বাংলাদেশে এখন চলছে বন্ধের হিড়িক। আজ এই বন্ধ হচ্ছে তো, কাল আরেকটা বন্ধ। শুধু বন্ধ ঘোষণাই নয়, দরজায় লাগছে তালা, চলছে হুমকি। কোনও কিছু নিষিদ্ধ না হয়েও সেখানে হামলা চালানো হচ্ছে, বন্ধ করা হচ্ছে, গ্রেফতার করা হচ্ছে। এই বন্ধ কারা করছে, কেন করছে, সেসব বিষয়ে সরকারের কোনও বক্তব্য নেই। কিন্তু সেগুলো ভূতের মতো লোকজন এসে বাস্তবায়ন করে দিয়ে যাচ্ছে।
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলা স্টেডিয়ামে পূর্ব-নির্ধারিত মেয়েদের প্রীতি ফুটবল ম্যাচ স্থানীয় কয়েকজনের আপত্তির মুখে স্থগিত করা হয়েছে। ৫ অক্টোবর বিকাল সাড়ে ৪টায় সিলেটের জারা স্পোর্টিং ক্লাব ও দিরাইয়ের স্বপ্নচূড়া স্পোর্টিং ক্লাবের মেয়েদের মধ্যে ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। (৬ অক্টোবর, ২০২৬ বাংলা ট্রিবিউন)
বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জন মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত স্লোগান জয় বাংলা কি নিষিদ্ধ করা হয়েছে? কিন্তু আমরা দেখছি, জয় বাংলা স্লোগান দিলেই গ্রেফতার করা হচ্ছে, গ্রেফতার করে মামলা দেওয়া হচ্ছে। জাসদ কি নিষিদ্ধ দল? কিন্তু আমরা দেখেছি, কয়েক দিন আগেই জাসদ অফিসে মব করে, হামলা করে সেখানে অবস্থানরত কর্মী, প্রতিনিধিদের গ্রেফতার করা হয়েছে, পরে যদিও বেশিরভাগকেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
এরপরের ঘটনাগুলো পরপরই ঘটছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি বিক্রির অপরাধে প্রকাশক ইউপিএলের বাংলা বাজার অফিসে তালা লাগিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে দুইজন কর্মীকে আটক করেছিল এবং পরে যদিও তাদের ছড়ে দেওয়া হয়।
বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইটি কি সরকার নিষিদ্ধ করেছে? না করেনি।
প্রসঙ্গত, এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি বিভিন্ন দূতাবাস এবং সরকারি অফিস থেকে সরিয়ে ফেলার অনানুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু কেন সেই বিষয়ে সেসময় সরকার কোনও ব্যাখ্যা দেয়নি। তবে এই বিষয়ে সরকারি কোনও সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে অনন্ত আমার জানান নেই। তাঁর ছবি, ভাস্কর্য বা তাঁর লেখা বই প্রকাশ করা কি নিষিদ্ধ করা হয়েছে?
এর কোনোটিই তো হয়নি। তাহলে কোন আইনের ভিত্তিতে এসব করা হচ্ছে, এটাই প্রথম প্রশ্ন। তাহলে কারা ‘দায়িত্ব’ নিয়ে এসব করে যাচ্ছে?
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বেই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। তাই এ ধরনের বই প্রকাশের ক্ষেত্রে হুমকি বা বাধার ঘটনা মুক্তিযুদ্ধ বা দেশের ইতিহাস নিয়ে বই প্রকাশ করা অন্য প্রকাশকদের জন্যও উদ্বেগের বিষয়। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে— সরকার এই বিষয়ে ‘নিশ্চুপতা’কেই শ্রেয় মনে করছে। আবার সরকারের এই নিশ্চুপ থাকা এক ধরনের সম্মতির দিকে ইঙ্গিত করে। কারণ সরকার এদের বিরুদ্ধ কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না, বা এই ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কোনও বক্তব্যও দিচ্ছে না।
পরের দিনের খবর, ‘‘বাংলাদেশ বিমানে তানভীর মোকাম্মেলের ‘লালসালু’ও ‘চিত্রা নদীর পারে’ প্রদর্শন বন্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায় যে সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট পরিবেশক প্রতিষ্ঠানকে বিমান কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। এছাড়া চলচ্চিত্র দুটির পরিচালক ও প্রযোজক বিশিষ্ট নির্মাতা তানভীর মোকাম্মেল নিজেও বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একাধিক পোস্টে সেটির জানান দিয়েছেন। কিন্তু কেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে দীর্ঘদিন ধরে প্রদর্শিত হয়ে আসা দুই কালজয়ী চলচ্চিত্র লালসালু ও চিত্রা নদীর পারে আর না দেখানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটি নিয়ে খোলাসা কোনও বক্তব্য দেয়নি।
গত এক মাসে এরকম আরও বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। মবের মুখে বা হালের অতি ক্ষমতাবান হিসেবে আবির্ভূত হওয়া ‘তৌহিদি জনতার’ এবং ওলামা পরিষদ বন্ধ করে দেয় অনেকগুলো অনুষ্ঠান। গত ১৯ আগস্ট কিশোরগঞ্জে ব্যান্ড অ্যাশেজ ও গায়ক নোবেলের একটি কনসার্ট স্থানীয় ওলামা পরিষদের আপত্তির মুখে বাতিল করে জেলা প্রশাসন। এর একদিন আগে অর্থাৎ ১৮ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলা পুলিশের নিজস্ব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল।
শুধু কনসার্ট, নাটক বা সিনেমাই নয়— প্রথমে বাধা এবং পরে বন্ধ হয়েছে লোক সংস্কৃতির বিভিন্ন আসরও। সিলেটের বিশ্বনাথে ইব্রাহিম শাহের মাজারসংলগ্ন বাউল গানের আসরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া নেত্রকোনার মদনেও বাউল গান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী গত ১৫ মাসে কেবল ‘তৌহিদী জনতা’ ‘ওলামা পরিষদ’-এর আপত্তিতে ১৩টি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়।
আপত্তি উঠেছে খেলাধুলা নিয়েও। এর আগে নারী খেলোয়াড়দের বিষয়ে দিনাজপুরে আপত্তি তুলেছিল ‘তৌহিদী জনতা’। এবার চোখ নৌকাবাইচের দিকে। সিলেটের বিয়ানীবাজারে ২৮ আগস্টের নির্ধারিত নৌকাবাইচ বন্ধের দাবি তোলা হয়েছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গত দুই বছর আপত্তির মুখে নৌকাবাইচ করা যায়নি। এবার অনুমতি মিললেও তা রয়েছে শর্তসাপেক্ষ। বলা হয়েছে, নৌকা বাইচে কোনও ধরনের বাদ্যযন্ত্র বাজানো বা নাচানাচি করা যাবে না। এখন নৌকা বাইচ করবেন নীরবে, শবের মতো।
আমরা জানি যে মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণার অনুচ্ছেদ ১৯ ও ২৭ এবং আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের ও ২১ অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশ, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ এবং সাংস্কৃতিক জীবনে অংশগ্রহণের অধিকার স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে কোনও গোষ্ঠী বা চাপের মুখে এসব সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অধিকার অস্বীকার, বন্ধ কিংবা খারিজ করার সুযোগ একেবারেই নেই। তাহলে জোর দিয়েই বলতে হবে—বাংলাদেশে বর্তমানে যে বন্ধের হিড়িক চলছে, তা স্পষ্টভাবেই মানবাধিবার সর্বজনীন ঘোষণার বিপরীত।
এখন আসি অতি দরকারি এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে কারা এই ‘তৌহিদি জনতা’ বা ‘ওলামা পরিষদ’-এর কর্তাব্যক্তি? কীভাবে তারা একের পর এক ‘বন্ধ’-এর কারিগর হয়ে উঠছে। সিনেমা, নাটক, গান, খেলাধুলা কিংবা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি বিক্রি নিয়ে কারা আপত্তি করছে এবং কেন করছে, সেটাও জানা দরকার। কেন স্থানীয় প্রশাসন এই আপত্তিকে আমলে নিয়ে এগুলো বন্ধ করছে কিংবা নানা ধরনের শর্ত জুড়ে দিচ্ছে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন তোলা খুব জরুরি। এগুলো বন্ধের ক্ষেত্রে সরকারি আশকারা না পেলে কেন প্রশাসন এগুলো বন্ধ করার উদ্যোগ নেবে? বরং এগুলোতো প্রশাসনিক উদ্যোগেই চলমান থাকার কথা। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে কি এই আপত্তি করা হচ্ছে, নাকি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের পক্ষ থেকে আপত্তি আসছে বলে এগুলোকে রাজনৈতিক মাঠে তুষ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে?
কেউ আপত্তি করলেই কি সরকার সেই আপত্তি বিবেচনায় নেবে? কেন নেবে? শুধু কোনও একটি পক্ষ আপত্তি করেছে বলেই সরকার কেন সেই আপত্তি গ্রহণ করবে—এটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। তাহলে আমাদের ধরেই নিতে হবে যে তৌহিদি জনতা বা ওলামা পরিষদই কী আরেকটি প্রশাসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে এবং এটিতে সরকারের সায় আছে! কিন্তু এই ধরে নেওয়া আর এই বন্ধ করার রাজনীতিতে আমাদের যে কষ্ট হচ্ছে, আমরা শ্বাস নিতে পারছি না। এই বন্ধ-বন্ধ রাজনীতি অচিরেই বাদ দিন। আমাদের শ্বাস নিতে দিন।
লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল: zobaidanasreen@gmail.com