বিএনপির ‘মিষ্টি’ অ্যাকশন

বুধবার বাংলা ট্রিবিউনের একটি খবরের শিরোনাম ছিল—বিতর্কিত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এবার ‘হার্ডলাইনে’ বিএনপি। খবরে বলা হয়, ‘চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, ভাঙচুর, সহিংসতা ও অন্যান্য অপরাধে দলের নাম ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ জোরদার করেছে বিএনপি। গুরুতর ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এর পরদিনই বিএনপির সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগের খবর আসে। রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় নাম আসার পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তিনি পদত্যাগ করেন এবং তার আসনটি শূন্য ঘোষণা করে সংসদ সচিবালয়। বিতর্কের মুখে কোনও এমপির পদত্যাগের ঘটনা ত্রয়োদশ সংসদে এটিই প্রথম। যদিও এর আগে নৈতিক স্খলনের সুস্পষ্ট অভিযোগ থাকায় সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে নির্বাচিত জামায়াতের এমপি গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও তিনি এখনও সংসদ সদস্য পদে বহাল আছেন। এমনকি দ্বিতীয় স্ত্রীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় গ্রেফতার হয়ে রিমান্ডে গেলেও সংবিধান অনুযায়ী, তিনি সংসদ সদস্য আছেন। কেননা, দল থেকে বহিষ্কৃত হলেই কারো সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয় না। বরং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, দল থেকে পদত্যাগ করলে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে। বহিষ্কৃত হলে কী হবে, সে বিষয়ে কিছু বলা নেই। যে কারণে গাজী নজরুলের ব্যাপারে বলা হচ্ছিলো, তার বিরুদ্ধে যে ধরনের নৈতিক স্খলনের অভিযোগ উঠেছে, তাতে তার স্বউদ্যোগেই পদত্যাগ করা উচিত ছিল। কিন্তু তিনি তা করেননি। দল থেকেও তাকে পদত্যাগ করতে বলা হয়নি। সম্ভবত তার সংসদ সদস্য পদ বহাল রাখার জন্য জামায়াত কৌশলের আশ্রয় নিয়ে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে দায় এড়াতে চেয়েছে। তার বিপরীতে একজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে বিএনপি যে ব্যবস্থা গ্রহণ করলো, সেটি প্রশংসনীয়। তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ এখনও প্রমাণিত না হলেও গণমাধ্যমে প্রতিবেদন এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনার জেরে যে প্রধানমন্ত্রী তাকে সরিয়ে দিলেন, সেটি দলের নেতাকর্মী তো বটেই, সংসদ সদস্যদের জন্যও একটা বড় সতর্কবার্তা বলে বিবেচিত হবে।

জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পরে অন্তর্বর্তী সরকারের আমল থেকেই নানা কারণেই বিএনপি সমালোচিত হতে থাকে। বিশেষ করে দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ আসতে থাকে বিভিন্ন স্থান থেকে। সেইসঙ্গে ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান দখল, আধিপত্য বিস্তারের জেরে নিজেদের মধ্যে খুনোখুনির মতো ঘটনায়ও বিএনপি বিতর্কিত হয়। যদিও শুরু থেকেই দলীয় নেতাকর্মীদের সব ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শুধু চাঁদাবাজি, দখলদারি, আধিপত্য বিস্তারের জেরে অভ্যন্তরীণ কোন্দলই নয়, বরং প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ওপরে কোনও ধরনের প্রতিহিংসামূলক আচরণ না করারও নির্দেশ দেন তিনি। কিন্তু তাতে যে খুব একটা কাজ হয়নি, তার প্রমাণ একের পর দখলবাজির ঘটনা। শুধু তাই নয়, অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো দেড় বছর যে ধরনের মব সহিংসতা চলেছে এবং একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পরে সেই মব সহিংসতা বন্ধ হবে বলে জনমনে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল—সেটিও পূরণ হয়নি। কেননা ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পরেও দেশের বিভিন্ন স্থানে মব সহিংসতা হয়েছে—যার অনেক ঘটনায় স্থানীয় বিএনপি এবং তার বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের জড়িত থাকার অভিযোগ এসেছে।

গত ২ জুলাই সমকালের একটি খবরে বলা হয়, চলতি বছরের প্রথম সাড়ে পাঁচ মাসে সারাদেশে ৫৯ রাজনৈতিক নেতাকর্মী খুন হয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপিরই ৪৫ জন। বিএনপি এবং অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কোন্দলে নিহত হয়েছেন ১৪ জন। জামায়াতের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন ছয়জন। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংঘর্ষে তিনজন। খবরে বলা হয়, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধে খুন হন বিএনপির সাতজন এবং জামায়াত ও আওয়ামী লীগের একজন করে নেতাকর্মী।

এ রকম বাস্তবতায় বিএনপির হাইকমান্ডের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, দুই ধরনের পদক্ষেপের পথে এগোতে চায় বিএনপি। প্রমাণিত অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আনা অভিযোগ রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা। তার মানে শুধু দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা গ্রহণ নয়; বরং কেউ পরিকল্পিতভাবে বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিএনপির বিরুদ্ধে বিষোদগার করলে; ভুয়া তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেবে। এ ক্ষেত্রে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদির একটি বড় কেসস্টাডি। যেমন তার স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় বিএনপি সমালোচিত হলেও ঘটনার পরপরই তার ব্যাংক হিসাবের তথ্য ও লেনদেনের বিবরণ চেয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।

সালমান মুক্তাদির ভিডিওতে যে ভাষায় বিএনপির সমালোচনা করেছেন এবং বিএনপিকে চাঁদাবাজের দল বলে অভিহিত করেছেন, সেটি দল হিসেবে বিএনপিকে বিব্রত করেছে। তবে সমালোচনা করলেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং যখন সালমানের স্টুডিওতে ভাঙচুরের সমালোচনা হচ্ছে, সেই সময়েই তার ব্যাংক হিসাব তলবকে সরকারের ওভার অ্যাকশন হয়ে গেলো কি না, তা নিয়েও কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন।

এটা ঠিক যে, সরকার যেকোনও সময় যেকোনও নাগরিকের ব্যাংক হিসাব বা তার যেকোনও তথ্য জানতে চাইতে পারে। কিন্তু কোন সময়ে কী উদ্দেশ্যে কার তথ্য চাওয়া হচ্ছে এবং সেই তলবের মধ্য দিয়ে আসলে কী বার্তা দেওয়া হচ্ছে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে একদিকে দলের পরিচয় বহনাকারী অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সেইসঙ্গে দলের বাইরের সমালোচকদের মোকাবিলার কৌশল কী হবে—সেটিও বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার কারণ, প্রায় দেড় যুগ লন্ডনে নির্বাসিত জীবন-যাপন করার ফলে তারেক রহমান যে ধরনের উন্নত গণতান্ত্রিক ও সহনশীল রাজনৈতিক পরিবেশ দেখেছেন এবং অভ্যস্ত হয়েছেন—সেটি তিনি তার নিজের জীবনেও প্রয়োগ করতে চান। কিন্তু তার শরীরি ভাষা, আচরণ, সাদামাটা জীবন-যাপন এবং কৃচ্ছ্রতা সাধন তার দলের সংসদ সদস্য ও নেতাকর্মীরা কতটা বুঝতে পারছেন বা আমলে নিয়ে নিজেরা চর্চা করছেন, সেটি প্রশ্নসাপেক্ষ।

যেহেতু দলের সবাই তার মতো আচরণ করছেন না—ফলে এখন তাকে হার্ডলাইনে যেতে হচ্ছে। আপাতত এর বিকল্পও নেই। কেননা, একটি রক্তক্ষীয় অভ্যুত্থানের পরে দেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে যে প্রত্যাশা জনমনে তৈরি হয়েছিল, সেখানে বিরাট ছন্দপতন ঘটে সরকারি দলের অনেক নেতাকর্মীর আচরণে।

একটি জটিল সময়ে জটিল পরিস্থিতিতে সরকার গঠন করে দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে বিএনপিকে শুরু থেকেই নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। সেরকম বাস্তবতায় দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি-দখলবাজি-মব এবং আধিপত্য বিস্তারের জেরে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের সুযোগ নিয়ে বিরোধীদল মাঠ গরমের সুযোগ পেয়েছে। এরই মধ্যে তারা লংমার্চের মতো কর্মসূচিও পালন করেছে। দেশের বাইরেও সরকার তথা বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। ফলে দলের ভেতরে শৃঙ্খলা আনতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কোনও বিকল্প ছিল না।

শুধু এমপি মিষ্টির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণই নয়, বরং এর আগেও বিএনপি ও তার বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। গণমাধ্যমের খবর বলছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক অভিযোগের পর দলের শীর্ষ নেতৃত্ব বিতর্কিত ব্যক্তিদের তালিকা ও তাদের কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহ করছে। তৃণমূল থেকে পাওয়া অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগের আগের দিনই সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ড ও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া পৌর বিএনপির সভাপতি এমদাদুল হক মোল্লার পদ স্থগিত করার খবর আসে। জেলা বিএনপির প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সংগঠনবিরোধী কাজ এবং অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের কারণে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হলো।

দলের বিতর্কিতদের বিরুদ্ধে সাংগঠিনক ব্যবস্থা বিএনপি নির্বাচনের আগেও নিয়েছে। ২০২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর যুগান্তরের খবরে বলা হয়, এক বছরে নানা অভিযোগে সারা দেশে এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে বিএনপি। প্রায় দুই হাজার নেতাকর্মী বহিষ্কার হয়েছেন। শতাধিক নেতাকর্মীর দলীয় পদ স্থগিত করা হয়েছে। অন্যদের কারণ দর্শানোর নোটিশ কিংবা সতর্ক করা হয়েছে। দল এমন অ্যাকশনে থাকার পরও প্রায় প্রতিদিনই দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বিরুদ্ধে। এতে ক্রমেই বাড়ছে বহিষ্কারসহ শোকজের সংখ্যা।

প্রশ্ন হলো, এত ব্যবস্থা গ্রহণের পরেও কি পরিস্থিতি কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হচ্ছে? সবশেষ যে একজন সংসদ সদস্যকেও সরিয়ে দেওয়া হলো, সেই ঘটনা থেকেই বা কতজন শিক্ষা নেবেন? ইতিহাসের শিক্ষাই হলো, কেউ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না। সুতরাং সরকার গঠনের পর থেকেই বিএনপি যে ধরনের চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেখানে দলের এমপি-মন্ত্রী ও নেতাকর্মীরা যদি বিতর্কিত কাজ বন্ধ না করেন; যদি চাঁদাবাজি-দখলবাজি আর মব সহিংসতা থেকে নিজেদের সরিয়ে না নেন—তাহলে বিএনপির জন্য দেশ চালানো আরও কঠিন হয়ে যাবে। সেই সুযোগ নেবে বিরোধীরা। মনে রাখতে হবে, এখন বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ শুধু সংসদের বিরোধী দলই নয়, বরং তার চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এমন একটি দল, যারা অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত এবং যে দলের শীর্ষ নেতা ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন।

আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক।