ফোনের টুইট টুইট শব্দ, এতো সকালে আবার কে ম্যাসেজ পাঠায়- ভাবতে ভাবতে ফোন হাতে নিয়ে ম্যাসেজ অপশন ওপেন করি। লেখা- দোস্ত, আজ আবার দুইজনকে বাসায় ঢুকে হত্যা। ‘আবার’ বলে চট করে ল্যাপটপে আরেকটি পেজ ওপেন করে নিউজ খুঁজতে থাকি। পেয়ে যাই ১০ সেকেন্ডে, পড়ি কলাবাগানে বাসায় ঢুকে দুজনকে খুন। নাম-ধাম পড়ি। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি, যাক নিজেদের ভাই-বেরাদার, আত্মীয়-পরিজন কেউ না। পেজ বন্ধ করে আবার ফিরে যাই খুঁজতে। কোথায় গেলে স্বপরিবারে আনন্দে কাটবে সময়।
দিন বাড়তে থাকে, ডুবে যাই কাজের মাঝে, বাচ্চা, সংসার, গ্রোসারি, বাইরে খাওয়া। বাচ্চাদের সঙ্গে হুটোপুটি। রাত নামলে বিছানায় ঘুমে সবাই। নামে না আমার চোখে ঘুম। সারাদিন ব্যস্ততার অজুহাতে ভুলে থাকার চেষ্টা ব্যর্থ হয় রাতের নীরবতায়। ‘আবারও’ বলে অভ্যস্ত হতে পারি না। চাপা কষ্টে গুমরে উঠি। কেন এতো হানাহানি, খুনোখুনি? আর নিরাপত্তাইবা কোথায়?
সরকারের ভোটের ম্যান্ডেটে কী ছিল মনে পড়ে না। হয়তো ‘বলার জন্য বলা’ টাইপের কিছু। না হলে কেন আজ আমাদের দেশে প্রতিদিন মানুষ খুন হচ্ছে? আর কেনইবা সরকার গা এলিয়ে বসে আছে? দাগ কি কাটে না? বেদনা অনুভব কি করে না? নাকি অনুভূতি শুধু একান্ত আপনজনের জন্য? আপনজনের বিপদের আশঙ্কায় কি পরিমাণ ক্ষোভ জন্মে, তা বোধকরি আর বলার দরকার পড়ে না। চাপাতির আঘাতে যারা মারা যান, তারা কারও না কারও আপনজন, সন্তান।
আরও পড়তে পারেন: নিরাপত্তাকর্মী পারভেজের মুখে হত্যার বর্ণনা
আপনাদের নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। আমাদের রক্ষায়ও আপনারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ-দায়বদ্ধ। তাহলে কেন আজ ‘আমরা নিরাপদ’ এই দাবি করছেন? এই আমরা কারা? আপনারা যারা নিরাপত্তার ঘেরাটোপে থাকেন, যাদের দেওয়ার কথা আমাদের নিরাপত্তা। সরকার ও প্রশাসন চলে আমাদের জন্য, সেই আমরাই নিরাপত্তা নামক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। কিছু চাই না ‘সরকার বাহাদুর’। আমাদের শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন।
একের পর এক মানুষ খুন হচ্ছে, সরকার উদ্ভট কিছু যুক্তি দিয়ে চলেছে। কেন এই কুযুক্তি! ক্ষমতাসীনরা কি বোঝে না, দেশের মানুষকে নিরাপত্তা দিতে পারলে, দুর্নীতি থামাতে পারলে ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হবে। উল্টো তারা দেশ সেবার বদলে নিজেদের সেবাতেই ব্যস্ত। এসব কারণে মানুষের ক্ষোভ জমে উঠছে। গত তিন মাসে সাড়ে ১৫শ খুন, ১৫ এপ্রিলের পর নয় দিনে ৪০টা খুনের পরেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জাতি নিরাপদ!
আরও পড়তে পারেন: নাস্তিক আখ্যা দিয়ে মানুষ হত্যা ইসলাম সমর্থন করে না: শোলাকিয়ার খতিব
প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি বললেন বিএনপি-জামায়াতের ইন্ধনেই কলাবাগানে দুই পেশাজীবী ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপককে হত্যা করা হয়েছে। দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্যই এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থায় আছে। সবাই মিলে এই অপশক্তিকে প্রতিহত করতে হবে।
আপনি আরও বললেন, এই গুপ্তহত্যা কারা ঘটাচ্ছে সবাই বোঝেন। বিভিন্ন রূপে বিএনপি-জামায়াত এগুলো করছে। দেশ যখন সবদিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে; দেশকে অস্থিতিশীল করতে তখন বেছে বেছে এই হত্যাকাণ্ডগুলো করা হচ্ছে। গত নির্বাচনের সময় থেকে দেশকে অস্থিতিশীল করতে তারা মানুষ পুড়িয়ে মারাসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে। এখন ব্যর্থ হয়ে গুপ্তহত্যা করছে। হত্যাকারীরা ধরা পড়বে। তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে।
প্রধানমন্ত্রী আপনি দেশবাসীকে এই অপশক্তির বিরুদ্ধে সজাগ থাকতে এবং এ সংক্রান্ত তথ্য দিয়ে সহায়তা করার আহ্বান জানিয়েছেন।
আরও পড়তে পারেন: ‘অপ্রস্তুত’ পাঁচ পুলিশের সামনে পাঁচ ‘পোলাপান’ খুনি!
কিন্তু হতাশ করলেন প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার মুখ থেকে নিঃসৃত বাণী মানেই হলো অকাট্য, সঠিক তথ্যপূর্ণ, যা প্রমাণ ছাড়া আপনি বলবেন না। আপনি যদি জানেনই জামায়াত বা বিএনপি করছে, তাহলে তাদের প্রধানদের আটক করছেন না কেন? কেন এখনও ওদের নেতারা বাইরে ঘুরছে? কবে তাদের আইনের আওতায় আনবেন? আর কয়জন মারা গেলে আইন প্রয়োগ হবে প্রিয় নেত্রী?
আপনি আমাদের সজাগ থাকতে বলেছেন, আর তথ্য দিয়ে সাহায্যও করতে বলেছেন! তাহলে আর নিরাপত্তা বিভাগের কী দরকার? পুলিশ, র্যাব, গোয়েন্দা বিভাগের কী দরকার? আপনি তো জানেন কারা এসব করাচ্ছে, তারপরও তথ্য দেব?
দেশ এগিয়ে যাচ্ছে সব দিক দিয়ে, এটা খুবই আনন্দের সংবাদ। কিন্তু আমাদের নিরাপত্তার উন্নতি কোথায়? আইন প্রয়োগের উন্নতি কোথায়? আমরা কিছু চাই না। শুধু একটু নিরাপত্তা দেন। রোজ রোজ খুনের রঙ দিয়ে ভোর শুরু করতে চাই না, দিন শেষ করতে চাই না হুমকি নিয়ে, রাত শেষ করতে চাই না ধর্ষণ দিয়ে।
লেখক: সাংবাদিক