কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে অঙ্গীকার নয়, চাই কার্যকর ব্যবস্থা

শেখ জেনিফা কে. জব্বার
১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:৪৯ আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:৪৯

কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি মোকাবিলায় বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। শ্রম আইনকে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে, আইনে যৌন হয়রানির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সহিংসতা ও হয়রানিবিষয়ক কনভেনশন ১৯০ (সি১৯০) অনুসমর্থন করেছে। বর্তমানে শ্রম বিধিমালা পর্যালোচনার কাজ চলছে। ফলে এসব অঙ্গীকারকে বাস্তবে কার্যকর একটি ব্যবস্থায় রূপ দেওয়ার সুযোগ আমাদের সামনে এসেছে।

এখন প্রশ্নটি আর যৌন হয়রানি মোকাবিলা করা উচিত কিনা, তা নিয়ে নয়। বরং প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কীভাবে এমন একটি কাঠামো গড়ে তুলবে, যার ওপর কর্মজগতের মানুষ আস্থা রাখতে পারবেন, প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কার্যকরভাবে আইন প্রয়োগ করতে পারবে।

প্রথমত, এটি অধিকার রক্ষার বিষয়। কাজ করতে এসে নিজের মর্যাদা, নিরাপত্তা কিংবা সমতার অধিকার বিসর্জন দেওয়া নয়। কর্মক্ষেত্রে হয়রানির ঘটনা ঘটার পর কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা চলতে পারে। সি১৯০ সহিংসতা ও হয়রানিমুক্ত কর্মজগতের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। একইসঙ্গে এই কনভেনশনে প্রতিরোধ, সুরক্ষা, আইন প্রয়োগ, প্রতিকার, কার্যকর তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

তবে এটি শুধু অধিকার রক্ষার বিষয় নয়; উৎপাদনশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মদক্ষতার সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। আইএলওর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির কারণে বিশ্বজুড়ে উৎপাদনশীলতা হ্রাসের আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল ২৬০ কোটি মার্কিন ডলার। এর বাইরে অন্যান্য আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৯০ কোটি ডলার।

অনিরাপদ কর্মপরিবেশের কারণে কর্মীদের অনুপস্থিতি বাড়তে পারে, কর্মী চলে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে, অভিজ্ঞ কর্মীদের হারাতে হতে পারে এবং কর্মীদের সম্পৃক্ততা ও কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যেতে পারে। অভিযোগ যথাযথভাবে সামাল দিতে না পারলে কর্মক্ষেত্রের সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী বিরোধে রূপ নিতে পারে। এতে আস্থা নষ্ট হয়, প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কার্যক্রম ব্যাহত হয়। তাই প্রতিরোধ ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণকে প্রতিষ্ঠানের জন্য কেবল আইন মেনে চলার খরচ হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মদক্ষতারও অংশ।

উন্নয়ন খাতের জন্যও বিষয়টি সমান গুরুত্বপূর্ণ। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) ও উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকে দাতা সংস্থা, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং উন্নয়ন অংশীদারদের সেফগার্ডিং ও যৌন শোষণ, নির্যাতন ও হয়রানি প্রতিরোধ (পিএসইএএইচ) সংক্রান্ত ক্রমবর্ধমান প্রত্যাশা পূরণ করতে হচ্ছে। শুধু নীতিমালা তৈরি করলেই হবে না। দাতা সংস্থাগুলো নিশ্চিত হতে চায়, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে নিরাপদে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা রয়েছে, দক্ষ ব্যক্তিদের মাধ্যমে তদন্ত হয়, অভিযোগকারী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক আচরণ প্রতিরোধ করা হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা ও রেফারেল সেবা দেওয়া হয়। উদ্বেগ বা অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও থাকতে হয়। কার্যকর ব্যবস্থা মানুষকে সুরক্ষা দেয়, একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থাও বজায় রাখে।

সরকারের জন্য বিষয়টি মূলত বাংলাদেশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারকে বাস্তবে কার্যকর করার প্রশ্ন। বাংলাদেশ ২০২৫ সালের নভেম্বরে সি১৯০ অনুসমর্থন করেছে। কনভেনশনটি বাংলাদেশের জন্য ২০২৬ সালের ২০ নভেম্বর থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। সি১৯০ সহিংসতা ও হয়রানি প্রতিরোধ ও মোকাবিলায় অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমন্বিত এবং জেন্ডার-সংবেদনশীল পদ্ধতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এতে প্রতিরোধ, আইন প্রয়োগ, প্রতিকার, তদন্ত, প্রশিক্ষণ ও সামাজিক সংলাপের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফলে শ্রম বিধিমালার চলমান সংস্কার বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আইনগত কাঠামোকে এসব অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।

এখন কী করা প্রয়োজন?

পরবর্তী পর্যায়ে শ্রম বিধিমালায় শুধু আরও কিছু শর্ত যুক্ত করলেই চলবে না। বরং শ্রম আইন ও বিধিমালা যেন সমন্বিত ও কার্যকর একটি ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রথমত, শ্রম আইনের ২৩, ২৪, ৩৩২ ও ৩৩২ক ধারার মধ্যকার সম্পর্ক স্পষ্ট করতে হবে। ২৩ ও ২৪ ধারায় অসদাচরণ ও শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থার কাঠামো রয়েছে। অন্যদিকে, ৩৩২ ও ৩৩২ক ধারায় সহিংসতা ও হয়রানি প্রতিরোধ এবং অভিযোগ কমিটি গঠনের বিষয়গুলো এসেছে। যৌন হয়রানির অভিযোগের তদন্তের সঙ্গে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থার সম্পর্ক কী হবে, অসদাচরণ প্রমাণিত হলে কে শৃঙ্খলামূলক কার্যক্রম শুরু করবেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কে নেবেন এবং সংশ্লিষ্ট সবার জন্য কী ধরনের সুরক্ষা থাকবে—আইনগত কাঠামোয় এসব বিষয় পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।

এর উদ্দেশ্য অভিযোগ সম্পর্কে আগেভাগে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো নয়। অভিযোগ কমিটিকে শৃঙ্খলামূলক কর্তৃপক্ষের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাও লক্ষ্য নয়। বরং অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত, তদন্তের ফলাফল, শৃঙ্খলামূলক সিদ্ধান্ত ও প্রতিকার—এই প্রতিটি ধাপের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট সংযোগ তৈরি করাই লক্ষ্য। আইনে যদি এ ধরনের প্রক্রিয়া পরিচালনার পর্যাপ্ত ভিত্তি না থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে। কারণ, শ্রম বিধিমালার মাধ্যমে এমন কোনও মৌলিক আইনগত দায়িত্ব বা পরিণতি তৈরি করা যায় না, যার ভিত্তি মূল আইনে নেই।

দ্বিতীয়ত, ৩৩২ ধারাকে বিধিমালার মাধ্যমে কার্যকর করতে হবে। সংশোধিত ধারায় সহিংসতা ও হয়রানি প্রতিরোধ এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে নিয়োগকর্তা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। বিধিমালায় এসব সাধারণ দায়িত্বকে বাস্তবসম্মত ও নির্দিষ্ট শর্তে রূপ দিতে হবে। এর মধ্যে কর্মক্ষেত্রের নীতিমালা, ঝুঁকি মূল্যায়ন, সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, সুরক্ষা এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত থাকা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, ৩৩২ক ধারার অধীনে গঠিত অভিযোগ কমিটির কার্যপ্রণালি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো স্পষ্ট করতে হবে। আইনে পাঁচ সদস্যের অভিযোগ কমিটির কথা বলা হয়েছে, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য নারী হবেন, সভাপতিও হবেন নারী এবং জেন্ডার ও যৌন সহিংসতা নিয়ে কাজ করা সংগঠনের দুজন সদস্য থাকবেন। কমিটির দায়িত্বের মধ্যে অভিযোগ তদন্ত করাও রয়েছে।

বিধিমালায় কমিটির এখতিয়ার, সদস্যদের দক্ষতা, স্বাধীনতা, তদন্তের সময়সীমা, গোপনীয়তা, প্রতিবেদন দেওয়ার পদ্ধতি এবং বাইরের হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষার বিষয়গুলো স্পষ্ট করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে কমিটির তদন্ত ও পর্যবেক্ষণের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক শৃঙ্খলামূলক প্রক্রিয়ার সম্পর্ক কী হবে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব কার—তাও নির্ধারণ করতে হবে।

চতুর্থত, অভিযোগ গ্রহণ থেকে নিষ্পত্তি পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া নির্ধারণ করতে হবে। কীভাবে অভিযোগ গ্রহণ করা হবে, তাৎক্ষণিক নিরাপত্তাঝুঁকি কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, কখন আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হবে, কে তদন্ত করবেন, স্বার্থের সংঘাত কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, কীভাবে প্রমাণ যাচাই করা হবে, শৃঙ্খলামূলক বা অন্য কোনও ব্যবস্থা কে শুরু করবেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কে নেবেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে কীভাবে জানানো হবে এবং কী ধরনের প্রতিকার ও সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকবে—সবকিছু স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

এক্ষেত্রে এটিও স্বীকার করতে হবে যে যৌন হয়রানি সব সময় সহকর্মীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। কোনও সুপারভাইজার, ব্যবস্থাপক, ঠিকাদার, গ্রাহক, সেবাদাতা কিংবা কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিও হয়রানির সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। তাই অভিযোগকারী বা অভিযুক্ত ব্যক্তি আইনের নির্দিষ্ট কোনও সংকীর্ণ শ্রেণির মধ্যে না পড়লে যেন অভিযোগটি সুরক্ষাব্যবস্থার বাইরে চলে না যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

পঞ্চমত, প্রতিশোধমূলক আচরণ ও হয়রানি থেকে কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা এবং গোপনীয়তা বজায় রাখতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী অভিযোগকারী, সাক্ষী, অভিযোগ কমিটির সদস্য এবং তদন্তপ্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া অন্য ব্যক্তিদেরও সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। তবে গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টি ন্যায়সংগত তদন্ত এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির অভিযোগ সম্পর্কে জানার ও নিজের বক্তব্য তুলে ধরার অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

এছাড়া অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া এবং ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা অভিযোগ করার মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। কোনও অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠা করা না গেলে শুধু সে কারণেই অভিযোগটিকে বিদ্বেষপ্রসূত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলা যায় না। অভিযোগ জানানোর প্রতি আস্থা বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার জন্য এ পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সবশেষে, বিভিন্ন খাত ও প্রতিষ্ঠানের আকার বিবেচনায় বিধিমালাকে বাস্তবসম্মত করতে হবে। একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, বড় কারখানা, এনজিও কিংবা ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য পরিচালনাগত ব্যবস্থা এক রকম নাও হতে পারে। তবে সব প্রতিষ্ঠানকেই প্রতিরোধ, নিরাপদে অভিযোগ জানানোর সুযোগ, ন্যায়সংগত তদন্ত, জবাবদিহি ও প্রতিকারের মৌলিক নীতিগুলো অনুসরণ করতে সক্ষম হতে হবে।

এখানে আইন ও বিধিমালার পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। আইনে মৌলিক অধিকার, দায়িত্ব, অসদাচরণ ও সুরক্ষার বিষয়গুলো নির্ধারিত হওয়া উচিত। আর বিধিমালায় সেই অধিকার ও দায়িত্ব বাস্তবে প্রয়োগ এবং কার্যকর করার প্রক্রিয়া থাকা প্রয়োজন। বিধিমালা আইনকে কার্যকর করতে পারে, কিন্তু আইনের মৌলিক ঘাটতির বিকল্প হতে পারে না।

কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?

কর্মজগতের মানুষের জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করে যে অভিযোগ জানাতে গিয়ে নিজের জীবিকা, মর্যাদা, নিরাপত্তা কিংবা পেশাগত অবস্থান ঝুঁকির মুখে ফেলতে হবে না।

প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি কর্মক্ষেত্রের ঝুঁকি মোকাবিলায় স্পষ্টতা, ধারাবাহিকতা ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে। একইসঙ্গে সমস্যাগুলো দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ, কর্মী চলে যাওয়া, অনুপস্থিতি কিংবা বৃহত্তর অস্থিরতায় রূপ নেওয়ার আগেই মোকাবিলার সুযোগ তৈরি করে।

শ্রমিক সংগঠন ও ট্রেড ইউনিয়নগুলোর জন্য এমন ব্যবস্থা কর্মীদের অভিযোগ জানানো এবং প্রতিশোধের ভয় ছাড়াই অধিকার চর্চার ক্ষেত্রে আস্থা বাড়ায়। অন্যদিকে, মালিকপক্ষের সংগঠন ও শিল্প সমিতিগুলোর জন্য সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত কাঠামো প্রতিযোগিতার সমান সুযোগ তৈরি করে এবং অভিযোগ মোকাবিলায় অনিশ্চয়তা কমায়।

সরকারের জন্য এটি প্রমাণ করার সুযোগ যে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নেই; বরং সেগুলো বাস্তবেও কার্যকর হচ্ছে। উন্নয়ন খাতের জন্য বিশ্বাসযোগ্য পিএসইএএইচ ও সেফগার্ডিং ব্যবস্থা দাতা সংস্থা ও উন্নয়ন অংশীদারদের আস্থা বজায় রাখার ক্ষেত্রে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ব্যবসার ক্ষেত্রেও বিষয়টি শুধু নিজস্ব কর্মক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক কার্যক্রমের প্রত্যাশা এখন সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি ধাপ পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে। ক্রেতারা দেখতে চান, শ্রম অধিকার, কর্মীদের কথা বলার সুযোগ, অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা, তদন্ত ও প্রতিকার বাস্তবে কার্যকর কি না। শুধু একটি নীতিমালা থাকাই যথেষ্ট নয়।

এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকারেরও সম্পর্ক রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের বড় অংশই বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতের। বাংলাদেশ বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ (ইবিএ) ব্যবস্থার সুবিধা পাচ্ছে। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পরও বাংলাদেশ অন্তত তিন বছর ইবিএ সুবিধা পাবে। এরপর নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হতে যাওয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের সংশোধিত জিএসপি কাঠামোয় মানবাধিকার, শ্রম অধিকার, টেকসই উন্নয়ন ও সুশাসনের ওপর গুরুত্ব অব্যাহত রয়েছে।

সরবরাহব্যবস্থার ক্ষেত্রেও এ বিষয়গুলোর গুরুত্ব বাড়ছে। ২০২৭ সালের ১৪ ডিসেম্বর থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জোরপূর্বক শ্রমবিষয়ক বিধিমালা কার্যকর হলে জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে রাখা, সরবরাহ করা কিংবা সেখান থেকে রফতানি করা নিষিদ্ধ হবে।

যৌন হয়রানিকে জোরপূর্বক শ্রমের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়। তবে সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে নির্যাতন এবং অন্যান্য জবরদস্তিমূলক আচরণ বৃহত্তর শ্রম অধিকার ও জোরপূর্বক শ্রমের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তাই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সরবরাহব্যবস্থার জন্য কর্মীদের কথা বলার সুযোগ, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, তদন্ত এবং প্রতিকারের বিশ্বাসযোগ্য প্রক্রিয়া এখন দায়িত্বশীল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশের রফতানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার এখন শুধু পণ্যের দাম, গুণগত মান ও সময়মতো সরবরাহের ওপর নির্ভর করে না। ক্রেতা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ভোক্তারাও দেখতে চান, শ্রম অধিকার এবং দায়িত্বশীল ব্যবসার অঙ্গীকার বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে কি না। তাই বিষয়টি কেবল আইন মেনে চলার প্রশ্ন নয়। এটি সুশাসন ও ভালো ব্যবসা পরিচালনারও প্রশ্ন।

