নিরাপদ সড়ক ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা চাই

শফিক আর. ভূঁইয়া
২২ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:০০ আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:০০

আমার দেখা প্রথম চলচ্চিত্রের নাম ‘ভেজা চোখ’। তখন সিনেমা দেখার বা বোঝার বয়স হয়নি। ময়মনসিংহের এক সিনেমা হলে মায়ের কোলে বসে ঘুমাতে ঘুমাতে দেখেছিলাম। তবে সেই সিনেমার গান ‘জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প’ ছোটবেলা থেকেই মনে গেঁথে আছে। সেই সঙ্গে গেঁথে গিয়েছিল ইলিয়াস কাঞ্চনের নাম। ঢাকাই সিনেমার জনপ্রিয় এই অভিনেতা, প্রযোজক ও পরিচালকের আরেকটি পরিচয় হলো— তিনি ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা) আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা।

ইলিয়াস কাঞ্চনের সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলনের পেছনে রয়েছে এক ব্যক্তিগত শোক। ১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর সড়ক দুর্ঘটনায় তার স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চনের মৃত্যু হয়। সেই শোককে শক্তিতে রূপ দিয়ে একই বছরের ১ ডিসেম্বর তিনি শুরু করেন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন। এরপর তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তাঁকে কখনও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচিতে, কখনও ব্যস্ত সড়কে দাঁড়িয়ে মানুষকে আইন মানার আহ্বান জানাতে দেখা গেছে। চালকদের প্রশিক্ষণ, সচেতনতামূলক কর্মশালা, সমাবেশ, বিজ্ঞাপন ও নাটকের মাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তার বার্তা ছড়িয়ে দিতে কাজ করেছেন তিনি এবং তাঁর মতো আরও অনেকে।

তবু আজও সড়কে প্রাণহানির চিত্র খুব একটা বদলায়নি। ২০ অক্টোবর ভোরেও আমার এক সহকর্মী পূজার ছুটিতে আত্মীয়ের বাসায় যাওয়ার পথে কন্যাসহ মৃত্যুবরণ করেছেন। তার স্ত্রী ও পুত্র গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। দুর্ঘটনার খবর ও মৃত্যুর সংখ্যা যেন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত অংশ হয়ে উঠেছে। প্রতিমাসে নতুন সংখ্যা প্রকাশ পায়, কিছু দিন আলোচনা চলে, তারপর আমরা পরের মাসের প্রতিবেদনের অপেক্ষায় থাকি।

২০২৬ সালের জুলাই মাসে সারা দেশে ৪৫৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪১৬ জন নিহত ও ৬২৯ জন আহত হন। আগস্টে দুর্ঘটনার সংখ্যা কমে ৪৪১ হলেও নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪২৬; আহত হন ৭৯৩ জন। সেপ্টেম্বরে ৪৪২টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৪২৩ জন, আহত হন ৬৭৪ জন। তিন মাসে মোট ১,২৬৫ জন নিহত হয়েছেন। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন নিহত হয়েছেন  প্রায় ১৪ জন। সংখ্যাগুলো ভয়াবহ, কিন্তু আরও উদ্বেগজনক হলো, এই ধারাবাহিক প্রাণহানির সঙ্গে আমরা ক্রমেই অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন কিংবা বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনগুলোতে বারবার উঠে আসে প্রায় একই চিত্র: বেপরোয়া গতি, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা, পথচারীর মৃত্যু এবং ট্রাফিক আইন অমান্য। কারণগুলো আমাদের অজানা নয়। তাহলে এত পরিচিত সমস্যার সমাধান হচ্ছে না কেন? প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে সড়কে মানুষ কেন মারা যাচ্ছেন; বরং কেন একই ধরনের ঝুঁকি শনাক্ত হওয়ার পরও বারবার একই পরিণতি ঘটছে?

