সমতার বৈপরীত্য এবং সম্মিলিত দায় 

রংপুরের পীরগঞ্জের একটি ছোট্ট গ্রামের কৃষক দুলাল মিয়া। তার জীবনে সকালের সূর্য ওঠার অর্থ— যুদ্ধ করে বেঁচে থাকার নতুন এক দিন। কিন্তু গত সপ্তাহের একটি তিক্ত অভিজ্ঞতা তার কাছে সমগ্র রাষ্ট্রব্যবস্থার নির্মম এক প্রতিচ্ছবি হয়ে ধরা দিয়েছে। তার ফসলি জমির ওপর দিয়ে একটি গ্রামীণ রাস্তা সম্প্রসারণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।

অথচ এই প্রকল্প যখন পরিকল্পনাধীন ছিল, তখন নীতিনির্ধারণী টেবিলে বসা কেউ একবারও দুলাল মিয়া বা তার মতো শত শত প্রান্তিক কৃষকের কাছে জানতে চাননি যে, এই পরিবর্তন তাদের জীবনযাত্রায় কী প্রভাব ফেলবে। ফাইলবন্দি কিছু সিদ্ধান্ত এবং আমলাতান্ত্রিক প্রটোকলের বেড়াজাল যেন তার এবং তার পরিবারের জীবিকার ওপর এক অদৃশ্য বুলডোজার চালিয়ে দিয়েছে।

দুলাল মিয়ার এই দীর্ঘশ্বাস কেবল একজন ব্যক্তির একক বেদনা নয়— এটি আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রে যুগ যুগ ধরে চলে আসা এক গভীর কাঠামোগত বৈষম্যের জীবন্ত দলিল। জন্ম, বর্ণ, ধর্ম, জাতিগোষ্ঠী, সামাজিক অবস্থান, অর্থনৈতিক অবস্থা কিংবা শিক্ষাগত যোগ্যতা— কোনও কিছু দিয়েই মানুষের মানবিক মর্যাদা নির্ধারিত হতে পারে না। প্রশ্ন হলো, আমরা যারা নিজেদের আধুনিক ও সচেতন নাগরিক বলে দাবি করি, তারা কি কখনও ভেবে দেখেছি, কেন দুলাল মিয়ার মতো মানুষগুলো প্রতিনিয়ত রাষ্ট্র নামক বিশাল যন্ত্রের নিচে পিষ্ট হন?

মানবতার এই শাশ্বত বাণী কোনও আধুনিক আবিষ্কার নয়, এটি মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই বিভিন্ন ধর্ম ও দর্শনের মূল ভিত্তি হিসেবে প্রোথিত রয়েছে। ইসলাম ধর্মের ঐতিহাসিক শিক্ষা ও আদর্শে মানুষের সমতার বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে মূর্ত হয়ে উঠেছে। মহানবী (সা.) তার বিখ্যাত বিদায় হজের ভাষণে মানবজাতির সামনে এক অতুলনীয় সমতার ঘোষণা দিয়েছিলেন।

সেখানে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছিল যে, কোনও আরববাসীর ওপর কোনও অ-আরববাসীর, কিংবা কোনও শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তির ওপর কোনও কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির কোনও শ্রেষ্ঠত্ব নেই। সবার শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা কেবল তাদের তাকওয়া বা নৈতিক চরিত্র এবং মানবিক গুণাবলির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ঠিক একইভাবে, হিন্দু ধর্মের প্রাচীন ও সনাতন দর্শনে বসুধৈব কুটুম্বকম বা সমগ্র পৃথিবী একটি একক পরিবার এবং প্রতিটি জীব বা মানুষের মধ্যে পরমাত্মার বা ঐশ্বরিক সত্তার উপস্থিতি রয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়েছে, যা ধনী-দরিদ্র কিংবা উচ্চ-নিচ ভেদাভেদকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে।

বৌদ্ধ ধর্মে গৌতম বুদ্ধ তৎকালীন কঠোর জাতিভেদ প্রথা বা বর্ণপ্রথার বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক ও আপসহীন সংগ্রাম পরিচালনা করেছিলেন এবং সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের জন্য সমান সম্মান ও আধ্যাত্মিক মুক্তির দরজা উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। খ্রিস্টধর্মেও ঈশ্বরকে মানবজাতির পরম পিতা এবং সব মানুষকে তার সন্তান হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, যেখানে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা এবং সমতার বার্তা প্রচার করা হয়েছে। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি প্রধান ধর্ম এবং দার্শনিক মতবাদ মানুষের অন্তর্নিহিত মর্যাদাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছে এবং কোনও রকম বৈষম্য ছাড়াই প্রতিটি মানুষকে সমানভাবে মূল্যায়ন করার তাগিদ দিয়েছে। কিন্তু ঐতিহাসিক সত্য হলো— ধর্মগুলোকে আমরা ব্যক্তিগত বিশ্বাসে রূপান্তর করলেও এর সাম্যবাদী ও মানবিক দর্শনকে বারবার প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের বলি বানিয়েছি।

ধর্মীয় ও নৈতিক এই বোধের আধুনিক রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপায়ণ ঘটেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর হাত ধরে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ববাসীর সম্মিলিত আকর্ষণে জাতিসংঘ কর্তৃক ১৯৪৮ সালে গৃহীত সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা বা ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটসের প্রথম অনুচ্ছেদেই অত্যন্ত জোরালোভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে, সব মানুষ স্বাধীনভাবে সমান মর্যাদা এবং অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। তাদের বিবেক ও বুদ্ধি রয়েছে এবং সবারই একে অপরের প্রতি ভ্রাতৃত্বসুলভ মনোভাব নিয়ে আচরণ করা উচিত। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত চুক্তি বা ইন্টারন্যাশনাল কোভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস (আইসিসিপিআর) এবং জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজির দশ নম্বর লক্ষ্যে (এসডিজি) দেশগুলোর ভেতরে ও মধ্যকার অসমতা কমিয়ে আনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। আমাদের নিজেদের জাতীয় পরিমণ্ডলেও এই নীতির শক্তিশালী সাংবিধানিক ভিত্তি রয়েছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করা হয়েছে যে, সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। এছাড়া সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, কেবল ধর্ম, গোত্র, বর্ণ, নারী-পুরুষ ভেদাভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনও নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করবে না।

সাংবিধানিক এবং আন্তর্জাতিক এই আইনগত কাঠামোগুলো আমাদের স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, সমতা কোনও অনুগ্রহ নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের জন্মগত ও আইনগত অধিকার। কিন্তু কাগজে কলমে থাকা এই অধিকারগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সময় কি এখনও আমাদের হয়নি?

কেন আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রে এখনও পদে পদে বৈষম্য দৃশ্যমান এবং কেন আমলাতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক সুবিধাগুলো গুটিকয়েক মানুষের হাতে কুক্ষিগত থাকে? এর উত্তর খুঁজতে আমাদের প্রবেশ করতে হবে আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের গভীর গবেষণার জগতে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং আইভি লিগ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষক ও পণ্ডিতেরা এই বিষয়ে যুগান্তকারী গবেষণা পরিচালনা করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ এবং অধ্যাপক ড্যারন এসেমোগলু এবং তাদের সহকর্মীদের দীর্ঘমেয়াদী প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি বিষয়ক গবেষণা, যা তাদের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘হোয়াই নেশনস ফেইল: দ্য অরিজিনস অব পাওয়ার, প্রস্পারিটি অ্যান্ড পভার্টি’ এবং বিভিন্ন গবেষণা পত্রে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে, তা আমাদের চোখ খুলে দেওয়ার মতো। তাদের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, যেসব রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্তিমূলক বা ইনক্লুসিভ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে এবং ক্ষমতার সুষম বণ্টন নিশ্চিত হয়, সে সব দেশ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, শান্তি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন করে। অপরদিকে যেসব রাষ্ট্রে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত থাকে এবং শোষণমূলক ব্যবস্থা টিকে থাকে, সে সব সমাজ ক্রমান্বয়ে ব্যর্থতার দিকে ধাবিত হয়।

এছাড়া ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচার গবেষণা কেন্দ্রগুলোর বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, সমাজে যখন অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য হ্রাস পায় এবং প্রতিটি নাগরিকের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়, তখন অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, সমাজে মানুষের পারস্পরিক আস্থা বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং সার্বিক সুশাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।

প্রিন্সটন এবং কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের গবেষণায়ও একই সত্য বারবার উঠে এসেছে যে, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং সমতাভিত্তিক সমাজ কেবল নৈতিক দিক থেকেই কাম্য নয়— বরং তা একটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক সফলতার পূর্বশর্ত।

সমতা এবং মানবাধিকারভিত্তিক ন্যায়বিচার কীভাবে একটি দেশের আইন-শৃঙ্খলা এবং সামগ্রিক সুশাসনের মানকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত মিলছে বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত ও সফল রাষ্ট্রের চর্চায়। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান বা নরডিক দেশগুলোতে— বিশেষ করে নরওয়ে এবং ফিনল্যান্ডে ন্যায়বিচার ও অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থার পরিবর্তে সামাজিক সমতা এবং পুনর্বাসনভিত্তিক মডেল অনুসরণ করা হয়।

নরডিক কাউন্সিল অব মিনিস্টার্স এবং তুলনামূলক অপরাধবিজ্ঞান বিষয়ক গবেষণায় দেখা গেছে যে, এসব রাষ্ট্রে আয় ও সামাজিক সুযোগের সমতা যত বেশি সুদৃঢ়, সেখানে অপরাধের হার এবং কারাগারের বন্দি সংখ্যা তত কম। এর ফলে রাষ্ট্রকে পুলিশি দমনপীড়নে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয় না, বরং সেই সম্পদ জনকল্যাণ ও সুশাসনে বিনিয়োগ করা সম্ভব হয়।

