‘জয় বাংলা’ বাংলাদেশের ইতিহাসের উত্তরাধিকার

একটি স্লোগান উচ্চারণ করলেই যদি কোনও দল বেঁচে ওঠে, তবে সেই দল তার শত্রুদের ভাবনার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। আর যদি না ওঠে, তবে স্লোগানটি ঠেকানোর এই তাড়াহুড়ো নিতান্তই অর্থহীন। অথচ ‘জয় বাংলা’ বললে মানুষকে থানায় যেতে হয়, রাজনৈতিক দলের কার্যালয় ঘেরাও হয়। তার চেয়েও বিস্ময়ের কথা, কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক স্লোগানটির শুদ্ধতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন।

ঘটনাটা ২৬ অক্টোবরের। সুনামগঞ্জে নারী বাউলদের গান গাইতে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে ধানমন্ডিতে আয়োজিত এক কর্মসূচি থেকে ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীলকে আটক করা হয়েছিল। পরে সিপিবির মিছিলে ‘জয় বাংলা, জয় সমাজতন্ত্র’ স্লোগান উঠলে আপত্তি, মারধর আর অবরোধের অভিযোগ ওঠে। ঘটনার বিবরণ এটুকুই। আমার আগ্রহ তার ভেতরের প্রশ্নে। একজন নারী বাউল গাইতে পারলেন না, একজন সংস্কৃতিকর্মী একটি স্লোগানের জন্য থানায় গেলেন। এই দেশে কে কী উচ্চারণ করবে, তা ঠিক করবে কে?

বাংলাদেশ কাগজের ঘোষণায় স্বাধীন হয়নি। সত্তরের নির্বাচন, অসহযোগ আন্দোলন, পঁচিশে মার্চ রাতের গণহত্যা, আর ৯ মাসের যুদ্ধ পেরিয়ে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। সেই পথে মানুষের কণ্ঠে সবচেয়ে বেশি উঠেছে যে ধ্বনি, তা ‘জয় বাংলা’। সিপিবির সাবেক সভাপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা মনজুরুল আহসান খানও স্মরণ করেছেন, অসহযোগ আন্দোলনের সময় স্লোগানটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এই ধ্বনি দিয়ে যুদ্ধ হয়েছে, এই ধ্বনি দিতে গিয়ে অনেকে শহীদ হয়েছেন, তাই তিনি তা কোনও দিন ছাড়বেন না। তাঁর আরও কথা, মুক্তিযুদ্ধ যেমন একটি দলের একক সম্পত্তি নয়, মুক্তিযুদ্ধের স্লোগানও নয়। তাঁর এই কথার বিপরীতে যে যুক্তি দাঁড় করানো হয়েছে, তা শুধু ভুল নয়, দুঃখজনকভাবে দুর্বল।

সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল ক্বাফী রতন বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় কমিউনিস্ট পার্টি এ স্লোগান দিয়েছে, কিন্তু ১৯৭২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত দলীয় কোন কর্মসূচিতে এই স্লোগান দেয়া হয়নি। এটি তিনি জানিয়েছেন নিরাসক্ত গলায়, প্রায় গর্বের সুরে। যে দল মেহনতি মানুষের পার্টি বলে দাবি করে, সেই দলের নেতা পঞ্চান্ন বছর ধরে মানুষের সবচেয়ে প্রিয় রণধ্বনি থেকে দূরে থেকে গৌরব করছেন। জনগণের ভাষা যে দল শিখতে চায়নি, সেই দল জনগণের নেতৃত্ব দেবে কীভাবে?

তাঁর আরেকটি যুক্তি আরও বিস্ময়কর। তিনি বলেছেন, যাঁরা এখন ‘জয় বাংলা’ বলছেন, তাঁরা আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে আবার প্রাসঙ্গিক করার পথ সুগম করছেন। এর অর্থ দাঁড়ায়, একটি স্লোগান উচ্চারণ করলেই একটি দলকে পুনর্বাসন করা হয়। এটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নয়, সংসর্গদোষের বাতিক। একজন মার্কসবাদীর তো সবচেয়ে ভালো জানার কথা যে স্লোগান জনতার সম্পত্তি, কোনও দলের জমিদারি নয়। আওয়ামী লীগ ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ জুড়ে দিয়েছে বলে ‘জয় বাংলা’ তাদের হয়ে গেল, এ হিসাব মানলে জাতীয় সংগীত, একুশের গান, এমনকি জাতীয় পতাকাও কোনও না কোনও দলের হাতে ছেড়ে দিতে হয়।

‘জয় বাংলা’ বললে আওয়ামী লীগ প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে—এই আশঙ্কার মধ্যে আরও একটি মৌলিক ভুল আছে। কোনও দলকে রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলার জন্য ইতিহাসের প্রতীক মুছে ফেলা যায় না। ইতিহাসের সত্য মেনে নিয়েও কোনও দলের রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা যায়। আবার কোনও দলের সমর্থক না হয়েও তার সঙ্গে যুক্ত ঐতিহাসিক ঘটনার গুরুত্ব স্বীকার করা যায়। গণতান্ত্রিক রাজনীতির পরিণত বোধ বলতে এটিই বোঝায়। যে সমাজে ইতিহাসের প্রতিটি প্রতীককে বর্তমানের দলীয় হিসাবের কাছে জবাবদিহি করতে হয়, সেখানে ইতিহাস শেষ পর্যন্ত কারও কাছেই নিরাপদ থাকে না।

