এআই বদলে দিতে পারে বাংলাদেশের পর্যটন খাত

আজ ২৭ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব পর্যটন দিবস। পর্যটনের বিশ্ব সংস্থা ইউএন ট্যুরিজম ১৯৮০ সাল থেকে বছরের এই দিনটিতে ঘটা করে পর্যটন দিবস উদযাপন করে আসছে। এবারও জাতিসংঘের ১৬০টি সদস্য রাষ্ট্রে সমান গুরুত্বে বিশ্ব পর্যটন দিবস উদ্‌যাপন করা হচ্ছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের (জাতীয় পর্যটন সংস্থা) উদ্যোগে আমাদের দেশেও বর্ণাঢ্য আয়োজনে দিবসটি উদযাপন করা হচ্ছে।

ইউএন ট্যুরিজম প্রতিবছরই বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে একটি যুৎসই ও সময়োপযোগী থিম প্রকাশ করে। আর এ থিমকে কেন্দ্র করেই বিশ্বব্যাপী সভা, সেমিনার ও আয়োজন করা হচ্ছে, বিভিন্ন ভাষায় হাজার হাজার প্রবন্ধ-নিবন্ধ লেখা হচ্ছে। আশা করা হয়, এসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে পর্যটন শিল্পের একটি নতুন অভিমুখ তৈরি হবে এবং এর মাধ্যমে বৃহত্তম এই সেবা খাতে নতুন মাত্রা যোগ হবে। পুরো পর্যটন ভ্যালু চেইনে এর প্রভাব পড়বে, যা শিল্পটিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে।

প্রযুক্তির যথোপযুক্ত ব্যবহারের মাধ্যমে পর্যটন ব্যবস্থাপনার উন্নয়নসহ এ শিল্পের সব ধরনের সেবা অধিকতর সহজলভ্য করে পর্যটনপ্রেমীদের হাতের মুঠোয় তুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে রচিত হয়েছে এবারের থিম ‘ডিজিটাল অ্যাজেন্ডা অ্যান্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স টু রিডিজাইন ট্যুরিজম’। ‘ডিজিটাল কর্মপরিকল্পনা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে পর্যটন শিল্পের ইতিবাচক পরিবর্তন’। আমাদের মাতৃভাষায় ইউএন ট্যুরিজমের থিমটিকে আমরা এভাবে বুঝে নিতে পারি। ভাষান্তর নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। যেকোনো বিতর্ক আমাকে এবং আমার পাঠককে আরও সমৃদ্ধ করবে।

এ বছর দিবসটি উদ্‌যাপনে কেন্দ্রীয় আসরটি বসবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় মধ্য আমেরিকার একটি ক্ষুদ্র দেশ এল-সালভাদরের সার্ফ সিটিতে। দেশটির পর্যটনমন্ত্রীর একটি বার্তা ইউএন ট্যুরিজমের ওয়েবসাইটে স্থান পেয়েছে। এ বার্তার মাধ্যমে পর্যটনপ্রেমীদের তার দেশে আমন্ত্রণ জানানোর পাশাপাশি ‘টেকনোলজিক্যাল ইনোভেশন’ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যথোপযুক্ত প্রয়োগের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আধুনিক পর্যটন শিল্প গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।

নিত্য পরিবর্তনশীল পর্যটন শিল্পে প্রযুক্তির প্রয়োগ হতে দেখছি আমরা গত কয়েক বছর ধরেই। প্রযুক্তির নতুন নতুন বিস্ময়কর উদ্ভাবনের ওপর ভর করে অন্যান্য দেশের পর্যটন খাতের মতোই আমাদের পর্যটন খাতেও কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান। ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা আদতে দেশীয় কোনো বিষয় নয়, এটি একটি সার্বজনীন বিশ্বব্যবস্থা, যা একজন পর্যটককে মুহূর্তের মধ্যে যুক্ত করতে পারে বিশ্বের অন্য যেকোনো প্রান্তে থাকা পর্যটন গন্তব্যের সঙ্গে। ঘরে বসেই পরিচয় করিয়ে দেয় স্থানীয় সংস্কৃতি ও জনগোষ্ঠীর সঙ্গে। পর্যটন ব্যবসায়ী, ব্যবস্থাপক, সরকার—সকলেই একটি বৃহত্তর ডিজিটাল কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত থেকে নিজেদের মধ্যে অসাধারণ ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে পারছেন।

নতুন নতুন প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন একটি চলমান প্রক্রিয়া, তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উদ্ভাবনের সঙ্গে সঙ্গেই এর প্রয়োগ ও ব্যবহার আগের সবগুলোকে ছাড়িয়ে গেছে। অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এটি আমাদের সমাজব্যবস্থার অংশ হয়ে গেছে। ইতোমধ্যেই সব বয়সের মানুষের কাছে এ প্রযুক্তি অতি অল্প সময়ের মধ্যে ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বলা হয়ে থাকে, ‘দ্য ইন্টারনেট গিভ পিপল অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন। এআই ইজ ইনক্রিজিংলি গিভিং পিপল অ্যাকসেস টু ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড অটোমেশন।’ বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শুধু একটি ‘ডিজিটাল টেকনোলজি’ হিসেবেই দেখা হচ্ছে না, বরং এটিকে ‘জেনারেল পারপাস টেকনোলজি’ বিবেচনা করে বিদ্যুৎ, কম্পিউটার কিংবা ইন্টারনেটের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সারা পৃথিবীর আর্থ-সামাজিক বাস্তবতাকে কোথায় নিয়ে যাবে, তা এখনই বলা সম্ভব হচ্ছে না। অনেকেই মনে করছেন, এ প্রযুক্তি অনাগত কালকে জয় করে কালজয়ী ও অভূতপূর্ব একটি প্রযুক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং পুরো পৃথিবীর বিদ্যমান আর্থসামাজিক ব্যবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অসামান্য ভূমিকা রাখবে। সেক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, ‘এআই শুডন্ট রিপ্লেস হিউম্যান হসপিটালিটি, ইট শুড এনহ্যান্স হিউম্যান হসপিটালিটি।’

মানবীয় মায়া-মমতায় গড়ে ওঠা পর্যটন শিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কী কাজ? পৃথিবীর সব পর্যটন গন্তব্যের দিকে এক নজর তাকালেই আমরা বুঝতে পারি, এগুলো গড়ে উঠেছে মানুষের মায়া-মমতায়, যত্নে আর সহমর্মিতায়। মানুষের শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় ও যত্নে টিকে রয়েছে হাজার বছরের সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং কালক্রমে এগুলোই হয়ে উঠেছে পর্যটনের বড় বড় গন্তব্য। ইতিহাস-ঐতিহ্যের খোঁজে মানুষ ছুটে বেড়ায় দেশ-দেশান্তরে। লক্ষ লক্ষ পর্যটকের পদভারে সর্বদা মুখরিত থাকে পর্যটনের এই গন্তব্যগুলো। লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে এদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

মানবীয় ভালোবাসায় গড়ে ওঠা পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে, সম্প্রসারণে, উৎকর্ষ সাধনে বিজ্ঞানের আপাত সর্বশেষ উদ্ভাবন ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ অনন্য ভূমিকায় অবতীর্ণ। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরির মাধ্যমে অনন্য সাধারণ ডিজিটাল ট্যুরিজম ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা হচ্ছে। একটি মাত্র প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হচ্ছে পর্যটক, পর্যটন সংস্থাগুলো, বিমান পরিবহন সংস্থা, পর্যটন আকর্ষণ, ট্যুর অপারেটর, ট্যুর গাইডসহ পর্যটন সুবিধা প্রদানকারী সব সংগঠন। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে একজন পর্যটক পৃথিবীর অন্য যেকোনো প্রান্তের পর্যটন গন্তব্যের সব তথ্য ঘরে বসেই সংগ্রহ করতে পারছেন।
ডেস্টিনেশন ম্যানেজমেন্ট বা গন্তব্য ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে পর্যটকের চাহিদা বিশ্লেষণ করা সহজ হয়েছে, অতিরিক্ত পর্যটক সমাগম নিয়ন্ত্রণে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে, সর্বোপরি গন্তব্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আধুনিক ধ্যান-ধারণার প্রয়োগ করে গন্তব্যকে আরও আকর্ষণীয় ও পর্যটকবান্ধব করা সহজ হয়েছে।

