দেবীর আরাধনা বনাম ঘরের নারীর অবহেলা

হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়েই এবার দুর্গাপূজা শুরু হয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করে একদল শিক্ষার্থীর প্রকাশ্যে গরু জবাই এবং ভিন্নধর্মীদের নিয়ে বিদ্বেষমূলক কথাবার্তা, বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা ভাঙচুরের খবর, পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা এবং সংখ্যালঘুদের মধ্যে বিরাজমান অনিশ্চয়তা উৎসবের আনন্দকে অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে। সরকার নিরাপত্তার আশ্বাস দিলেও তাতে সবার মনে স্বস্তি ফিরেছে, এমন বলা যায় না।

অপরদিকে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে নারী নির্যাতন, নিপীড়ন ও সহিংসতার নানা ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়ে চলেছে। বিভিন্ন স্থানে নারীর মরদেহ উদ্ধার, ধর্ষণ ও হত্যার খবর আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা এখনও কতটা অনিশ্চিত। এমন এক বাস্তবতায় দেবী দুর্গার আরাধনা, অশুভ শক্তির বিনাশ এবং নারীশক্তির বন্দনা নিছক ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। যে সমাজ দেবীকে শক্তি, সাহস ও অসুরবিনাশের প্রতীক হিসচিররঞ্জন সরকারবে পূজা করে, সেই সমাজেই নারীরা যদি ঘরে-বাইরে বৈষম্য, অবহেলা, নির্যাতন ও অসম্মানের শিকার হন, তবে সেই আরাধনার তাৎপর্য নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

প্রতিমার সামনে নারীশক্তির বন্দনা আর বাস্তব জীবনে নারীর অধিকার অস্বীকারের এই বৈপরীত্য আমাদের আত্মসমালোচনার মুখোমুখি দাঁড় করায়। দুর্গাপূজার এই আবহে তাই প্রশ্নটি শুধু নারীর নিরাপত্তা নিয়ে নয়, আমাদের বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও সামাজিক আচরণের সামঞ্জস্য নিয়েও— দেবীকে শক্তিরূপে পূজা করি, অথচ ঘরের নারীর শক্তি, স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদাকে কতটা স্বীকৃতি দিই?

প্রশ্নটি ধর্মীয় বিশ্বাসকে আঘাত করার জন্য নয়; বরং বিশ্বাসের সঙ্গে বাস্তব জীবনের সম্পর্ক খতিয়ে দেখার জন্য।

দেবী দুর্গার সামনে মাথা নত করা সহজ, কিন্তু ঘরের নারীটির মতামতকে সম্মান করা অনেকের কাছেই কঠিন। প্রতিমার হাতে অস্ত্র দেখে আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে শক্তির বন্দনা করি, অথচ সংসারের নারীর প্রতিবাদকে প্রায়ই অবাধ্যতা বলে দাগিয়ে দিই। মণ্ডপে নারীর শক্তির প্রশংসা চলে, আর বাড়ি ফিরে সেই নারীকেই শোনানো হয়— সংসার করতে হলে মানিয়ে চলতে হয়। এই দ্বিচারিতার নাম ভক্তি হতে পারে, কিন্তু মানবিকতা নয়।

বাংলাদেশের সমাজে নারীর অগ্রগতি অস্বীকার করার উপায় নেই। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রশাসন, চিকিৎসা, ব্যবসা, সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। পোশাকশিল্প থেকে কৃষি, বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, পরিবার থেকে রাষ্ট্র—অসংখ্য ক্ষেত্রে তাঁদের শ্রম ও অবদান দেশের অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিচ্ছে। তবু এই অগ্রগতির পাশে রয়ে গেছে বৈষম্য, বাল্যবিবাহ, যৌতুকের চাপ, পারিবারিক সহিংসতা, যৌন হয়রানি, সম্পত্তির অধিকার নিয়ে বঞ্চনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর সীমিত অংশগ্রহণ। বাইরে সাফল্যের গল্প যত উজ্জ্বল, ঘরের ভেতরের বাস্তবতা ততটা সব সময় আলোকিত নয়।

একজন নারী চাকরি করেন, সংসারের খরচে অবদান রাখেন, সন্তানকে বড় করেন, বয়স্কদের দেখাশোনা করেন— তারপরও তাঁকে প্রমাণ করতে হয় যে, তিনি একজন ভালো স্ত্রী, ভালো মা এবং ভালো গৃহিণী। পুরুষের উপার্জনকে অনেক সময় পরিবারের প্রধান অবদান হিসেবে দেখা হয়, অথচ নারীর আয়কে ধরা হয় বাড়তি সহায়তা। আবার নারী উপার্জন না করলেও তাঁর গৃহস্থালি শ্রমকে স্বাভাবিক কর্তব্য বলে ধরে নেওয়া হয়। রান্না, পরিষ্কার, কাপড় ধোয়া, সন্তানকে পড়ানো, অসুস্থের সেবা—এসব কাজের কোনও বেতন নেই, ছুটি নেই, অবসরের নিশ্চয়তাও নেই। সংসারের হিসাবের খাতায় এই শ্রমের মূল্য প্রায় শূন্য, অথচ এর ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে পরিবারের দৈনন্দিন জীবন।

বিস্ময়ের বিষয়, এই বৈষম্যকে অনেক সময় ভালোবাসা, কর্তব্য কিংবা ঐতিহ্যের সুন্দর মোড়কে পরিবেশন করা হয়। নারী সংসারের জন্য ত্যাগ করলে তাঁকে মহীয়সী বলা হয়, নিজের স্বপ্নের কথা বললে বলা হয় স্বার্থপর। স্বামীর সিদ্ধান্ত মেনে নিলে তিনি আদর্শ স্ত্রী, প্রশ্ন তুললে সংসারে অশান্তির কারণ। ছেলের স্বাধীনতা ব্যক্তিত্বের লক্ষণ, মেয়ের স্বাধীনতা পরিবারের সম্মানের জন্য বিপদ—এমন অদ্ভুত হিসাব এখনও বহু পরিবারে চালু। যেন সম্মান কোনও মানুষের সহজাত অধিকার নয়— নারীর চলাফেরা, পোশাক, বন্ধুত্ব এবং পছন্দের ওপর বসানো অদৃশ্য পাহারাদারের পুরস্কার।

দুর্গাপূজার আয়োজনেও নারীর শ্রমের এই অদৃশ্যতা চোখে পড়ে। মণ্ডপ সাজানো, অতিথি আপ্যায়ন, রান্নাবান্না, পরিবারের সদস্যদের প্রস্তুত করা কিংবা উৎসবের নানা দায়িত্ব সামলাতে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁদের পরিশ্রমে উৎসব পূর্ণতা পায়, অথচ প্রশংসার আলো প্রায়ই পড়ে মঞ্চের বক্তা, সংগঠক কিংবা অর্থদাতার ওপর। নারীরা যেন উৎসবের অপরিহার্য কর্মী, কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সব সময় সমান অংশীদার নন। দেবীর সামনে ফুল দেওয়ার আয়োজন থাকে, কিন্তু যাঁরা ফুল সাজান, তাঁদের বিশ্রাম, মতামত ও মর্যাদার কথা কতটা ভাবা হয়?

ধর্মীয় উৎসব মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করে। বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজে দুর্গাপূজা শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিরও উপলক্ষ। এই উৎসবের প্রকৃত সৌন্দর্য আরও গভীর হতে পারে, যদি দেবীর শক্তির প্রতীকী অর্থ আমাদের সামাজিক আচরণেও প্রতিফলিত হয়। নারীকে শুধু মা, বোন, স্ত্রী কিংবা কন্যার পরিচয়ে নয়, স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে সম্মান করতে হবে। তাঁর পরিচয় পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, কিন্তু তাঁর অধিকার সেই সম্পর্কের দয়ার ওপর নির্ভরশীল নয়।

নারীর প্রতি সহিংসতা কেবল ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যা নয়— এটি সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের প্রশ্ন। নির্যাতনের শিকার নারীকে দোষারোপ করা, তাঁর পোশাক বা আচরণকে ঘটনার কারণ হিসেবে দেখানো, কিংবা পরিবারের সম্মানের অজুহাতে তাঁকে চুপ থাকতে বাধ্য করা অন্যায়কে আরও শক্তিশালী করে। অনেক নারী সামাজিক লজ্জা, আর্থিক নির্ভরতা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ কিংবা নিরাপত্তার আশঙ্কায় নির্যাতনের কথা প্রকাশ করতে পারেন না। তাঁদের পাশে দাঁড়াতে পরিবার, প্রতিবেশী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, প্রশাসন ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কার্যকর ভূমিকা জরুরি। শুধু সহানুভূতির কথা বললে চলবে না; নিরাপদ অভিযোগব্যবস্থা, আইনি সহায়তা এবং ন্যায়বিচারের বাস্তব সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

পরিবর্তনের শুরু হতে পারে ঘর থেকেই। পরিবারের কাজ নারী-পুরুষের মধ্যে ন্যায্যভাবে ভাগ করা, সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই সমতা শেখানো, মেয়েদের শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং ছেলেদের গৃহস্থালি কাজে অংশ নিতে উৎসাহিত করা জরুরি। পরিবারের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, সন্তানের শিক্ষা, সম্পত্তি কিংবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় নারীর মতামতকে  গুরুত্ব দিতে হবে। কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ, সমান কাজের ন্যায্য পারিশ্রমিক, মাতৃত্ব ও পিতৃত্বের দায়িত্ব পালনের সহায়তা এবং হয়রানির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।

নারীর ক্ষমতায়ন মানে তাঁকে একা সব দায়িত্ব সামলানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া নয়— বরং অন্যায় বাধা সরিয়ে তাঁর নিজের জীবন বেছে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা। এখানে পুরুষের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা পুরুষের পরাজয় নয়, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের শর্ত। সংসারে সহযোগিতা করা কোনও পুরুষের অনুগ্রহ নয়— এটি যৌথ জীবনের স্বাভাবিক দায়িত্ব। একইভাবে নারীর স্বাধীনতা মানেই পরিবার ভেঙে যাওয়া নয়। বরং পারস্পরিক সম্মান, আস্থা এবং সমান মর্যাদার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা পরিবারই অধিক সুস্থ, নিরাপদ ও স্থিতিশীল হতে পারে। পুরুষ যদি নিজের কর্তৃত্বের কিছুটা ছেড়ে দিতে শেখেন, নারী যদি নিজের কণ্ঠস্বর প্রকাশের নিরাপদ পরিসর পান, তবে পরিবারে সংঘাত কমবে, সম্পর্কের গভীরতা বাড়বে।

দুর্গাপূজার সময় আমরা অসুরবধের কাহিনি স্মরণ করি। কিন্তু অশুভ শক্তি কেবল পৌরাণিক কাহিনির চরিত্র নয়— বৈষম্য, অবমাননা, নির্যাতন, কুসংস্কার এবং নারীর স্বাধীনতা অস্বীকার করার প্রবণতাও অশুভেরই রূপ। এসবের বিরুদ্ধে লড়াই প্রতিমার সামনে প্রার্থনা করলেই শেষ হয় না। এর জন্য দরকার আত্মসমালোচনা, সামাজিক সাহস, ন্যায্য আইন প্রয়োগ এবং দৈনন্দিন আচরণে পরিবর্তন। পূজার মণ্ডপে শক্তির বন্দনা করে ঘরে ফিরে নারীর কণ্ঠরোধ করলে সেই আরাধনার অর্থ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

দেবী দুর্গার প্রতি শ্রদ্ধা তখনই জীবন্ত হয়ে উঠবে, যখন নারীর নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদা আমাদের সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হবে। যে মেয়েটি নিজের পছন্দের পড়াশোনা করতে চায়, যে নারী কর্মক্ষেত্রে সম্মান চান, যে স্ত্রী সংসারের সিদ্ধান্তে সমান অংশ নিতে চান, যে মা নিজের জন্যও একটু সময় চান—তাঁদের প্রত্যেকের আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাঁদের দাবি কোনো বাড়তি সুবিধা নয়— ন্যায্য অধিকার। দেবীর কাছে শক্তি চাওয়ার পাশাপাশি আমাদের নিজেদের মধ্যেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি জাগাতে হবে। কারণ প্রকৃত পূজা শুধু প্রতিমায় নয়, মানুষের মর্যাদায়; শুধু উৎসবের আলোয় নয়, প্রতিদিনের জীবনে।

লেখক:গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট