আমার এক কাজিন একবার বলেছিলেন, ‘জারিনা (ছদ্মনাম) না থাকলে আমি সম্ভবত আমার নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে এতখানি এগোতে পারতাম না।’ আমি অবাক হয়েছিলাম। এখন নিজে সংসার, সন্তান, ক্যারিয়ার-সবকিছু নিয়ে নিয়ে যখন হিমশিম খাই, বুঝি কথাটা কতটা সঠিক।
আমার কাজিন চিকিৎসক। সরকারি হাসপাতালের দায়িত্ব পালন, চেম্বার, সন্তানের দেখাশোনা, সংসার সামলানো—সবকিছুর পাশাপাশি তাকে পড়াশোনাও করতে হয়েছে। মেডিক্যালের উচ্চতর ডিগ্রিগুলো তিনি সফলভাবে নিতে পেরেছেন। একজন নারীর পক্ষে এতগুলো দায়িত্ব একা সামলানো যে কতটা কঠিন, তা কর্মজীবী নারীরা খুব ভালো করেই জানেন।
আর ওই সংসারে একজন নির্ভরযোগ্য গৃহকর্মীর ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটিও তারা জানেন। শুধু কর্মজীবী নারী নন, সন্তান ও সংসার নিয়ে হিমশিম খাওয়া অনেক নারীই জানেন, বাসার একজন সহায়তাকারী মানুষ তাদের কতটা স্বস্তি দিতে পারেন।
ধরা যাক, একজন নারী ঢাকায় থাকেন। চাকরি করেন, তার ছোট সন্তান আছে। বাবার বাড়ি ও শ্বশুরবাড়ি জেলা শহরে। কর্মক্ষেত্রে কি তার সন্তানের জন্য পর্যাপ্ত ডে- কেয়ারের ব্যবস্থা আছে? থাকলেও সেখানে কি তার সন্তানের বয়স,প্রয়োজন এবং কর্মঘণ্টার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সেবা পাওয়া যায়?
সব কর্মক্ষেত্রে ডে-কেয়ার নেই। আবার সব ডে-কেয়ারে স্কুলপড়ুয়া শিশুদের রাখার সুযোগও থাকে না। আত্মীয়স্বজন কাছে না থাকলে বিকল্প আরও সীমিত হয়ে যায়। তখন অনেক নারী গ্রাম থেকে একজন গৃহকর্মী নিয়ে আসেন। তিনি ঘরের কাজ করেন, শিশুর দেখাশোনায় সাহায্য করেন। মা নিশ্চিন্তে কর্মক্ষেত্রে যেতে পারেন, নিজের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে পারেন, ক্যারিয়ারে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান।
সন্তান বড় হলে হয়তো ছুটা গৃহকর্মী দিয়ে কাজ চালানো সম্ভব। কিন্তু সন্তান ছোট থাকলে এই সহায়তার প্রয়োজন আরও বেশি হয়। আমি প্রায়ই বাবা-মাকে একটি প্রশ্ন করি। আপনার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ কী? গয়নাগাটি,টাকা-পয়সা, জমিজমা, নাকি আপনার সন্তান?
একবার ভাবুন তো, আপনার গয়নাগাটি আপনি আলমারিতে তালা দিয়ে রাখেন। টাকা-পয়সা, দামি জিনিসপত্রও যথাসম্ভব নিরাপদে রাখেন। অথচ আপনার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ— আপনার সন্তানকে প্রতিদিন দীর্ঘ সময়ের জন্য একজন গৃহকর্মীর তত্ত্বাবধানে রেখে যান। তো আপনার মূল্যবান সম্পদের হেফাজতকারীকে আপনাকে কতটা মূল্য দিতে হবে ভেবেছেন কখনো?
আমি বলছি না, সবকিছু অরক্ষিত রাখুন। গৃহকর্মীকে সন্দেহ করবেন না, এমন কথাও বলছি না। আমি শুধু জানতে চাই— যে মানুষটির হাতে আপনি আপনার সন্তানের বা আপনার বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ির দৈনন্দিন যত্নের দায়িত্ব দিচ্ছেন, তার প্রতি আপনার দায়িত্ব কতটুকু হওয়া দরকার? সেই দায়িত্ব কি আপনি ঠিকঠাক পালন করছেন?
জারিনা আমার কাজিনের বাসার গৃহকর্মী। একটানা প্রায় ২০-২১ বছর তিনি ওই বাসায় ছিলেন। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর এসেছিলেন। জরিনা আমাকে কত খাইয়েছেন! হলে থাকার সময় গজা বানিয়ে আপুর কাছে দিতেন। আপু হলে নিয়ে আসতেন আমার জন্য। আমার কাজিন যখন ফ্ল্যাট কিনলেন, জরিনার থাকার জন্য আলাদা ঘর ও অ্যাটাচড বাথরুমের ব্যবস্থা করেছিলেন। জরিনার দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। মেয়েরা, জামাই, নাতি-নাতনিরাও বাসায় আসতেন। আমার কাজিন তাঁদের আত্মীয়ের মতোই দেখভাল করতেন। সবার পক্ষে আমার কাজিনের মতো এতোখানি ভূমিকা পালন করা বা সুবিধা দেওয়াটা হয়তো সম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে একজন গৃহকর্মীর অবদান কতটা স্বীকৃতি পায়?
আপনার শিশুকে যিনি কোলে-পিঠে রাখছেন, তার নিজের প্রয়োজনগুলোর কথা কি আপনি ভাবেন? তিনি কি পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছেন? বিশ্রামের সুযোগ পাচ্ছেন? অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাচ্ছেন? তার কি নিজের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করার, প্রয়োজনে ছুটি নেওয়ার সুযোগ আছে? নাকি আপনি ধরে নিয়েছেন, মাস শেষে বেতন দিলেই তার প্রতি আপনার সব দায়িত্ব শেষ?
অনেক পরিবারে গৃহকর্মীর জন্য আলাদা চাল কেনা হয়, আলাদা ভাত রান্না করা হয়। অনেকের বাড়িতেই গৃহকর্মীকে স্থায়ীভাবে রাখার ব্যবস্থা নেই। তার জিনিসপত্র থাকছে রান্নাঘরের এক কোনায়। সে রাতে ঘুমাচ্ছে রান্নাঘরের মেঝেতে, নয়তো আপনার বাচ্চাদের ঘরের মেঝেতে। আপনার ঘরের ড্রয়িংরুমের সোফায় বসার তার অধিকার নেই। আপনার ডাইনিং টেবিলে বসে তার খাওয়ার অধিকার নেই। সে খাচ্ছে রান্নাঘরের মেঝেতে বসে।
একবার ভেবে দেখুন, আপনার ঘরের দামি জিনিসপত্র, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, আসবাব, এমনকি আপনার শিশুটির দেখাশোনার দায়িত্বও আপনি তার হাতে তুলে দিচ্ছেন। অথচ তার খাবারের মান বা পরিমাণ নিয়ে আপনার এত হিসাব! তার থাকার জন্য আপনার ঘরে কোনও ব্যবস্থা নেই। আপনি কি তার জন্য রান্নাঘরেই একটা চেয়ারের ব্যবস্থাও রেখেছেন? তাকে একটা তোশক দিয়েছেন নাকি পাটি বিছিয়ে ঘুমাতে দিচ্ছেন?
এখানে প্রশ্নটি চালের দামের নয় বা তোশকের দামেরও নয়। প্রশ্নটি হলো, একজন মানুষকে আপনি কীভাবে দেখছেন। তিনি কি আপনার কাছে কেবল একটি শ্রমের উৎস, নাকি প্রয়োজন ও অনুভূতিসম্পন্ন একজন মানুষ?
সাম্প্রতিক সময়ে শিশু গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতনেরযেসব অভিযোগ সামনে আসে, সেগুলো আমাদের আতঙ্কিত সকরে। নির্যাতনের অভিযোগে বাংলাদেশ বিমানের সাবেক এমডির স্ত্রী এখনও জেলে আছেন। তাদের এই ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা খবরে এসেছে। তাই ব্যবস্থা নেওয়া গেছে। কিন্তু এখনও অনেক পরিবার আছে, যাদের ঘরে প্রতিনিয়ত গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, দেখার কেউ নেই। সেসব ঘটনা বাইরে বা আলোচনায় আসে না। সব শিশু গৃহকর্মীর বাবা-মা মামলা করেন না। সেই সুযোগ তারা পান না। সামর্থ্যও থাকে না। অথচ ঝুকিপূর্ণ শিশুশ্রম বেআইনি।
যে বয়সে তার স্কুলে যাওয়ার কথা, খেলাধুলা করার কথা, নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার কথা, সে বয়সে তাকে অন্যের সন্তান, সংসার সামলাতে হয়। শিশুশ্রম শুধু একটি শিশুকে কাজে লাগানো নয়; এটি তার শিক্ষা, বিকাশ, নিরাপত্তা ও শৈশবের অধিকারকে সংকুচিত করে।
শুধু শিশু নয়, বড়রাও (গৃহকর্মী) এদেশে নানা ধরনের বঞ্চনার বা নির্যাতনের শিকার হন। মানছি যে, অনেক পরিবার গৃহকর্মী নিয়ে ঝামেলায় পড়েন। অনেক গৃহকর্মী টাকা-পয়সা চুরি করে পালিয়ে যান। অনেকেই সন্তানকে মারধর করেন। বয়স্কদের দেখাশোনা করেন না। ঠিকমতো ওষুধ খাওয়ান না। তাদের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা দরকার।
প্রয়োজনে আপনি আর তাকে কাজে নাও রাখতে পারেন। কিন্তু কথায় কথায় তার গায়ে হাত তোলা, তাকে ঠিকমতো খেতে না দেওয়া শুধু অন্যায়ই নয়, অমানবিকও। দেশের বাইরের মতো আমাদের দেশেও গৃহকর্মকে আসলে শ্রমের একটি উৎস হিসেবে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া সময়ের দাবি। বিভিন্ন দেশে গৃহকর্মীদের জন্য রীতিমতো কড়া আইন রয়েছে। তাদের বেতন, নিরাপত্তা, চিকিৎসা, এমনকি মাসে দুই-তিনদিন ডে অফ কাটানোর ব্যবস্থা করে কঠোর আইনও রয়েছে।
জরিনা আমার কাজিনের বাসায় ২০-২১ বছর ছিলেন। তার উপস্থিতি আমার কাজিনের জীবনকে সহজ করেছে। আমার কাজিনও তাকে শুধু একজন কর্মী হিসেবে দেখেননি; তার পরিবারকে আপন করে নিয়েছিলেন, থাকার জন্য ভালো ব্যবস্থা করেছিলেন, সম্পর্কটিকে মানবিক মর্যাদা দিয়েছিলেন।
সব পরিবারের অভিজ্ঞতা এক রকম হবে না। সব গৃহকর্মীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কও গড়ে উঠবে না। তবে পারস্পরিক সম্মান ও আস্থার সম্পর্ক তৈরি হলে একজন নারী তার পেশাগত জীবনে এগিয়ে যেতে পারেন।
আবার আমরা যখন নারীর কর্মসংস্থান, আর্থিক স্বাধীনতা ও ক্যারিয়ার নিয়ে কথা বলি, তখন ঘরের ভেতরে থাকা অন্য এক নারীর শ্রমের কথাও বলতে হবে। সেও একজন কর্মজীবী। আপনার কাজ আলাদা। তার কাজ আলাদা। আপনি বেতন পান। সেও পায়। তার কাজকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। বা তাকে আপনার চাকর মনে করারও সুযোগ নেই।
মনোবিজ্ঞান বলে, কাউকে নিজের চেয়ে সামাজিকভাবে নিচু অবস্থানে দেখলে তার প্রতি অসম্মানজনক আচরণকে স্বাভাবিক মনে করার প্রবণতা তৈরি হয়। এর পেছনে কাজ করতে পারে সামাজিক শ্রেণিবোধ, ক্ষমতার অসমতা এবং অন্য মানুষের প্রয়োজনকে কম গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা। নিজের কর্তৃত্বকে প্রশ্নাতীত ভাবলে বকাঝকা, অপমান কিংবা শাস্তি দেওয়াকেও কেউ কেউ নিজের অধিকার বলে মনে করেন। অথচ নিয়োগকর্তা হওয়া মানে অন্য একজন মানুষের মর্যাদা নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার পাওয়া নয়।
কারণ এক নারীর এগিয়ে যাওয়ার গল্পের পেছনে অনেক সময় আরেক নারীর শ্রম থাকে। সেই শ্রমকে অদৃশ্য করে রেখে আমরা পূর্ণাঙ্গ সমতার কথা বলতে পারি না। তাই গৃহকর্মীকে ভালো খাবার দেওয়া দয়া নয়, ন্যায্য আচরণ। তাকে সম্মান করা অনুগ্রহ নয়, তার অধিকার।
লেখক: সাইকোলজিস্ট