ব্রিকস: বদলে যাওয়া বিশ্বের নতুন বাস্তবতা 

নরেন্দ্র মোদি যখন ভারত মণ্ডপমে শি জিনপিং ও ভ্লাদিমির পুতিনের মাঝখানে দাঁড়ালেন, তখন যৌথ ঘোষণাপত্র পড়ার আগেই সেই ছবিটি অনেক কিছু বলে দিয়েছিল। “স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসইতা গড়ে তোলা”—এই প্রতিপাদ্যে ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়া দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে এমন এক জোটের নেতারা একত্রিত হয়েছেন, যা এখন বিশ্বের বড় একটি অংশের জনসংখ্যা ও অর্থনীতির প্রতিনিধিত্ব করে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী, চীনের রাষ্ট্রপতি, রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ও ইরানের রাষ্ট্রপতির একসঙ্গে উপস্থিতিই ছিল সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য। যৌথ ঘোষণাপত্রের বিষয়বস্তু অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এই দৃশ্যও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। আর দুটো বিষয়ই ওয়াশিংটনের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

কূটনীতিতে সময় নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। এই সম্মেলন এমন সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যখন শি জিনপিংয়ের ২৪ সেপ্টেম্বর ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে। সেই বৈঠকের আগে নয়া দিল্লিতে শি জিনপিংয়ের অন্যান্য গ্লোবাল সাউথ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। মস্কোর জন্যও এই সম্মেলন ছিল গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি রাশিয়াকে একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চ দিয়েছে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক যখন দীর্ঘদিনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উত্তেজনাপূর্ণ, তখন মোদি ও শি জিনপিংয়ের পাশে পুতিনের উপস্থিতি দেখিয়েছে যে রাশিয়া এখনও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সক্রিয় এবং পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নয়।

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর সাড়ে তিন বছরেরও বেশি সময় পরও রাশিয়া এই সম্মেলনে অংশ নিয়েছে। এই সময়ে দেশটি এমন পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে—যা তাকে পশ্চিমা পুঁজিবাজার, প্রযুক্তি এবং শিপিং ও বিমা ব্যবস্থার বড় অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানাও পুতিনের বিদেশ সফর সীমিত করেছে। এমন পরিস্থিতিতে নয়া দিল্লিতে অন্য বড় শক্তির নেতাদের পাশে পুতিনের উপস্থিতি নিছক কূটনৈতিক সৌজন্য ছিল না। এটি ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলসের জন্য একটি বার্তা—রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে রাখা সম্ভব নয়।

ভারত এখনও ছাড়ে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল কিনছে। অপরদিকে, চীন রাশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত রুশ অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা। ২০২২ সালের পর এই দুই দেশের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। ব্রিকসে অংশগ্রহণের মাধ্যমে পুতিনের আরেকটি লক্ষ্য হলো— ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প লেনদেন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা ভবিষ্যতে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কমাতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ব্রিকসে রাশিয়া শক্তিশালী বা সমমর্যাদার অংশীদার।

অর্থনৈতিকভাবে এটি জোটের দুর্বল সদস্যদের একটি এবং চীনের ওপরও এর নির্ভরতা বাড়ছে। তারপরও নয়া দিল্লি সম্মেলন পুতিনকে এমন একটি মঞ্চ দিয়েছে, যেখানে তিনি নিজেকে বিচ্ছিন্ন বা সাহায্যপ্রার্থী নেতা হিসেবে নয়, বরং অন্য বড় শক্তির নেতাদের সমান কাতারে দাঁড়ানো একজন অংশীদার হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছেন। এই দৃশ্যই তাঁর জন্য যৌথ ঘোষণাপত্রের অনেক বক্তব্যের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এরপর আসে ইরানের বিষয়টি। সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সম্মেলনে উপস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ব্রিকসে ইরানের  অংশগ্রহণ পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্দেশ্য নিয়ে তেহরানের সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে এবং চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার আগ্রহও জোরদার করেছে। নয়া দিল্লিতে পেজেশকিয়ানের উপস্থিতি দেখিয়েছে যে ব্রিকস এখন এমন একটি মঞ্চে পরিণত হয়েছে, যেখানে পশ্চিমা চাপের মুখে থাকা দেশগুলো একা নয়, বরং একসঙ্গে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে পারে।

সম্মেলনে নেতারা সর্বসম্মতভাবে একটি যৌথ ঘোষণাপত্র গ্রহণ করেন। এতে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানানো হয় এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য, সরবরাহ ব্যবস্থা ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের জোর করে বাস্তুচ্যুত করার বিরুদ্ধেও তারা দৃঢ় অবস্থান নেন। এই অবস্থান গ্লোবাল সাউথের জনমতের সঙ্গে ওয়াশিংটন ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের অবস্থানের তুলনায় বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। অর্থনৈতিক বিষয়েও বাণিজ্য, অর্থায়ন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

পাশাপাশি, ব্রিকসের দীর্ঘদিনের দাবিও আবার উঠে এসেছে— বিশ্ব অর্থনীতি ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে সদস্য দেশগুলোর ভূমিকার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো।

এসব কিছুই কোনও আনুষ্ঠানিক পশ্চিমাবিরোধী জোট গঠনের অর্থ বহন করে না। ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর স্বার্থ এখনও অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন। ভারত ও চীনের সীমান্ত বিরোধ মেটেনি, রাশিয়া-চীন অংশীদারত্বও মূলত বেইজিংয়ের পক্ষে ভারসাম্যপূর্ণ। আবার সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের মতো সদস্য দেশগুলো ব্রিকসের অংশ হয়েও ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রেখেছে। তবে এত ভিন্ন স্বার্থের দেশ গাজা ও মধ্যপ্রাচ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একসঙ্গে অবস্থান নিতে পারছে—এটি পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার প্রতি তাদের অভিন্ন অসন্তোষেরই একটি ইঙ্গিত। ওয়াশিংটনের জন্য অস্বস্তির কারণ এই নয় যে ব্রিকস রাতারাতি ডলারকে সরিয়ে দেবে বা যুদ্ধোত্তর প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে ফেলবে। এত শক্তি ব্রিকসের নেই। তাছাড়া, ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর নিজেদের মধ্যেও নানা ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও মতপার্থক্য রয়েছে। তবে এর চেয়েও বড় বিষয় হলো, ব্রিকস এখন অনেক দেশের জন্য কোনও একটি শক্তি বা জোটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর একটি বিকল্প পথ তৈরি করছে। মিসর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ গত বছর যোগ দেওয়া ১০টি অংশীদার দেশও এই প্রক্রিয়ার অংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা বা বাণিজ্যনীতিতে হঠাৎ পরিবর্তন অনেক দেশকে তাদের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও বৈচিত্র্যময় করার কথা ভাবতে বাধ্য করছে। এই পরিস্থিতিতে ব্রিকস ধীরে ধীরে সেই বৈচিত্র্যময় সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠছে। জার্মান মার্শাল ফান্ডের ইয়ান লেসারের মতে, এই পরিস্থিতি রাশিয়া ও চীনকে একটি বিশেষ সুযোগ দিচ্ছে। তারা ওয়াশিংটনের অনিশ্চিত নীতির কারণে তৈরি হওয়া উদ্বেগকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের প্রভাব আরও বাড়াতে পারে।

ভারতের জন্য এই সম্মেলন ছিল ভারসাম্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। ভারত একদিকে কোয়াড ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে, অপরদিকে রাশিয়ার সঙ্গে পুরোনো সম্পর্ক ধরে রেখেছে এবং চীনের সঙ্গেও কাজ করছে।

ব্রিকসের সভাপতিত্ব করা এবং শি ও পুতিনকে নিজ দেশে স্বাগত জানিয়ে ভারত স্পষ্ট করেছে যে তার পররাষ্ট্রনীতি কোনও একক দেশের ওপর নির্ভরশীল নয়। এই বার্তা যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও  রাশিয়া—তিন দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।

এই সম্মেলন দেখিয়েছে যে ব্রিকস কোনও নতুন বিশ্বব্যবস্থা তৈরি করছে না, বরং বিশ্বে এখন আর কোনও একক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। ২০ বছর আগে চারটি দেশ নিয়ে শুরু হওয়া ব্রিকস এখন ১১ সদস্যে পরিণত হয়েছে, আর আরও অনেক দেশ এর সঙ্গে যুক্ত হতে আগ্রহী। এর একটি কারণ হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তিগুলো দীর্ঘদিন গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। নয়া দিল্লিতে চার বড় শক্তির একসঙ্গে উপস্থিতি তাই একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—বিশ্বের অনেক দেশ এখন নিজের স্বার্থে একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে চায়। ব্রিকস এই ঐক্যকে কতটা কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিতে রূপ দিতে পারবে, তা এখনও অনিশ্চিত—তবে এর প্রতীকী উত্থানই ওয়াশিংটনের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর