প্রতিবছর ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিকভাবে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ দিবস পালিত হয়। পৃথিবীব্যাপী এ দিনটিতে বলপূর্বক হারিয়ে যাওয়া মানুষদের স্মরণ করার পাশাপাশি, তাঁদের পরিবারের অনিশ্চয়তা, অপেক্ষা এবং ন্যায়বিচারের দাবিকে রাষ্ট্রের সামনে নতুন করে তুলে ধরার জন্যে নানা আয়োজন করা হয়ে থাকে। গুমের শিকার ব্যক্তি কোথায় আছেন, কী অবস্থায় আছেন, তিনি জীবিত নাকি মৃত, এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া একটি পরিবারকে বছরের পর বছর যে অসহনীয় অবস্থার মধ্যে রাখে, তার পূর্ণ মাত্রা কোনও পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয়। জাতিসংঘের দৃষ্টিতে গুম কেবল একজন ব্যক্তির অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নয়; এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ে তাঁর পরিবার, নিকটজন এবং পুরো সমাজের ওপর। একজন মানুষকে তুলে নিয়ে তাঁর অবস্থান বা পরিণতি গোপন করার মাধ্যমে রাষ্ট্র শুধু তাঁকেই আইনের সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করে না, বরং অন্যদের মধ্যেও ভয়, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে দেয়।
বাংলাদেশে গুমের অভিযোগ বহু পুরোনো এবং অনেক বছর ধরেই রাজনৈতিক ও মানবাধিকার সুরক্ষার প্রশ্নে এটি খুব আলোচিত একটি বিষয়। বিভিন্ন সময়ে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার রাষ্ট্রীয় সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে। কেউ ফিরে এসেছেন, কেউ ফিরে এসে নীরব থেকেছেন, আবার অনেকের কোনও সন্ধান আজও পাওয়া যায়নি। এই বাস্তবতায় গুমকে আলাদা অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে উত্থাপিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ সেই দীর্ঘদিনের আইনি শূন্যতা পূরণের একটি প্রচেষ্টা। বিলটি ২০২৬ সালের ২৭ আগস্ট সংসদে উত্থাপনের পর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। ফলে এখনই এর শক্তি ও দুর্বলতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা জরুরি।
আন্তর্জাতিক আইনে গুম বলতে কেবল কাউকে তুলে নিয়ে নিখোঁজ করে দেওয়াকে বোঝায় না। ২০০৬ সালের ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য প্রটেকশন অব অল পারসনস ফ্রম এনফোর্সড ডিস্যাপিয়ারেন্স অনুযায়ী, রাষ্ট্রের প্রতিনিধি অথবা রাষ্ট্রের অনুমোদন, সহায়তা বা সম্মতিতে কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কাউকে গ্রেফতার, আটক, অপহরণ বা অন্যভাবে স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করার পর সেই ঘটনা অস্বীকার করলে, অথবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থান ও পরিণতি গোপন করে তাঁকে আইনের সুরক্ষার বাইরে রাখলে তা গুম হিসেবে গণ্য হয়। এই সংজ্ঞার তিনটি মূল উপাদান হলো স্বাধীনতা হরণ, রাষ্ট্রীয় সংশ্লিষ্টতা এবং আটক বা অবস্থান অস্বীকার কিংবা গোপন করা। সুতরাং দেখা যায় আন্তর্জাতিক কনভেনশনের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট।
যুদ্ধ, যুদ্ধের হুমকি, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, জরুরি অবস্থা বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রয়োজন, কোনও অবস্থাতেই গুমের বৈধতা দিতে পারে না। একই সাথে প্রতিটি রাষ্ট্রকে গুমকে তার নিজস্ব ফৌজদারি আইনে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের তদন্ত ও বিচারের আওতায় আনতে হবে। শুধু সরাসরি অপরাধী নয়, আদেশদাতা এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ ঊর্ধ্বতন ব্যক্তির দায় নির্ধারণের কথাও কনভেনশনে রয়েছে। অন্যদিকে, গুম যখন কোনো বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালিত ব্যাপক বা পদ্ধতিগত আক্রমণের অংশ হিসেবে সংঘটিত হয়, তখন তা মানবতাবিরোধী অপরাধে পরিণত হতে পারে। রোম সংবিধির ৭ অনুচ্ছেদে গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে রাষ্ট্রের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংগঠনের অনুমোদন, সমর্থন বা সম্মতিতে সংঘটিত গুমকেও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের দৃষ্টিতে কেবল মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা নয়, রাষ্ট্রীয় বা সাংগঠনিক নীতি, পরিকল্পনা ও নির্দেশনার সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বও ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায় বহন করতে পারে।
