একটি ব্যক্তিগত ঘটনা দিয়ে লেখাটা শুরু করা যাক। বারিধারা ডিওএইচ-এর নিরিবিলি রাস্তায় হাঁটছি আর ভবনগুলোর সামনের নম্বর দেখে দেখে এগোচ্ছি। উদ্দেশ্য, অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নাতনি রাজিয়া বানুর মেয়ে তাসনিম করিম বেবীর বাসা। অবশেষে পাওয়া গেলো। বাসায় যাওয়ার আগে অবশ্য মোবাইল ফোনে তার সঙ্গে অনেক আলাপ হয় এবং তার মায়ের সম্পর্কে বিস্তারিত জানা, বিশেষ করে কিছু দুর্লভ ছবি সংগ্রহই যে আমার উদ্দেশ্য—সেটাও তাকে জানাই। কিন্তু তারপরও প্রথম সাক্ষাতেই তার কণ্ঠে আক্ষেপের সুর: ‘এই জেনারেশন তো শেরেবাংলার সম্পর্কেই জানে না। আমার মায়ের নাম জানবে কী করে!’
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে সংবিধানের খসড়া প্রণয়নের জন্য ৩৪ সদস্যের যে কমিটি গঠন করা হয়েছিল, রাজিয়া বানু ছিলেন সেই কমিটির একমাত্র নারী সদস্য। কিন্তু ‘সংবিধান প্রণেতাগণ’ বই লিখতে গিয়ে ওই কমিটির অনেক সদস্যের সম্পর্কেই যখন খুব বেশি তথ্য পাচ্ছিলাম না, তখন পরিবারগুলো খুঁজে বের করি।
ঘটনাটা এ কারণে উল্লেখ করলাম যে প্রতিটি রাষ্ট্র গঠনের পেছনে অনেক মানুষের অবদান থাকে। কিন্তু সেসব শত শত বা হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে দুই চার জন, কখনও মাত্র একজনই হয়ে ওঠেন ইতিহাসের নায়ক। একটি জাতিরাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ায় কিছু খলনায়কেরও জন্ম হয়। ইতিহাসে তাদের প্রত্যেকের অবস্থান নির্ধারিত। আবার অনেক সময় ইতিহাসের বাঁকবদল হয়। অনেক সময় প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসের গায়ে রাজনীতির রঙ চড়িয়ে বিতর্কিত করা হয়। কলুষিত করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এরকম ঘটনা অনেক। সবশেষ যার উদাহরণ মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ।
সংস্কার শেষে সম্প্রতি চালু হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একক বা গৌরবোজ্জ্বল ছবি ঠাঁই না পেলেও নতুন যুক্ত হয়েছে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর আলোচিত ছবি। শিক্ষার্থী সংসদের মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলন-বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা এ সংগ্রহশালার উদ্বোধন করেন। যে সংগ্রহশালায় ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী ডাকসু নির্বাচন, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদী হত্যার পূর্বাপর বেশ কিছু স্থিরচিত্র স্থান পেয়েছে।
পাকিস্তানের নেতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি এখানে ঠাঁই পেয়েছিল। এর মধ্যে একটি ছবি ১৯৪৮ সালে ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক অনুষ্ঠানের, যেখানে তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক তথা স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বলা হয় যাকে, সেই বঙ্গবন্ধুর কোনও গৌরবোজ্জ্বল ছবি কেন নেই, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ফাতিমা তাসনিম জুমা বলেন, ‘‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ফ্যাসিবাদের সব আইকনের ছবি এখান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।’’ তার মানে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু তার বা তাদের কাছে ‘ফ্যাসিবাদের আইকন’!
এই ঔদ্ধত্যের উৎস কী—সেটি না বোঝার কোনও কারণ নেই। তবে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের একটি সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের জাতির পিতা জিন্নাহর ছবি টানানো নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হয় এবং একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী ডাকসুর সংগ্রহশালায় ঢুকে ছবিগুলো ছিঁড়ে ফেলে প্রতিবাদ জানান। যদিও তার এই প্রতিবাদের ধরন নিয়েও অনেকে সমালোচনা করছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ দাবি করেছেন, বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে জিন্নাহ যে অবস্থান নিয়েছিলেন, সেই ইতিহাস জানানোর জন্যই সংগ্রহশালায় তার ছবি টানানো হয়েছিল। কিন্তু তার এই ব্যাখ্যা কতজন মানুষ বিশ্বাস করেন—সেটি প্রশ্নসাপেক্ষ। কারণ তারা যে আদর্শের তথা যে দলের রাজনীতি করেন, সেখানে জিন্নাহকেই যে তারা জাতির পিতা মনে করেন বা মুখে না বললেও তারা যে এটা অন্তরে ধারণ করেন—সে বিষয়ে সন্দেহ কম। ফলে প্রতিবাদের মুখে তারা এখন যে ব্যাখ্যাই দিন না কেন, এগুলো বিশ্বাস করানো কঠিন।
জিন্নাহকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক করা তথা মহিমান্বিত করার এই প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছে চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পরপরই, যে অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পরে শেখ হাসিনার সাথে সাথে তার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকেও ইতিহাস থেকে মাইনাস করে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। শুধু বঙ্গবন্ধুকে মাইনাস করে দেওয়া নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসকে বিতর্কিত করে নিত্য নতুন বয়ানও সামনে আনা হয়েছে। আর এসব প্রক্রিয়া ও প্রবণতার পেছনে রয়েছে মূলত একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত দেশি-বিদেশি শক্তির প্রতিশোধ নেওয়ার অভিলাষ ও প্রচেষ্টা—যে সুযোগ তারা বিগত ৫৫ বছরে পায়নি। তারা মনে করে এবং বিশ্বাস করে, জুলাই অভ্যুত্থান তাদের সামনে সেই সুযোগ এনে দিয়েছে। যে কারণে জুলাই অভ্যুত্থানে কর্তৃত্ববাদী হাসিনা সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে জনমনে রাষ্ট্র সংস্কারের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল—সেটি ধূলিসাৎ হয়ে গেছে, যখন অভ্যুত্থানের সামনের সারিতে থাকা তরুণদের বিরাট অংশেই চব্বিশের অভ্যুত্থানকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা শুরু করলো। যখন তারা একটি রাজনৈতিক আন্দোলনকে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবজনক মুক্তিযুদ্ধের কাতারে নিয়ে যেতে চাইলো এবং মুক্তিযুদ্ধ, সংবিধান এবং বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে এমন সব বয়ান সামনে আনা শুরু করলো—যেগুলো মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তিগুলো এতদিন দিয়ে আসছিল।
স্বাধীন বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় যদি তার ঐতিহাসিক ঘটনাবলির ছবি টানানো হয়, সেখানে শুধু জিন্নাহ নয়, ইয়াহিয়া খান ও ভুট্টোর ছবিও থাকতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সংগ্রহশালা কি ইতিহাসের সেই ধারাক্রম বর্ণনা করার আয়োজন, নাকি সুনির্দিষ্ট এক বা একাধিক ব্যক্তিকে ইতিহাস থেকে মাইনাস করার জন্য ইতিহাসের বিকল্প নায়ক তৈরির প্রচেষ্টা? রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে শেখ মুজিবের সফল হতে না পারা কিংবা তার বাকশাল গঠনের সমালোচনা ইতিহাসের একটি অধ্যায়। কিন্তু পুরো ষাটের দশক থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত এই দেশের অবিসংবাদিত নেতার নাম কি শেখ মুজিব নয়? কার নামে এই দেশের সাত কোটি মানুষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং কার কারামুক্তির জন্য এই দেশের সাধারণ মানুষ প্রার্থনা করেছে, রোজা রেখেছে। জিন্নাহর নামে? স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীনদের চেয়ে জিন্নাহ বেশি প্রাসঙ্গিক?
জুলাই অভ্যুত্থানের পরপরই বাংলাদেশে জিন্নাহকে মহিমান্বিত করার প্রচেষ্টা শুরু হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পরের মাসেই ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে জিন্নাহর ৭৬তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। যে অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশনার কামরান ধাঙ্গাল উপস্থিত ছিলেন। এরপর ওই বছরের ২৫ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে নবাব সলিমুল্লাহ অ্যাকাডেমি নামে একটি সংগঠন ‘কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ১৪৮তম জন্মবার্ষিকী’ শীর্ষক একটি সেমিনারের আয়োজন করে। ২০২৫ সালের ২২ ডিসেম্বর নওয়াব সলিমুল্লাহ অ্যাকাডেমি আবারও জাতীয় প্রেস ক্লাবে জিন্নাহর ১৪৯তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভার আয়োজন করে। সবশেষ গত ১১ সেপ্টেম্বর ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ তাদের ফেসবুক পেজে জিন্নাহর ৭৮তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাকে ‘গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়’ স্মরণ করে। একই সময়ে জাতীয় বিপ্লবী পরিষদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে জিন্নাহর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল করে। এরপর গত ১৪ সেপ্টেম্বর নওয়াব সলিমুল্লাহ অ্যাকাডেমি জাতীয় প্রেস ক্লাবে জিন্নাহর ৭৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আবার আলোচনা সভা করে। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলের নাম পরিবর্তন করে পুনরায় ‘জিন্নাহ হল’ করার দাবিও তোলা হয়।
১৯৭১ সালে যে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, সেই দেশের জাতির পিতাকে এভাবে মহিমান্বিত করা, তার জন্মমৃত্যু দিবস উদযাপন এমনকি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা সূর্য সেনের নাম পরিবর্তন করে জিন্নাহর নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের নামকরণের দাবির ভেতরে শুধু ঔদ্ধত্যই নয়, বরং একটি সুদূরপ্রসারী রাজনীতিও রয়েছে। সেটি হলো, যারা এখন নানাভাবে জিন্নাহকে মহিমান্বিত করার চেষ্টা করছেন, তারা একসময় বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের দাবি তুলবেন। জুলাই অভ্যুত্থানের পরে কেউ কেউ এই দাবি তুলেও ছিলেন। এমনকি কেউ কেউ ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় দিবস পরিবর্তনের দাবি সামনে এনেছিলেন। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের নাম পরিবর্তনের দাবিও উঠেছে। এর সবই কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা? সম্ভবত না। এগুলো পরস্পর সম্পর্কিত। যারা এসব কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত সেই সব ব্যক্তি ও সংগঠন একই রাজনীতি ও বিশ্বাসের অনুসারী। তাদের সবার লক্ষ্য এক, সেটি হলো, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হিসেবে প্রমাণ করা এবং মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক বঙ্গবন্ধুকে ভিলেনে পরিণত করা। সেই চেষ্টা কতটা সফল হবে—সেটি নির্ভর করে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার হাতে গড়া দল বিএনপি সরকার এসব তৎপরতাকে কীভাবে মোকাবিলা করবে এবং দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ এসব দেশবিরোধী তৎপরতাকে কতটা সমর্থন জানাবে, তার ওপর।
আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক