ব্যাংকিং খাতে জেন্ডার সমতা, সংখ্যার বাইরে বাস্তবতা

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:০০আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:০০

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক জেন্ডার ইক্যুইটি প্রতিবেদন একটি প্রশ্ন নতুন করে সামনে এনেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৬১টি তফসিলি ব্যাংকে নারীকর্মীর সংখ্যা বেড়েছে ৯১০ জন, প্রায় আড়াই শতাংশ। মোট জনবলের ১৬ দশমিক ৫১ শতাংশ এখন নারী। সংখ্যাটি দেখে স্বস্তি পাওয়ার আগে একটু পেছনে তাকানো দরকার।

২০২৫ সালের পুরো বছরে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নারীকর্মীর সংখ্যা কমেছিল প্রায় ২ হাজার ৬০০ জন, একা ব্যাংক খাতেই কমেছিল ২ হাজার ৫৮৮ জন। তাহলে চলতি বছরের বৃদ্ধিকে নতুন অর্জন বলা ঠিক হবে কি? বাস্তবতা হলো, এটি একটি আংশিক পুনরুদ্ধার মাত্র, আগের ক্ষতির তুলনায় এখনও অনেক পিছিয়ে থাকা একটি সংখ্যা।

এই প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ সংখ্যাবৃদ্ধি নয়, পদক্রম অনুযায়ী নারীর উপস্থিতির চিত্র। প্রাথমিক ও মধ্যম পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ প্রায় ১৭ শতাংশ, অথচ উচ্চপদে তা নেমে দাঁড়ায় সাড়ে ১০ শতাংশে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে নারী সদস্যের হার মাত্র ৪ শতাংশ। প্রবেশদ্বারে নারীর উপস্থিতি ভালো, কিন্তু ওপরে ওঠার সিঁড়িতে তারা কমে যাচ্ছেন কেন? এই প্রশ্নের একটা বড় অংশের উত্তর জড়িয়ে আছে ব্যাংকিং খাতের বদলি ব্যবস্থায়।

ব্যাংকিং খাতে পদোন্নতি প্রায়ই জেলা শহর বা গ্রামীণ শাখায় বদলির সঙ্গে যুক্ত থাকে। একজন পুরুষ কর্মকর্তার জন্য এটি ক্যারিয়ারের স্বাভাবিক একটি ধাপ, কিন্তু একজন নারী কর্মকর্তার জন্য এটি প্রায়ই সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি কঠিন মুহূর্ত হয়ে দাঁড়ায়। পরিবার থেকে দূরে কোনও শাখায় বদলি হলে সন্তানের দেখভাল কে করবে, এই প্রশ্নের কোনও নির্ভরযোগ্য উত্তর তার হাতে থাকে না। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় রাজস্ব-খাতভুক্ত শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের সংখ্যা সারা দেশে মাত্র ৪৩টি। সরকার জেলা পর্যায়ে আরও ৬০টি ডে কেয়ার সেন্টার স্থাপনের একটি প্রকল্প নিয়েছে বটে, তবে সেখানে বছরে মাত্র ৩ হাজার শিশুকে সেবা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে। দেশের কর্মজীবী নারীদের বিশাল সংখ্যার তুলনায় এই ব্যবস্থা কতটা যথেষ্ট, সেই প্রশ্নটা থেকেই যায়। গ্রাম ও উপজেলা পর্যায়ে গেলে এই সেবা প্রায় নেই বললেই চলে।

বিআইডিএসের এক জরিপ বলছে, দেশের নারীরা গৃহস্থালি ও পরিবারের সদস্যদের যত্নে পুরুষের চেয়ে প্রায় চার গুণ বেশি সময় ব্যয় করেন। এই তথ্যটি একা দাঁড়িয়ে থাকলে হয়তো এত গুরুত্বপূর্ণ মনে হতো না, কিন্তু বদলি নীতির বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একজন নারী কর্মকর্তা যখন জানেন যে, বদলি হলে তার সন্তান পরিচর্যার কোনও বিকল্প ব্যবস্থা থাকবে না, তখন তিনি হয় পদোন্নতির সুযোগ এড়িয়ে যান, নয়তো একেবারেই চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। এটি কোনও ব্যক্তিগত দুর্বলতার গল্প নয়, এটি একটি কাঠামোগত সমস্যার ফল।

এখানেই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ভাবার জায়গা তৈরি হয়। ব্যাংকগুলো যদি নারী কর্মকর্তাদের জন্য পোস্টিং ক্রাইটেরিয়ায় কিছুটা নমনীয়তা আনে, যেমন- একটানা কয়েক বছর একই কর্মস্থলে থাকার সুযোগ, ঘন ঘন বদলির বদলে পরিকল্পিত ও পূর্বঘোষিত বদলি নীতি, তাহলে পারিবারিক চাপ অনেকটাই কমবে। এটাকে বৈষম্যমূলকর সুবিধা বলার সুযোগ নেই। এটি বাস্তব একটি কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার সঙ্গে মানানসই একটি সমন্বয়, যেখানে দেশের বেশিরভাগ ডে কেয়ার সেন্টারের মান প্রশ্নবিদ্ধ এবং গ্রামাঞ্চলে তা প্রায় অনুপস্থিত।

নমনীয় বদলিনীতি দাবি করার পেছনের যুক্তিও দুর্বল নয়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদনে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিজেই বলেছেন, নারীকর্মীদের কাজের আউটপুট সন্তোষজনক, তারা মনোযোগী এবং সময় অপচয় কম করেন। এটি কোনও বিচ্ছিন্ন পর্যবেক্ষণ নয়। আন্তর্জাতিক গবেষণাও একই দিকে ইঙ্গিত করে। আলবেনিয়ার একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ১০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে বেক, বেহর ও গাটলারের গবেষণায় (তিনজন অর্থনীতি গবেষক, যাদের গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে রিভিউ অব ফাইন্যান্স জার্নালে) দেখা গেছে, নারী ঋণ কর্মকর্তাদের অনুমোদিত ও তদারকি করা ঋণের খেলাপি হার পুরুষ কর্মকর্তাদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। অর্থাৎ যেখানে ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রশ্ন আসে, সেখানে নারী কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তগুলো ব্যাংকের জন্য বাড়তি সুরক্ষা বয়ে এনেছে।

বিশ্বের অন্যান্য অর্থনীতিতেও একই ধরনের চিত্র বারবার উঠে এসেছে, নারী পরিচালিত শাখা বা নারী নেতৃত্বাধীন দলে ঋণ পোর্টফোলিওর মান তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকে, কারণ ঝুঁকি নেওয়ার আগে যাচাই বাছাইয়ের প্রবণতা বেশি থাকে। গ্রাহকসেবার ক্ষেত্রেও নারী কর্মকর্তাদের ধৈর্য ও মনোযোগের প্রশংসা নতুন কিছু নয়, শাখা পর্যায়ে যারা প্রতিদিন গ্রাহকের সঙ্গে কাজ করেন তারা প্রায়ই বলেন যে, জটিল ও স্পর্শকাতর লেনদেনে নারী কর্মকর্তাদের ব্যবহার গ্রাহকের আস্থা বাড়ায়। দক্ষতা বা নিষ্ঠার প্রশ্নে নারীরা পিছিয়ে নেই, কোনও কোনও ক্ষেত্রে এগিয়েই আছেন। তাহলে যে বাধা তাদের শীর্ষপদ থেকে দূরে রাখছে, তার উৎস দক্ষতার ঘাটতি নয়, কর্মপরিবেশ ও নীতির ঘাটতি।

বিদেশি ব্যাংকগুলোতে নারীর অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি হওয়ার একটি কারণ সম্ভবত তাদের তুলনামূলক নমনীয় ও কেন্দ্রীভূত কর্মপরিবেশ, যেখানে ঘন ঘন শাখা বদলির চাপ কম। এই মডেল থেকে রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর শেখার আছে কি?

নিশ্চয়ই আছে, কারণ সংখ্যাটা নিজেই সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। ৩০ বছরের কম বয়সী নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে বলে যে ইতিবাচক দিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সেটিও তখনই টেকসই হবে, যখন এই তরুণ কর্মকর্তারা মাঝপথে ক্যারিয়ার ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন না।

আমার মতে, শুধু নিয়োগসংখ্যা বাড়িয়ে বা প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান উন্নত করে এই সমস্যার সমাধান হবে না, যতক্ষণ না বদলিনীতিতে বাস্তবসম্মত নমনীয়তা এবং শাখা পর্যায়ে ন্যূনতম শিশু পরিচর্যার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়।

কর্তৃপক্ষ যদি নীতিমালায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে যে, নারী কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বদলি হবে পরিকল্পিত, পূর্বঘোষিত এবং পারিবারিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে, তাহলে প্রবেশদ্বারেই নয়, শীর্ষপদেও নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

ব্যাংকগুলো একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিতে পারে, যেমন- আগামী পাঁচ বছরে শীর্ষপদে নারীর হার কত শতাংশে উন্নীত করা হবে, তার একটি লক্ষ্যমাত্রা। এতে শুধু সংখ্যা বাড়বে না, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াতেও বৈচিত্র্য আসবে। আর সেটি হবে কেবল একটি ভালো প্রতিবেদন নয়, একটি প্রকৃত অর্থে ন্যায্য কর্মক্ষেত্রের প্রতিফলন।

লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
নৌকা ভ্রমণে এসে পদ্মায় নিখোঁজ ছাত্রদল নেতার লাশ উদ্ধার 
নৌকা ভ্রমণে এসে পদ্মায় নিখোঁজ ছাত্রদল নেতার লাশ উদ্ধার 
ব্যাংকিং খাতে জেন্ডার সমতা, সংখ্যার বাইরে বাস্তবতা
ব্যাংকিং খাতে জেন্ডার সমতা, সংখ্যার বাইরে বাস্তবতা
ট্রেনে শুকনো নারকেল নিষিদ্ধ কেন?
ট্রেনে শুকনো নারকেল নিষিদ্ধ কেন?
ইসলামী ব্যাংকের সামনে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা ও গ্রাহকদের পাল্টাপাল্টি অবস্থান
ইসলামী ব্যাংকের সামনে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা ও গ্রাহকদের পাল্টাপাল্টি অবস্থান
সর্বশেষসর্বাধিক