আমার কাছে বাংলাদেশের প্রস্তাবিত বিলটির সবচেয়ে দিকগুলোর একটি হলো, এতে গুমকে একটি স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কোনও ব্যক্তিকে গ্রেফতার, আটক, অপহরণ বা অন্যভাবে স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করার পর সেই ঘটনা অস্বীকার করা কিংবা তাঁর অবস্থান, অবস্থা বা পরিণতি গোপন করে তাঁকে আইনের সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করাকে গুম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর ফলে গুমের ঘটনাকে সাধারণ নিখোঁজ, অপহরণ বা বেআইনি আটকের ঘটনা হিসেবে দেখিয়ে দায় এড়ানোর পথ কিছুটা সংকুচিত হবে।
পাশপাশি এই বিলে গুমকে চলমান অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। অর্থাৎ গুম হওয়া ব্যক্তির অবস্থান, অবস্থা বা পরিণতি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অপরাধটি চলতে থাকবে। বাংলাদেশের জন্য এটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, বহু পুরোনো গুমের ঘটনায় অভিযুক্তরা সময় অতিবাহিত হওয়ার যুক্তি তুলে দায়মুক্তি চাইতে পারেন। চলমান অপরাধের ধারণা সেই সুযোগ সীমিত করবে এবং নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রের অনুসন্ধানের দায়িত্ব বহাল রাখবে। এ বিধান আন্তর্জাতিক কনভেনশনের উদ্দেশ্য ও গুমের বিশেষ প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আবার বিলটি গুমের দায় শুধু সেই ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি, যিনি সরাসরি কাউকে আটক বা অপহরণ করেছেন, গুমের আদেশদাতা, নির্দেশদাতা, সহায়তাকারী, প্ররোচনাকারী এবং ষড়যন্ত্রকারীকেও মূল অপরাধের জন্য দায়ী করার সুযোগ রাখা হয়েছে। সাক্ষ্যপ্রমাণ বিনষ্ট বা গোপন করা এবং গোপন আটককেন্দ্র নির্মাণ, স্থাপন বা ব্যবহারকেও পৃথক অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে এই বিধানগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, গুম সাধারণত একজন কর্মকর্তার বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্তে ঘটে না। এর সঙ্গে বাহন, স্থাপনা, নজরদারি, যোগাযোগ, জিজ্ঞাসাবাদ, নিরাপত্তা এবং তথ্য গোপনের একটি বিস্তৃত কাঠামো যুক্ত থাকে। উত্থাপিত বিলটিতে কমান্ড রেসপনসিবিলিটি বা ঊর্ধ্বতনের দায়ও স্বীকৃত হয়েছে।
কোনও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অধস্তনদের গুমের বিষয়ে জানতেন, অপরাধের তথ্য সচেতনভাবে উপেক্ষা করেছেন, কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছেন অথবা অপরাধ প্রতিরোধ ও বিচারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেননি, এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁকেও দায়ী করা যাবে। শৃঙ্খলা-বাহিনীর সদস্য নন এমন বেসামরিক ঊর্ধ্বতন ব্যক্তির দায়ের কথাও বলা হয়েছে। আমার মনে হয় এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গুমের বিচার শুধু যাঁরা ধরে নিয়ে গেছেন তাঁদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে ন্যায়বিচার অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আরও ইতিবাচক বিষয় হলো, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, জরুরি পরিস্থিতি বা ঊর্ধ্বতনের আদেশকে গুমের পক্ষে গ্রহণযোগ্য অজুহাত হিসেবে স্বীকার করা হয়নি।