একটি বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা মানুষের অধিকার রক্ষা করতে পারে, উৎপাদনশীলতার এড়ানো সম্ভব এমন ক্ষতি কমাতে পারে, কর্মক্ষেত্রে আস্থা বাড়াতে পারে, দায়িত্বশীল সরবরাহব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে পারে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সহায়তা করতে পারে এবং দাতা সংস্থার আস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ বাজারে প্রবেশাধিকার বজায় রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে।

এসব স্বার্থ পরস্পরবিরোধী নয়। কর্মজগতের মানুষের প্রয়োজন সুরক্ষা ও প্রতিকার। প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন স্পষ্টতা ও বাস্তবসম্মত প্রক্রিয়া। সরকারের প্রয়োজন কার্যকরভাবে প্রয়োগযোগ্য কাঠামো। ট্রেড ইউনিয়নের প্রয়োজন শ্রমিকের অধিকার রক্ষার নিশ্চয়তা। উন্নয়ন অংশীদারদের প্রয়োজন বিশ্বাসযোগ্য সেফগার্ডিং ব্যবস্থা। শিল্প খাতের প্রয়োজন প্রতিযোগিতার সমান সুযোগ। আর ক্রেতাদের প্রয়োজন দায়িত্বশীল সরবরাহব্যবস্থার ওপর আস্থা। সবকিছুই একই লক্ষ্যের দিকে নির্দেশ করে—এমন একটি কর্মক্ষেত্রব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা বাস্তবে কার্যকর।

‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা বলতে তাই শূন্য অভিযোগ বোঝানো উচিত নয়। কোনও কর্মক্ষেত্রে অভিযোগ না থাকার অর্থ সেখানে হয়তো নিরাপত্তা রয়েছে। আবার এমনও হতে পারে, মানুষ সেখানে অভিযোগ জানানোর মতো নিরাপদ বোধ করেন না। শূন্য সহনশীলতা বলতে হয়রানি, প্রতিশোধমূলক আচরণ এবং নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা বোঝাতে হবে।

বাংলাদেশ আইন সংস্কারের পথে এগিয়েছে। এখন পরবর্তী পদক্ষেপ হলো আইন ও বিধিমালাকে সমন্বিতভাবে বাস্তবে কার্যকর করা। সংস্কারের প্রকৃত পরীক্ষা হবে সেখানেই।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) ও গুডউইভ ইন্টারন্যাশনালের ‘প্রমোটিং লিভিং ওয়েজ, লেবার রাইটস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস ডিউ ডিলিজেন্স ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পের আওতায় এ নিবন্ধটি লেখা হয়েছে।

লেখক: প্রিন্সিপাল, জেনিফা জব্বার কনসালটেন্সি (জেজেসি)

/এম/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ডেপুটি স্পিকারের সঙ্গে টাওয়ার হ্যামলেটসের স্পিকারের সাক্ষাৎ
ডেপুটি স্পিকারের সঙ্গে টাওয়ার হ্যামলেটসের স্পিকারের সাক্ষাৎ
ঢাকায় চারজাতি নারী হ্যান্ডবল, বাংলাদেশের চোখ ফাইনালে 
ঢাকায় চারজাতি নারী হ্যান্ডবল, বাংলাদেশের চোখ ফাইনালে 
‘ফিল্মি স্টাইলে’ চলন্ত গাড়ি থেকে যেভাবে ক্রিকেটারদের ৮টি লাগেজ নিয়ে যায় তারা
‘ফিল্মি স্টাইলে’ চলন্ত গাড়ি থেকে যেভাবে ক্রিকেটারদের ৮টি লাগেজ নিয়ে যায় তারা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স: শুরু ২১তম বাংলাদেশ ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরাম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স: শুরু ২১তম বাংলাদেশ ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরাম
সর্বশেষ সর্বাধিক