উপনিবেশ-পরবর্তী সমকালীন বিশ্বে সরাসরি ভূখণ্ড দখল বা শাসনের ধরন অনেকটাই রূপান্তরিত হয়ে এখন সূক্ষ্ম প্রভাব বিস্তারের কৌশলে পরিণত হয়েছে। উন্নয়ন সহায়তা যা সাধারণত দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার মহৎ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হতো, তা ক্রমেই একটি নিয়ন্ত্রণমূলক হাতিয়ার হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। এই সহায়তার সঙ্গে যুক্ত শর্তাবলি এবং বণ্টন পদ্ধতি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, উন্নত দেশগুলো তাদের বৈশ্বিক প্রভাব বজায় রাখতে এটিকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করে। ফলে বৈদেশিক সহায়তার প্রকৃতি ও প্রভাবকে বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা জরুরি।
এখন দেখা যাক, উন্নয়ন সহায়তার বৈশ্বিক চিত্র। ২০২৪ সালে মোট সরকারি উন্নয়ন সহায়তা (ওডিএ) পরিমাণ ছিল প্রায় ২৫৫ বিলিয়ন ডলার— যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে প্রায় ৩০ শতাংশ সহায়তা প্রদান করে এবং জার্মানি, যুক্তরাজ্য, জাপান ও ফ্রান্স এই পাঁচটি দেশ মোট সহায়তার প্রায় ৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। সহায়তার প্রধান প্রাপক হিসেবে আফ্রিকার দেশগুলো, সংঘাতপ্রবণ রাষ্ট্র (যেমন ইউক্রেন) এবং নিম্ন আয়ের অর্থনীতি যেমন- বাংলাদেশ, ইথিওপিয়া, আফগানিস্তান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একইসঙ্গে সহায়তার বড় অংশ কৌশলগত ও রাজনৈতিক গুরুত্বসম্পন্ন দেশগুলোর দিকেও প্রবাহিত হচ্ছে, যেমন- ইউক্রেন একাই মোট সহায়তার উল্লেখযোগ্য অংশ (১০-১২ শতাংশ এর বেশি) পেয়েছে। ফলে ২০২৪ সালের চিত্রে দেখা যায়, বৈদেশিক সহায়তা প্রধানত দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে লক্ষ্য করলেও এর বণ্টন সম্পূর্ণভাবে প্রয়োজনভিত্তিক নয়, বরং ভূরাজনৈতিক অগ্রাধিকার ও কৌশলগত স্বার্থও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এখন উন্নয়ন সহায়তার সমালোচনা দিকে আলোকপাত করা যাক। উন্নয়ন সহায়তার অন্যতম বড় সমালোচনা হলো— এটি প্রাপ্য দেশগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল করে তোলে। শর্তযুক্ত সহায়তায় প্রাপ্য দেশকে দাতার দেশ থেকেই পণ্য বা সেবা কিনতে বাধ্য করা হয়। এর ফলে দাতা দেশের শিল্প খাত অযৌক্তিক সুবিধা পায় এবং প্রাপ্য দেশের নিজস্ব উন্নয়ন অগ্রাধিকার বাধাগ্রস্ত হয়।
উদাহরণস্বরূপ, ২০১০ সালের ভূমিকম্পের পর যুক্তরাষ্ট্র হাইতিকে যে সহায়তা দেয়, তাতে মার্কিন চাল কিনতে বাধ্য করা হয়। এতে তাৎক্ষণিক সংকট কিছুটা লাঘব হলেও হাইতির স্থানীয় ধান উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দেশটি আমদানিনির্ভর খাদ্য ব্যবস্থার দিকে আরও ঝুঁকে পড়ে। একইভাবে, ইউরোপীয় সহায়তা পাওয়া অনেক আফ্রিকান দেশকে ইউরোপীয় কোম্পানি থেকে কৃষি উপকরণ কিনতে বাধ্য করা হয়, যা বাণিজ্য বৈষম্য ও নির্ভরশীলতা বাড়ায়।
এছাড়া আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সহায়তা প্রায়ই দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দাতা দেশগুলো সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়াই প্রাপ্য দেশকে নিজেদের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে চাপ প্রয়োগ করে। মিশর এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ, যা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার অন্যতম বৃহৎ প্রাপক। ১৯৭৮ সালের ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র মিশরের নীতিনির্ধারণে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়া ও সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করে আসছে। একইভাবে, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) অবকাঠামো অর্থায়নের মাধ্যমে রাজনৈতিক নির্ভরশীলতা তৈরি করছে এমন অভিযোগও রয়েছে।
উন্নয়ন সহায়তা অনেক সময় দাতা দেশের সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও শাসনব্যবস্থার মানদণ্ডও প্রাপ্য দেশের ওপর আরোপ করে। যদিও এগুলোকে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের মতো সর্বজনীন মূল্যবোধের সমর্থন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, বাস্তবে এগুলো স্থানীয় সংস্কৃতি ও অগ্রাধিকারকে উপেক্ষা করে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন সৃষ্টি করে। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে পশ্চিমা সহায়তা প্রায়ই নির্দিষ্ট শাসন কাঠামো বা সামাজিক নীতিমালা যেমন- সরকারি সেবার বেসরকারিকরণ বা নির্দিষ্ট সামাজিক অধিকার বাস্তবায়নের শর্তে প্রদান করা হয়।
অন্যদিকে, উন্নয়ন সহায়তার নামে দেওয়া ঋণ অনেক সময় দেশগুলোকে অসহনীয় ঋণের ফাঁদে ফেলে— যা তাদের নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করে। এ ঘটনাকে ‘ডেট-ট্র্যাপ ডিপ্লোমেসি’ বলা হয়।
কেনিয়ার স্ট্যান্ডার্ড গেজ রেলপথ প্রকল্প, যা চীনা ঋণে নির্মিত, দেশটিকে বিপুল ঋণের বোঝায় ফেলেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর সম্ভাব্য বিদেশি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উন্নয়ন সহায়তার প্রচলিত বয়ান প্রায়ই বৈশ্বিক ক্ষমতার বৈষম্যকে আড়াল করে। সহায়তাকে নৈতিক দায়বদ্ধতা হিসেবে উপস্থাপন করে উন্নত দেশগুলো শোষণমূলক সম্পর্কগুলোকে আড়াল করে রাখে। উদাহরণস্বরূপ, ইউরোপীয় ইউনিয়নের আফ্রিকায় সহায়তা বাণিজ্য চুক্তির সঙ্গে যুক্ত, যা আফ্রিকান দেশগুলোকে ইউরোপীয় পণ্যের জন্য বাজার উন্মুক্ত করতে বাধ্য করে, অথচ তাদের নিজস্ব পণ্যের জন্য সমান সুযোগ প্রদান করে না। ফলে কাঠামোগত বৈষম্য আরও দৃঢ় হয় এবং ইউরোপের অর্থনৈতিক প্রাধান্য বজায় থাকে।
বাংলাদেশের মতো একটি দেশের ক্ষেত্রে নব্য সাম্রাজ্যবাদের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি সুসমন্বিত কৌশল প্রয়োজন, যেখানে অভ্যন্তরীণ নীতি সংস্কার, কৌশলগত আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে।
প্রথমত, সহায়তার উৎস বৈচিত্র্যকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি নির্দিষ্ট দাতা বা জোটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা শর্ত আরোপের ঝুঁকি বাড়ায়। বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো দ্বিপাক্ষিক অংশীদারদের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। এসব সম্পর্ক অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখলেও প্রায়ই শর্তযুক্ত। তাই অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে এই নির্ভরশীলতা কমানো যেতে পারে।
সেই সঙ্গে আঞ্চলিক উদ্যোগ থেকে সহায়তার সুযোগ খোঁজা জরুরি। ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। ঢাকার মেট্রোরেল প্রকল্প, যা জাপানের সহায়তায় বাস্তবায়িত, প্রমান করে যে, সঠিক অংশীদার নির্বাচন উন্নয়ন ফলাফলকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
পাশাপাশি, সহায়তার শর্ত নিয়ে কৌশলগতভাবে দরকষাকষি করতে হবে। বৈশ্বিক উন্নয়ন লক্ষ্য যেমন- টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এডিজিএস) এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে সহায়তা গ্রহণ করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ প্রধান প্রধান ঋণ গ্রহণকারি প্রতিষ্ঠানের দরকষাকষির সক্ষমতা বাড়াতে হবে— যাতে ক্ষতিকর শর্ত শনাক্ত ও প্রত্যাখ্যান করা যায়।
সেই সঙ্গে, আঞ্চলিক জোট জোরদার করা গুরুত্বপূর্ণ। সার্ক ও বিমসটেকের মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করলে বহিঃনির্ভরতা কমানো সম্ভব।
অধিকন্তু, সহায়তা প্রকল্পে স্থানীয় মালিকানা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। স্থানীয় চাহিদা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে প্রকল্পগুলো আরও কার্যকর হয় এবং বিদেশি পরামর্শকের ওপর নির্ভরতা কমে। বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি)-এর একটি সফল উদাহরণ, যেখানে বহুদাতা সহায়তা থাকলেও স্থানীয় নেতৃত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে।
বর্তমান বৈদেশিক সহায়তা কাঠামো অনেকাংশে সাম্রাজ্যবাদী প্রভাবের ধারাবাহিকতা বহন করে— যা মানবিক সহায়তার আড়ালে অর্থনৈতিক নির্ভরতা, রাজনৈতিক প্রভাব, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এবং ঋণের ফাঁদ সৃষ্টি করে। প্রকৃত উন্নয়ন অর্জনের জন্য প্রয়োজন এই নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো ভেঙে সহায়তাকে শোষণের হাতিয়ার নয়, বরং ক্ষমতায়নের উপকরণ হিসেবে পুনর্গঠন করা। নব্য সাম্রাজ্যবাদের এই সূক্ষ্ম রূপ মোকাবিলায় সচেতনতা, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানই হতে পারে প্রধান হাতিয়ার। অন্যথায়, উন্নয়নের নামে নির্ভরতার নতুন চক্র থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন হয়ে উঠবে।
লেখক: একজন জনপ্রশাসন ও জননীতি বিশ্লেষক