এ আইনের অধীন অপরাধ আমলে নেওয়ার জন্য সরকার বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদনও প্রয়োজন হবে না। ভুক্তভোগী ও তাঁর পরিবারের সত্য জানার অধিকার, তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত হওয়ার অধিকার, আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের অধিকার স্বীকার করা হয়েছে। দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা সম্ভব না হলে রাষ্ট্রকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে। এসব বিধান আন্তর্জাতিক কনভেনশনে স্বীকৃত সত্য, বিচার ও প্রতিকারের অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিলটি নিয়ে আমার কিছু উদ্বেগের জায়গাও রয়েছে। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন শুধু আইনের কঠোর ভাষাই ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো, অভিযোগটি স্বাধীনভাবে তদন্ত হবে কিনা, প্রমাণ সুরক্ষিত থাকবে কিনা এবং বিচার ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত পৌঁছাবে কিনা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে প্রস্তাবিত বিলে কয়েকটি গুরুতর দুর্বলতা রয়েছে। যেমন- এই বিলে ‘সরকারি কর্মচারী’ বলতে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে। কিন্তু মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক উপদেষ্টা, দলীয় নেতা কিংবা আনুষ্ঠানিক পদে না থেকেও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ওপর কার্যকর প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তিরা সরাসরি এই সংজ্ঞার মধ্যে পড়বেন কিনা, তা পরিষ্কার নয়।
শৃঙ্খলা-বাহিনীর সদস্য নন এমন ঊর্ধ্বতন ব্যক্তির দায়ের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু ‘ঊর্ধ্বতন ব্যক্তি’, ‘কার্যকর কর্তৃত্ব’, ‘বাস্তব নিয়ন্ত্রণ’ কিংবা ‘রাজনৈতিক নির্দেশদাতা’র স্পষ্ট সংজ্ঞা নেই। অথচ আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে আনুষ্ঠানিক পদবির চেয়ে বাস্তবে কে কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগ করেছেন, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রোম সংবিধির কাঠামো রাষ্ট্রের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংগঠনের সংশ্লিষ্টতাকেও বিবেচনায় নেয়।
দ্বিতীয় উদ্বেগ ধারা ৪(১)-এ সাংবিধানিক সময়সীমার মধ্যে আটক ব্যক্তিকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হলে, তার আগে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে গ্রেফতার বা অবস্থানের তথ্য গোপন রাখাকে গুম হিসেবে গণ্য না করার সুযোগ রয়েছে। এই ব্যতিক্রম অপব্যবহার হলে আটকের প্রথম ২৪ ঘণ্টা কার্যত গোপন হেফাজতের সময় হয়ে উঠতে পারে। গ্রেফতারের প্রকৃত সময় গোপন রাখা, পরিবার ও আইনজীবীকে তথ্য না দেওয়া, আটকস্থল পরিবর্তন করা কিংবা পরে নথি তৈরি করার ঝুঁকি এখানে থেকে যায়। অথচ আন্তর্জাতিক কনভেনশন স্পষ্টভাবে বলেছে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বা জরুরি পরিস্থিতি গুমের অজুহাত হতে পারে না।
তবে জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনে কোনও তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ সাময়িকভাবে সীমিত করা যেতে পারে, কিন্তু তাই বলে আটক ব্যক্তির অস্তিত্বই গোপন রাখা যায় না। গ্রেফতারের মুহূর্ত থেকে একটি স্বাধীন কেন্দ্রীয় হেফাজত নিবন্ধনে তথ্য সংরক্ষণ করা, আদালত ও মানবাধিকার কমিশনকে অবহিত করা এবং পরিবারের মনোনীত সদস্য বা আইনজীবীকে আটকের কথা জানানো বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। অন্যথায় বৈধ গ্রেফতার এবং গোপন আটকের মধ্যকার সীমারেখা দুর্বল হয়ে যাবে।
তৃতীয় সমস্যা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের একচ্ছত্র ভূমিকা। অভিযোগ কমিশন, থানা বা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে করা গেলেও তদন্ত শেষে কমিশন প্রতিবেদন অনুমোদন না করলে মামলাটি ট্রাইব্যুনালে পৌঁছানোর বাস্তব পথ সংকুচিত হয়ে যায়। ট্রাইব্যুনালও মূলত কমিশনের দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অপরাধ আমলে নেবে। ফলে কমিশন এখানে শুধু তদন্তকারী নয়, বিচারপ্রাপ্তির প্রবেশদ্বারও।
কমিশন যদি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হয়, পর্যাপ্ত জনবল না পায়, তদন্তে বিলম্ব করে বা প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবেদন অনুমোদন না করে, তাহলে কঠোর অপরাধ ও শাস্তির বিধান কাগজে থেকেই যেতে পারে। কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীর কার্যকর বিচারিক প্রতিকার থাকা তাই অপরিহার্য। কমিশন অভিযোগ খারিজ করলে অথবা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে ব্যর্থ হলে ভুক্তভোগীকে সরাসরি ট্রাইব্যুনাল বা হাইকোর্ট বিভাগে যাওয়ার অধিকার দিতে হবে। কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে নিয়োগপ্রক্রিয়া, বাজেট, তদন্তকারী নিয়োগ এবং প্রসিকিউশন ব্যবস্থাকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব থেকে কার্যকরভাবে আলাদা করতে হবে।
আরেকটি উদ্বেগজনক বিধান হলো ঊর্ধ্বতন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তী তদন্ত। ধারা ৯ অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে সন্তোষজনক প্রমাণ না পাওয়া গেলে ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিকে কার্যধারা থেকে অব্যাহতি দেওয়া যেতে পারে। গুমের মতো গোপন ও সংঘবদ্ধ অপরাধে উচ্চপর্যায়ের সম্পৃক্ততার প্রমাণ সাধারণত তদন্তের শুরুতেই পাওয়া যায় না। অধস্তনদের জবানবন্দি, ফোন রেকর্ড, ডিজিটাল যোগাযোগ, কমান্ড কাঠামো, গোপন বাজেট, যানবাহনের তথ্য, একাধিক ঘটনার ধরন এবং পরবর্তী সময়ে প্রমাণ গোপনের প্রচেষ্টা একসঙ্গে বিশ্লেষণ করার পর রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক নির্দেশনার যোগসূত্র প্রকাশ পেতে পারে।
পূর্ণ তদন্তের আগে ঊর্ধ্বতনকে অব্যাহতি দেওয়া হলে প্রয়োজনীয় নথি ও সাক্ষ্য সংগ্রহ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। একই সাথে পূর্ণ বা আংশিক মার্জনার বিধানও সতর্কতার সঙ্গে পুনর্বিবেচনা করা দরকার। গুম হওয়া ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধার, সত্য উদ্ঘাটন বা অন্য অপরাধীদের শনাক্ত করতে কার্যকর সহযোগিতা করলে সাজা হ্রাসের সুযোগ থাকা যৌক্তিক। কিন্তু ‘কার্যকর অবদান’ কী, তা স্পষ্ট নয়। এ অবস্থায় প্রধান পরিকল্পনাকারী বা নির্দেশদাতাও অধস্তন কয়েকজনের নাম প্রকাশ করে পূর্ণ মার্জনা চাইতে পারেন। সর্বোচ্চ পর্যায়ের পরিকল্পনাকারী, আদেশদাতা ও কমান্ডারদের পূর্ণ মার্জনার বাইরে রাখা উচিত। মার্জনার আগে প্রকাশিত তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই এবং ভুক্তভোগী পরিবারের বক্তব্য শোনা বাধ্যতামূলক হওয়া প্রয়োজন।
আবার মিথ্যা ও হয়রানিমূলক অভিযোগের জন্য শাস্তির বিধানটিও ভয় সৃষ্টি করতে পারে। গুমের মামলায় অধিকাংশ প্রমাণ রাষ্ট্রীয় বাহিনী বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকে। ফলে অভিযোগ প্রমাণ করা না যাওয়া মানেই অভিযোগটি মিথ্যা নয়। অভিযোগকারীকে শাস্তি দেওয়ার আগে প্রমাণ করতে হবে যে, তিনি জেনেশুনে, বিদ্বেষমূলক উদ্দেশ্যে এবং মিথ্যা তথ্য বা সাজানো প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগ করেছেন। এই সুরক্ষা না থাকলে নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবার, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী এবং সম্ভাব্য সাক্ষীরা অভিযোগ করতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। অথচ জাতিসংঘ গুমের ঘটনায় পরিবার, সাক্ষী, আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীদের ভয়ভীতি এবং হয়রানিকে বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
প্রস্তাবিত বিলের অধীনে কোনও এমপি বা মন্ত্রীকে বিচারের আওতায় আনা আইনগতভাবে অসম্ভব নয়। যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে, তিনি গুমের আদেশ দিয়েছেন, অনুমোদন বা সম্মতি দিয়েছেন, সহায়তা বা প্ররোচনা দিয়েছেন, ষড়যন্ত্রে অংশ নিয়েছেন অথবা গুম বাস্তবায়নকারী ব্যক্তি বা ইউনিটের ওপর কার্যকর কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগ করেছেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে। একইভাবে, তিনি গুম সম্পর্কে জানতেন কিন্তু অপরাধ প্রতিরোধ, তদন্ত বা বিচারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেননি, এমন প্রমাণ থাকলেও ঊর্ধ্বতনের দায়ের প্রশ্ন উঠবে।
কিন্তু মূল সমস্যা প্রমাণ ও প্রক্রিয়ায়। শুধু মন্ত্রী বা এমপি হওয়া কাউকে ফৌজদারিভাবে দায়ী করার জন্য যথেষ্ট নয়। দেখাতে হবে, সংশ্লিষ্ট অপরাধের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, জ্ঞান, সম্মতি, নির্দেশনা বা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার যোগসূত্র ছিল। একজন সাধারণ এমপির কোনও বাহিনীর ওপর আনুষ্ঠানিক কমান্ড নাও থাকতে পারে। একজন মন্ত্রীও দাবি করতে পারেন— সংশ্লিষ্ট বাহিনী অপারেশনালভাবে তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল না। যেহেতু গুমের নির্দেশ সচরাচর লিখিতভাবে দেওয়া হয় না, তাই প্রত্যক্ষ প্রমাণের অভাবে রাজনৈতিক নির্দেশদাতা দায় এড়িয়ে যেতে পারেন। এই বাধা দূর করতে বিলে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক উপদেষ্টা এবং আনুষ্ঠানিক পদে না থেকেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তিদের স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শুধু ‘জানতেন’ নয়, পারিপার্শ্বিকতা ও নিজের দায়িত্বের কারণে ‘জানার কথা ছিল’ এমন ব্যক্তিকেও জবাবদিহির আওতায় আনার মানদণ্ড প্রয়োজন। নীতি, পরিকল্পনা, বাজেট, নিয়মিত ব্রিফিং, ঘটনার ধারাবাহিকতা, অপরাধীদের পদোন্নতি বা সুরক্ষা এবং পরবর্তী প্রমাণ গোপনের আচরণকে পরিস্থিতিগত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনার স্পষ্ট বিধান থাকা দরকার।
ক্ষমতাসীন সরকারের কোনো মন্ত্রী বা প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে স্বাধীন বিশেষ প্রসিকিউটর নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা উচিত। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তি যাতে তদন্তকারী, সাক্ষী, নথি কিংবা সংশ্লিষ্ট বাহিনীর ওপর প্রভাব বিস্তার করতে না পারেন, সে জন্য তদন্ত চলাকালে তাঁর প্রশাসনিক বা অপারেশনাল ক্ষমতা সীমিত করার বিচারিক ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। অন্যথায় আইনে রাজনৈতিক ঊর্ধ্বতনের দায় লেখা থাকলেও বাস্তবে বিচার মাঠপর্যায়ের সদস্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে।
প্রস্তাবিত বিলে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড, যাবজ্জীবন এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে অপরাধ দমনে শাস্তির কঠোরতার চেয়ে তদন্ত ও বিচারের নিশ্চয়তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তি প্রমাণের উচ্চমান, ন্যায়বিচার এবং ভুল রায়ের ঝুঁকি নিয়ে আলাদা প্রশ্ন তৈরি করে।তাই গুমের বিচারকে বিশ্বাসযোগ্য করতে স্বাধীন তদন্ত, সাক্ষী সুরক্ষা, ডিজিটাল ও ফরেনসিক প্রমাণ সংরক্ষণ, আটক নিবন্ধন, বিচারিক তদারকি এবং ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত সমানভাবে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।
আমার মনে হয়, একটি কার্যকর গুমবিরোধী আইন কখনো প্রতিহিংসার হাতিয়ার হতে পারে না, আবার রাষ্ট্রীয় অপরাধের দায় আড়াল করার ঢালও হতে পারে না। আইনটি এমন হতে হবে— যাতে নির্দোষ ব্যক্তি সুরক্ষা পান, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীরা ভয় ছাড়াই কথা বলতে পারেন এবং পদমর্যাদা বা রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে প্রকৃত দায়ী ব্যক্তির বিচার হয়।বাংলাদেশের সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে। প্রস্তাবিত বিলের ইতিবাচক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করে কমিশনের স্বাধীনতা, ভুক্তভোগীর সরাসরি বিচারপ্রাপ্তি, গোপন আটক প্রতিরোধ, রাজনৈতিক ঊর্ধ্বতনের দায় এবং সাক্ষী সুরক্ষার বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান যোগ করা সম্ভব। কিন্তু আইন প্রণয়নের সাফল্য কেবল সংসদে বিল পাসের মাধ্যমে পরিমাপ করা যাবে না। সাফল্যের প্রকৃত মানদণ্ড হবে, নিখোঁজ মানুষের পরিবার সত্য জানতে পারছে কিনা, গোপন আটককেন্দ্রের অস্তিত্ব চিরতরে বন্ধ হচ্ছে কি না এবং গুমের নির্দেশ যে স্তর থেকেই আসুক, আইন সেখানে পৌঁছাতে পারছে কি না।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব লেস্টার, যুক্তরাজ্য




