আমি তখন ক্লাস সিক্স বা সেভেনে পড়ি। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেছি। গেটের কাছে ২/৩টা কুকুর ঘেউ ঘেউ করছে। ভয়ে আমি বাড়ির ভেতরে ঢুকতে পারছি না। চিৎকার করে মাকে ডাকছি।
আমার ছোট ভাইয়ের তখন বয়স বড়জোর তিন। সে একটা পাটকাঠি হাতে নিয়ে ভাঙা ভাঙা গলায় বলছে— আপু, আমি আসছি….।
আজও দৃশ্যটা আমার চোখে ভাসে। আমার চেয়ে প্রায় ১০ বছরের ছোট ভাইটি আমাকে কুকুরের হাত থেকে রক্ষা করতে ছোট্ট হাতে একটা পাটকাঠি নিয়ে এগিয়ে আসছে! দৃশ্যটাতে আবেগ আছে। ভালোবাসা আছে। পারিবারিক বন্ধন আছে। সবই ঠিক আছে। কিন্তু কোথাও যেন একটা ফাঁকও আছে। সেটা কোথায়?
আচ্ছা,‘জব উই মেট’ মুভির কথা মনে আছে? প্রায় দুই দশক আগের এই মুভিতে একটা দৃশ্য আছে— অচেনা এক স্টেশনে নেমে যায় এক মেয়ে। পরের স্টেশনে কীভাবে যাবে, সেটা জানতে সে যায় স্টেশন মাস্টারের কাছে। স্টেশন মাস্টার উপায় তো বলেনই, সঙ্গে শুরু করেন বিনা পয়সার জ্ঞান বিতরণ। হুঁশিয়ার থাকা উচিত ছিল। অচেনা জায়গায় একা নামা ঠিক হয়নি… এরপর আসে সেই বহুল আলোচিত সংলাপ— ‘একা মেয়ে খোলা তিজোরির মতো।’ অর্থাৎ একা মেয়ে মানেই সে অরক্ষিত, বিপন্ন, সহজ টার্গেট। তাই অচেনা স্টেশনে তার একা নামাটাই যেন মস্ত বড় ভুল। বিশ্ব এগিয়ে গেছে। কিন্তু দুই দশক পরও একা মেয়ে খোলা তিজোরিই রয়ে গেছে। অন্তত আমাদের দেশে বা এই উপমহাদেশে। তা না হলে গত ৮ আগস্ট নেপালে যেতে বাধা দেওয়া হলো কেন তিন প্রাপ্তবয়স্ক নারী— রিফা তামান্না, সোহানী ইসলাম সোমাপতি ও নাজনীনকে।
তারা একটি সম্মেলনে যোগ দিতে নেপাল যাচ্ছিলেন। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ইমিগ্রেশনে আদের আটকে দেওয়া হয়। কারণ তারা অবিবাহিত। তাদের সঙ্গে পুরুষ কেউ ছিল না। অথচ তারা প্রাপ্তবয়স্ক। তাদের কাছে বৈধ পাসপোর্ট ও ভ্রমণ-সংক্রান্ত কাগজপত্রও ছিল। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে কোনও মামলা বা বিদেশযাত্রায় আদালতের নিষেধাজ্ঞাও ছিল না। কিন্তু তবু কেন ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা তাদের আটকে দিলেন? তাদের অপরাধ কী ছিল? ইমিগ্রেশনে তাদের অবিবাহিত হওয়া এবং পরিবারের অনুমতি নিয়ে তারা বিদেশ যাচ্ছেন কিনা—এমন প্রশ্ন করা হয়েছিল। ভাবা যায়? তারা কি পালিয়ে যাচ্ছিলেন?
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার— তারা একা একা যাচ্ছিলেন না। তিনজন একসঙ্গেই যাচ্ছিলেন। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, তারা নিছক বেড়াতে নয়, একটি পেশাগত সম্মেলনে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন। অর্থাৎ শুধু একা নারী নয়—পুরুষ অভিভাবক ছাড়া একসঙ্গে তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীও আমাদের চোখে এখনও অরক্ষিত!
আহারে মন! সিনেমার সেই অবিবাহিত মেয়েটির কথাও মনে পড়ে। একা রোমে বেড়াতে যাওয়ার সময় তাকেও ইমিগ্রেশনে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছিল। বিয়ের সনদ দেখাতে বলা হয়েছিল, কারণ সেও একা যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সে বিদেশ যেতে পেরেছিল। কিন্তু আমাদের তিন প্রাপ্তবয়স্ক নারী শেষ পর্যন্ত নেপাল যেতে পারেননি। তাই প্রশ্নটা থেকেই যায়— একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর বিদেশযাত্রার বৈধতা কি তার বৈবাহিক অবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে?
অবশ্য এই তিন নারী হাল ছেড়ে দেননি। বিষয়টি নিয়ে তারা আদালতে গিয়েছেন। কিন্তু সবাই কি এভাবে আদালতে যেতে পারেন বা পারবেন? আজও আমাদের দেশে একজন পুরুষকে— সে ছোট হোক বা বড়, শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। আর নারীকে মনে করা হয় তুলনামূলকভাবে অসহায়, দুর্বল, নরম ও কোমল।
এখনও নারীরা খোলা তিজোরির মতো। সেকারণেই তাদের রক্ষায় সবসময় সঙ্গে কাউকে না কাউকে থাকতে হয়। না হলে চারপাশ থেকে বহু বিপদ তাকে ঘিরে ধরবে। তাই তো একা একটা মেয়ে অচেনা স্টেশনে নামতে পারবে না। অচেনা স্টেশনে একা নামলে প্রশ্ন, একা পার্কে গেলে সতর্কবাণী, রেস্টুরেন্টে একা বসলে কৌতূহল, একা ভ্রমণে গেলে সন্দেহ! এর মানে আমাদের দেশে এখনও নারীদের স্বাধীনতাও নেই। নিরাপত্তাও নেই। নারীর একা চলাফেরাকে আমরা এখনও স্বাভাবিক নাগরিক স্বাধীনতা হিসেবে দেখতে শিখিনি।
একজন নারী একা ভ্রমণ করলে তার হয়রানি বা সহিংসতার ঝুঁকি থাকতে পারে। সেই ঝুঁকি কমানোর দায়িত্ব কি নারীর স্বাধীনতা কমিয়ে দেওয়া, নাকি এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা— যেখানে একজন নারী একা চললেও নিরাপদ থাকবেন?
তাছাড়া রাষ্ট্র কেন ধরে নেবে যে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর পাশে একজন পুরুষ না থাকলে, তিনি নিজেকে রক্ষা করতে পারবেন না?
আসলে শিশুকাল থেকেই আমরা ছেলে ও মেয়েকে ভিন্ন ভিন্ন বার্তা দিয়ে বড় করি। ছেলেকে বলা হয়—তুমি ছেলে, ভয় পেও না, বোনকে দেখো, মাকে রক্ষা করো। অন্যদিকে মেয়েকে বলা হয়—একা যেও না, সাবধানে থেকো, কোনও পুরুষ সঙ্গে থাকলেই নিরাপদ। ফলে ধীরে ধীরে পুরুষের সঙ্গে শক্তি এবং নারীর সঙ্গে দুর্বলতার একটি মানসিক যোগসূত্র তৈরি হয়।
মনোবিজ্ঞানে একে লিঙ্গভিত্তিক সামাজিকীকরণ বলা হয়। দীর্ঘদিন একই বার্তা শুনতে শুনতে শুধু পুরুষ বা নারীরাই নয়, পুরো সমাজই বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, পুরুষ স্বাভাবিকভাবেই রক্ষাকর্তা আর নারী সুরক্ষাপ্রার্থী।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় অভিভাবকসুলভ নিয়ন্ত্রণ। এর একটি কোমল রূপ আছে—যেখানে বলা হয়, তোমার ভালোর জন্যই তো বলছি। কিন্তু সমস্যা হলো, এই ‘ভালো চাওয়া’ কখনও কখনও একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারকেও অস্বীকার করে।
আর আছে সুরক্ষামূলক পক্ষপাত। আমরা যখন মনে করি— কোনও একটি গোষ্ঠী দুর্বল, তখন তাদের সুরক্ষার জন্য বাড়তি বিধিনিষেধ আরোপ করাকে স্বাভাবিক মনে করি।
নারীর ক্ষেত্রে সেটিই হতে পারে—একা ভ্রমণ না করা, রাতে বাইরে না থাকা, পুরুষ অভিভাবক ছাড়া কোথাও না যাওয়া।
অথচ সৌদি আরবেও হজ-সংক্রান্ত বর্তমান নীতিতে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নারীরা মাহরাম ছাড়াই হজ করতে পারেন—বিশেষ করে সংগঠিত/নিরাপদ হজ-ব্যবস্থার আওতায়। অর্থাৎ বয়স, ভ্রমণের ধরন, নিরাপত্তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে একজন নারীর সঙ্গে পুরুষ অভিভাবক থাকা সবসময় অপরিহার্য নয়।
কথা হচ্ছে, যদি একজন বয়স্ক নারী মাহরাম ছাড়া পবিত্র হজ পালনের জন্য বিদেশ যেতে পারেন, তাহলে একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী পেশাগত সম্মেলনে যোগ দিতে দেশের বাইরে যেতে পারবে না কেন? কেন তার পাশে পুরুষ অভিভাবক থাকা অপরিহার্য হয়ে উঠবে?
অবশ্যই বিদেশযাত্রায় নিরাপত্তা যাচাইয়ের প্রয়োজন আছে। মানবপাচার, জাল কাগজপত্র, অবৈধ অভিবাসন কিংবা অন্য কোনও অপরাধের আশঙ্কা থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই করার দায়িত্ব আছে। কিন্তু নিরাপত্তা যাচাই আর নারী হওয়ার কারণে অতিরিক্ত সন্দেহ—দুটি এক বিষয় নয়।
আমাদের দেশে একজন নারীকে নিরাপদ রাখার সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হলো— তার চলাফেরার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা। আর সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো— এমন একটি সমাজ তৈরি করা, যেখানে একজন নারী একা বের হলেও নিরাপদ থাকবে। প্রথমটি নিয়ন্ত্রণ তৈরি করে, দ্বিতীয়টি স্বাধীনতা নিশ্চিত করে।
প্রশ্ন হলো, নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে আমরা কি তার স্বাধীনতাকেই সংকুচিত করছি না? আমরা এমন এক সমাজ তৈরি করেছি, যেখানে নারী নিরাপদ থাকতে চাইলে, তার চলাফেরার স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে হয়।
আমরা কোন সমাজ চাই? নারীকে খোলা তিজোরি ভাবা বন্ধ করার সময় কি এখনও আসেনি?
লেখক: সাইকোলজিস্ট