লাকীর বিয়ে হয়েছে এক বছর আগে। চেহারা মোটামুটি হলেও এক দেখাতেই ওকে বরপক্ষ পছন্দ করেছে এবং সেই রাতেই নিয়ে গেছে শ্বশুরবাড়িতে। লাকী আর ওর মা-বাবা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন—কম সুন্দর মেয়েটিকে বিনা যৌতুকে একজন ব্যবসায়ী পাত্রের হাতে তুলে দিতে পেরে।
বিয়ের দুই মাস পর থেকেই লাকীর ফোন আসতে শুরু করে ওর নিম্ন মধ্যবিত্ত বাবার কাছে। স্বামী ব্যবসা করবে বলে শ্বশুরের কাছে আট লাখ টাকা চাইছে। বারবার ফোন, মেয়ের কান্না ইত্যাদি দেখে লাকীর বাবা দুই লাখ টাকা জোগাড় করে জামাইয়ের হাতে তুলে দিলেন।
এরপরেও লাকী রেহাই পেলো না। বাকি টাকার জন্য স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন গায়ে হাত তুললো। গালাগালি ও গাধার খাটুনিতো আছেই। কিন্তু লাকীর বাবার পক্ষে আর একটি টাকাও দেওয়া সম্ভব ছিল না।
লাকীর বাবা তাই বাধ্য হয়ে ছেলের বাবাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘টাকা দিতে হবে, মানে যৌতুক দিতে হবে, এ কথা বিয়ের সময় বলেন নাই কেন? সেক্ষেত্রে আমি ভেবে দেখতাম।’’ ছেলের বাবার স্পষ্ট উত্তর, ‘‘এটাকে যৌতুক বলছেন কেন? এটা যৌতুক নয়। আপনার জামাই ব্যবসা বড় করতে পারলে তো আপনার মেয়েই ভালো থাকবে, সুখে থাকবে। আপনি শুধু সাহায্য করবেন।’’
লাকীর বাবা টাকা দিতে পারেন নাই। তাই মারধর খেয়ে লাকী বাবার বাড়িতে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছে। নববধূর সংসার করার স্বপ্ন এক বছরের মধ্যে ভেঙে গেছে। এখন তালাকের জন্য আদালতে দৌড়াচ্ছে, চেষ্টা করছে ‘ব্যবসা’র সেই দুই লাখ ফিরে পেতে।
যৌতুকের ঘটনাগুলো আমাদের দেশে এমনই। সবাই যে বিয়ের সময় টাকা বা জমিজমা চাইবে, তা নয়। ধনী-দরিদ্র দুই পরিবারেই এইভাবে যৌতুক চাওয়া হয়। একে বলা যায়,‘প্যাকেটে মোড়ানো যৌতুকের দাবি’, যা দেখা যায় না, কিন্তু কন্যাপক্ষ অনুভব করতে পারে।
যৌতুকের এরকম হাজারটা উদাহরণ দেওয়া যাবে। একেকজনের যৌতুক দাবির একেক চেহারা, একেক কাহিনি। এখানে শিক্ষিত-অশিক্ষিত ও গরিব-ধনীর কোনও প্রভেদ নেই। ভদ্র মানুষের মুখোশের আড়ালেও চলে নানা কায়দায় যৌতুক চাওয়া। প্রতিটি যৌতুক ঘটনার সাথে থাকে নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা। কারণ সহিংসতা, অর্থাৎ নির্যাতন করলে যৌতুক আদায় করাটা সহজ হয়।
এর প্রমাণ, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, শুধুমাত্র যৌতুক সম্পর্কিত সহিংসতার শিকার হয়েছেন ৮১ জন নারী। ৪২ জনকে শারীরিক নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে। ২৯ জন শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ও ৮ জন শারীরিক নির্যাতনের পর আত্মহত্যা করেছেন। (সূত্র: আইন ও সালিশ কেন্দ্র)
খুব সম্প্রতি হাইকোর্টের এক রায়ে বলা হয়েছে, বিয়ের শর্ত ছাড়া কেবল ব্যবসার প্রয়োজনে স্ত্রীর কাছে অর্থ দাবি করাকে আইনগতভাবে যৌতুক হিসেবে গণ্য করা যাবে না। আদালত জানায়, বিয়ের চুক্তির সাথে সম্পৃক্ত না থেকে শুধু ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে টাকা চাওয়া যৌতুকের পর্যায়ে পড়ে না। আইনের ২(ঞ) ধারা অনুযায়ী, ‘‘বিয়ের শর্ত বা বিবেচনা হিসেবে বর বা বরপক্ষের দ্বারা কোনও অর্থ বা সম্পত্তি দাবি করাকেই কেবল যৌতুক বলা যায়।’’ যেহেতু এই মামলায় স্বামী বিয়ের কোনও শর্ত ছাড়া সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে টাকা চেয়েছিলেন, তাই এটিকে আইনিভাবে যৌতুক বলা যায় না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই রায় নিয়ে আলোচনা চলছে। কেউ কেউ একে স্বাগত জানালেও একাংশের আশঙ্কা—রায়ের সুযোগ নিয়ে কোনও কোনও ক্ষেত্রে প্রকৃত নির্যাতনকারীরাও নিজেদের যৌতুক দাবিকে ব্যবসায়িক সাহায্য বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
যৌতুকের অভিযোগ তখনই অপরাধ হবে, যদি সেটা যৌতুকের আইনি সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে। কথা হচ্ছে, যারা যৌতুক দাবি করেন, তারা অনেকেই এখন যৌতুক দাবির সংজ্ঞার মধ্যে পড়তে পারে—এভাবে যৌতুক চায় না, যেমনটা চেয়েছে লাকীর স্বামী।
লাকীর স্বামীর যৌতুক চাওয়ার পক্ষে আইনগত কোনও প্রমাণ নেই। বিয়ের বেশ কয়েকদিন পরে ওর স্বামী ব্যবসার জন্য টাকা চেয়েছে। লাকীকে ঘরে এনে চাপ প্রয়োগ ও মারধর করেছে। ওর এই দাবির পক্ষে নাই কোনও কাগজপত্র বা অন্য কোনও প্রমাণ। এখন তাহলে লাকী কি নিয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যাবে?
যৌতুকের দাবিতে একইভাবে স্ত্রীকে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে জয়পুরহাটের একজনের বিরুদ্ধে। তার স্ত্রী মাসুদা নির্যাতনের কারণে মারা গেছেন। এখানেও বিয়ের সময়ে কোনও টাকা দাবি করেনি মেহেদী হাসান। পরে বাপের বাড়ির সম্পত্তি ভাগাভাগির পর যখন মাসুদা ২০ শতক জমি পেয়েছিলেন, তখন ওই জমি বিক্রি করার জন্য স্ত্রীর ওপর চাপ দিয়েছে।
আইন ও আদালত যাই বলুক, পরিসংখ্যান ও গণমাধ্যমের রিপোর্ট কিন্তু অন্য কথা বলছে। বাংলাদেশে যৌতুক বা পণপ্রথার কারণে নারী নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা এখনো একটি ভয়াবহ জাতীয় সংকট হিসেবে রয়ে গেছে। ২০২৫-২০২৬ সালের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার রিপোর্টে এই চিত্র স্পষ্ট হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউএনএফপি’র সহিংসতা বিষয়ক জরিপে দেখা গেছে, বিবাহিত নারীদের ওপর স্বামীর পারিবারিক নির্যাতনের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে যৌতুক প্রথা দায়ী। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের রিপোর্ট বলেছে, ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ২৮০৮ জন নারী ও কন্যাশিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে যৌতুকের কারণে মারধর ও নির্যাতন একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে।
যৌতুককেন্দ্রিক সহিংসতার শিকার নারীদের মধ্যে প্রায় ৯৪ শতাংশই গৃহিণী, যারা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নন এবং স্বামীর পরিবারের ওপর নির্ভরশীল। বিভিন্ন রিপোর্ট ও কেস স্টাডি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যৌতুকের হেনস্তা এখন কেবল বিয়ের শুরুর সময়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। মোটরসাইকেল, নগদ টাকা বা ব্যবসায় বিনিয়োগের অজুহাতে বিয়ের কয়েক বছর পরও প্রতিনিয়ত চাপ দেওয়া হয়। সমীক্ষায় আরও দেখা গেছে, যৌতুকের দাবি ও পারিবারিক কলহের জেরে ৭.২ শতাংশ অন্তঃসত্ত্বা নারীও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে পারিবারিক সহিংসতার গ্রাফ ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী। পারিবারিক সহিংসতার জেরে প্রতি বছর ৩০০-র বেশি নারী ও শিশু প্রাণ হারান বা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন—যার একটি বিশাল অংশের মূল কারণ থাকে বাবার বাড়ি থেকে টাকা বা সম্পদ এনে দেওয়ার চাপ। সবচেয়ে বেশি হত্যার ঘটনা ঘটে সরাসরি স্বামীর হাতে এবং স্বামীর পরিবারের অন্য সদস্যদের নির্যাতনে খুন হন অনেকে।
আমাদের দেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মেয়ের বিয়ে যৌতুক ছাড়া দেওয়াটা সাধারণ পরিবারের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। এমন পরিস্থিতিতে কন্যাপক্ষ বাধ্য হন ছেলেপক্ষের সাথে দরকষাকষি করতে। তারা ভাবেন মেয়ের সুখের জন্য তারা এটা করছেন। কিন্তু প্রায়শই সুখের বদলে অনেক মেয়ের কপালে নির্যাতন জোটে।
যৌতুক নানা ধরনের হয়। এমনকি মেয়েকে সাজিয়ে দেওয়াও এক ধরনের যৌতুক হতে পারে। যেমন- ডিমলার হামিদাকে ওর বিধবা মা সাজিয়ে দেবেন বলে কথা দিয়েছিলেন। সাজাতে গিয়ে হাতের দুটি বালা দিতে পারেন নাই, কানের দুল ও মালা দিয়েছিলেন।
তাই মেয়েকে সবসময় মারধর, গালাগালি করতো, খেতে দিতো না। মেয়ে কান্নাকাটি করে বলে তাকে নিয়ে এসেছেন। এখন বলেছে, বালাজোড়া দিতে পারলে নিয়ে যাবে, নয় তারা ছেলের আবার বিয়ে দেবে। এই হামিদার পক্ষে যৌতুকের দাবি প্রমাণ করার উপায় কী হবে? তাও একবার ভেবেছিলেন মামলা করবেন।
হামিদার মা মেয়েকে নিয়ে গ্রাম্য সালিশে গিয়েছিলেন। কারণ এলাকার মতমোড়লরা বলেছেন, সরকার আইনে পরিবর্তন এনেছে। যৌতুকের কারণে ‘সাধারণ জখম’র শিকার নারীদের এখন থেকে মামলার আগে মধ্যস্থতায় যেতে হবে, অর্থাৎ সালিশে বসতে হবে।
কিন্তু সেখানে উপস্থিত সবাই বলেছেন, হামিদাকে যে ওর স্বামীর বাড়ির লোকজন মেরেছে, তার প্রমাণ কই? এই হালকা জখম ইস্যুটা নিয়ে সালিশে বসার বিধান চালু করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। তারাই ‘আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করেছে।
মানবাধিকার কর্মীদের অনেকেই বলেছেন, এই সংশোধনী নারীর মামলা করার আইনি অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করবে। সাধারণত যৌতুকের জন্য নিপীড়ন হয় শ্বশুরবাড়িতে বা স্বামীর গৃহে। এর কোনও প্রমাণ হাজির করতে পারেন না নারীরা।
সাধারণ সালিশ প্রক্রিয়ার দুর্বলতা ও অকার্যকর হওয়া কারণেই আইনি ধারা বলবৎ করা হয়েছে। এই সালিশি ব্যবস্থা ভুক্তভোগীকে অপরাধীর সঙ্গে আপস করতে বাধ্য করবে। কারণ ভুক্তভোগীরা সাধারণত কম ক্ষমতাসম্পন্ন ও কম অর্থনৈতিক অবস্থাসম্পন্ন হন। যৌতুকের জন্য ‘সাধারণ জখমে’র অপরাধটি উচ্চ আদালতের রায়ের ভিত্তিতে ২০২০ সালে আপসযোগ্য অপরাধ করা হয়েছে।
এই আপস বাদী যেভাবে চাইতো, সেভাবেই হতো। এই আপস মধ্যস্থতার জন্য নতুন বিধান আনতে হলো কেন?
তাছাড়া যৌতুকের জন্য নারীর গায়ে হাত তোলার মতো অপরাধ কোনোভাবেই সালিশের আওতায় পড়তে পারে না। দেশের আইন যেখানে বলেছে—যৌতুক চাইলেই অপরাধ, সেখানে যৌতুকের জন্য ‘হালকা’ বা ‘ভারী’ জখম দুটোই অপরাধ।
অপরাধের জন্য শাস্তিই প্রাপ্য, সালিশ বা আলোচনার মাধ্যমে মধ্যস্থতা নয়। এরপরও বাদী যদি বিবাদীর সাথে আলোচনার মাধ্যম ‘হালকা জখম’র জন্য সমঝোতা করতে চান, করবেন। কিন্তু রাষ্ট্র আইন করে মধ্যস্থতায় বাধ্য করতে পারে না।
আর মানসিক নির্যাতনকে কী দিয়ে বিচার করবে আইন? এ ধরনের অপরাধে ভুক্তভোগী নারীকে মধ্যস্থতার দিকে ঠেলে দেওয়া হলে, ‘হালকা জখম’ টাইপের নির্যাতন বেড়ে যেতে পারে। অথচ আইন সংশোধন করে রাষ্ট্র তাকে বাধ্য করছে মামলা না করতে।
বাংলাদেশে যৌতুক প্রথা নানাভাবে টিকে আছে। এদেশে পারিবারিক সহিংসতার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার যৌতুক। বাল্যবিবাহের অন্যতম কারণ হচ্ছে ‘কম’ যৌতুক। যৌতুকের দাবিতে নববধূকে হত্যা, স্ত্রীকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করা, যৌতুক না পেয়ে দ্বিতীয় বিয়ের ঘটনাগুলো একদিনের নয়। ‘হালকা জখম’ দিয়ে শুরু হয়, ধীরে ধীরে অত্যাচারের মাত্রা বাড়তে থাকে।
সমাজে যৌতুককে স্বাভাবিক প্রথা হিসেবে গ্রহণ করার প্রবণতা আছে। এমনিতেই যৌতুকের কারণে নিপীড়নের ঘটনা প্রায়ই আইনি প্রক্রিয়ায় পৌঁছায় না। এর ওপর যখন রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে, শাস্তি তুলে নেওয়ার বা লঘু করার প্রবণতা লক্ষ করা যায়, তখন সত্যিই তা উদ্বেগজনক।
যৌতুক প্রথা থেমে নেই। কারণ যারা যৌতুক নেয়, তারা নানান উপায়ে এই কাজটি করে, কোনও প্রমাণ রেখে করে না। আর প্রমাণ থাকলেও আইনি লড়াই কঠিন হয়ে দাঁড়ায় কন্যাপক্ষের জন্য। নানান সমস্যার কারণে যৌতুকের জন্য নির্যাতিত নারী ও তাদের পরিবার মামলা করতে ও সেই মামলা প্রমাণ করতে পারেন না। আর প্রমাণ করতে পারছেন না বলে মামলাগুলোতে শাস্তি হচ্ছে না। অপরাধী পার পেয়ে যাচ্ছে এবং যৌতুক প্রথা চলমান থাকছে।
শাহানা হুদা রঞ্জনা: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক