মব সহিংসতা: শুধু সংখ্যা নয়, খুঁজতে হবে ধরন

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির
০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:০০আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:০০

আইনের শাসনের সবচেয়ে মৌলিক শর্তগুলোর একটি হলো—কেউ অপরাধী কিনা, তা নির্ধারণ করবে আইন ও আদালত; জনতা নয়। কিন্তু কোনও অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই যখন একদল মানুষ কাউকে শাস্তি দিতে এগিয়ে আসে, তখন তা শুধু একটি সহিংস ঘটনা থাকে না—এটি আইনের শাসনের প্রতি সমাজের আস্থার জন্যও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ‘মব’ বা জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কিন্তু এসব ঘটনাকে শুধু কতজন নিহত বা আহত হয়েছেন, এই হিসাব দিয়ে দেখলে সমস্যাটির পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। জানতে হবে, এসব ঘটনার ধরন কী, কেন ঘটছে এবং এর পেছনে কী ধরনের সামাজিক বা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কাজ করছে।

বাংলাদেশের সমাজে ‘গণপিটুনি’ বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা অবশ্য নতুন নয়। ‘ছেলে ধরা’ সন্দেহে, ‘চোর বা ছিনতাইকারী’ সন্দেহে, গরু চুরির অভিযোগে কিংবা কাউকে অপরাধী মনে করে জনতার হাতে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা আমরা বহু বছর ধরে দেখে আসছি। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ সত্য কিনা, তা যাচাইয়ের প্রয়োজনও বোধ করা হয়নি। সন্দেহই হয়ে উঠেছে অপরাধের প্রমাণ, আর জনতাই হয়ে উঠেছে বিচারক ও শাস্তিদাতা।

সাম্প্রতিক সময়ে এসব ঘটনার সঙ্গে আরও একটি শব্দ ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছে ‘মব’। গণপিটুনি, মব সহিংসতা নিয়ে আলোচনা এখন গণমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠন ও নাগরিক সমাজে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, গণপিটুনি ও মব সহিংসতা কি সব ক্ষেত্রে একই ধরনের ঘটনা?

আমার মনে হয়, সব ঘটনাকে একই ছাতার নিচে দেখলে সমস্যাটিকে পুরোপুরি বোঝা কঠিন হবে। একজন মানুষকে চোর সন্দেহে রাস্তায় ধরে তাৎক্ষণিকভাবে একদল মানুষ পিটিয়ে হত্যা করলো—এটি এক ধরনের ঘটনা। অপরদিকে কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে লক্ষ্য করে আগে থেকে লোক জড়ো করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্তেজনা ছড়ানো কিংবা পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো—এটি ভিন্ন ধরনের মব সহিংসতা। আবার ধর্মীয় অনুভূতি, নৈতিকতার প্রশ্ন, স্থানীয় আধিপত্য, ব্যক্তিগত বিরোধ বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকেও জনতাকে সংঘবদ্ধ করে হামলা হতে পারে।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুধু সংখ্যা দিয়ে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে আমরা জানতে পারি কতজন নিহত বা আহত হয়েছেন— কিন্তু কেন তারা আক্রান্ত হয়েছেন, তা জানতে হলে ঘটনার ধরন ও প্রেক্ষাপটও বুঝতে হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় পর্যায়ে কাজ করা বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রকাশিত তথ্য মব সহিংসতার একটি উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এনেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে মব হামলায় অন্তত ৩৩ জন নিহত হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। জুলাই মাসেও মব সহিংসতায় ১৭ জন নিহত এবং ৫১ জন আহত হওয়ার তথ্য এসেছে। এসব ঘটনার মধ্যে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতির অভিযোগের পাশাপাশি স্থানীয় বিরোধ, অনানুষ্ঠানিক সালিশ এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগের মতো বিভিন্ন কারণও উঠে এসেছে।

এই তথ্যগুলোকে শুধু সংখ্যা হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যাবে না। রাষ্ট্রীয় তথ্যের পাশাপাশি গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের সংগৃহীত তথ্য পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি বিস্তৃত ধারণা দিতে পারে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে প্রাথমিক সতর্কসংকেত হিসেবে কাজ করতে পারে। তাই মব সহিংসতার সংখ্যা গণনার পাশাপাশি এর ধরন, কারণ ও প্রেক্ষাপট সম্পর্কেও ধারাবাহিক তথ্য থাকা প্রয়োজন।

ধরা যাক, এক মাসে ২০টি মব হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে কতটি ছিল চুরি বা ডাকাতির সন্দেহে তাৎক্ষণিক গণপিটুনি, কতটি গুজব বা ভুল তথ্যের ভিত্তিতে, কতটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে, কতটি ধর্মীয় বা নৈতিকতার নামে, কতটি স্থানীয় বিরোধ বা আধিপত্যের কারণে এবং কতটি আগে থেকে পরিকল্পিত—এই তথ্যগুলো জানা গেলে সমস্যার প্রকৃতি অনেক পরিষ্কার হবে।

এখানে গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণ আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে। ঘটনাগুলোকে সম্ভাব্য কারণ ও চরিত্র অনুযায়ী নথিবদ্ধ করা এবং নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী শ্রেণিবিন্যাস সংশোধনের সুযোগ রাখা হলে এসব তথ্য গবেষণা ও নীতিনির্ধারণে আরও কার্যকর হবে। একই সঙ্গে অভিযোগ, প্রাথমিক তথ্য এবং তদন্তে নিশ্চিত তথ্যের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট রাখলে তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতাও বাড়বে।

সরকারের জন্যও এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক সতর্ক সংকেত হতে পারে। সরকারি তথ্য, গণমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণ পাশাপাশি বিশ্লেষণ করা গেলে মব সহিংসতার প্রকৃত প্রবণতা বোঝা সহজ হবে। কোথাও তথ্যের মধ্যে পার্থক্য থাকলে সেটিকে পরস্পরকে অস্বীকার করার বিষয় হিসেবে না দেখে কেন এই পার্থক্য তৈরি হয়েছে, তা যাচাই করা প্রয়োজন।

কারণ সমস্যার ধরন অনুযায়ী প্রতিরোধের কৌশলও ভিন্ন হওয়া দরকার। গুজব বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভুল তথ্য থেকে ঘটনা তৈরি হলে দ্রুত তথ্য যাচাই ও জনসচেতনতা জরুরি। স্থানীয় বিরোধের ক্ষেত্রে কার্যকর বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা প্রয়োজন। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সংঘবদ্ধ হামলার অভিযোগ থাকলে সেটিকে রাজনৈতিক সহিংসতার দৃষ্টিকোণ থেকে তদন্ত করতে হবে। আর ধর্মীয় বা নৈতিকতার নামে হামলা হলে আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি উসকানির উৎসও চিহ্নিত করা প্রয়োজন।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার তুলনায় এ ধরনের ঘটনায় জনমনে তৈরি অস্বস্তি কিছুটা কমেছে- এমন একটি ধারণা থাকতে পারে। বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকেও মব সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণ এবং জনতার মাধ্যমে দাবি আদায়ের প্রবণতা বন্ধ করার বিষয়ে প্রকাশ্য অবস্থান এসেছে। বিপরীতে, আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মব সহিংসতার একের পর এক ঘটনা ঘটলেও তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর, ধারাবাহিক ও দৃশ্যমান উদ্যোগের ঘাটতি ছিল। ফলে জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিকেও নিশ্চিত সাফল্য হিসেবে দেখার আগে নিয়মিত ও তুলনাযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। কারণ ২০২৬ সালেও মব সহিংসতার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। এখন প্রয়োজন আতঙ্ক তৈরি করা নয়— বরং তথ্যের ভিত্তিতে বোঝা-সহিংসতা কোথায় কমছে, কোথায় বাড়ছে এবং তার চরিত্র কীভাবে বদলাচ্ছে।

