সমাজে সহনশীলতা কমছে কেন?

ড. প্রণব কুমার পাণ্ডে
২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০

রাস্তায় সামান্য ধাক্কা লাগলে চিৎকার, ফেসবুকে ভিন্নমত দেখলে গালাগাল, পরিবারে মতের অমিল হলে মুখ দেখাদেখি বন্ধ। এগুলো এখন আর অস্বাভাবিক কিছু মনে হয় না। অনেকেরই মনে হয়, আগের তুলনায় আমরা একে অপরকে সহ্য করতে পারছি কম। প্রশ্ন হলো, কেন?

সহনশীলতা মানে নিজের মত ছেড়ে দেওয়া নয়। এর অর্থ, আমার সঙ্গে যার মিল নেই, তার কথা শোনার ধৈর্য রাখা এবং তার বেঁচে থাকার ও কথা বলার অধিকারকে মেনে নেওয়া।

আমরা একমত না-ও হতে পারি, তবু একসঙ্গে থাকতে পারি। একটি সমাজের শান্তি এই সক্ষমতার ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে। তাই এটি কমে গেলে ক্ষতিটা শুধু ব্যক্তির নয়, পুরো সমাজের। আজ আমাদের হাতে হাতে মোবাইল, আর সেই মোবাইলে সারাক্ষণ মতামতের ঝড়। ফেসবুক, ইউটিউব বা টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো এমনভাবে তৈরি, যাতে আমরা বেশি সময় সেখানে কাটাই। যে বিষয় মানুষকে বেশি রাগায় বা উত্তেজিত করে, তা সাধারণত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায়। গবেষকেরা বহুদিন ধরেই বলছেন, এই ব্যবস্থায় আমরা প্রায়ই আমাদের নিজের মতের সঙ্গে মেলে—এমন কনটেন্টই বেশি দেখি। ফলে ধীরে ধীরে মনে হতে থাকে, আমি যা ভাবি, সবাই তা-ই ভাবে। যে ভিন্নমত দেয়, তাকে তখন শত্রু মনে হয়।

এর সঙ্গে আছে মুখোমুখি না থাকার সুবিধা। সামনাসামনি কাউকে কটু কথা বলতে আমরা সংকোচ করি। কিন্তু স্ক্রিনের আড়ালে সেই সংকোচ অনেক কমে যায়। অচেনা কারও সঙ্গে তর্কে জড়ানো সহজ, আর কঠিন কথা বলাও সহজ। এভাবে কটুবাক্য আমাদের অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে।

গুজব ছড়িয়ে পড়া আজ আমাদের সমাজের একটি পরিচিত সমস্যা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনও খবর বা পোস্ট মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। অনেক সময় সেই খবর সত্য কি না, তা যাচাই করার আগেই মানুষ রেগে যায়, প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং কখনো কখনো আইন নিজের হাতে তুলে নেয়। এর ফল হয় ভয়াবহ। নিরপরাধ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন, সম্পর্ক নষ্ট হয়, আর সমাজে অবিশ্বাস বাড়ে। যাচাই করার ধৈর্য না থাকা এবং রাগ আগে আসা, এটি সহনশীলতা কমে যাওয়ারই একটি স্পষ্ট লক্ষণ।

আমাদের রাজনীতিতে ভিন্নমতকে অনেক সময় প্রতিপক্ষ নয়, শত্রু হিসেবে দেখা হয়। আমরা আর ওরা, এই বিভাজন সমাজের নিচের স্তরেও ঢুকে পড়েছে। চায়ের দোকানে, অফিসে, এমনকি পারিবারিক আড্ডায়ও রাজনৈতিক আলোচনা এখন অনেক সময় ঝগড়ায় গিয়ে শেষ হয়। যখন ভোট বা দল দিয়ে মানুষকে চেনা হয়, তখন মানুষের অন্য পরিচয়গুলো ঢাকা পড়ে যায়। সে কারও প্রতিবেশী, বন্ধু বা সহকর্মী— এই সত্যটা হারিয়ে যায়।

মানুষ যখন চাপে থাকে, তার ধৈর্য কমে যায়। এটি সাধারণ মনস্তাত্ত্বিক সত্য। নিত্যপণ্যের দাম, চাকরির অনিশ্চয়তা, যানজট, আর সংসার চালানোর টানাপড়েন মানুষের মেজাজ খিটখিটে করে দেয়। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকা, গাদাগাদি করে চলাফেরা করা, এসবে মানসিক চাপ বাড়ে। ক্লান্ত ও চাপে থাকা মানুষ ছোট বিষয়েও দ্রুত রেগে যায়। এটি তার দোষ যতটা, পরিস্থিতির ফলও ততটাই।

আগে পাড়া-মহল্লায় মানুষ একে অপরকে চিনতো। সন্ধ্যায় একসঙ্গে বসা, সুখ-দুঃখের কথা বলা ছিল স্বাভাবিক। এখন শহরে অনেকে পাশের ফ্ল্যাটের মানুষের নামও জানেন না। যার সঙ্গে আমাদের পরিচয় নেই, তার প্রতি সহানুভূতি রাখা কঠিন। আড্ডা কমেছে, মাঠে খেলার অভ্যাস কমেছে, আর সবাই নিজের স্ক্রিনে ডুবে আছে। যেসব জায়গায় আমরা ভিন্ন ধরনের মানুষের সঙ্গে মিশতে শিখতাম, সেগুলো সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।

সহনশীলতা জন্মগত গুণ নয়, শিখতে হয়। শিশু প্রথমে পরিবার থেকে শেখে। বাবা-মা যদি ভিন্নমতকে অসম্মান করেন বা রাগের বশে চিৎকার করেন, শিশুও তা-ই শেখে। আবার আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষা আর ফলাফলের দৌড় এত বেশি যে, ভিন্নমত শোনা, প্রশ্ন করা বা তর্কের ভদ্র নিয়ম শেখার সুযোগ কম থাকে। এর ফলে অনেকে বড় হয়ে এমন মানসিকতা নিয়ে ওঠে যে,আমি যা বলছি, সেটাই ঠিক। সমস্যার কারণ যেমন একাধিক, সমাধানও ছোট ছোট অনেক পদক্ষেপের সমষ্টি।

প্রথমত, কোনও খবর বা পোস্ট শেয়ার করার আগে একটু থামা। উৎস কী, আর অন্য কোনও বিশ্বস্ত মাধ্যমে একই খবর আছে কি না, তা দেখা। এটুকু অভ্যাসই অনেক গুজব থামাতে পারে।

দ্বিতীয়ত,অনলাইনে তর্কে জড়ানোর আগে ভাবা, আমি কি সত্যিই কিছু বোঝাতে চাইছি, নাকি শুধু জিততে চাইছি? অনেক সময় চুপ থাকাও একটি পরিণত সিদ্ধান্ত।

তৃতীয়ত, পরিবারে শিশুদের সামনে ভিন্নমতকে সম্মান করার উদাহরণ তৈরি করা। শিশুরা আমাদের কথার চেয়ে আচরণ থেকে বেশি শেখে।

চতুর্থত, স্কুল-কলেজে বিতর্ক, আলোচনা ও দলগত কাজের সুযোগ বাড়ানো, যেখানে শিক্ষার্থীরা শোনা ও বোঝার চর্চা করতে পারে।

পঞ্চমত, রাজনৈতিক নেতা ও গণমাধ্যমের দায়িত্ব আছে। তাঁরা যদি ভাষায় সংযম দেখান এবং ভিন্নমতকে শত্রুতা হিসেবে উপস্থাপন না করেন, সমাজে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

ষষ্ঠত, নিজের চেনা বৃত্তের বাইরের মানুষের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা। আমরা যখন কাউকে সামনাসামনি চিনতে পারি, তখন তার প্রতি কঠোর হওয়া কঠিন হয়ে যায়।

সহনশীলতা কমে যাওয়া কোনও একটি কারণের ফল নয়। প্রযুক্তি, রাজনীতি, অর্থনৈতিক চাপ, নগর জীবন আর শিক্ষার ঘাটতি, সব মিলিয়ে এই অবস্থা তৈরি হয়েছে। তবে এটি অনিবার্য নয়। আমরা প্রত্যেকে প্রতিদিন ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নিই। কাউকে অপমান করবো না ক্ষমা করবো, রাগে উত্তর দেবো না একটু থেমে ভাববো, গুজব ছড়াবো না যাচাই করবো, এসবই সেই সিদ্ধান্ত। একটি সহনশীল সমাজ হঠাৎ গড়ে ওঠে না। তা গড়ে ওঠে আমাদের প্রতিদিনের আচরণের মধ্য দিয়ে। আর সেই চর্চা শুরু করার সবচেয়ে সহজ জায়গা হলো— নিজের ঘর আর নিজের মন।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক-প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর

/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
লক্ষ্মীপুরে ৫ ও বানিয়াচংয়ে ৮ জনকে হত্যায় ২ প্রতিবেদন প্রস্তুত
মানবতাবিরোধী অপরাধ লক্ষ্মীপুরে ৫ ও বানিয়াচংয়ে ৮ জনকে হত্যায় ২ প্রতিবেদন প্রস্তুত
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নতুন উপজেলা গঠনের প্রতিবাদে মহাসড়ক অবরোধ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নতুন উপজেলা গঠনের প্রতিবাদে মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা ওয়াসার ব্যর্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের
ঢাকা ওয়াসার ব্যর্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট-২ এর জন্য জ্বালানি সরবরাহ শুরু
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট-২ এর জন্য জ্বালানি সরবরাহ শুরু
সর্বশেষ সর্বাধিক