নিজের দলের ভেতর থেকেই রতনের দাবি চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সদস্য মিহির ঘোষ জানিয়েছেন, মনজুরুল আহসান খান বিভিন্ন সমাবেশে ‘জয় বাংলা, জয় সমাজতন্ত্র’ বলে বক্তব্য শেষ করেছেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনেও সিপিবির নেতাকর্মীরা স্লোগানটি দিয়েছেন। রতন এর জবাবে বলেছেন, ওটা নির্দলীয় আন্দোলন ছিল, দলীয় ব্যানারে নয়। ভাবুন যুক্তিটা—কমিউনিস্ট কর্মীরা জনতার ভেতরে দাঁড়িয়ে যে স্লোগান দেন, সেটা দলের ঠিকুজিতে ওঠে না, অথচ দলের নামে মুখ খুললে সেটা নিষিদ্ধ। এই দ্বিচারিতা কোনও আদর্শ নয়, সুবিধার হিসাব।

কমিউনিস্ট রাজনীতির সঙ্গে এই স্লোগানের কোনও মৌলিক বিরোধ থাকার কথা নয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় বামপন্থিদের একটি অংশ শ্রেণিসংগ্রাম ও সর্বহারার রাজনীতিকে সামনে রেখে নিজেদের স্লোগানকে গুরুত্ব দিয়েছিল। কিন্তু জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম ও শ্রেণিসংগ্রামকে পরস্পরের শত্রু হিসেবে দেখার প্রয়োজন কোথায়? একটি দেশের স্বাধীনতা, তার মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং শোষণমুক্ত সমাজের আকাঙ্ক্ষা পরস্পরবিরোধী নয়। বরং জাতীয় মুক্তি ছাড়া সমাজের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথ অনেক ক্ষেত্রেই সংকুচিত হয়।

সবচেয়ে অস্বস্তিকর হলো সময়। কার্যালয়ে যখন হামলা করা হলো, দুজন কর্মী যখন মার খেলেন, তখন দলের সাধারণ সম্পাদকের মনোযোগ গেল আক্রান্তদের পাশে দাঁড়ানোর চেয়ে স্লোগানের শুদ্ধতা বিচারে। তিনি অবশ্য বলেছেন, স্লোগান দেওয়ায় হামলা বা মব করা গ্রহণযোগ্য নয়। এটুকু ঠিক। কিন্তু এর পরপরই যদি কমরেডদের বলা হয় ‘জয় বাংলা’ থেকে দূরে থাকতে, তাহলে হামলাকারীদের লক্ষ্য কার্যত সফল হলো। যে মার খেলো, তাকেই স্লোগান বদলাতে বলা হচ্ছে। এর নাম আত্মসমর্পণ। রতন বলেছেন, কমিউনিস্টদের উচিত অবস্থান স্পষ্ট করা। আমি একমত। অবস্থান স্পষ্ট হোক—‘জয় বাংলা’ একাত্তরের, কারও দলীয় সম্পত্তি নয়, আর তা উচ্চারণের অধিকারের পক্ষে দাঁড়ানোই প্রগতির প্রথম শর্ত। মনজুরুল আহসান খান সেই অবস্থানই নিয়েছেন। রতনের অবস্থান অস্পষ্ট নয়, স্পষ্টভাবেই পশ্চাদপসরণ।

এই পশ্চাদপসরণের পেছনের প্রশ্নটা সেই আওয়ামী লীগকে ঘিরে, যাকে নিয়ে রতনের এত অস্বস্তি। মনজুরুল আহসান খান বলেছেন, বাংলাদেশের ইতিহাস যতদিন থাকবে, আওয়ামী লীগও ততদিন সেই ইতিহাসের অংশ থাকবে। কোন দল কখনো প্রাসঙ্গিক হয়, কখনো গুরুত্ব হারায়, ভবিষ্যৎ সময়ই বলবে। এটিই ঠিক কথা।

এখানে আরেকটি অপ্রিয় কথা বলতে হচ্ছে। সম্প্রতি ‘লাল-সবুজ জোট’ নামের একটি ধারণা আলোচনায় এসেছে। ইমানুয়েল কারাগিয়ানিস ও ক্লার্ক ম্যাককাউলির ২০১৩ সালের গবেষণাপত্র The Emerging Red-Green Alliance দেখিয়েছে, সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ কিংবা বিশ্বায়নের বিরোধিতার নামে কট্টর বামপন্থি ও ইসলামপন্থিরা কীভাবে কাছাকাছি আসে। সহজ কথায়, শত্রু এক হলে বন্ধুত্ব সহজ হয়। কিন্তু সেই বন্ধুত্বে দুই পক্ষ সমান থাকে না। একপক্ষের থাকে সংগঠন, অর্থ, কার্যালয়, কর্মী আর বিদেশি যোগাযোগ। অন্যপক্ষের থাকে বুদ্ধিজীবীর খ্যাতি, মানুষের সহানুভূতি আর একটি সাময়িক জোট। গবেষণাটি মূলত কট্টর বামপন্থীদের নিয়ে, সব লিবারেলকে এই ছাঁচে ফেলা যায় না। তবু ইতিহাসের উদাহরণগুলো ভাবার মতো।