মব সহিংসতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে রাষ্ট্রের ভূমিকার প্রশ্নটিও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ‘ক্রসফায়ার’, ‘বন্দুকযুদ্ধ’, হেফাজতে মৃত্যু ও গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনার আইনগত ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আলাদা। কিন্তু যখন সমাজে দীর্ঘদিন ধরে আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়, তখন মানুষের একটি অংশের মধ্যেও শক্তির মাধ্যমে বিচার করার মানসিকতা তৈরি হতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে রাষ্ট্রীয় বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ এবং মবের হাতে হত্যাকে একই বিষয় হিসেবে দেখতে হবে। বরং উভয় ক্ষেত্রেই মূল নীতিটি একই-আইনের শাসনের বিকল্প হিসেবে শক্তি যেন বিচার নির্ধারণের মাধ্যম না হয়ে ওঠে।

অভিযোগ সত্য হলেও কাউকে জনতার হাতে শাস্তি দেওয়া যাবে না। কোনও ব্যক্তি অপরাধী কিনা, তা নির্ধারণ করবে তদন্ত ও আদালত। সন্দেহ, গুজব, রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা সামাজিক অবস্থান কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার ভিত্তি হতে পারে না।

একইভাবে প্রতিটি মব ঘটনাকে রাজনৈতিক ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন। আবার কোনও ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা সংঘবদ্ধতার প্রমাণ থাকলে সেটিকে নিছক ‘গণপিটুনি’ বলে এড়িয়ে যাওয়াও ঠিক হবে না। ঘটনার চরিত্র নির্ধারণ করতে হবে তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে।

মব সহিংসতা মোকাবিলায় তাই শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তাৎক্ষণিক ভূমিকা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা, গুজব ও উসকানির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা বাড়ানো। একই সঙ্গে গণমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় ও সমন্বয় বাড়ানো গেলে মব সহিংসতার প্রবণতা আগেই শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।

তবে এই দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্রের নয়। সমাজকেও এই প্রবণতার বিরুদ্ধে সক্রিয় অবস্থান নিতে হবে। গুজব ছড়ানো, কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে জনতাকে উত্তেজিত করা কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো আচরণকে সামাজিকভাবে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় নেতৃত্ব-সবাইকে এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে হবে। আমাদের সমাজের ভেতর থেকেই জনতার হাতে বিচার তুলে দেওয়ার এই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

মব সহিংসতা প্রতিরোধের পথ তাই শুধু ঘটনার সংখ্যা গোনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের বুঝতে হবে কেন মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে, কীভাবে মানুষ সহিংস হয়ে উঠছে এবং কোন পরিস্থিতি তাকে উসকে দিচ্ছে। এই কারণগুলো চিহ্নিত করা গেলে প্রতিরোধের পথ আরও কার্যকরভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব। রাষ্ট্রকে তার দায়িত্ব পালন করতে হবে, পাশাপাশি সমাজকেও নিজের ভেতর থেকে এই বেআইনি ও সহিংস প্রবণতা নির্মূলের উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনতার হাতে বিচার তুলে দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের পাশাপাশি আমাদের সবার।

লেখক: মানবাধিকার কর্মী

/ইউএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ব্যয়বহুল সুইজারল্যান্ডে কম বাজেটে ঘোরার উপায় জানুন
ব্যয়বহুল সুইজারল্যান্ডে কম বাজেটে ঘোরার উপায় জানুন
এশিয়া কাপে আজ বাংলাদেশের বিপক্ষে অঘটন ঘটাতে চায় আমিরাত!
এশিয়া কাপে আজ বাংলাদেশের বিপক্ষে অঘটন ঘটাতে চায় আমিরাত!
 রণবীর কাপুর-সালমান ও আল্লু অর্জুন নন, ভারতের সবচেয়ে সফল কে এই স্টার কিড
 রণবীর কাপুর-সালমান ও আল্লু অর্জুন নন, ভারতের সবচেয়ে সফল কে এই স্টার কিড
ইরান যুদ্ধের ঝুঁকির মধ্যেও খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে সরকার সতর্ক: তথ্য উপদেষ্টা
ইরান যুদ্ধের ঝুঁকির মধ্যেও খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে সরকার সতর্ক: তথ্য উপদেষ্টা
সর্বশেষসর্বাধিক