অপরদিকে, কোস্টারিকার মতো দেশগুলো সামরিক বাজেট সম্পূর্ণ বাতিল করে সেই অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সমতা অর্জনে ব্যয় করার মাধ্যমে লাতিন আমেরিকায় এক অনন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছে, যা জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি বা ইউএনডিপির মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে বারবার প্রশংসিত হয়েছে।  এই আন্তর্জাতিক উদাহরণের মাধ্যমে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে যায় যে, সমতা ও ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত করা গেলেই কেবল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা সহজ হয় এবং সুশাসন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।

আমাদের বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামো এবং বিশেষ করে আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায় যে, ব্রিটিশ আমলের ঔপনিবেশিক মানসিকতা এবং পিতৃতান্ত্রিক শাসনের অনেক অবশেষ এখনও সুপ্ত বা দৃশ্যমান অবস্থায় রয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, লাল ফিতার দৌরাত্ম্য এবং নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতা সাধারণ মানুষকে রাষ্ট্র ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু থেকে বহুদূরে ঠেলে দেয়। যেসব প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা সমাজে বৈষম্য তৈরি করে বা টিকিয়ে রাখে, সেগুলোকে কাঠামোগতভাবে সংস্কার করা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর ও মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে ওপর থেকে কোনও সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে তা কখনোই জনকল্যাণকর হতে পারে না।

আমাদের আমলাতন্ত্রকে হতে হবে সম্পূর্ণ জনবান্ধব, সেবামুখী, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক। ফাইল আর প্রটোকলের কৃত্রিম দেয়াল ভেঙে সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের অংশীদার হওয়ার মানসিকতা যখন প্রশাসনে জাঁকিয়ে বসবে, তখনই রাষ্ট্র সত্যিকার অর্থে জনগণের রাষ্ট্রে পরিণত হবে। কিন্তু এই পরিবর্তন কি কেবল চাওয়া মাত্রই আসবে, নাকি এর জন্য প্রয়োজন এক অপ্রিয় সত্যের মুখোমুখি হওয়া? ক্ষমতার বলয়ে যারা বসে আছেন, তারা কি স্বেচ্ছায় তাদের বিশেষ অধিকার ছেড়ে দেবেন?

সমতা প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব কেবল বর্তমান মুহূর্তের দাবিতেই সীমিত নয়, এর সুদূরপ্রসারী স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব রয়েছে। স্বল্পমেয়াদে সমতা নিশ্চিত করা হলে সমাজে বিদ্যমান তাৎক্ষণিক ক্ষোভ, হতাশা ও সংঘাতের মাত্রা দ্রুত হ্রাস পায়, মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো সুরক্ষিত হয় এবং আইনের শাসন সত্যিকার অর্থে কার্যকর হয়ে ওঠে। আর দীর্ঘমেয়াদে সমতা একটি শোষণহীন, প্রগতিশীল এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ করে, যেখানে প্রতিটি নাগরিক তার অন্তর্নিহিত প্রতিভা ও সম্ভাবনাকে পুরোপুরি বিকশিত করার অবাধ সুযোগ পান। এটিই হলো প্রকৃত মানব মুক্তি বা হিউম্যান ইমেন্সিপেশন।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই মুক্তি অর্জন অত্যন্ত জরুরি, কারণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও যদি তার সুফল সমাজের প্রতিটি স্তরে সমানভাবে বণ্টিত না হয়, তবে সেই উন্নয়ন কখনোই টেকসই হতে পারে না। বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থা টিকিয়ে রেখে কখনোই একটি শক্তিশালী ও স্বাবলম্বী রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

এই মহান লক্ষ্য অর্জনের জন্য আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে এবং দৈনন্দিন যাপনে একটি গভীর পরিবর্তন আনতে হবে। রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে সমতা, ন্যায়বিচার এবং সুশাসনের ত্রয়ী সূত্রকে ধারণ করতে হবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, কর্মক্ষেত্র, বিচারালয় এবং পারিবারিক পরিমণ্ডলেও বৈষম্যবিরোধী মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। যখন রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিককে সমান চোখে দেখবে, যখন নীতি প্রণয়নের আগে দুলাল মিয়ার মতো সাধারণ কৃষকদের মতামতকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে, কেবল তখনই আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবে রূপ নেবে।

সমতা, ন্যায়বিচার এবং সুশাসনের হাত ধরে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের জীবন হবে মর্যাদাপূর্ণ, নিরাপদ এবং সম্ভাবনাময়। তবে প্রশ্ন থেকে যায়—এই পরিবর্তনের সূচনা কি রাষ্ট্রের তরফ থেকে আসার অপেক্ষায় বসে থাকবে, নাকি তা শুরু হতে হবে আমাদের নিজেদের চিন্তার বিপ্লব থেকে?

লেখক: একজন উন্নয়নকর্মী