আমার মনে হয়, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সড়ক দুর্ঘটনাকে শুধু চালকের ভুল হিসেবে দেখার অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ বাংলাদেশের সড়কে প্রাণহানি অনেকাংশেই সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির ব্যর্থতার ফল।

সেপ্টেম্বরের পরিসংখ্যানই বিষয়টি বোঝার জন্য যথেষ্ট। ওই মাসে ৪৪২টি দুর্ঘটনার মধ্যে ১৫৪টি ছিল মোটরসাইকেল-সম্পর্কিত; এসব ঘটনায় ১৩৯ জন নিহত হন। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে চালকের বেপরোয়া গতি, হেলমেট না পরা কিংবা ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের দায় অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু মোটরসাইকেলের ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও সেই অনুপাতে নিরাপদ সড়ক, গতি নিয়ন্ত্রণ, চালক প্রশিক্ষণ এবং ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা কতটা সম্প্রসারিত হয়েছে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

পথচারীদের মৃত্যুর ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক। সেপ্টেম্বরে ১০৬ জন পথচারী প্রাণ হারিয়েছেন; আগস্টে এই সংখ্যা ছিল ৬২। প্রায়ই পথচারীর অসতর্কতা কিংবা নিয়ম না মানার কথা বলা হয়। কিন্তু ফুটপাত দখল হয়ে থাকলে, নিরাপদে রাস্তা পার হওয়ার ব্যবস্থা পর্যাপ্ত না হলে কিংবা ফুটওভারব্রিজ ব্যবহারবান্ধব না হলে দায় কি কেবল পথচারীর? মানুষকে নিয়ম মানতে বলা জরুরি, কিন্তু নিয়ম মানার মতো নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব।

আগস্টে নিহতদের মধ্যে ১৩৬ জন ছিলেন পরিবহনকর্মী, যাদের মধ্যে চালকেরাও রয়েছেন। সেপ্টেম্বরে এই সংখ্যা ছিল ৫৩। এই পরিসংখ্যান মনে করিয়ে দেয়, সমস্যাটি কেবল ‘বেপরোয়া চালক বনাম অসতর্ক পথচারী’র বিষয় নয়। পরিবহনব্যবস্থার সঙ্গে প্রতিদিন যুক্ত মানুষও বিপুল ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন। চালকের কর্মঘণ্টা, বিশ্রামের সুযোগ, প্রশিক্ষণ, যানবাহনের অবস্থা এবং সড়কের নিরাপত্তা—সবকিছু মিলিয়েই এই ঝুঁকি তৈরি হয়।

দুর্ঘটনার ধরন ও স্থানও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। আগস্টে ৬১.৪৫ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে পথচারী বা অন্য যানবাহনকে চাপা দেওয়া কিংবা ধাক্কা দেওয়ার ঘটনায়; ২১.৯৯ শতাংশ ছিল মুখোমুখি সংঘর্ষ এবং ১২.৯২ শতাংশ ক্ষেত্রে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের খাদে পড়ে যায়। সেপ্টেম্বরে ১৬৮টি দুর্ঘটনায় চালক যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারান, ১০৯টি ঘটনায় পথচারীকে চাপা দেওয়া বা ধাক্কা দেওয়ার ঘটনা ঘটে এবং ৯৮টি ছিল মুখোমুখি সংঘর্ষ। একই মাসে আঞ্চলিক সড়কে ১৭৮টি এবং জাতীয় মহাসড়কে ১৪৫টি দুর্ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ সমস্যাটি কোনও একটি শহর বা নির্দিষ্ট ধরনের সড়কে সীমাবদ্ধ নয়।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি যেসব কারণ চিহ্নিত করেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে— মহাসড়কে ব্যাটারি ও ইঞ্জিনচালিত তিন চাকার যানবাহনের চলাচল, সড়কে মার্কিং, ডিভাইডার ও সাইনেজের অভাব, অতিরিক্ত যাত্রী ও মাল বহন, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক প্রকৌশল, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন। এগুলোকে বিচ্ছিন্ন কিছু সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। প্রতিটি সমস্যার পেছনে রয়েছে কোনও না কোনও নীতিগত সিদ্ধান্ত, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, তদারকি কিংবা প্রয়োগের ঘাটতি।

এখানে অন্য খাতের একটি সহজ উদাহরণ দেওয়া যায়। কোনও প্রতিষ্ঠানে যদি প্রতি মাসে একই ধরনের জালিয়াতি ঘটে, তাহলে শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মীকে শাস্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায় না। প্রতিষ্ঠানটিকে খুঁজে দেখতে হয়, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় কোথায় ফাঁক ছিল, তদারকি কেন ব্যর্থ হয়েছে এবং একই ঘটনা ঠেকাতে কী পরিবর্তন দরকার। সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও দুর্ঘটনার তদন্তের উদ্দেশ্য শুধু দায়ী ব্যক্তিকে শনাক্ত করা নয়; ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধের উপায় বের করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এ কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ বা নিরাপদ সড়কব্যবস্থার ধারণা গুরুত্ব পেয়েছে। এর মূল কথা হলো— মানুষ ভুল করতে পারে, কিন্তু সেই ভুল যেন অনিবার্যভাবে মৃত্যু বা গুরুতর আঘাতের কারণ না হয়। নিরাপদ সড়ক নকশা, উপযুক্ত গতি নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ যানবাহন, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত জরুরি চিকিৎসা—এসবকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হয়।

বাংলাদেশেও প্রতিটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার পর এমন সমন্বিত পর্যালোচনা প্রয়োজন। দুর্ঘটনাস্থলের নকশা, সাইনেজ, আলোকব্যবস্থা, যানবাহনের অবস্থা, চালকের কর্মঘণ্টা, গতি, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও জরুরি চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা- সবকিছু খতিয়ে দেখা উচিত। কোনও স্থানে বারবার দুর্ঘটনা ঘটলে সেটিকে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা বলে এড়িয়ে না গিয়ে ‘উচ্চঝুঁকির স্থান’ হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে এবং ঝুঁকি কমানোর জন্য নির্দিষ্ট সংস্থাকে দায়িত্ব দিতে হবে।

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দায়িত্বের বিভাজন। আমাদের দেশে সড়ক নির্মাণ করে একটি সংস্থা, লাইসেন্স দেয় আরেকটি, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করে পুলিশ, আর পরিবহনের অনুমোদন দেয় অন্য কোনও কর্তৃপক্ষ। প্রত্যেকে নিজের নির্ধারিত কাজ করলেই সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের পাশাপাশি সড়কে প্রাণহানি কমানোর জন্য কে সামগ্রিকভাবে জবাবদিহি করবে, সেটিও স্পষ্ট হওয়া দরকার। নইলে দায়িত্ব অনেকের মধ্যে ভাগ হয়ে থাকলেও ফলাফলের দায় কারও ওপর বর্তাবে না।

জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসে ইলিয়াস কাঞ্চনের দীর্ঘ আন্দোলনের কথা স্মরণ করা তাই শুধু একজন নন্দিত  অভিনেতার ব্যক্তিগত শোককে সম্মান জানানোর বিষয় নয়; এটি আমাদের অর্জন ও ব্যর্থতার হিসাব নেওয়ারও উপলক্ষ। তিন দশকের বেশি সময় ধরে সচেতনতার বার্তা দেওয়া হয়েছে, আইন হয়েছে, নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই উদ্যোগগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করা এবং যেসব জায়গায় ব্যবস্থা ব্যর্থ হচ্ছে, সেখানে বাস্তব পরিবর্তন আনা।

সড়ক নিরাপত্তার সাফল্য কতটি মামলা হয়েছে, কতটি গাড়ি আটক হয়েছে কিংবা কত কিলোমিটার সড়ক নির্মিত হয়েছে, শুধু তা দিয়ে মাপা যায় না। আসল প্রশ্ন হলো, এসব উদ্যোগের ফলে কত মানুষের মৃত্যু ও গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা কমেছে। সড়কে বের হওয়া প্রতিটি মানুষের নিরাপদে বাড়ি ফেরার অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার নিশ্চিত করা কোনও বাড়তি সুবিধা নয়; এটি একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মৌলিক কর্তব্য।

লেখক: কমিউনিকেশন, কালচার ও করপোরেট দায়িত্বশীলতা পেশায় নিয়োজিত

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
সৌদির বিমানবন্দরে হুথিদের হামলায় ভারতীয়সহ নিহত ২, আহত ৮
সৌদির বিমানবন্দরে হুথিদের হামলায় ভারতীয়সহ নিহত ২, আহত ৮
বলিউডের তিন তারকাকে খুনের ছক, ৩ মাস ধরে চলেছে পরিকল্পনা
বলিউডের তিন তারকাকে খুনের ছক, ৩ মাস ধরে চলেছে পরিকল্পনা
১০ লাখ টাকার প্রাইজমানি, সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার মোটরসাইকেল
১০ লাখ টাকার প্রাইজমানি, সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার মোটরসাইকেল
সেনাবাহিনীর সহায়তায় সাজেক থেকে নিরাপদে ফিরেছেন পর্যটকরা
সেনাবাহিনীর সহায়তায় সাজেক থেকে নিরাপদে ফিরেছেন পর্যটকরা
সর্বশেষ সর্বাধিক