জুলাই জাতীয় সনদ ইস্যুতে সংসদে এবং সংসদের বাইরে যেসব বিতর্ক হচ্ছে, সেগুলোর যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া কঠিন। কেননা এই সনদে উল্লিখিত প্রস্তাবগুলোর ব্যাপারে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে খুব পার্থক্য আছে বলে মনে হয় না। অন্তত জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের বক্তৃতায় এটা কখনোই মনে হয়নি যে, তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবেন না। বরং সংসদে আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেছেন, তারা জুলাই সনদের প্রতিটি বাক্য ও শব্দ ধারণ করেন। যদি তাই হয়, তাহলে জুলাই সনদ কেন অহেতুক তর্কের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে?
বিতর্কটা শুরুটা হয়েছে ১২ ফেব্রুয়ারি একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের পরে যেদিন সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করলেন, সেদিনই। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে, যা সংবিধান সংস্কার বিষয়ে সব ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে। পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ হতে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে।
এখানে প্যাঁচ লেগেছে রাষ্ট্রপতি কর্তৃপক্ষ জারিকৃত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ নিয়েই। কেননা বিএনপির যুক্তি হলো, রাষ্ট্রপতি কোনও আদেশ জারি করতে পারেন না। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুসারে সংসদ না থাকা অবস্থায় তিনি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। কিন্তু এমন কোনও অধ্যাদেশ তিনি জারি করতে পারেন না, যাতে সংবিধানের কোনও বিধান পরিবর্তন হয়ে যায়। যেহেতু জুলাই সনদে উল্লিখিত ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত, অতএব এরকম একটি সনদ বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রপতি আদেশ বা অধ্যাদেশ কোনোটাই জারি করতে পারে না। তাহলে এই আদেশের আলোকে অনুষ্ঠিত গণভোটে কেন বিএনপি রাজি হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। বিএনপির তরফে এর কিছু ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে।
বাস্তবতা হলো, যদি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ বা গণভোটের বিতর্ক বাইরেও রাখা হয়, তারপরও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে কোনও বাধা নেই। কেননা এই সনদটি তৈরি হয়েছে ৩০টির বেশি রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে। এই সনদে মোট ৮৪টি প্রস্তাব রয়েছে, যার মধ্যে ৩০টি প্রস্তাবে সবগুলো দল একমত হয়েছে। অনেকগুলো প্রস্তাবে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট বা আপত্তি রয়েছে। পরে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন চূড়ান্তভাবে যে ৪৮টি প্রস্তাব সম্বলিত সনদ অন্তর্বর্তী সরকার পেশ করে, সেই আলোকে রাষ্ট্রপতি ওই আদেশ জারি করেন। কিন্তু এই আদেশ বা গণভোটের ফলাফল বিবেচনায় নিয়ে ত্রয়োদশ সংসদ জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধন করতে বাধ্য নয়। তাছাড়া সরকারি ও বিরোধী দল যদি জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে একমত হয়, সেক্ষেত্রে সেটি সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের আলোকে বিদ্যমান সংসদেই হতে পারে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন আবশ্যক নয়। তাছাড়া জামায়াত ও এনসিপি যেভাবে জুলাই সনদের প্রতিটি প্রস্তাব হুবহু সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে চায়, সেটি সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বিএনপি মানতে বাধ্য নয়। গণভোটে জনগণ হ্যাঁ দিয়েছে মানেই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের আলোকে জুলাই সনদের ৪৮টি প্রস্তাব হুবহু সংবিধানে যুক্ত হবে যাবে, এটি ভাবারও সুযোগ নেই। জামায়াত ও এনসিপি যদি মনে করে যে— জুলাই সনদে উল্লিখিত প্রস্তাবগুলো হুবহু সংবিধানে যুক্ত করতে হবে, তাহলে আর ত্রয়োদশ সংসদের কোনও এখতিয়ার থাকে না। তাহলে আর এই সনদ নিয়ে আলোচনারই কোনও প্রয়োজন ছিল না। তবে জামায়াত ও এনসিপি দুই তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হলে তারা জুলাই সনদের হুবহু ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধানে যুক্ত করতে পারতো।
কেন সংবিধান সংশোধনের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদই লাগবে? এর উত্তরে অনেকে এই যুক্তি দেন যে, গণপরিষদের আদলে একটি পরিষদ গঠন করে যদি সংবিধান সংশোধন করা হয়, তাহলে কেউ আর ওই সংশোধনীর বিরুদ্ধে আদালতে যেতে পারবে না। কিন্তু বিদ্যমান নিয়মে সংবিধান সংশোধন করা হলে সেটি যে কেউ আদালতে চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন। এটা কোনও শক্ত যুক্তি নয়। কারণ ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরের বছর গণপরিষদে যে সংবিধান গৃহীত হয়েছিল, সেই সংবিধানে ১৯৭৩ সালেই সংশোধন আনা হয়। বাহাত্তরের এই সংবিধানে এ পর্যন্ত ১৭ বার সংশোধনী আনা হয়েছে। কয়েকটি সংশোধনী আদালত অবৈধ বলেও রায় দিয়েছেন। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনা হয় ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর সময়ে। এই সংশোধনীর সময়ে বাহাত্তরের সংবিধানের মূলনীতিসহ আদি সংবিধানের অনেক বিধান ফিরিয়ে আনা হয়— যে বিধানগুলো যুক্ত করা হয়েছিল গণপরিষদে। অথচ এই সংশোধনীও আদালত অবৈধ বলেছেন। সুতরাং সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে সংবিধান সংস্কার করলেই সেটা আনচ্যালেঞ্জড থাকবে বা ভবিষ্যতে কোনও সংসদ তা বাতিল করতে পারবে না, এমনটি ভাবার কোনও সুযোগ নেই। সংবিধান সব সময়ই সংশোধন তথা পরিবর্তনযোগ্য এবং এই এখতিয়ার সংসদের।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশ ছিল একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বা একটি ‘ইউনিক সিচুয়েশন’—তার সঙ্গে নির্বাচন-পরবর্তী সময়কালকে মেলানোর সুযোগ নেই। নির্বাচনের পরে যখন সরকার ও সংসদ গঠিত হয়েছে, তখন সেই সরকার ও সংবিধানকে চলতে হবে স্বাভাবিক নিয়মে। সেখানে সংবিধানের নির্দেশনার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। সুতরাং সংবিধান ও আইন মেনে অভ্যুত্থান হয়নি এবং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সবকিছু সংবিধান মেনে হয়নি—এই যুক্তিতে নির্বাচন-পরবর্তী সরকার ও সংসদও আগের মতোই চলবে, এমন বক্তব্যের কোনও যুক্তি নেই। একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সঙ্গে স্বাভাবিক পরিস্থিতির তুলনা করা যায় না।
কিন্তু জুলাই সনদ নিয়ে সংসদে এবং সংসদের বাইরে সরকারি ও বিরোধীদলীয় নেতাদের কথাবার্তায় মনে হচ্ছে, এই ইস্যুতে তাদের মধ্যে বিরোধ অনেক। যেমন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, “সরকার যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে প্রয়োজনীয় সংস্কার থেকে পিছিয়ে যায়, তবে জুলাইয়ের মতো আরেকটি অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি শুরু করা হবে।” (বাংলা ট্রিবিউন, ০৬ এপ্রিল ২০২৬)।
প্রশ্ন হলো, সংস্কার থেকে পিছিয়ে যাওয়ার প্রশ্নটি কেন উঠছে? বিএনপি কি বলেছে যে তারা জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধন করবে না?
সংশোধন না সংস্কার—এই শব্দের মারপ্যাঁচেও পড়েছে জুলাই সনদ। জামায়াত ও এনসিপি বলছে সংবিধান সংস্কার করতে হবে। কিন্তু বিএনপি বলছে সংশোধন। কেননা বিদ্যমান সংবিধানে ‘সংবিধান সংস্কারের’ কোনও বিধান নেই। ১৪২ অনুচ্ছেদে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া বলা আছে। তবে সংশোধনের মধ্য দিয়ে যা করা হয় সেটিও একধরনের সংস্কার। সুতরাং জুলাই সনদের আলোকে যদি সংবিধানে পরিবর্তন আনা হয়, তাহলে সেটিকে সংশোধন বা সংস্কার—যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন, তাতে কোনও ইতরবিশেষ হয় না।
জুলাই সনদে সংবিধানের যেসব পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে, তার সবগুলো হুবহু সংবিধানে যুক্ত করার পক্ষে বিএনপি নয়। যেমন একই ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান না হওয়ার কথা বলা হয়েছে জুলাই সনদের ১৫ নম্বর পয়েন্টে। বিএনপি এই প্রস্তাবের সঙ্গে একমত নয়। উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে বিএনপি একমত হলেও এর গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে জুলাই সনদে যা বলা হয়েছে, সেখানে বিএনপির ভিন্নমত আছে। কিন্তু বিএনপি উচ্চকক্ষ গঠনের বিরোধী নয়। সংবিধান সংশোধন বিল আইনসভার উভয় কক্ষে পাস হতে হবে—এমন প্রস্তাব করা হয়েছে জুলাই সনদে। কিন্তু বিএনপি এই বিধানের সঙ্গে একমত নয়।
আবার জুলাই সনদে উল্লিখিত নেই, কিন্তু বিএনপি সংবিধানে যুক্ত করতে চায়, এমনও কিছু বিধান আছে। যেমন— জিয়াউর রহমান সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর সময় সংবিধানের মূলনীতি পরিবর্তন করেছিলেন এবং ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ কথাগুলো যুক্ত করেছিলেন। ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর সময় বাহাত্তরের মূল সংবিধানের আলোকে চার মূলনীতি (জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা) ফিরিয়ে আনা হয় এবং ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ কথাগুলো বাদ দেওয়া হয়। জুলাই সনদে এ সম্পর্কে কোনও প্রস্তাব না থাকলেও বিএনপি পঞ্চম সংশোধনীর আলোকে সংবিধানে এই কথাগুলো আবারও যুক্ত করতে চায়। বিএনপির যেহেতু সংসদে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, অতএব তারা চাইলে তাদের মতো করে সংবিধানে সংযোজন-বিয়োজন করতে পারবে। এই এখতিয়ার সংবিধানই তাদের দিয়েছে।