পর্যটন শিল্পের কাঙ্ক্ষিত সম্প্রসারণে মার্কেটিংয়ের প্রভাব অপরিসীম। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক আকর্ষণীয় কনটেন্ট তৈরি হচ্ছে, তাও আবার স্বল্প খরচে। প্রেডিকটিভ অ্যানালাইসিস বা পূর্বাভাসভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে কোনো একটি নির্দিষ্ট পর্যটন গন্তব্যে পর্যটকের আগমন, পর্যটকদের ব্যয় প্রবণতা এবং সম্ভাবনাময় নতুন বাজার সম্পর্কে পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। এআই চ্যাটবট, স্বয়ংক্রিয় চেক-ইন, ব্যক্তিকেন্দ্রিক হোটেল সেবা এবং হোটেলের স্মার্ট রেভিনিউ ম্যানেজমেন্টে আধুনিকতা এনেছে।

টেকসই পর্যটন নিশ্চিত করা আমাদের আরেকটি গ্লোবাল অ্যাজেন্ডা (এসডিজি-৩০)। পর্যটন গন্তব্যের ধারণক্ষমতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি নিরাপত্তা, পানি ব্যবহার এবং পরিবেশগত প্রভাব পর্যবেক্ষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ টেকসই পর্যটন নিশ্চিতে সাহায্য করতে পারে। প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমেই বিকশিত হচ্ছে ভার্চুয়াল ট্যুরিজম। পর্যটন কেন্দ্র, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও জাদুঘর ভ্রমণের আগে ও পরে এআর/ভিআর প্রযুক্তির মাধ্যমে আগ্রহী পর্যটকদের ভার্চুয়াল অভিজ্ঞতা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। আবার ডিজিটাল ম্যাপ, স্মার্ট সাইনেজ, ই-মার্কেটিং, ক্যাশলেস পেমেন্ট ও রিয়েল টাইম তথ্য প্রদানের মাধ্যমে পর্যটন শিল্পকে আরও স্মার্ট করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

ব্যক্তিকেন্দ্রিক পর্যটনের ক্ষেত্রেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দৃশ্যমান। পর্যটক বিশেষের আগ্রহ, তার বাজেট সীমাবদ্ধতা, সময় ও ভ্রমণ আচরণের ভিত্তিতে দুর্দান্ত সব ভ্রমণ পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে এরই সহায়তায়। আরও মজার কথা হচ্ছে, জেনারেটিভ এআই পর্যটন শিল্পে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, এটি যেকোনো লেখা, ছবি, আইটিনেরারি, প্রমোশনাল কনটেন্ট এবং পর্যটকের ফিডব্যাক অনায়াসে তৈরি করতে পারছে।

এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজে থেকে ইচ্ছামতো তথ্য সংগ্রহ করে না, বরং মানুষের তৈরি বইপত্র, সংবাদপত্র, গবেষণাপত্র, ওয়েবসাইট, ছবি, ভিডিও, অডিও, সরকারি প্রতিবেদন ইত্যাদির মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে এবং সেগুলোই তার ক্লায়েন্টদের সরবরাহ করে থাকে। কাজেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা পেতে হলে আমাদের নিজস্ব তথ্যভান্ডার সমৃদ্ধ করতে হবে। কেউ কেউ পর্যটন শিল্পকে ডেটা ড্রিভেন ইন্ডাস্ট্রি হিসেবেও আখ্যায়িত করে থাকেন। যে দেশের পর্যটন-সংক্রান্ত তথ্যভান্ডার যত সমৃদ্ধ, সে দেশের পর্যটন শিল্পও তত সমৃদ্ধ।

বলা যায়, পর্যটন শিল্পের ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য তথ্যভিত্তিক পর্যটন নীতি ও পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য একটি জাতীয় ডেটা হাব প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি। ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে পর্যটনের সম্পূর্ণ ভ্যালু চেইনকে নতুনভাবে সাজানোর সুযোগ এসেছে। টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পর্যটনকে মাথায় রেখে সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতার সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মিশেল ঘটিয়ে এমন একটি পর্যটন ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা দরকার, যা শুধু পর্যটক আকর্ষণ করবে না, উন্নত পর্যটন অভিজ্ঞতা, বেশি পর্যটন আয়, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকতর অংশগ্রহণ এবং পরিবেশগত স্থায়িত্ব নিশ্চিত করবে। এবারের পর্যটন দিবসে এটি হোক আমাদের অঙ্গীকার।

লেখক: সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড