবে শোক করার সুযোগ পান না।
এ কারণেই গুমের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা, ঘটনার তদন্ত করা, কিংবা দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা নয়। বিচার ও সত্য উদ্ঘাটনের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
বাংলাদেশে গুমের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। এসব প্রক্রিয়া অবশ্যই স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ হতে হবে। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয়, পদমর্যাদা কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান যেন বিচারের পথে বাধা না হয়। একইসঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে, একটি তদন্ত শেষ হতে সময় লাগে— বিচার শেষ হতে আরও বেশি সময় লাগতে পারে।
কিন্তু পরিবারের জীবন তো অপেক্ষা করে না। শিশুর স্কুলের বেতন মাস শেষে দিতে হয়। বই-খাতা কিনতে হয়। অসুস্থ হলে চিকিৎসা করাতে হয়। ঘরে প্রতিদিন খাবার জোগাড় করতে হয়। বাড়িভাড়া দিতে হয়। বিচার একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া— কিন্তু জীবনের প্রয়োজনগুলো প্রতিদিনের।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে গুমের শিকার পরিবারগুলোর জন্য সরকার একটি অন্তর্বর্তীকালীন সহায়তা ও পুনর্বাসন কর্মসূচি চালু করতে পারে। এটি কোনোভাবেই চূড়ান্ত ক্ষতিপূরণ নয়, বিচার বা দায় নির্ধারণের বিকল্পও নয়। বরং তদন্ত ও বিচার চলাকালে পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি ব্যবস্থা।
উল্লেখ্য, এর আন্তর্জাতিক নজিরও আছে। পেরুতে ১৯৮০ থেকে ২০০০ সালের সংঘাত ও সহিংসতায় গুমসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের জন্য সমন্বিত ক্ষতিপূরণ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। সেখানে অর্থনৈতিক সহায়তার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন ও অন্যান্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও ছিল। নেপালেও গুমের শিকার পরিবারগুলোর জন্য তদন্ত চলাকালে আর্থিক সহায়তা ও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সুবিধার সুপারিশ করা হয়েছে।
এই অভিজ্ঞতাগুলো থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট— প্রতিকার মানে শুধু অর্থ দিয়ে ক্ষতি পূরণ করা নয়, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে আবার একটি স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ করে দেওয়াও প্রতিকারের অংশ।
বাংলাদেশেও এ ধরনের একটি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা কঠিন হওয়ার কথা নয়। প্রথমে গুমের শিকার পরিবারগুলোর একটি নির্ভরযোগ্য তালিকা তৈরি করে তাঁদের আর্থিক ও সামাজিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা যেতে পারে। পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারানো পরিবার, নির্ভরশীল সদস্যের সংখ্যা এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট মেয়াদে মাসিক অন্তর্বর্তীকালীন সহায়তা দেওয়া যেতে পারে।
এর পাশাপাশি অসহায় পরিবারগুলোর জন্য খাদ্যসহায়তা বা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বিশেষ সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের সন্তানদের পড়াশোনা যাতে বন্ধ না হয়ে যায়, সে জন্য বিশেষ শিক্ষাবৃত্তি, শিক্ষা উপকরণ ও প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষাভাতার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও তাদের জন্য বিশেষ সহায়তার কথা বিবেচনা করা যায়।
চিকিৎসার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন প্রিয়জনের কোনও সন্ধান না পাওয়া, অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা এবং বছরের পর বছর তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার পেছনে ছুটে চলা পরিবারের সদস্যদের ওপর গভীর মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। তাই সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার মাধ্যমে তাঁদের চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।
সবচেয়ে জরুরি হতে পারে একটি ভুক্তভোগী পরিবার সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। তদন্তের অগ্রগতি, আইনি সহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা ও চিকিৎসা— এসব বিষয়ে পরিবারগুলো যেন এক জায়গা থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহায়তা পায়। একই তথ্যের জন্য তাঁদের যেন বারবার বিভিন্ন দপ্তরের দরজায় যেতে না হয়।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া মানে বিচার বন্ধ করা নয়। সন্তানের পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়া মানে অপরাধীর দায় থেকে কাউকে মুক্তি দেওয়া নয়। বরং এর অর্থ হলো—বিচার চলবে, পাশাপাশি পরিবারও বাঁচবে।
কারণ গুমের শিকার পরিবারগুলো শুধু অর্থনৈতিক সহায়তা চায় না। তারা সত্য চায়। জানতে চায়, তাঁদের স্বজনকে কে নিয়ে গিয়েছিল, কোথায় নিয়ে গিয়েছিল, কেন নিয়ে গিয়েছিল এবং তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছিল।
কেউ মারা গিয়ে থাকলে তাঁরা মরদেহ চান। কেউ জীবিত থাকলে তাঁকে খুঁজে বের করার দাবি তাঁদের। আর কেউ রাষ্ট্রীয় হেফাজতে মারা গিয়ে থাকলে সেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং দায়ীদের পরিচয় জানার অধিকার তাঁদের রয়েছে। তাই ক্ষতিপূরণ কখনোই সত্য ও বিচারের বিকল্প হতে পারে না। ক্ষতিপূরণ প্রতিকারের একটি অংশ, সত্য প্রকাশ ও বিচার তার অপরিহার্য ভিত্তি।
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুমবিরোধী কনভেনশনে যোগ দিয়েছে এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে গুমের শিকার পরিবারগুলোর জন্য একটি কার্যকর সহায়তা কর্মসূচি নেওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে।
৩০ আগস্ট আমরা গুমের শিকার মানুষদের স্মরণ করবো। তাঁদের জন্য বিচার চাইবো। সত্য উদ্ঘাটনের দাবি জানাবো। কিন্তু একইসঙ্গে তাঁদের পরিবারের বর্তমান জীবনটিও আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে।
হয়তো কোনও মা এখনও সন্তানের ফিরে আসার অপেক্ষায় আছেন। কোনও স্ত্রী জানেন না— তাঁর স্বামীর কী হয়েছে। কোনও সন্তান বাবাকে ছাড়াই বড় হচ্ছে। কোনও পরিবার বছরের পর বছর আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছে।
এই পরিবারগুলোর কাছে রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু এই নয় যে, একদিন তাঁদের প্রশ্নের উত্তর দেবে। উত্তর পাওয়ার অপেক্ষার সময়টুকুতেও তাঁদের পাশে থাকা। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে তাই বাংলাদেশের একটি অর্থবহ অঙ্গীকার হতে পারে—গুমের শিকার ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা, সত্য উদ্ঘাটন ও বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁর পরিবারকে বেঁচে থাকার মতো একটি জীবনযাপনের সুযোগ করে দেওয়া।
কারণ বিচার পেতে অপেক্ষা করতে হতে পারে, কিন্তু বেঁচে থাকার প্রয়োজনের জন্য কোনও পরিবারকে অপেক্ষা করানো যায় না।
লেখক: মানবাধিকার কর্মী