১৯৭৯ সালে ইরানের মানুষ শাহের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে একসঙ্গে রাস্তায় নেমেছিলেন। সেই আন্দোলনে নারীরা ছিলেন, জাতীয়তাবাদীরা ছিলেন, বামপন্থিরা ছিলেন, আর ছিলেন আয়াতুল্লাহ খোমেনির ধর্মীয় অনুসারীরা। তখন সবার একটাই লক্ষ্য ছিল, শাহের পতন। নতুন দেশ কেমন হবে, নারী কতটা স্বাধীনতা পাবেন, ভিন্নমত কতটা সহ্য করা হবে—এসব প্রশ্নের উত্তরে তখন বলা হয়েছিল ‘‘আগে শাহ যাক, তারপর দেখা যাবে।’’ শাহ গেলেন, কিন্তু সেই ‘তারপর’ আর এলো না। জাতীয়তাবাদী ও বামপন্থি শক্তি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইকে বড় করে দেখেছিল। নারীর অধিকারকে সেই লড়াইয়ের নিচে রেখেছিল। শাহ পড়ে যাওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই, ১৯৭৯ সালের মার্চে, সেই নারীরা আবার রাস্তায় নামলেন। এবার তাঁদের দাবি ছিল জোর করে পোশাক চাপানোর বিরুদ্ধে এবং পারিবারিক আইনে নারীর সুরক্ষা কমানোর বিরুদ্ধে। যাঁরা প্রতিবাদে নেমেছিলেন, তাঁরা হয়রানি ও হামলার শিকার হন, আর সাবেক সহযোগীদের অনেকেই তখন পাশে দাঁড়াননি।

বামপন্থিদের পরিণতিও ছিল একই রকম। কমিউনিস্ট তুদেহ পার্টি নতুন ইসলামপন্থি শাসকদের সঙ্গে সহযোগিতা করেছিল। অথচ ১৯৮৩ সালে সেই শাসকরাই তুদেহ পার্টিকে নিষিদ্ধ করে নেতাদের গ্রেফতার করে। যে হাত শাহকে সরাতে সাহায্য করেছিল, সেই হাতই পরে বেঁধে ফেলা হলো। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের অনুসন্ধানে ১৯৮৮ সালের কারাগারে গণহত্যায় বামপন্থিসহ হাজার হাজার ইরানি বন্দির মৃত্যুর বিবরণ আছে। এখান থেকে একটা সহজ শিক্ষা পাওয়া যায়। যতক্ষণ শক্তিশালী শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই চলে, ততক্ষণ সবার দাম থাকে। শত্রু সরে গেলে ক্ষমতা যার হাতে যায়, নিয়ম বানায় সে-ই।

নারী বাউলের গান গাওয়ার স্বাধীনতা, ভিন্নমতের অধিকার, আর একাত্তরের ধ্বনি উচ্চারণের স্বাধীনতা কোনও দলের দাবি নয়, একটি সভ্য দেশের ন্যূনতম বন্দোবস্ত। ‘জয় বাংলা’ আওয়ামী লীগের নয়, সিপিবির নয়, কোনও সরকারেরও নয়। এ ধ্বনি সেই মা-বাবার, যাঁরা ঘর ছেড়ে নদী পেরিয়েছিলেন, সেই তরুণের, যে মাঠে নেমে আর ফেরেনি। মনজুরুল আহসান খানের মতো মানুষেরা সেই ধ্বনি ঘাড়ে করে বয়ে এনেছেন বলেই আজও তা বেঁচে আছে। রতন ও তাঁর সহযাত্রীরা যদি ভয়ে বা হিসাবে সেটিকে ছেড়ে দিতে চান, দিন। জাতি ছাড়বে না। একটি স্লোগান কোন দলকে বাঁচায় না, দল মরলেও স্লোগান মরে না। যে ধ্বনি রক্তে লেখা, তাকে থানার খাতায় আটকানো যায় না।

একদিন এই বিভেদের কোলাহল থামবে, আর তখন সবাই দেখবে, আমরা যাঁরা ‘জয় বাংলা’ বলেছি, আমরা কারও পুনর্বাসন চাইনি, চেয়েছিলাম কেবল এটুকু: এই দেশে মানুষ যেন ভয় ছাড়া নিজের কণ্ঠে নিজের স্বাধীনতার নাম উচ্চারণ করতে পারে।

লেখক: ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি বেকার্সফিল্ডের কমিউনিকেশনস বিভাগের চেয়ারপারসন